অপরাজিতা

অপরাজিতা

 বিয়ের তিন মাস পর আমার স্বামী নিশান আমাকে রেখে ইতালি চলে গিয়েছিল। দীর্ঘ আট মাস পরে আজ দেশে ফিরছে সে। বছরের পর বছর দেশে আসা ওর কাছে স্বাভাবিক বিষয়। তবে এবার সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে—আমি, আর আমাদের অনাগত সন্তান, একসাথে তিনজন পাড়ি দেব ইতালিতে।

বাচ্চা এখনো হয়নি, মাতৃ*গ*র্ভে আছে। আমি আট মাসের প্রেগ*ন্যা*ন্ট । সামনের মাসেই ডেলিভারির তারিখ। ডাক্তার সম্পূর্ণ বেড রেস্ট দিয়েছেন বলে এখন বাপের বাড়িতে আছি। তাছাড়া নতুন বিয়ে, স্বামী বিদেশে, নতুন অবস্থায় তাকে ছাড়া শ্বশুরবাড়িতে থাকাটা খালি খালি লাগে। তাই বাবার বাড়িতে থাকাটাই স্বস্তিদায়ক মনে হয়েছে।
তার আসার খবর শুনে গতকালই শ্বশুরবাড়ি যেতে চেয়েছিলাম। সে বাধা দিলো। বলল, "রিস্ক নেওয়ার কি দরকার? শুধু এক রাত বাড়িতে কাটাবো, তারপরেই তোমার কাছে চলে আসব। ওখানেই বেশি সময় থাকব।"
সে যতই বলুক, আমার এই ছটফটানিটা সে টের পাচ্ছে না। শুধু আমি জানি, আমার ভেতরে কি চলছে। আমি এক রাতও অপেক্ষা করতে পারছি না। তাকে কাছে পেতে চাই, জড়িয়ে ধরতে চাই। সে আমার শহরেই আছে অথচ আমার পাশে নেই—এই ভাবনায় মনটা আরও ধুকপুক করতে লাগলো।
চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। না, চোখ বন্ধ করলেও চোখের সামনে ভেসে উঠছে ওর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। প্রথম কাছে আসা, শরীর কাঁপা, স্পর্শ করা, হাত ধরা—আর কত কী! আপনাআপনি লজ্জায় মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। মিটিমিটি হাসতে লাগলাম।
ভিডিও কল করলাম তাকে। বললাম, "আর সহ্য হচ্ছে না আমার, পাখি হয়ে উড়ে এসো জান।’"
সে হেসে বলল, ‘"পা*গ*লী আমার! একটু অপেক্ষা করো, সকালটা হোক। দেখবে আমি তোমার কাছে চলে আসছি। খুব টায়ার্ড আমি। এখন একটু ঘুমুতে দাও, প্লিজ।"
ছাড়তে মন চাচ্ছিল না তাকে, তবু কল কাটলাম। সত্যিই তো, বেচারা অনেক ক্লান্ত। একটু ঘুমিয়ে নিক।
তখনি পেটের মধ্যে পুঁচকেটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ওকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে বিড়বিড় করে বললাম, "জানো সোনা, তোমার আব্বু আসছে। কাল প্রথমবার তোমাকে ছুঁয়ে দেখবে! তুমি টের পাবে তো? চিনতে পারবে তো বাবার স্পর্শ? জানো? তোমার আগমনের খবর পেয়ে সবচেয়ে খুশি হয়েছিল তোমার পাপা....!রাজপুত্রের সঙ্গে মনে মনে কথা বলতে বলতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, টেরই পাইনি।
সকালে বড় ভাবির ডাকে ঘুম ভাঙলো। ঘড়ির কাঁটায় তাকিয়ে দেখি সকাল সাতটা বাজে। ভাবি বললেন, "ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নাও সুমাইয়া।"
তারপর মিটিমিটি হেসে বললেন,
"আজ একটু পরিপাটি হয়ে থেকো, কেমন? কতদিন পর দুজনার দেখা হবে!"
