ফোনের ওপাশে লামহার বরফের মতো ঠান্ডা কণ্ঠস্বর শুনে আরমান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে আশা করেছিল, লামহা বরাবরের মতোই কান্নাকাটি করবে, কিংবা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলবে যে সে ভুল করেছে। কিন্তু লামহার গলায় আজ কান্নার কোনো আভাস নেই, আছে এক অস্বাভাবিক দৃঢ়তা। আরমান নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ধমকের সুরে বলল,
“লামহা, তুমি এসব কী সব ফালতু কথা বলছ? তুমি আমার স্ত্রী, আমার অনাগত সন্তানের মা। এসব ইমোশনাল নাটক বাদ দিয়ে বাসায় ফেরো। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, তোমার মায়ের বাসায় থাকার কোনো মানে হয় না।
লামহা ফোনের ওপারেই এক চিলতে হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে এক গভীর অবজ্ঞা আর ঘৃণা। সে শান্ত গলায় উত্তর দিল-
“আরমান, আমি যখন বিয়ের পর তোমাদের ঘরে পা রেখেছিলাম, তখন নিজেকে তোমাদেরই পরিবারের একজন ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম, তোমাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকাই আমার দায়িত্ব। কিন্তু আজ সব ধোঁয়াশা কেটে গেছে। আমি বুঝতে পেরেছি, আমি তোমাদের কাছে কোনো স্ত্রী বা আপনজন ছিলাম না, আমি ছিলাম একজন বেতনহীন গৃহকর্মী। আর নীলা? সে যে কি তা সময় হলে বুঝবে। তোমরা সবাই মিলে আমাকে যে ধোকা দিয়েছোআ তার জবাব দেওয়ার সময় এসেছে। আমি ফিরে আসছি, তবে তোমাদের মতো ভিক্ষা চাইতে নয়, বরং আমার প্রাপ্য বুঝে নিতে।
ফোনটা কেটে দিয়ে লামহা কয়েক মুহূর্ত জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল-
“মা আর কোনো কান্না নয়। আমি এখন আর আগের সেই দুর্বল লামহা নেই।
পরদিন সকালেই লামহা তার বাবার উকিল বন্ধুকে নিয়ে উপস্থিত হলো আরমানের সেই ফ্ল্যাটের সামনে। কড়া নাড়তেই দরজা খুললেন আরমানের মা। ভেতরে আরমান, নীলা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা হইহুল্লোড় করছিল। লামহাকে উকিলের সাথে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরমানের মা অবাক হলেন, তারপর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মুখ বাঁকিয়ে বললেন-
“কী গো তুমি? একা এসেছ এখন ? যাক বুদ্ধি হয়েছে তাহলে? যা, ভেতরে গিয়ে চা বানাও, নীলা তোমার মতো সব সামলাতে পারছে না, সব কিছু এলোমেলো হয়ে আছে।
লামহা ভেতরে ঢুকে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল-
“না আম্মা, আমি এখানে আর চা বানাতে আসিনি। আপনাদের সেবা করার পাট আমি অনেক আগেই চুকিয়ে ফেলেছি।
সে সোজা ড্রয়িংরুমের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।আরমান সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত মুখে বলল-
"লামহা এসব কী নাটক করছো? উকিল কেন এনেছো সাথে?
লামহা তার ব্যাগের ভেতর থেকে কিছু নথিপত্র বের করে টেবিলের ওপর রাখল। এবং বললো-
“নাটক তোমরা করেছ আরমান এতো বছর ধরে। এই ফ্ল্যাটটা রেজিস্ট্রি অনুযায়ী আমার নামে। আমি তোমাদের অনেকবার সুযোগ দিয়েছি, কিন্তু তোমরা আমার ভালোবাসার কোনো মর্যাদা দাওনি। এখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই ফ্ল্যাট আমি বিক্রি করে দেব। আগামী সাত দিনের মধ্যে তোমরা সবাই এখান থেকে অন্য কোথাও শিফট হয়ে যাবে।
পুরো ঘরে যেন বজ্রপাত হলো। আরমান চিৎকার করে উঠল-
“লামহা তুমি এটা করতে পারো না! তুমি আমাদের রাস্তায় নামিয়ে দিবে?
