তেজস্বী

তেজস্বী

 স্বামী দ্বিতীয়বার বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে বাড়িতে পা রেখেছে। খবর পেয়ে কৌতূহলী প্রতিবেশীরা উঠোনে ভিড় জমিয়েছে। সবার মনেই এক প্রবল উত্তেজনা হয়তো আর কিছুক্ষণ পরেই প্রথম প*ক্ষের স্ত্রী*র আর্তনাদ আর কান্না শুরু করবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি একপাশে শান্ত হয়ে বসে আছে। তার চোখেমুখে কোনো উদ্বেগের রেখা নেই, নেই কোনো অস্থিরতা।

এমন সময় প্রতিবেশী এক বৃদ্ধা দাদু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী রে, এভাবে পাথরের মতো বসে আছিস কেন? স্বামী সতীন ঘরে আনল, তুই কিছুই বলবি না?"
তেজস্বী মৃদু হাসল। সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছিল নাকি বিষাদ, তা বোঝা দায়। সে ধীরপায়ে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো স্বামী শওকত আর তার ঘোমটা টানা নতুন বউয়ের মুখোমুখি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল তাদের। তারপর নির্বিকার কণ্ঠে বলে উঠল,
“কী হলো শওকত, দরজায় ওভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? নতুন বউকে নিয়ে ভেতরে যাও।”
শওকত মাথা তুলে স্ত্রী*র দিকে তাকাল। সে জানত তেজস্বী বরাবরই শক্ত মনের মানুষ, কিন্তু এমন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে সে যে এতটা অবিচল থাকবে, তা শওকতের কল্পনাতীত ছিল। স্বামীর অবাক দৃষ্টি দেখে তেজস্বী আবারও চমৎকার এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল অধরে।মেয়েটার গালের বাম দিকে ঢুল পড়ে হাসলে তাই আরো চমৎকার সুন্দরী দেখায় তাকে। বলল,
“এভাবে অবাক হয়ে কী দেখছ? ভয় নেই, আমি তোমাকে এই বস্তাপচা প্রশ্ন করব না যে আমার মাঝে কীসের কমতি ছিল?কেন তুমি অন্য আরেকটা বিয়ে করলে?কেন আমাকে ঠাকালে? কারণ আমি জানি, আমার কোনো কমতি ছিল না। রূপে কিংবা যোগ্যতায়,বরং তোমার কমতি ছিল।”
তেজস্বীর নাম আর ব্যক্তিত্বের মধ্যে যেন এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য। উপস্থিত জনতা তখন কানাঘুষা শুরু করেছে। কেউ সহানুভূতি নিয়ে বলছে, “পুরুষ মানুষগুলোই এমন স্বার্থপর! এমন গুণবতী আর সুন্দরী বউ থাকতেও আবার বিয়ের কী দরকার ছিল?”
আবার কেউ ফিসফিস করে বিদ্রূপের সুরে বলছে, “এমনি এমনি কি আর সতীন আনে? নির্ঘাত বউয়ের সাথে বনিবনা ছিল না, ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে!”
চারপাশের গুঞ্জন তেজস্বীর কানে পৌঁছালেও সে নির্বিকার। শওকত অপরাধবোধে মাথা নত করে তেজস্বীর পাশে এসে দাঁড়াল। কুণ্ঠিত স্বরে বলল,
“বিশ্বাস করো তেজস্বী, আমি এই বিয়েটা করতে চাইনি। আসলে পরিস্থিতি এমন ছিল যে...”