ভাবির কথায় লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম।
ভাবি চলে গেলেন। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। রুমে ফিরে হাতে ভর দিয়ে চেয়ারে বসলাম। শরীর এত ভারি হয়েছে যে হাঁটাচলা, বসা-উঠা—সবই কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে।
মা বিভিন্ন রকম ফল নিয়ে এসে আমার পাশে বসলেন। খেতে খেতে অনেক গল্প করলাম।
ঘরে সুস্বাদু খাবারের রান্না চলছে। ঘ্রাণে বাড়িটা মইমই করছে। বড় ভাই বাজার থেকে বড় রুই মাছ, গলদা চিংড়ি, গরুর মাংস—আরও কত কি এনেছেন! বাড়ির জামাই আসছে বলে কথা! কোনো দিক দিয়েই কোনো ত্রুটি নেই।
আমার তো কোনো কাজ নেই। বসে বসে ফোন টিপছি আর ওর কথা ভাবছি। সকাল থেকে বহুবার ফোন চেক করেছি, অথচ ওর কোনো কল পেলাম না। মন খারাপ করিনি। অনেকদিন পর বাড়ি এসেছে, কত লোক দেখতে আসছে— হয়তো আলাপে ব্যস্ত। এই ভেবে আমিও আর কল করিনি।
১১টার দিকে ভাবি হালকা গরম পানি দিয়ে দিলেন। গোসল করে কমফোর্টেবল একটা প্রে*গন্যা*ন্সি ফ্রক পরলাম। মুখে হালকা ফেস পাউডার, চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে লিপস্টিক দিলাম। আয়নায় নিজেকে দেখলাম, মাশাআল্লাহ লাগছে আমাকে।
দুপুর ১২টা বাজে। নিশানের এখানে এসে লাঞ্চ করার কথা। আমার বাড়ি থেকে তার বাড়ির দূরত্ব ৩ ঘন্টা। এখন নিশ্চয়ই সে গাড়িতে। কল করলাম, কয়েকবার রিং হওয়ার পরেও রিসিভ হলো না। শাশুড়ী মায়ের কাছে কল করে জানলাম, সে এগারোটায় বাড়ি থেকে বের হয়েছে আমাদের বাড়ি আসার জন্য। তার অপেক্ষা করতে লাগলাম আমিসহ ঘরের সবাই।
অপেক্ষা করতে করতে ২টা পার হয়ে গেল, নিশান এখনও আসেনি। কল করছে একাধারে সবাই, কিন্তু সুইচ অফ। আমার মুখ নিভে গেল। দুনিয়ায় যত রকমের বিপদ আপদ আছে, সব একে একে মনে পড়তে লাগল।
আমার বেহাল অবস্থা দেখে মা আমাকে ধরে বসালেন। বুঝালেন, রাস্তাঘাটে কত ঝামেলা হয়, জ্যাম থাকে, সময়ও যায় মাঝেমধ্যে। টেনশনের কিছু নাই। তোর শাশুড়ী তো বলেছে, চলে আসবে, দেখিস।
না, মায়ের কথা ঠিক হয়নি। সন্ধ্যা পেরিয়ে এশার সময় হতে গেল, তার খোঁজ নেই এখনও। শশুড়বাড়ি আর আমার বাড়ির সবাই যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউ পারছে না। অবশেষে আমার দুই ভাই থানায় গেলেন। আমার দেবর, শশুড়সহ ওখানের অনেক লোক সবাই এক হয়ে সবাই মিলে থানায় জিডি করলেন। আমার আপন চাচা সেনাবাহিনীর উচ্চপদে আছেন, তিনি তার পরিচিত পু*লি*শ অফিসারদের দিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়েছেন।
আমি নামাজ পড়লাম, জায়নামাজে বসে কাঁদতেই আছি। কেঁদে কেঁদে দোয়া করছি, "আল্লাহ, আমার স্বামীকে সকল ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করো। সে যেখানেই থাক, তাকে সুস্থভাবে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।" এমনিতে প্রে*গ*ন্যা*ন্ট, তার ওপর মনের মধ্যে যে কী যাচ্ছে, তা বলার মতো নয়। সবাই ঘিরে বসে, পজিটিভ বুঝাচ্ছে আমাকে। টেনশন না করতে বলছে, কারণ বেশি টেনশন করলে বাচ্চার ক্ষতি হবে।
আমি চাচ্ছি কান্না যেন থামে, তবুও চোখের পানি অনবরত পড়তেই আছে। কাঁদতে কাঁদতে একদম নেতিয়ে পড়েছি। প্রেশার হাই হয়ে গেছে। ডাক্তারকে কল করে নিয়ে আসছিল ভাবি। ডাক্তার ঔষধ দিয়েছে, ঘুমাতে বলেছে। কিন্তু আমি সন্ধ্যা থেকে না ঘুমিয়ে আছি। ঘুম না আসলে জোর করে তো ঘুমাতে পারব না। আমার স্বামী হুট করে উধাও, এতকিছুর মাঝে ঘুম পালিয়ে যাওয়ারই কথা।
অপেক্ষা করতে করতে সময় যেতে থাকে। ভাইয়েরা এখনও কেউ বাড়ি ফেরেনি। এদিকে ভোর চারটা বাজে। মা সজাগ ছিলেন এতক্ষণ, একটু আগে উনার চোখ লেগে গেছে।। ছোট বোনও পাশে ঘুমাচ্ছে। শুধু ভাবি সজাগ। চুপচাপ শুয়ে আছেন। ভাবিকে বললাম,
"আরেকবার কল দাও, ভাবি। দেখো ভাইয়া কী বলেন। কোন খবর পাওয়া গেলো নাকি!"
ভাবি কল করলেন, ভাইয়া কী বলছে জানিনা, ভাবি উঠে বাহিরে গেলেন। ভাবির চলে যাওয়া দেখে আমার মনে কু ডাকছে। সন্দেহ লাগছে। আমি ধীরে ধীরে খাট থেকে নামলাম। দরজার পাশে পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভাবি কথা বলছেন আস্তে আস্তে। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। তখনই প্রস্রাবের বেগ পেল প্রচুর। ওয়াশরুমে ঢুকলাম।
তখনি মা ডাকলেন, "সুমাইয়া, তুই কই?"
