“অপ্রিয় তুমি”

“অপ্রিয় তুমি”

 দাদুর রুম থেকে বেরিয়ে রিনি, সিঁথি, উৎসা তিনজন বসলো সোফায়। তিনজন জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এমন সময় হাতে এক কাপ কফি নিয়ে এলো সালেহা বেগম। সিঁথিকে বলল,

"সিঁথি যা না এটা মেহরাব কে দিয়ে আয়। রান্না ঘরে আমার অনেক কাজ পড়ে গেছে"
উৎসা উঠে বলল,
"চলো আমি তোমায় হেল্প করছি"
সিঁথি ঝট পট কফির কাপ উৎসার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
"তোর সাহেবের কফি তুই দিয়ে আয়। আমি যাচ্ছি আম্মুকে হেল্প করতে"
উৎসা রিনির দিকে তাকাতেই রিনিও ফটাফট উঠে দাঁড়ালো। রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
"আমিও আম্মুকে হেল্প করতে যাচ্ছি"
দুজন হাওয়া হয়ে গেল। উৎসা ব্যাক্কেলের মতো ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। হুট্ করে দুজনের কি হলো কিছুই বুঝতে পারলো না। তাকিয়ে রইলো ওদের যাওয়ার দিকে। সালেহা বেগম তাড়া দিয়ে বলল,
"যা না মা। জানিস তো কফি ঠান্ডা হয়ে গেলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলবে"
উৎসা করুণ চোখে তাকালো। কি দরকার ওর মতো ছোটো খাটো মানুষটাকে বাঘের গুহায় পাঠানোর? সালেহা বেগম চলে গেল। আর কোনো উপায় নেই। অগত্যা উৎসাকেই যেতে হবে। কিছু করার নেই। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলো। মেহরাবের ঘরের সামনে পৌঁছতেই বুকে মোচর দিয়ে উঠলো। বারবার একই স্মৃতি নাড়া দিয়ে ওঠে। উৎসা ভয়ে জমে যায়। কোনো মতে কাঁপা কাঁপা হাতে দরজায় ধাক্কা দিলো। প্রবেশ করলো রুমের ভেতর। হিম শীতল পরিবেশ রুমের ভিতরে। গাঁ শিউরে ওঠার মতো। উৎসার গাঁয়ে কাপুনি দিয়ে উঠলো। এতো ঠান্ডা কেন? বাহিরের তাপমাত্রা তো বেশ স্বাভাবিক। চোখ গেল এসির পাওয়ারের দিকে। এসির পাওয়ার বেশ কমানো। উৎসার এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো এটা ফ্রিজিং রুম। কোনো সাধারণ মানুষের কক্ষ মোটেও না। উৎসা এগিয়ে গিয়ে কফির কাপটা রাখলো। চোখ পড়লো বিছানায় মাঝ বরাবর ঘুমিয়ে থাকা মেহরাবের দিকে। উদাম শরীরে উবুড় হয়ে কোমর পর্যন্ত কম্ফোটার গাঁয়ে জড়িয়ে শুয়ে আছে। বুকের নিচে একটা বালিশ রাখা। উৎসা অবাক হলো। এই তাপমাত্রায় লোকটা কিভাবে আছে? তার কি একটুও ঠান্ডা লাগছে না? দেখে তো মনে হচ্ছে না! মেহরবারের উস্ক খুস্ক চুল। উৎসার ইচ্ছে করলো হাত বাড়িয়ে লোকটার সিল্কি চুল গুলো ছুঁয়ে দিতে। জেগে থাকলে কখনোই সেটা সম্ভব না। মানুষটাকে দেখলেই ওর বুকের মাঝে ধুপুক ধুপুক করে। মনের মাঝে ঝড় শুরু হয়। সাহস হয়না মানুষটার চোখের দিকে তাকানোর। উৎসা সাহস করে এগিয়ে গেল। হাত বুলিয়ে দিলো মেহরাবের ঘন কালো কেশ গুচ্ছে। মানুষটার চুল গুলো বেশ ঘন কালো মেয়েদের চুল কেও হার মানায়। একদম সিল্কি সিল্কি। মনে হয় হাতে নিলেই ফস্কে পড়ে যাবে। উৎসা হাত বুলিয়ে উঠতে নিলে হাতে টান পড়লো। এক টানে উৎসা বিছানায় পড়ে গেল। সোজা মেহরাবের উন্মুক্ত বুকে। মেহরাবের খোলা বুকে উৎসা আছড়ে পড়লো। মুহূর্তের মাঝে কি থেকে কি হলো উৎসা বুঝে উঠতে পারলো না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে আবিষ্কার করলো মেহরাবের উন্মুক্ত বহুদয়ের মাঝে। মেহরাব উৎসাকে আরো খানিকটা কাছে টেনে নিলো। যতোটা কাছে নেওয়া যায়। পারে না বুকের মাঝে ঢুকিয়ে ফেলে। উৎসার মাথা যেয়ে ঠেকলো মেহরাবের বুকে। উৎসা কেঁপে কেঁপে উঠলো। মেহরাবের শরীর ঠান্ডা। মনে হলো কোনো আত্মার সাথে শুয়ে আছে। মেহরাব মুখ গুজলো উৎসার ঘাড়ে। মেহরাবের উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে উৎসার ঘাড়ে। বেচারি এমন ঘটনায় শিউরে উঠলো। প্রথম বারের মতো কোনো পুরুষ ওর এতটা কাছে। তার নিঃশ্বাস এসে পড়ছে উৎসার উন্মুক্ত কাঁধে। মেহরাব মুখ গুঁজে রাখা অবস্থায় ক্ষীণ কণ্ঠে সুধালো,