তাকে কথা শেষ করতে দিল না তেজস্বী। তীক্ষ্ণ স্বরে হাত তুলে বাধা দিয়ে বলে উঠল,
“নিজের ইচ্ছায় করোনি, কিন্তু ধরা পড়ে গিয়ে বাধ্য হয়েছ, তাই তো?যাকে বলে কট ম্যারেজ।”
শওকত আর কোনো শব্দ করতে পারল না, লজ্জায় তার মাথা আরও নিচু হয়ে গেল। তেজস্বী এবার ধীরপায়ে নতুন বধূর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটির বয়স বড়জোর আঠারো কি উনিশ। নববধূর থুতনিতে আঙুল ছুঁয়ে পরম মমতায় আলতো করে তুলে ধরল তার মুখটা। স্নিগ্ধ স্বরে বলল,
“যাও বোন, ভেতরে যাও।”
তারপর শওকতের দিকে একবার তাকিয়ে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল, “তুমিও ভেতরে যাও।"
ওরা ভেতরে চলে গেলে তেজস্বী একা গিয়ে বারান্দার কোণে দাঁড়াল। দৃষ্টি তার আকাশের সীমানায় স্থির। বাইরের কঠোরতা বজায় রাখাটা যতটা সহজ, বুকের ভেতরের হাহাকার সামলানো ততটাই কঠিন। জগতের কোনো মেয়েই কি স্বেচ্ছায় তার স্বামীর ভাগ অন্য কাউকে দিতে চায়? মনের অজান্তেই দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শওকতের সাথে প্রথম পরিচয়, সেখান থেকে প্রণয় এবং শেষমেশ পারিবারিকভাবে বিয়ে। বিয়ের মাত্র দেড়টা বছর কাটতে না কাটতেই শওকত অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল।তা বুঝে ছিল আগেই তেজস্বী কিন্তু শওকত তাকে এতটাই মিথ্যা ভালোবাসা দেখিয়েছিল যে সে সেই বিষয়ে কথা বলার জায়গা পায়নি।আর আজ সেই সম্পর্কের দায় মেটাতে গিয়ে সামাজিক চাপে পড়ে তাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে ঘরে ফিরতে হলো।
তেজস্বী দ্রুত হাতে চোখের জল মুছে ফেলল। তার মনে এক দৃঢ় সংকল্প দানা বেঁধে উঠল,মেয়েরা যত কোমল হয়, এই সমাজ তাদের তত সহজে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তাই এখন তাকে শক্ত হতে হবে। ভীষণ রকম শক্ত! নিজেকে এমন এক দুর্ভেদ্য পাষাণে পরিণত করতে হবে, যেখানে আঘাত করতে এলে আগন্তুক নিজেই চূর্ণ হওয়ার ভয়ে থমকে দাঁড়ায়।
তেজস্বী ধীরপায়ে নিজের শয়নকক্ষে প্রবেশ করল। দেখল শিলা শওকতের নতুন বউ বিছানায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। শওকত তার খুব কাছে বসে শিলার হাত ধরে নিচু স্বরে কিছু একটা বলছিল। তেজস্বীকে ঘরে ঢুকতে দেখেই সে তড়িঘড়ি করে শিলার হাত ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়াল।
তেজস্বী সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। আলমারি খুলে সে নির্বিকারভাবে নিজের কাপড়-চোপড়গুলো বের করতে শুরু করল। শওকত দ্রুত তার কাছে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়ালো। মিনতি করে বলল,
“প্লিজ তেজস্বী, তোমাকে এই ঘর ছাড়তে হবে না। এটা তোমারই ঘর। শিলা অন্য রুমে থাকবে।”
তেজস্বী থামল না, নিজের গোছগাছ চালিয়ে যেতে যেতেই অস্ফুট স্বরে বলল, “আমি এই ঘর ছেড়ে যাচ্ছি না।”
শওকতের চোখেমুখে কিছুটা স্বস্তির আভাস ফুটে উঠল, কিন্তু তা স্থায়ী হলো না। তেজস্বী তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে যোগ করল, “আমি এই বাড়ি ছেড়েই চলে যাচ্ছি।”
শওকত যেন আকাশ থেকে পড়ল। রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“এসব তুমি কী বলছ, তেজস্বী? দোহাই তোমার, এমনটা করো না। আমি তো শুধু তোমাকেই ভালোবাসি!”