জবাব দিলাম, "মা, আমি ওয়াশরুমে আছি।"
মিনিট দুয়েক পর বের হয়ে দেখি মা রুমে নেই। বারান্দায় বের হলাম। দেখি, ভাবি আর মা অন্যরুমে ফিসফিস করে কথা বলছেন। তাদের এইসব লুকোচুরি দেখেই আমার ভয় বাড়ছে। কী এমন কথা তারা এরকম আমাকে এড়িয়ে গিয়ে বলছে? শুনতেই হবে আমার। আমি চুপ পায়ে হেঁটে পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্পষ্ট শুনতে পেলাম, ভাবি বলছে, "সুমাইয়ার এই অবস্থা, যদি সে শুনে, নিশান তাকে ঠকিয়ে অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেছে, তার অবস্থা কী হবে মা, বুজতে পারছেন?"
কথাটা শুনে আমার শরীর ভূমিকম্পের মতো এক ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠল। আমি টের পেলাম, পুরো বাড়ি যেন আমার চারপাশে ঘুরছে। সবকিছু অন্ধকার লাগছে। নিজেকে আর স্থির রাখতে পারিনি। আল্লাহ গো! বলে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম সেই জায়গায়।
মাথা ঝিনঝিন করছে। চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় ব্যথা অনুভব করলাম পুরো শরীরে। চোখ খুলতে গেলে কষ্ট হলো। তবু আস্তে আস্তে বন্ধ চোখ খুললাম। নিজেকে অচেনা একটা জায়গায় দেখে চমকালাম। চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে বুঝলাম আমি হাসপাতালে। চট করে মনে পড়তে লাগলো রাতের ঘটনা। কলিজা কাঁপতে শুরু করল, ধড়ফড় করে উঠার চেষ্টা করে ব্যথা পেলাম। স্যালাইন লাগানো হাতে। পেটে হাত দিয়ে আমার আ*,ত্মা শুকিয়ে গেল। পেটে আমার মানিক নেই। পেট খালি। জোরে কান্না করে দিলাম।
ঠিক তখনই নার্স আসলো রুমে। জিজ্ঞেস করলাম, “আমার মা কই? আমার বেবি কই?”
নার্স বলল, “আপনি কেবিনে আছেন। আপনার বাড়ির সবাই আছে এখানে।”
“আর আমার বাচ্চা? পেট খালি কেন আমার?”
নার্স চুপ থাকল। আমি হেঁচকা টান দিয়ে স্যালাইনের সুচ খুলে উঠলাম। নার্স শক্ত করে আমাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেও পারল না। চেচিয়ে উঠলো, “রোগীর লোক কই? পড়ে যাবেন তো উনি!”
আমি চি*ৎ*কার করলাম, “মা!”
ভাবি দৌড়ে এসে আমাকে ধরলেন, “তুমি উঠেছো কেন?”
“আমার ছেলে কই ভাবি?”
“সে আছে। তুমি বসো তো এখানে। বসো। তোমার যা অবস্থা, এই অবস্থায় উঠছো কেন? দেখো তো, হাতে র*ক্ত বের হচ্ছে।”
মা আমার দিকে তাকাচ্ছেন না। মুখ ঘুরিয়ে আছেন। কেঁদে কেঁদে ডাকলাম মাকে, “মা, তাকে আমার কাছে এনে দাও। তাকাও না মা। আমার দিকে তাকাও। মুখ ঘুরিয়ে আছো কেন?”
মা এসে আচমকা আমার হাত ধরে কাঁদতে লাগলেন। আমি স্ত*ব্ধ। কিছু টের পাচ্ছি। কাঁপছে শরীর। “কি হয়েছে মা খুলে বলো, আমাকে টেনশনে রেখো না।”
ভাবি আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, "দেখো সুমাইয়া, আমাদের হাতে কিছু নেই। সব আল্লাহর হুকুমে হয়।
কাল রাতে তুমি এমন জোরে ফ্লোরে পড়েছিলে যে, ভিতরে থাকা বাচ্চার চাপ সহ্য হয়নি। ডেলিভারি ডেট নিকটে হওয়ায়, আগেভাগেই প্র*স*বের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। হাসপাতালে নেয়ার আগেই বাচ্চার মাথা নিচের দিকে নেমে আসে... তোমার ওমনভাবে পরে যাওয়ায় বাচ্চার মাথায় প্রচণ্ড চাপ পড়ে, অনেক র*ক্তও যায়। তুমি তখন অ*জ্ঞা*ন ছিলে।
তোমাকে আর বাচ্চাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাচ্চাকে এনআইসিইউতে রাখা হয়। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বাচ্চার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগায় তারা হার মেনেছেন। ঘণ্টাখানেক আগে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়!"
