সায়ন আর আয়না নদীর পাড়ে বসে আছে চুপচাপ। আস্তে আস্তে আকাশ হালকা মেঘাচ্ছন্ন হলো। হঠাৎ পাড়ে একটা ছোট নৌকা ভিড়ানো আছে দেখে সায়ন আয়নাকে বলল, —চলুন… ওদিকে যাই। সে আয়নার হাত ধরে ধীরে ধীরে নৌকায় কাছে গিয়ে আয়নকে সহ নিয়ে নিজেও এক পাশে বসাল। নদীর জল হালকা দুলছে,। আয়না আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে থেমে থেমে। হঠাৎ আয়না বলল, —আমি একটু আপনার বুকে মাথা রাখবো? খুব ক্লান্ত লাগছে… একটু রাখি? সায়নের বুকটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে আয়নাকে টেনে নিজের কাছে এনে তার মাথাটা বুকের উপর রাখল। আয়না চোখ বন্ধ করে রইল। তার অশ্রু সায়নের শার্টের এক পাশ ভিজিয়ে দিচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর আয়না ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল—যখন আমার পনেরো বছর বয়স, তখন আব্বুর হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হলো। আম্মু নিজের সব গয়না বিক্রি করে আব্বুকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু না… তখনই শুরু। আব্বুর চাকরি চলে গেল, জমানো টাকা শেষ হয়ে গেল। একদিন হঠাৎ বাড়িটাও বিক্রি করে দিলেন। কারণটা আজও জানি না। সেদিন খুব কেঁদেছিলাম… বাড়ির জন্য না, আমার কাঠগোলাপ গাছটার জন্য। মনে হয়েছিল এখানে আমার শৈশব, আমার সব সুখ রেখে যাচ্ছি । পরে আব্বু আরেকটা চাকরি পেলেও শরীর ভালো থাকত না।
এরপর আমাদের জীবনে অভিশাপ হয়ে এলো গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলে রকি সবসময় বিরক্ত করতো স্কুল কলেজ কোথাও যেতে পারতাম না। একদিন বাজারে আব্বুর সাথে গিয়েছিলাম, ভরা মানুষের মাঝে সে আমার ওড়না টেনে ধরল। সবাই দেখল, কিন্তু কেউ কিছু বলল না চেয়ারম্যানে ছেলে কে কি বলবে। আব্বু অনেক আকুতি-মিনতি করে আমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু রকির অত্যাচার দিন দিন বাড়তে লাগল। তাই আব্বু তাড়াহুড়ো করে আমার বিয়ে ঠিক করলেন। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের পছন্দ ছিল না বউমা পড়াশোনা করবে, তাই আমি এইচএসসি পরীক্ষাটাও দিতে পারলাম না।
বিয়ের পর বুঝলাম, এক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক যন্ত্রণায় পড়েছি। স্বামী অন্য এক মেয়ের জন্য আমাকে অপমান করত, মারধর করত। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও আমাকে মানুষ মনে করত না। বিয়ের এক মাস পরই সে অন্য মেয়ের সাথে চলে গেল। আমি শ্বশুরবাড়ির কাছে বোঝা হয়ে গেলাম, তাই তারা আমাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিল।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—বাবা-মায়ের কাছেও একসময় আমি বোঝা হয়ে দাঁড়ালাম। রকির অত্যাচার আবার বাড়তে লাগল। আমাকে বাঁচাতে আব্বু সিদ্ধান্ত নিলেন দূরে কোথাও রাখবেন। তাই ওই চাচা নামক জানোয়ার টার বাড়ি রেখে আসা বাবা আসার সময় বরে ছিলেন মোস্তফা আমার মেয়েটাকে একটু দেখে রাখিস। কিন্তু আমাকে রেখে ফেরার পথে, বাস দুর্ঘটনায় বাবা মা মারা যাই। সেদিন আর কাঁদার মতো চোখে পানি ছিল না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম শূন্যে চোখে।