'ভালোবাসা' শব্দটা কানে যেতেই তেজস্বীর ভেতরের চাপা ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। কপালে রাগের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে হুংকার দিয়ে বলে উঠল, “খবরদার! ওই পবিত্র শব্দটা তোমার মুখে উচ্চারণ করবে না। শুনলে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। তুমি তোমার সংসার করো, আমি তো বাধা দিচ্ছি না। শুধু একটা কথা বলব আমার মতো তোমার দ্বিতীয় স্ত্রীকেও যেন ঠকতে না হয়। ভালো থেকো।”
তেজস্বী মুহূর্তের জন্য না থেমে তার ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। শওকত তখন নিরুপায় হয়ে শেষ অস্ত্র হিসেবে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“এত জেদ দেখাচ্ছ কেন তেজস্বী? ইসলামে তো চার বিয়ে করা জায়েজ। আমি তো মাত্র দুটো করলাম, তাতে সমস্যাটা কোথায়?”
শওকতের শেষ কথাটি শুনে তেজস্বী ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আগুনের ঝিলিক। স্থির গলায় সে প্রশ্ন করল, “আজ সকালে ফজরের নামাজ পড়েছিলে?”
শওকত কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে কেবল মাথা দুদিকে নাড়াল যার যার অর্থ, 'না'।
তেজস্বী এবার বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল,
“শেষ কবে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়েছ, তা কি মনে করতে পারবে? পারবে না। অথচ নামাজ হলো ফরজ কাজ, জান্নাতের চাবিকাঠি। সেই ফরজের কথা তোমার মনে নেই, কিন্তু নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য চার বিয়ের 'সুন্নত' নিয়ে ঠিকই তর্কে মেতেছ! তোমার তো এটাও জানা উচিত যে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অধিকার এবং ইনসাফ কায়েম করা কতটা জরুরি।দ্বিতীয় বিয়ে করার ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর থেকে অনুমতি নিতে হয়।তুমি কি তা নিয়েছিলে? আর ইসলামে বিয়ের যে বিধানগুলো আছে, তা কি কেবল সুন্দরী আর অল্পবয়সী মেয়েদের লালসার জন্য? বরং তা ছিল বিধবা ও অসহায় নারীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য।”
শওকত এবার লজ্জায় একেবারে কুঁকড়ে গেল। তেজস্বীর যুক্তির সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো শক্তি তার অবশিষ্ট নেই। তেজস্বী এবার চূড়ান্ত ঘোষণাটি দিল,
“কয়েকদিনের মাঝেই তুমি ডিভোর্স পেপার পেয়ে যাবে।”
বলেই তেজস্বী আর এক মুহূর্তও সেখানে অপচয় করল না। গটগট করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল সে। শওকত কয়েকবার পিছু ডেকে আটকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। সে জানত, তেজস্বী নামক এই মেয়েটির আত্মসম্মানবোধ পাহাড়ের মতো অটল একবার যে পথ সে বেছে নিয়েছে, সেখান থেকে তাকে ফেরানোর সাধ্য কারও নেই।
★★★
তেজস্বীর পরিবারে মা-বাবা ছাড়াও রয়েছে দুই ভাই ও এক বোন কণা। সেই পৈত্রিক ভিটাতেই সে আজ আশ্রয় নিয়েছে। সন্ধ্যাবেলা ভাইয়েরা যখন অফিস থেকে ফিরে শুনল তেজস্বী চিরতরে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে এসেছে, তখন যেন তাদের মাথায় বিনামেঘে বজ্রপাত হলো। বড় ভাই ড্রয়িংরুমে বসে গম্ভীর কণ্ঠে তেজস্বীকে শাসন করতে শুরু করলেন,
“বিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয় তেজস্বী। চাইলেই যখন-তখন জেদ করে এভাবে সবকিছু ছেড়ে চলে আসা যায় না।”
তেজস্বীর চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা। সে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“আমি হুট করে আসিনি ভাইয়া, অনেক ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ছোট ভাই বড় ভাইয়ের চেয়েও কঠোর সুরে যোগ করল,
“শওকত ছেলেটা তো খারাপ নয়। ভালো চাকরি-বাকরি করে, সমাজে সম্মান আছে।চাইলে দুইটা কেন চার পাঁচ টা বিয়েও করতে পারে।সামান্য একটা কারণে ঘর ছেড়ে চলে আসতে হবে? তুই বরং আগামীকালই ফিরে যা।”
তেজস্বী এবার অসহায় চোখে তার মা-বাবার দিকে তাকালো। যে মা-বাবা একসময় মেয়ের সামান্য অসুখেই অস্থির হয়ে পড়তেন, আজ তারা পাথরের মতো নিশ্চুপ। হয়তো সমাজ আর সংসারের চাপে তারা নিজেরাও চান তেজস্বী তার অপছন্দের সেই নরকেই ফিরে যাক।
নীরবতার সুযোগ নিয়ে এবার মোক্ষম চালটি চাললেন ছোট ভাবি। তিনি কণ্ঠে বিষ ঢেলে বললেন,
“তোমার কি কাণ্ডজ্ঞান বলতে কিছু নেই তেজস্বী? এভাবে হুট করে চলে আসাটা কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ! তোমার ভাইদের অবস্থা তো জানো? নিজেদের সংসার চালাতেই তারা হিমশিম খাচ্ছে, এর মধ্যে তুমি এখন এক উটকো ঝামেলা হয়ে দাঁড়ালে!”