আমি পা*থর হয়ে বসে থাকলাম। বুঝতে পারছি না আমার সাথে কি হচ্ছে, না হচ্ছে। টাল খেতে লাগল মাথা। সবাই আমাকে ঘিরে ধরল আবার। পানি খাওয়ালো। মা পা*গল হয়ে ডাক্তারকে ডাকলেন। ডাক্তার এসে আমাকে উত্তে*জিত না হতে বললেন।
আমি স্থির থাকতে পারছি না। মাকে বললাম, “আমার কিছু হবে না। আমার পোড়া কপাল। পোড়া কপাল যাদের, তাদের কিচ্ছু হয় না। আমাকে আমার ছেলের কাছে নিয়ে যাও। উঠো। ধরো আমাকে।”
মা আর ভাবি আমাকে বাচ্চার ওয়ার্ডে নিয়ে গেলেন। আমার কলিজাটা ঘুমিয়ে আছে অচেতন হয়ে। কী সুন্দর চেহারা আল্লাহ দিয়েছেন, মাশাআল্লাহ। তার কাছে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন আমার বাবা আর ভাই। আমি তার কাছে বসলাম। হাতে-পায়ে পা*গলের মতো হাত বুলিয়ে চুমু খেতে লাগলাম। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না তো আছেই।
পাশেই একজন ডাক্তার ছিলেন, তাঁকে ডাকলাম জোরে। কাছে আসলে অনুরোধ করলাম, “প্লিজ, আরেকবার চেক করে দেখুন না, হয়তো বেঁচে আছে।”
ডাক্তার না বলেননি। আমার কথামতো দেখলেন। দুইবার চেক করলেন। তিনি বললেন, “বাচ্চা আর নেই। আপনার জন্য আবারও দেখলাম। মন খারাপ করবেন না। আল্লাহর ইচ্ছে সব।”
মা জোরে জোরে কাঁদছেন। হাসপাতালের অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে মায়ের কাছে। আমি বাবুর পায়ের কাছে মাথা নুইয়ে আমার ঠোঁটজোড়া তার পায়ে লাগিয়ে বসে আছি। চোখের পানিতে আমার বুক ভিজে গিয়ে সিটে পড়ছে।
মহিলারা আমাকে বুঝাতে লাগলো, “ছোট বাচ্চা মা*রা যাওয়া ভালো। কেয়ামতের দিন সুপারিশ করে মা-বাবাকে জান্নাতে নেবে। তোমার ভাগ্য ভালো, তাই আল্লাহ তোমার বাচ্চাকে উনার কাছে নিয়ে গেছেন।”
কারও কথা আমাকে স্পর্শ করছে না। আমার ভেতর যে অদ্ভুত ব্যথা হচ্ছে সেটা আল্লাহ ছাড়া কেউই টের পাবে না।
বাচ্চাকে বাড়ি নিয়ে যাবে।
আমি বললাম, “আমার কোলে দাও। বাড়ি পৌঁছানোর আগে অব্দি সে আমার কোলে থাকুক।”
নার্স বলল, “আপনার শরীর ভালো না। ট্রিটমেন্ট চলছে। আপনাকে হাসপাতালে থাকতে হবে।”
আমি কারও কথা শুনিনি। মাকে বললাম, “দরকার হলে পরে আসব। তবুও আজ থাকব না হাসপাতালে। ম*রলে ম*রব, তাও থাকব না।”
বাবা-ভাই মিলে আমার ওষুধ নিয়ে অ্যা*ম্বু*লে*ন্সে করে বাড়ি চললাম। সারা রাস্তা ছেলেকে আমার কোলেই রাখলাম। বুকের সাথে বুক জড়িয়ে রাখলাম। চুমু খেলাম। গাড়ি থেকে নামলে মা বললেন, “আমার কাছে একটু দে সুমাইয়া, আমি একটু সোনাটারে বুকে জড়িয়ে রাখি।”
আমার সাথে যে কাল রাত থেকে এত কিছু হয়েছে তা নিশানের বাড়ির কেউ জানেনা। রাগে আমাদের বাড়ির কেউ তাদের জানায়নি। অবশেষে হয়তো ভাবি জানিয়েছেন, বাচ্চার খবর। শাশুড়ি, ননদ, শ্বশুরসহ আরও কয়েকজন আসছেন ওখান থেকে। শ্বশুর একবার বলছিলেন, "আমাদের বংশের ছেলে আমাদের বাড়ি নিয়ে ক*ব*র দেই।" কথাটা আমার কানে আসতেই সারা শরীরে আ*গুন ধরে গেল আমার।
গলা উঁচু করে বললাম, "ও আমার ছেলে! আমার পেট থেকে হয়েছে। এটাই ওর বড় পরিচয়। ওর বাবা নেই, বাবার বাড়ির কেউ নেই। আমার ছেলের ক*ব*র আমার বাবার বাড়িতেই হবে। আমার চোখের সামনে থাকবে। এটাই শেষ কথা।"
তারা কেউ আর কিছু বলেনি। চুপ থাকলেন।
শাশুড়ি আমার কাছে অনুনয় করলেন অনেক, দুঃখ প্রকাশ করলেন, কাঁদলেন। ছেলের জন্য তো আর তাঁকে বা তাঁর পরিবারের অন্য কাউকে দোষ দিতে পারি না।
ছেলের ক*বর দেওয়া হলো। হাসপাতাল থেকে বাড়ি এনে ক*বর দেওয়া পর্যন্ত আমি স্বাভাবিক ছিলাম। কান্না করিনি।
কিন্তু যখন তাকে ক*বর দিয়ে সবাই বাড়ি আসল, তখন আকাশ, গাছ-গাছালী ভেঙে চুরে বৃষ্টি নামলো ধরণীতে। চারপাশ ঘন কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল।
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সব খালি লাগতে লাগল।
এই গল্পের সকল পর্ব এবং আপডেট জানতে "Sneh0" পেইজটাকে ফলো করতে পারেন।