"কখন এসেছো?"
মেহরাবকে এতো কাছ থেকে অনুভব করে উৎসার কথা গুলো গলায় দলা পাকিয়ে আটকে গেল। গলার স্বরও আজকে বেইমানি করছে। তবুও উৎসা নিজেকে সামলে কোনো মতে বলল,
"এইতো একটু আগে"
"মিথ্যা বলছো কেন? তুমি আরো আধ ঘন্টা আগে এসেছো"
উৎসা অবাক হলো। উনি জানলো কিভাবে উৎসা আধ ঘন্টা আগে এসেছে? উনি তো ঘুমিয়ে ছিলো।
"আপনি জানলেন কি করে?"
মেহরাব নেশালো কণ্ঠে বলল,
"তোমার উপস্থিতি আমি অনুভব করতে পারি। আমার ঘটা করে জানতে হয় না। তুমি আমার আশেপাশে থাকলে আমি টের পাই"
উৎসা অবাক হলো। মানুষটার কোনো আধ্যাত্মিক শক্তি আছে নাকি? নাহলে ও আসলে ওর উপস্থিতি টের পাবে কি করে?
"তোমার ঐ ছোট্ট মাথায় এতো কিছু ঢুকবে না। তাই প্রেসার দিয়ে লাভ নেই"
উৎসা অপমানিত বোধ করলো। উঠে যাওয়ার জন্য মোচড়া মুচরি শুরু করে দিলো। মেহরাব ধমকদিয়েই বলল,
"সমস্যা কি? সাপের মোচড়া মুচরি করছো কেন?"
"রুমের দরজা খোলা। যে কেউ এসে পড়বে"
"কেউ আসবে না। সবাই জানে তুমি আমার রুমে এসেছো। সো নো টেনশন"
"তাও। আমি উঠবো। ছাড়ুন আমায়"
"উঠে কোথায় যাবে?"
"নিচে যাবো"
"কেন?"
উৎসা কণ্ঠ নামিয়ে নিলো। মিন মিনে কণ্ঠে বলল,
"নিচে সবাই আছে। এতক্ষন এই রুমে থাকলে সবাই কি ভাববে?"
"কিছু ভাববে না। তুমি রিলেক্স থাকো"
মেহরাব ফের উৎসার ঘাড়ে মুখ গুজলো। উৎসার মাঝে ঝড় বইছে। মেহরাবকে এতো কাছ থেকে অনুভব করে বুকে ধুপুক ধুপুক করছে। এই বুঝি আত্মা বাবাজি বেরিয়ে আসবে।
মেহরাব উৎসার ঘাড়ের কাছে জামা ঘাড় গলিয়ে কিছুটা সরিয়ে দিলো। অতঃপর ছোটো ছুটো চুমু বসালো সেখানে। মেহরাবের ওষ্ঠের ছোঁয়ায় উৎসা আঁকড়ে ধরে মেহরাবের বাহু। মেহরাব তাতে হাসে। হেসে ফিসফিসিয়ে বলল,
"এইটুকুতেই এই অবস্থা হলে আমায় সামলাবে কি করে?"
উৎসার কান দিয়ে গরম ধোয়া উঠলো। মনে হলো কেউ কানে মরিচ ডলে দিয়েছে। গাল লাল হয়ে উঠলো। লোকটার যতো সব বেলাজ মার্কা কথা বার্তা। মেহরাবের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। মেহরাব উৎসার অবস্থা বুঝে হাসলো।
"আচ্ছা যাও আর কিছু করবো না। চুপচাপ শুয়ে থাকো"
"আপনি উঠবেন না? কফি তো ঠান্ডা হয়ে যাবে"
"কফি ঠান্ডা হলে হবে। রাতের শেষ ভাগে কাজ শেষ করে ঘুমিয়েছি। আমার ঘুম এখনো পরিপূর্ণ হয়নি"
উৎসা ঝটপট বলল,
"তাহলে আপনি ঘুমান। আমি গেলাম"
মেহরাবের কাট কাট কথা,
"আমি ঘুমাবো, তুমি একপা নড়লো খবর আছে। আমি উঠে যদি তোমাকে না পাই তাহলে সারাদিন তোমায় এভাবেই থাকতে হবে। মনে রেখো"
উৎসা শুকনো ঢোক গিললো। বজ্জাত লোকটা যে ওর মান সম্মান কিছু রাখবে না সেটা উৎসা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে। বাহিরে যেয়ে ওদের মুখ দেখাবে কি করে? সিঁথি আর রিনি নিশ্চই ওকে খেপাবে। উৎসার কান্না করতে ইচ্ছে করলো। কোন কুক্ষনে লোকটার রুমে পা রেখেছিলো? মেহরাব ফের উৎসার ঘাড়ে মুখ গুঁজে চোখ বুজেছে। উৎসা এটা সেটা ভাবছে।

Post a Comment

0 Comments