পাশ থেকে বড় ভাবিও যোগ করলেন অবহেলার সুরে,
“দেখো তেজস্বী, মা-বাবার নিয়মিত ওষুধ আর কণার স্কুলের খরচ সবই তো আমাদের টানতে হয়। এর মাঝে তোমার ভাইয়েরা বাড়তি মানুষের খরচ জোগাবে কোত্থেকে?”
তেজস্বী হাত উঁচু করে তাদের থামিয়ে দিল। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও সে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে মা-বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল,
“তোমরাও কি তাই চাও? আমি চলে যাই?”
মা মেয়ের পিঠে সান্ত্বনার হাত রাখলেন ঠিকই, কিন্তু কণ্ঠে আশ্রয় দেওয়ার জোর ছিল না। তিনি মৃদু স্বরে বললেন,
“দেখ মা, দাম্পত্য জীবনে কত চড়াই-উতরাই আসে। একটু মানিয়ে নিলে সব ঠিক হয়ে যায়।”
তেজস্বী আর একটি মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। কারো কোনো উপদেশের তোয়াক্কা না করে সে নিজের ব্যাগটি শক্ত হাতে তুলে নিল। তার এই প্র*স্ততি দেখে সবার চোখেমুখে স্বস্তির আভাস দেখা দিল,তারা ভাবল তেজস্বী হয়তো হার মেনে স্বামীর ঘরেই ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু সবার সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়ে তেজস্বী তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“ভয় পেয়ো না, তোমাদের ওপর বোঝা হয়ে থাকার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমি আমার থাকার ব্যবস্থা নিজেই করে নেব। আজই আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি।”
এই অপ্রত্যাশিত ঘোষণা শুনে উপস্থিত সবার মুখ থমথমে হয়ে গেল। তেজস্বী তার ছোট বোন কণার দিকে এগিয়ে গেল। কণা বোনকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তেজস্বী তাকে আগলে রেখে নিচু স্বরে বলল,
“কাঁদিস না কণা। নিজেকে শক্ত কর। আমি গুছিয়ে নিয়ে কয়েকদিন পরেই তোকে আমার কাছে নিয়ে যাব।”
তেজস্বী যখন ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে পা বাড়াল, তখন পেছন থেকে বড় ভাইয়ের তাচ্ছিল্যভরা মন্তব্য ভেসে এল,
“মেয়ে মানুষের এত তেজ থাকা ভালো না রে তেজস্বী। এই তেজ তোকে পুড়িয়ে খাক করে দেবে।”
তেজস্বী থমকে দাঁড়াল, কিন্তু পেছন ফিরে তাকাল না। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে এক চিলতে বিষণ্ণ কিন্তু দৃঢ় হাসি হাসল। তারপর অবজ্ঞাভরে বলল,
“কী করব বলো ভাইজান? আমার নামটাই যে ‘তেজস্বী’। আমার ধমনীতেই জেদ মিশে আছে। আমি হারতে শিখিনি, আর যারা আমাকে ছোট করে তাদের ক্ষমা করতেও শিখিনি।”
বলেই সে দ্রুত পায়ে অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। তার চলে যাওয়ার পথের দিকে সবাই পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
★★★