যার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম, যাকে কোলেপিঠে করে আদরে মানুষ করতাম, হেসে খেলে দিন যেত, সে আজ আমার কাছে নেই। একটা বিড়াল পুষলেও তার প্রতি মানুষের মায়া হয়, আর যাকে নয়টা মাস কষ্টে, যন্ত্রণায় গ*র্ভে বড় করলাম, সেই মানিক আজ আর আমার পেটে নেই। বড্ড খালি খালি লাগে পেটটা। পেটের চারপাশে হাত বুলিয়ে এক হাতে শক্ত করে ধরে মুখে ওড়না গুঁজে চি*ৎকার করতে লাগলাম। এত অসহায় আমি নিজেকে কখনও অনুভব করিনি৷
আমাকে পরদিন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে অনেকদিন থাকার কথা থাকলেও দিন কমিয়ে নিয়ে আসি। বলি, বাসায় ভালোভাবে ট্রিটমেন্ট করব৷ বাসায় থাকার মূল কারণ—বাড়ির পশ্চিম দিকে আমার ছেলের ক*বর। আমি সেটা রোজ কয়েকবার দেখি। রোজ রাতে তার জন্য আমি কাঁদি।
নিশানের প্রতি এমন ঘৃ*ণা জন্মেছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। জা*নো*য়া*রকে সামনে পেলে জ্যা*ন্ত মে*রে ফেলতাম আমি।
আস্ত এক খু*নি সে। তাকে পু*লি*শে ধরিয়ে শা*স্তি না দিলে আমি শান্তি পাব না।
অ*মা*নুষটার জন্য আজ আমার বাচ্চা আমার কাছে নেই।
তার কথা তো বলাই হয়নি—আমার ছেলে মা*রা যাওয়ার পরদিন তার সমস্ত তথ্য জানা গেছে।
কক্সবাজারের একটা হোস্টেলে উঠেছিল মেয়েটাকে নিয়ে। অলরেডি বিয়ে করেছে তারা। মেয়েটার বাড়ি তার আর আমার বাড়ির ধারেকাছেই।
তাদের সম্পর্ক নাকি বিয়ের আগে থেকেই ছিল। বিচ্ছেদ হয়েছিল মাঝখানে, তাই পরিবারের কথামতো বিয়ে করেছিল।অবশেষে একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে না পেরে বিয়ে করেছে।
মেয়েটার প্রতি ও রাগ হলো প্রচুর। যদি হাতের সামনে পাই, তাকেও শেষ করে দেব আমি।
তোদের এত ভালোবাসা কোথায় থাকে রে! কী সুন্দর করে তোরা মানুষকে শেষ করে ফেলিস!
মেয়েরাই মেয়েদের প্রধান শত্রু।
জানে একজন বিবাহিত, তবুও বিয়ে করে! যতই আগের প্রেমিক হোক না কেন! ন*ষ্টা মেয়ে!
দুইদিনের মধ্যেই চাচা তাদের গ্রেফতার করেন।
একজন বউকে ডিভো*র্স না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে—এর জন্য নিশানের একবছর জেল আর টাকা জরিমানা করা হয়।
আমার পক্ষ থেকে ডিভো*র্স পেপার ও পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
যেদিন তাকে গ্রেফতার করে থানায় নেওয়া হয়, সেদিন ভাবি মাকে সঙ্গে নিয়ে আমিও যাই চাচা, বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে।
পু*লিশ অফিসারকে বলি, “আমার একটু কথা আছে, একটু দাঁড় করান ওদের।”
চাচা থামাতে বললে অফিসার থামিয়ে দিলেন।
নিশান এক পলক আমার দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। মেয়েটা মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমি পায়ের জুতো খুলে দুই হাতে দুজনকে এলোপাতাড়ি মারতে থাকি।
ভাবি আমাকে টেনে সরান।
আমি চি*ৎ*কার করে বলি, “চাচা, ওদের ওতটুকু শা*স্তি দেবেন যতটুকু আমি পাচ্ছি। আমার কাছ থেকে আমার বাচ্চাকে কেড়ে নেওয়ার শাস্তিটাও দেবেন।
যন্ত্রণা দিতে দিতে দুজনকে জ্যান্ত মে*রে ফেলবেন। আদালতে মেয়েটার বিচার হবে না জানি, ওরে আমার কাছে ছেড়ে দিন, থা*প্পড় আর লা*ত্তি দিতে দিতে শেষ করে ফেলব আমি। ভাবি টেনে সরান আমাকে। হাাঁপাতে থাকি আমি। জোরে নিশ্বাস নেই।
________
দিন, মাস গড়িয়ে যায়। আমার ক্ষত ধীরে ধীরে সারতে থাকে। না, নিশানের জন্য আমার খারাপ লাগে না। কখনও আমার কলিজা কাঁদে না—কাঁদে আমার বাচ্চার জন্য।
হয়তো নিশানের জন্য আমার অনেক কষ্ট হতো, যদি আমার বাচ্চা মা*রা না যেত।
যার কারণে আমার সব শেষ, সে আমার কাছে আস্ত একটা জা*নো*য়া*র। এর থেকে বড় পরিচয় আর কিছু নেই তার।
আগের চঞ্চল আমি দিন দিন চুপচাপ, গম্ভীর হয়ে যাচ্ছি। কারও সঙ্গে বেশি কথা বলি না, আগের মতো হাসি না।
একজন বে*ই*মা*ন আমার সব কেড়ে নিয়েছে। এখনও সে জে*লে। মেয়েটা কই জানিনা৷ তাদের তালাক হয়নি এতটুকু জানি। সাজা শেষ হবে, বের হবে। দুটো মিলে সংসার করবে। করুক।
আমার কিছু যায় আসে না। আমি তার কোনো খবর রাখি না।
তবু হঠাৎ হঠাৎ, মনের বিরুদ্ধে গিয়ে মনে হয়—সে কেন আমার সঙ্গে এমন করল?
