সকালটা সাপোর্ট সেন্টারের জন্য অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, কিন্তু মরিয়মের জন্য আজকের সকালটা একটু আলাদা। জানালার বাইরে সূর্যের আলো যখন ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকছিল, তখন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ ধরে। নিজের প্রতিচ্ছবি সে আগে বহুবার দেখেছে, কিন্তু আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে এই মানুষটা তার নিজের।
চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ আছে, কিন্তু মুখে এখন আর সেই ভয়ের ছায়া নেই। যে মুখ একসময় শুধু নির্দেশ আর বকুনি শুনে অভ্যস্ত ছিল, সেই মুখেই এখন একটা স্থিরতা এসেছে। সে চুলটা ঠিক করে নেয়, তারপর ধীরে ধীরে নিজের জন্য রাখা সাধারণ একটা ওড়না গায়ে দেয়।
আজ তার জীবনে একটা ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিন।
সাপোর্ট সেন্টারের ট্রেনিং শেষ করে আজ কয়েকজন নারীকে ছোট কাজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হবে। মরিয়মের নামও সেই তালিকায় আছে।
সে খাতাটা হাতে নেয়।
এই খাতাটা এখন শুধু লেখা নয়, এটা তার নতুন জীবনের সাক্ষী। প্রতিদিন সে এখানে কিছু না কিছু লিখেছে—কখনো ভয়, কখনো শেখা, কখনো নিজের ভেতরের পরিবর্তন।
সে শেষ পাতাটা খুলে লেখে—
“আমি এখন আর শুধু কারো স্ত্রী নই, আমি আমি।”
লেখার পর সে কিছুক্ষণ থেমে থাকে।
তারপর খাতাটা বন্ধ করে ব্যাগে রাখে।
অন্যদিকে শহরের অন্য প্রান্তে ইয়াসিন সেই একই সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এইবার তার চোখে আগের মতো অস্থিরতা নেই, আছে ক্লান্তি আর বোঝার চেষ্টা।
সে ভেতরে ঢোকে।
রিসেপশনে এবার আগের সেই নারী নেই, অন্য একজন আছে। ইয়াসিন ধীরে বলে, “আমি মরিয়মের সাথে দেখা করতে চাই।”
নারীটি তাকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
“আপনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছেন?”
ইয়াসিন মাথা নাড়ে।
“না… কিন্তু আমি তার স্বামী।”
এই শব্দটা বলার পরও সে নিজেই বুঝতে পারে, এই “স্বামী” শব্দটা এখন আর আগের মতো শক্তিশালী না। এটা এখন শুধু একটা সম্পর্কের পরিচয়, ক্ষমতার না।
নারীটি তাকে বলে, “সে এখন ট্রেনিং সেশনে আছে। আপনি অপেক্ষা করতে পারেন, কিন্তু দেখা হবে কি না সেটা তার সিদ্ধান্ত।”
এই কথাটা ইয়াসিনকে আবার থামিয়ে দেয়।
তার মনে পড়ে যায় সেই রাত—যখন মরিয়ম রান্নাঘরে একা দাঁড়িয়ে ছিল, আর সে শুধু বলেছিল, “মাকে বিরক্ত করো না।”
সেই এক লাইন আজ তার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অন্যদিকে মরিয়ম ট্রেনিং রুমে বসে আছে।
তার সামনে কয়েকটা নারী বসে আছে, সবাই নিজের মতো গল্প করছে। কেউ নতুন কাজ শিখছে, কেউ চাকরির স্বপ্ন দেখছে।
মরিয়ম মন দিয়ে শুনছে।
একজন নারী বলে, “আমি আগে ভাবতাম আমি কিছুই করতে পারব না।”
আরেকজন বলে, “আমার স্বামী আমাকে ঘর থেকে বের হতে দিত না।”
এই কথাগুলো শুনে মরিয়মের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়।
সে বুঝতে পারে, সে একা না।
তার কষ্টটা ব্যক্তিগত ছিল, কিন্তু একক না।
এই প্রথম সে নিজের গল্পকে বড় একটা বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
ঠিক তখনই ট্রেনিং লিডার ঘোষণা দেয়—
“আজ যাদের সিলেকশন হবে, তারা আগামী সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করবে।”
মরিয়মের নাম ডাকা হয়।
এই শব্দটা শোনার পর তার ভেতরে একটা কাঁপুনি হয়।
সে উঠে দাঁড়ায়।
তার পা একটু থেমে যায়, কিন্তু সে বসে পড়ে না।
এটাই তার প্রথম সিদ্ধান্ত, যেটা কেউ তাকে নিতে বলেনি।
অন্যদিকে ইয়াসিন বাইরে বসে আছে।
সে ঘড়ির দিকে তাকায়।
মরিয়ম বের হবে।
কিন্তু কীভাবে বের হবে, কীভাবে তাকাবে, কী বলবে—সে জানে না।
তার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে।
“সে কি আমাকে ঘৃণা করে?”
এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
কারণ সে নিজেই জানে, সে যা করেছে, সেটা শুধু ভুল না—এটা ছিল নীরব অন্যায়।
বিকেলের দিকে মরিয়ম ট্রেনিং শেষ করে বের হয়।
তার হাতে একটা ছোট কাগজ দেওয়া হয়েছে—চাকরির প্রথম সুযোগের অনুমতি পত্র।
সে সেটা দেখে একটু থামে।
তার চোখে হালকা পানি আসে।
কিন্তু সে মুছে ফেলে।
এইবার সে কান্নাকে থামায় না, সে সেটাকে শক্তিতে বদলে ফেলে।
সেন্টারের গেট দিয়ে বের হতেই সে দেখে ইয়াসিন দাঁড়িয়ে আছে।
দুইজন এক মুহূর্তে থেমে যায়।
চারপাশের শব্দ যেন কমে যায়।
শুধু তাদের দুজনের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দূরত্ব দাঁড়িয়ে আছে।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বলে, “মরিয়ম…”
মরিয়ম তাকায়।
তার চোখে কোনো রাগ নেই, কিন্তু আগের সেই নরমতা নেই।
“তুমি ভালো আছো?” ইয়াসিন জিজ্ঞেস করে।
এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এখানে এটা অনেক ভারী।
মরিয়ম কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর বলে, “আমি এখন বুঝতে শিখছি আমি খারাপ ছিলাম না।”
এই কথাটা ইয়াসিনের বুকের ভেতর গিয়ে লাগে।
সে নিচু স্বরে বলে, “আমি তোমাকে খুঁজছিলাম।”
মরিয়ম একটু হালকা হাসে।
“তুমি আমাকে তখন খুঁজোনি, যখন আমি ঘরের ভেতরে ছিলাম।”
এই বাক্যটা থেমে যায় না, এটা যেন সত্য।
ইয়াসিন মাথা নিচু করে ফেলে।
মরিয়ম আবার বলে, “তুমি জানো, সবচেয়ে কষ্টের ছিল না কাজ, কষ্টের ছিল না রাত জাগা… কষ্টের ছিল তোমার চুপ থাকা।”
ইয়াসিন কিছু বলতে পারে না।
কারণ এই সত্যের সামনে কোনো অজুহাত কাজ করে না।
ঠিক তখনই কিছুটা দূর থেকে সবুরা বেগমের গাড়ি এসে থামে।
তিনি নেমে আসেন।
তার মুখে আগের সেই কঠোরতা নেই।
তিনি মরিয়মকে দেখে থেমে যান।
প্রথমবার তিনি মরিয়মকে শুধু “বউ” হিসেবে না, একজন মানুষ হিসেবে দেখেন।
তিনি ধীরে বলেন, “তুমি ভালো আছো?”
এই প্রশ্নটা শুনে মরিয়ম একটু অবাক হয়।
কারণ এই প্রশ্নটা সে আগে কখনো শোনেনি।
মরিয়ম কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর বলে, “আমি এখন শিখছি কিভাবে ভালো থাকা যায়।”
এই কথাটা তিনজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাতাসকে ভারী করে তোলে।
সবুরা বেগম কিছু বলতে চান, কিন্তু পারেন না।
তার ভেতরে বহু বছরের অভ্যাস ভাঙছে।
তিনি বুঝতে পারছেন, ক্ষমতা দিয়ে সম্পর্ক টিকে থাকে না।
ইয়াসিন ধীরে বলে, “তুমি কি ফিরে আসবে?”
এই প্রশ্নটা এই গল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মরিয়ম তার দিকে তাকায়।
তার চোখে এখন আর সেই আগের ভয় নেই, নেই নির্ভরতা।
শুধু আছে নিজের তৈরি হওয়া একটা মানুষ।
সে ধীরে ধীরে বলে—
“ফিরে আসা মানে যদি আবার আগের মতো হওয়া হয়, তাহলে না।”
এই বাক্যটা থেমে যায়।
কিন্তু বাতাসে থেকে যায়।
ইয়াসিন চুপ থাকে।
সবুরা বেগমও চুপ থাকে।
কারণ এই নীরবতার ভেতরেই প্রথম সত্যটা জন্ম নিচ্ছে।
মরিয়ম আবার বলে, “আমি কাউকে হারাতে আসিনি। আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।”
তারপর সে ধীরে ধীরে সামনে হাঁটা শুরু করে।
পেছনে কেউ ডাক দেয় না।
কারণ কেউ জানে, এই মুহূর্তে তাকে থামানো মানে আবার ভাঙা।
সে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার দিকে যায়।
তার হাতে সেই চাকরির কাগজ।
তার চোখে নতুন আলো।
পেছনে পড়ে থাকে একটা বাড়ি, একটা পরিবার, আর বহু বছরের বোঝা।
সামনে আছে অচেনা জীবন।
যেটা এখনো সহজ না, কিন্তু নিজের।
ইয়াসিন আর সবুরা বেগম দূর থেকে তাকিয়ে থাকে।
একজন হারানোর ব্যথায়, আরেকজন উপলব্ধির ভারে।
কিন্তু দুজনেই বুঝে গেছে
এটা শেষ না। এটা শিক্ষা।

0 Comments