ঢাকা শহরের ব্যস্ত বুক চিরে সাতটি কুচকুচে কালো আভিজাত্যপূর্ণ গাড়ির একটি বহর সুশৃঙ্খল গতিতে ছুটে চলছে। তাদের রাজকীয় চলন আর কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে এমন এক সম্মোহনী শক্তি আছে যে, পথচারীরা বিমুগ্ধ হয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশরা অত্যন্ত তৎপরতার সাথে রাস্তা পরিষ্কার করে দিচ্ছে, যেন এই যান্ত্রিক বহরের গতিতে বিন্দুমাত্র ছেদ না পড়ে। দৃশ্যটি দেখে সাধারণ যে কেউ নিশ্চিতভাবে ধরে নেবে, হয়তো রাষ্ট্রের কোনো অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রভাবশালী কোনো মন্ত্রী যাচ্ছেন।
বহরের সামনে এবং পেছনে তিনটি করে অত্যাধুনিক এসইউভি,আর ঠিক মাঝখানে মধ্যমণি হয়ে ধীরস্থিরভাবে চলছে একটি লেটেস্ট মডেলের মার্সিডিজ বেঞ্জ।
রাস্তার পাশে যানজটে আটকে থাকা এক ট্যাক্সির যাত্রী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ভাই, কোনো এমপি-মন্ত্রী যাচ্ছে নাকি? এত প্রটোকল কেন?”
ট্যাক্সি ড্রাইভার এক চিলতে বাঁকা হাসি হেসে উত্তর দিল, “না মামা, উনি মন্ত্রী নন। শহরের বাঘা বাঘা ব্যবসায়ীরাও ওনার নাম শুনলে সিঁটিয়ে থাকে। নামকরা 'সিংহ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ'-এর মালিক।আজই কানাডা থেকে প্রথম দেশে আসলো।কেউ দেখেনি এখনও ওনাকে।উফফ যদি একবার দেখতে পারতাম।”
মার্সিডিজের পেছনের সিটে গা এলিয়ে বসে থাকা আর্য চৌধুরী জানলার কাঁচ দিয়ে বাইরের জনস্রোতের দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। উৎসুক জনতার এই বিস্ময়ভরা চাউনি তাকে আনন্দ দিচ্ছে না, বরং এই অহেতুক আড়ম্বর তাকে ক্রমশ বিরক্ত করে তুলছে। তিনি কানের ব্লুটুথ হেডসেটে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“এইসব অপ্রয়োজনীয় তামাশার আয়োজন করার অনুমতি কে দিয়েছে?”
ওপাশ থেকে কাঁপাকাঁপা স্বরে উত্তর এল,
“সরি স্যার! মূলত আপনার নিরাপত্তার কথা ভেবেই আমরা এই বাড়তি ব্যবস্থা নিয়েছি। এবারের মতো ক্ষমা করবেন স্যার।”
আর্যর বিরক্তি চরমে পৌঁছাল। তিনি ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে সংক্ষিপ্ত কিন্তু কঠিন স্বরে বললেন, “গাড়ি থামাও।”
মুহূর্তের মধ্যে মার্সিডিজের চাকা থেমে গেল। সেই সাথে সামনের এবং পেছনের প্রতিটি গাড়ি নিখুঁত ছন্দে ব্রেক কষল। গাড়িগুলো স্থির হতে না হতেই পাশের গাড়িগুলো থেকে কালো পোশাক আর সানগ্লাস পরা একদল সুঠামদেহী রক্ষী বিদ্যুৎবেগে নেমে এল। নিমিষেই তারা মার্সিডিজটিকে ঘিরে এক দুর্ভেদ্য ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করল।
একজন দেহরক্ষী মার্সিডিজের জানলার কাছে এসে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এনি প্রবলেম, স্যার? কোনো সমস্যা হয়েছে কি?”
আর্য শীতল চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপাতত কোনো সমস্যা নেই, তবে হবে। দ্রুত এই নিরাপত্তা বলয় সরাও।”
দেহরক্ষী কিছুটা দ্বিধা নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু স্যার...”