সে তো বহুবার বলেছে, আমাকে ভালোবাসে, আগলে রেখেছে, কেয়ার করেছে।
তবে এত যত্ন করে কীভাবে মানুষ মানুষকে ঠকাতে পারে? আমার কোনো হিসেবই মেলে না।
জীবনের এত কঠিন সময় পার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি আমি। ধুঁকে ধুঁকে ম*র*ছি রোজ। নতুন করে বাঁচতে চাই। আগের আমি হতে চাই। হাসিখুশি দিন ফিরে পেতে চাই। হুট করে একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, এ শহরে আর থাকব না। বাংলাদেশেও না। পাড়ি জমাবো এবার সাত সমুদ্রের ওপারে।
ফ্রান্সের প্যারিসে আমার বড় বোন, তার মেয়ে আর জামাই থাকে।দুলাভাইয়ের নিজস্ব ব্যবসা আছে সেখানে। আমি সেখানে যাব।
ভিন্ন জায়গায় গেলে হয়তো আমার আগের আমিকে একটু হলেও খুঁজে পাব।
নতুন করে সব পেছনে ফেলে বাঁচতে পারব। নিশান আমাকে ঠকিয়ে দিব্যি বেঁচে থাকতে পারলে, আমি কেন ঠকে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারব না?
অবশ্যই পারব। পারতেই হবে আমাকে।
পাসপোর্ট অলরেডি আগে থেকে করা আছে আমার। বাবাকে বললাম, "আমার সবকিছু রেডি করো, আপুর সঙ্গে কথা বলে। আমি প্যারিস যাব। দয়া করে কেউ বাধা দিও না। আমাকে নতুন করে বাঁচতে সাহায্য করো।"
আপা আর দুলাভাইয়ের মাধ্যমে লং-স্টে ভিসা হয় আমার। হাতে পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই ফ্রান্সে পা রাখি। সেখানে গিয়ে বসে না থেকে একটা কফিশপে জব নেই দুলাভাইয়ের মাধ্যমে। মূলত সব সময় কাজের মধ্যে ব্যয় করতে চাই। ঘটে যাওয়া ঘটনা যেন গভীরভাবে মনে না পড়ে, আর পড়লেও যেন তার প্রভাব তেমন না পড়ে, সব ফোকাস যেন কাজেই থাকে। সময়টা ভালোই কাটছিল। ভালো সময়কে আরও ভালো রূপ দিতে আমার জীবনে একজনের আগমন হলো। সেও ওখানে একটা কোম্পানিতে জব করে। আমাকে কফিশপে দেখে একদিন। তারপর পরপর এক সপ্তাহ একই কফিশপে আসে। আমাকে একদিন ডেকে বলে, “আমাকে বিয়ে করবেন?”
আচমকা এমন কথায় আমি তাজ্জব বনে গেলাম। রাগও হলো কিঞ্চিৎ। পুরুষদের প্রতি নিজের অজান্তেই কেন জানি একটা রাগ চলে আসছিল ভিতর থেকে। তাই কোনো ছেলের এত মাখামাখি কথাবার্তা একদম অসহ্য লাগে আমার। কিন্তু ছেলেটা রোজ আসতে লাগল কফি শপে। এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে আমাকে। অস্বস্তি ফিল হয় আমার। সহ্য করতে না পেরে সরাসরি একদিন বলেই দিলাম, “আপনি কফি খেতে আসেন, না কি মেয়েদের দেখতে আসেন?”
সে এক গাল হেসে বলল, “আপনাকে দেখতে আসি, কোনো সমস্যা?”
ফিরে কিছু বলার না পেয়ে সেখান থেকে সরে যাই।
দুলাভাই আর আপাকে বিষয়টা জানাই। দুলাভাই সরাসরি তার সাথে কথা বলেন। আমাকে ডিস্টার্ব করতে না বলেন। সে দুলাভাইকে আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। বিয়ের কথা শুনে দুলাভাই আমার সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বলেন। সে তাও বিয়ে করতে চায়। দুলাভাই আর আপার সাথে তার একটা সুন্দর সম্পর্ক হয়ে যায়। কিন্তু আমি তখনও এড়িয়ে চলি। নতুন করে কোনো পুরুষের সাথে জড়াতে চাচ্ছিলাম না। কফি শপে আসা-যাওয়া সে কমিয়ে দিলো। সপ্তাহে দু’দিন আসে। তার যাতায়াত এখন বাসাতেই হয়, দুলাভাইয়ের সাথে ভালো বন্ধুত্ব তাই। আমি তেমন সামনে পড়ি না। সে দুলাভাইয়ের বাসার পাশেই বাসা নেয়।
এক সকালবেলা হাঁটতে বের হয়েছি। খোলা বাতাসে, নিরিবিলি রাস্তায় হাঁটছি। দূরে ছেলে-মেয়েরা জগিং করছে। গাছের ডালে দুটো পাখি টুকটাক করছে। সে জায়গায় থেমে গিয়ে অবাক চোখে তাদের দেখছি। কী যে সুন্দর লাগছে দেখতে!