শুরুর দিকে চাচিরা ভালো ব্যবহার করতো ভাবলাস হয়তো সুখের মুখ দেখবো একটু কিন্তু আস্তে আস্তে বদলে গেল সব। খারাপ ব্যবহার অত্যাচার শুরু হলো। যাবে বাবা৷ আসনে বসিয়ে ছিলাম সে চাচা খারাপ নজরে তাকাত। চাচিদের বললে উল্টো আমাকেই মারত। একদিন চাচা রুমে ঢুকে অসভ্য আচরণ করতে চাইলে আমি চিৎকার করে চাচিদের বলেছিলাম। তারা উল্টো আমাকে বেশ্যা বলল, কুন্তি দিয়ে মারল, তিনদিন খেতে দেয়নি। আমি চাচিদের কাছে একটু খাবার চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে কুকুরের মতো লাথি মারলো জানেন দেওয়ালেও মাথাতে বারি খাইয়েছিলো তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
আয়না শিশুর মতো সায়নের জামা আঁকড়ে ধরল। সায়নের চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। আয়না কষ্টের হাসি হেসে বলল, —কি করবো বলুন? মানুষ তো… খিদে-পিপাসা তো লাগবেই।
এরপর যেন সব অভ্যাস হয়ে গেল। এক রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম, জানোয়ার টা ঘরে ঢুকে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি প্রাণপণে চিৎকার করলাম। চাচিরা এসে উল্টো আমাকেই মারতে লাগল। আশেপাশের মানুষ জড়ো হলো। চাচিরা বলল, আমি নাকি তাদের স্বামীর সাথে বাজে কাজ করতে চেয়েছি। হায়রে সমাজের মানুষের বিচার উল্টো জানোয়ার টার সাথে বিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নেয় কারণ কি জানেন আমার আর কোথাও বিয়ে হবে না আর আমার জন্য নাকি জানোয়ার টার সম্মান নষ্ট হয়েছে
আমি রাজি হইনি। তখন সে একটা ছবি দেখাল—আমার শরীর বিকৃত করে বানানো একটা ছবি।
আয়নার গলা কেঁপে উঠল, সে হঠাৎ খেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগল।
নদীর জল দুলছে, আকাশ নিঃশব্দ। চারদিকে এক অদ্ভুত শান্তি। সায়ন আয়নাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল। আয়নার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তেই থাকল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “আচ্ছা, আপনিও কি আমাকে বে—” বাকিটুকু আর বলা হলো না। তার আগেই সায়ন ঝুঁকে এসে আয়নার ঠোঁট নিজের আয়ত্তে নিল। যেন বহুদিনের জমে থাকা অস্থিরতা এক মুহূর্তে উছলে উঠেছে—অস্থির, পাগল করা এক চুম্বন। দীর্ঘ পাঁচ মিনিট পর সে ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল, ছাড়ার আগে হালকা রাগ মেশানো এক কামড় বসাল আয়নার ঠোঁটে। ব্যথায় আয়না “উমুহ…” করে উঠল।
সায়ন নিচু গলায় বলল, “পরের বার কথাটা যদি সেই মুখ দিয়ে বের হয়, তার ফল কিন্তু এর থেকেও খারাপ হবে। আপনি আমার কাছে একগুচ্ছ সদ্য ফোটা কাঠগোলাপের মতো শুভ্র—আপনার পবিত্রতা আমার অনুভূতির সবচেয়ে নির্মল জায়গাটায় বাস করে।”
আয়না চুপ করে সায়নের বুকে মাথা রাখল। তার কাঁধ কেঁপে উঠছে, মাঝে মাঝে হেঁচকি তুলে ফেলছে।
“শুনছেন…”
“হুম…”
“ভালোবাসেন?”
সায়ন একটু থেমে বলল, “সব কথা মুখে বলতে নেই।”
আয়না আরও একটু জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করল, “আমি শুনতে চাই…”
তারপর চারপাশ আবার নিঃশব্দ হয়ে গেল। শুধু শোনা যাচ্ছে নদীতে বহমান স্রোতের আওয়াজ আর দুই মানব মানবির হৃদয় স্পন্দ যেন না বলা সব কথা বুঝে নেওয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নামলো কিন্তু কেউ জায়গা থেকে উঠলো না বসেই রইলো।

0 Comments