“আমি যা বলেছি, ঠিক সেটুকুই করো।” আর্যর মৃদু ধমকে এক ধরনের অমোঘ আদেশ ছিল।
তারা আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। আদেশের সাথে সাথেই সকল দেহরক্ষী পুনরায় নিজ নিজ গাড়িতে গিয়ে বসল। আর্য ধীরস্থিরভাবে তার গায়ের দামি কোট আর হাতের দামী ঘড়িটি খুলে সিটের ওপর রাখল। শার্টের হাতা দুটো সামান্য গুটিয়ে সে অনেকটা স্বাভাবিক ও সাধারণ বেশ নিলো। তারপর গাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল।
কতগুলো দীর্ঘ বছর পর আজ সে নিজের দেশের মাটিতে পা রাখল। দীর্ঘ দশ বছর বাহিরের দেশে জীবন কাটিয়ে আর্য আজ কানাডা থেকে বাংলায় ফিরেছে। বুক ভরে নিজের দেশের বাতাসের ঘ্রাণ নিলো সে। তারপর সাথে থাকা সহকারীর দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বলল,
“খবরদার, আমার পেছন পেছন আসার চেষ্টা করবে না। তোমরা এখন সোজা অফিসে যাও, আমি ঠিক সময়ে চলে আসব।”
লোকটি কোনো কথা না বলে শুধু নিরবে সম্মতি জানিয়ে মাথা নোয়ালো। জনাকীর্ণ রাজপথে আর্য চৌধুরী এবার একা এক সাধারণ পথিকের মতো হাঁটতে শুরু করল।
হঠাৎ আর্য দেখল একটি লোকাল বাস তীব্র গতিতে ধেয়ে আসছে। আর্য বাসটিকে থামার সংকেত দিতেই দরজায় ঝুলে থাকা হেলপার চেঁচিয়ে উঠল,
“আরে মামা, লাফ দিয়ে উঠে পড়েন! আপনার জন্য বাস পুরোপুরি থামবে না।”
পাবলিক বাসে ওঠার অভিজ্ঞতা না থাকলেও আর্য মুহূর্তের মধ্যে চলন্ত বাসে লাফিয়ে উঠল। ভেতরটা মানুষে ঠাসা, তিল ধারণের জায়গা নেই। আর্য ভিড় ঠেলে বাসের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। বাসের এই গাদাগাদি আর ঝাঁকুনিতে সে বারবার টাল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। ঠিক তখনই পাশ থেকে একটি শান্ত স্পষ্ট মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল,
“আপনি চাইলে এখানে বসতে পারেন।”
আর্য পাশে তাকিয়ে দেখল, সাধারণ একটি চুড়িদার পরা এক তরুণী বসে আছে। জানলার হালকা বাতাসে তার অবিন্যস্ত চুলগুলো উড়ছে। আর্য আর দ্বিধা না করে শূন্য হওয়া জায়গাটিতে বসে পড়ল। পাবলিক বাসের সিটগুলো বড্ড সরু,না চাইলেও পাশের যাত্রীর শরীরের সাথে শরীর ঘেঁষে থাকে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রী কিছুটা ঈর্ষান্বিত স্বরে টিপ্পনী কাটল,
“কী আপা! আমরা এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ঘামছি, আমাদের তো বসতে বললেন না?”
তেজস্বী সেই মন্তব্যের দিকে ভ্রুক্ষেপও করল না। বরং জানলার বাইরে নির্লিপ্ত দৃষ্টি রেখে বলে উঠল,
“আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে না আপনি আগে কখনো পাবলিক বাসে উঠেছেন।”
আর্য হালকা হেসে উত্তর দিল, “না না, উঠেছি তো!” যদিও তার হাসিই বলে দিচ্ছিল সে কতটা অপ্রস্তুত।
পরিবেশটা হালকা করতে আর্য এবার বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল, “আপনার নামটা কি জানতে পারি?”
মেয়েটি সংক্ষেপে উত্তর দিল, “তেজস্বী।”

Post a Comment

0 Comments