"জোড়ায় জোড়ায় সবাইকে ভালো লাগে"— কথাটি শুনে চমকে গেলাম আমি। খানিক ভয়ও পেলাম। বুকে থু থু দিয়ে পেছনে ফিরে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে এক গাল হেসে দাঁড়িয়ে আছে ওই লোকটা। নামটা তার রোশান, দুলাভাইয়ের কাছে শুনেছি।
আমার আনইজি ফিল হচ্ছে, এত সকালে এই লোক এখানে! রাস্তায় প্রায় ফাঁকা। সে কি আমাকে ফলো করছিল? হেঁচকি উঠলো আমার। শক্ত হয়ে বললাম, “আপনি আমার পেছন পেছন আসছেন কেন? কবে ছাড়বেন এসব পাগলামি? ক্লিয়ার কথা শুনেন, কোনো অনুভূতি নেই আমার। আমি আপনার সাথে কখনও প্রেমে জড়াব না। দয়া করে আমার পিছু ছাড়েন। আপনি এরকম করলে আমি বিব্রতবোধ করি।"
“আমি তো প্রেম করতে চাই না। বিয়ে করতে চাই। বিয়ের পর প্রেম করব। একজনের কাছে ঠকছো বলে, অন্যজনকে শাস্তি দেবে কেন? আমি তোমাকে চাই। চাই মানে চাই। তুমি আমার না হলে আমি নিজেকে শেষ করে দেবো।”
প্রচণ্ড বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে তাকালাম তার দিকে। “পা*গ*ল হইছেন?”
“হ্যাঁ, পা*গ*লই।” তারপর সে মুখ মলিন করে বলল, “দয়া করে মেনে নাও। আজ কতদিন ধরে তোমাকে চেয়ে যাচ্ছি কিন্তু পাচ্ছি না। আমার কষ্ট হয় খুব। একবার আমার হয়ে দেখো, কত ভালো রাখি তোমায়। দুঃখ তোমাকে ছুঁতেও পারবে না। প্লিজ সুমাইয়া। মেনে নাও।”
আমি কোনো কথা না বলে চলে আসি। চলে আসলে কি হলো! তার কথাগুলো কানে বাজছিল খুব। যতই বলি, পুরুষের প্রতি আগ্রহ উঠে গেছে, তবু আমার অবচেতন মন চায়— কেউ আমাকে ভালোবাসুক, যত্ন করুক, আগলে রাখুক। নতুন করে হাসিখুশি থাকতে শিখাক। ভালো থাকতে কে না চায়, আমিও চাই। শুধু বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
তার প্রতি আস্তে আস্তে ফিলিংস আসতে শুরু করে। তবু তাড়াতাড়ি পাত্তা দেই না। সেও পিছু হটে না। সেইম এনার্জি নিয়ে আমাকে চাইতে থাকে। আপা অনেক বুঝালো আমায়, মাকে ফোন দিয়ে বলল, আমাকে বুঝাতে। সবাই বুঝালেন যাতে রাজি হই। এভাবে চলতে চলতে একসময় আমিও সায় দেই। ভাবলাম, নতুন করে আরেকবার সুন্দরভাবে বাঁচার চেষ্টা করেই দেখি। হয়তো সুখ আসবে। সবাই তো আর ঠকায় না।
তার পরিবারের খোঁজ নিলেন দুলাভাই। বলল, মা-বাবা নেই। শুধু একটা বোন আছে, বিবাহিত। তার সাথে সে কথাও বলিয়ে দিলো। তার দেশের বাড়ি সিলেটে, আর আমার দেশের বাড়ি বরিশাল। অনেক দূর। ছেলেকে দেখে সবার ভালো লেগেছে। আপা-দুলাভাইয়ের ভেতরে সে ততদিনে অনেক জায়গা করে নিয়েছে। তাই তাকে বিশ্বাস করে বোনের সাথে ফোনে কথা বলে সব ঠিক করা হলো। বাড়িতে আর যায়নি কেউ।
বিয়ে হলো প্যারিসে। ছোট্ট আয়োজনে বিয়ে সম্পন্ন হলো। বিয়ের পরবর্তী সময় এতো সুন্দর ভাবে কাটতে লাগলো, যা বলার বাহিরে। সে এত মুগ্ধ হয়ে আমাকে দেখে, আমারই লজ্জা লাগে। এত ভালোবাসে, এত কেয়ার করে—যা দেখে আমি অবাক হই। ভেতর খুশিতে ভরে ওঠে। হাসি আর ভাবি, মানুষটাকে ফিরিয়ে দিলে কত কিছু মিস করতাম। এত যত্ন, ভালোবাসা আর কোথায় পেতাম! সে আমাকে নিয়ে রোজ ছুটির দিনে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। খুব ভালো গান গায় সে। আমার কোলে মাথা রেখে গান শুনায়। রাতে গান গেয়ে চুলে বিলি কেটে ঘুম পাড়ায়। সবসময় মনে হতো, দুঃখের পরেই বোধহয় সুখ হয়। আমার কপালে এত সুখ! হাজার শুকরিয়া আল্লাহর দরবারে।
দিন ভালো কাটে আমার। সময় ভালো যায়। রাজরানীর মতো আছি আমি। নিশানকে একটা বার দেখাতে ইচ্ছে হয়, বলতে ইচ্ছে করে, দেখো—ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে আমায়, সেই আমাকেও কেউ কত যত্ন করে ভালোবাসছে, ইম্পরট্যান্স দিচ্ছে। তুমি বেইমানি না করলে এত ভালোবাসা আমি কোথায় পেতাম?
বছর খানেক পর সে দেশে ফিরতে চায়। আমি আসব কিনা জিজ্ঞেস করলে আমি জানাই, তুমি যাও, আমি আরও কয়েকদিন পরে আসব। সে দেশে আসে। আমার ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করে তাকে ছাড়া। কষ্ট হয়। তার সাথে না এসে ভুল করলাম—এমনটাই মনে হতে লাগল।
খারাপ লাগলো তখন খুব বেশি, যখন দেখলাম, সে দেশে গিয়ে আমার সাথে কথা বলা কমিয়ে দিলো—বলে দিনে একবার বা দুবার, তাও অল্প সময়। মন ছটফট করতে লাগল আমার। আজেবাজে কত কিছু মনে আসতে লাগল। তবু সে যখন কথা বলে তখন সব উধাও হয়ে যায়। কারণ খুব সুন্দর করে কথা বলে। যত্ন করে বলে। তার কথা শুনলেই আমি ফিল করি, সে আমাকে কতটা ভালোবাসে। সময় কম দিচ্ছ কেন জিজ্ঞেস করলে বলে, জমি নিয়ে মা*মলা চলছে, আরও কত কিছু—এজন্য সময় হচ্ছে না।
দিন দিন সময় আরও কমতে থাকে। আমি ছটফট করতে থাকি। মন খারাপে, একলা বিকেলে তাকে মনে পড়ে, কিন্তু চাইলেই পাই না। এসব পীড়া দিচ্ছিলো খুব। আর সহ্য করতে না পেরে আপাকে বলি, আমাকে দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। আমি আর থাকব না। নিশ্চয় রোশানের কিছু হয়েছে, নয়তো এমন করতো না আমার সাথে।
সবকিছু ঠিক করে এক মাসের ব্যবধানে বাড়ি আসি। রোশানকে জানাইনি যে আসছি। বাড়ি এসে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেই। মুগ্ধ হয়ে দেখি পুরো বাড়ি। ছেলের ক*ব*রের পাশে গিয়ে চুপচাপ খানিক দাঁড়িয়ে থাকি। তার কবরে আমের আঁটি ফেলে রেখেছিলাম—সে গাছটা অনেকটা বড় হয়েছে। বাতাসে গাছের ছোট ছোট পাতা আর ঘাসের পাতা নড়ছে, দেখতে খুব ভালো লাগছে। মুগ্ধ হয়ে দেখছি, পাতা নড়া দেখলে আমার মন পাড়ি দিয়ে দিচ্ছে ওই জগতে।
যত দাঁড়িয়ে থাকব, তত মন-মেজাজ খারাপ হবে, তাই আর না দাঁড়িয়ে বাড়ি যাই। মা-ভাবির সাথে এতদিনের জমা গল্প করি।
ওই দিন রাতে জানাই রোশানকে—আমি দেশে আসছি। তুমি এসে নিয়ে যাও আমাকে, নয়তো পুরো ঠিকানাটা দাও—ভাইয়াকে নিয়ে আসব।
সে বলল, বাড়িতে মা*মলা চলছে, এটা শেষ হোক। তুমি এসো না, আমিই আসব। মানলাম তার কথা। সে আসলো দুদিন পর। থাকলো এক সপ্তাহ। অনেক ঘুরলাম তাকে নিয়ে। বললাম, বাড়ি কবে নিবা? বাড়ি যেতে চাই। নয়তো পরে ছুটি ফুরিয়ে যাবে।
বলল, শীঘ্রই নেবো। এটা সমাধান হোক, জানিয়ে দেবো। আমাকে যেতে হবে লক্ষীটি। বুঝতেই পারছো, কত ঝামেলা বাড়িতে। সব ঠিক করে তোমাকে এসে নিয়ে যাব। ঘুরবো কয়েকদিন।
তার কথায় “আচ্ছা” বললাম। তবু জানি না কেন, ভেতরে একটা খটকা লেগেই থাকল। তার দেশে আসার পর থেকেই আমার এমন লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা বদলে গেছে।
তার জেলা-উপজেলা সব জানি। কখনও যাওয়া হয়নি ওখানে, তাই ক্লিয়ারলি অত চিনি না। সাহস করে বসলাম, ওখানে যাব। তাকে না জানিয়ে যাব। ছোট ভাইকে নিয়ে সিলেটের নাইট গাড়িতে উঠলাম। ভাবলাম, সিলেট নেমে তার কাছে কল দিয়ে সারপ্রাইজ দেবো। আর কোন গ্রামে বাড়ি সেটা জানব।

Post a Comment

0 Comments