লামহা তার আট মাসের গর্ভবতী পেটের ওপর হাত রাখল, তার চোখে এখন এক অদ্ভুত শীতলতা। সে শান্তভাবে বলল-
“রাস্তায় থাকবে কেন? আমাকে বিয়ে করার আগে কোথায় ছিলে সেখানেই থাকবে। যখন তুমি আমারই ঘরে, আমারই চোখের সামনে আমার ছোট বোনের সাথে রাত কাটাতে। সেদিন তো তোমাদের বিবেক জাগেনি? সেদিন তো তোমরা ভাবোনি, একজন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর মনে কতটা আঘাত লাগছে? এখন যখন নিজের আরামের জায়গাটা হারাচ্ছ, তখন বিবেকের দোহাই দিচ্ছ? এই ফ্ল্যাটের প্রতিটা ইঞ্চি আমার বাবার ঘামের পয়সায় কেনা, তোমাদের কোনো অধিকার নেই এখানে থাকার।
নীলা এতক্ষণ ভয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল।ভয় হ্যাঁ ভয়, কারন সে ভেবেছিলো লামহাকে তারিয়ে দিয়ে সব কিছুর রানী সে হবে। এখন সে এগিয়ে এসে কান্না করার ভান করে বলল-
“আপু, এমনটা করো না। আমরা তো ভুল করেছি, মাফ করে দাও না! আমি তো তোমার বোন, আমার জন্য ওনাদের রাস্তায় নামিয়ে দিও না। আমি আরমান কে তোমায় দিয়ে দিবো।
লামহা নীলার দিকে এক পা এগিয়ে গেল। নীলা ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে ঠেকে গেল। লামহা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল-
"মাফ শব্দটা তোমার মুখে বড্ড বেমানান নীলা। যে বোন আমার ঘরে ঢুকে আমার সংসার ভাঙতে পারে, তার জন্য আমার কোনো ক্ষমা নেই। আর রইলো কথা আরমানের?আরমার আমার স্বামী তাকে তুমি আমাকে দিবে? থাক ওকে আর আমার লাগবেনা। আরমানকে নিয়ে সুখে থেকো তুমি। তবে আমার ছাদটুকু আর তোমাদের জন্য বরাদ্দ নেই। তোমরা এই ফ্ল্যাট দখল করে ছিলে, এখন সময় এসেছে রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসার।
আরমানের বড় বোন ঝগড়া করতে এগিয়ে এলে লামহার সাথে থাকা উকিল সাহেব এগিয়ে এলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, লামহা চাইলে এখনই আইনিভাবে সবাইকে বাড়ি ছাড়া করতে পারে। আরমানের পরিবারের সেই দাপট মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেল। তারা বুঝতে পারল, যে লামহাকে তারা হাতের পুতুল ভেবেছিল, সে এখন আর সেই নরম মনের মেয়ে নেই। সে এখন একজন মা, যে তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করতে জানে। লামহা তার বাবার বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য শেষবারের মতো ফ্ল্যাটে এসেছে। সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে সে। ফ্ল্যাটের চাবিগুলো আরমানের হাতে দিয়ে সে শেষবারের মতো বলল-
"আমাদের মাঝের সম্পর্কটা আমি আগেই কবর দিয়েছি আরমান। এই সন্তান আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার, কিন্তু তোমার সাথে তার আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আইনের মাধ্যমে সবকিছুর নিষ্পত্তি হবে। তোমরা এখন যেখানে খুশি যেতে পারো।
আরমান লামহাকে উত্তর দিলো-
" লামহা এনাফ হয়েছে। ছেলেমানুষী আর করোনা। জানোনা প্রেগন্যান্সির মধ্যে আইনী ভাবে তালাক জিবনেও হয় না?
আরমানের কথায় কিছুটা চিন্তায় পরে গেলো লামহা।
আরমান আর লামহার কথা মাঝেই নীলা তেল এনে কিছুটা তেল লামহার যাওয়ার রাস্তায় ফেলে দিলো। নীলার এরকম কাজ কেউ দেখতে পেলোনা। অন্যদিকে লামহা ভাবছে আসলেই আরমান সত্যি কথা বলছে।
" সেটা দেখা যাবে আরমান। কিন্তু তোমার সাথে আর সংসার আমি করবোনা।
" আপু, আমার জন্য তুমি আরমান কে অপমান করতে পারনা। এতো অহংকার ভালোনা। টাকা আছে দেখে সবাইকে ছোট ভাবো?
নীলার কথায় শান্ত চোখে তার দিকে তাকালো লামহা। অহংকার আর সে? নীলার চেহারায় তাকালো। তাকিয়ে থু থু ছিটিয়ে দিয়ে বললো-
" তোর মুখে এসব মানায় না নীলা। যে বোনের হাজবেন্ডের বিছানায় যেতে ভাবেনা তাকে পতি*তা বলতেও ঘৃনা লাগে।
নীলা রেগে প্রচন্ড। নীলা কিছু বলতে যাবে তার আগে আরমান নীলা কে বললো'
" মাফ চাও নীলার কাছে লামহা। তুমি অযথা ওকে অপমান করছো। যা বলার আমাকে বলো নীলা কে না। ও একটা ইনোসেন্ট মেয়ে। ওকে নিজেদের বাসায় অত্যাচার করে মন ভরে নাই? এখন আরো করছো।
নীলা অবাক হয়ে শুনলো। অত্যাচার আর তারা তাও নীলাকে? নীলাকে লামহার মা নিজের মেয়ের মতো লালন পালন করছে। কোনো কিছুর অভাব পেতে দেয় নাই। অথচ তাদের নামে এইসব রটিয়েছে। লামহা এবার আশ্চর্যজনক কাজ করলো। নীলার গালে থাপ্পর লাগিয়ে দিলো জোরে৷ থাপ্পরের চোট সামলাতে না পেরে নিচে বসে পরলো নীলা।আর জোরে কেদে উঠলো।
" কি করলে এটা তুমি লামহা? নীলাকে আবার মারলে কেনো?
রাগে আরমান লামহাকে জোরে ধাক্কা দিলো। শরীরে ধাক্কা লাগতেই লামহা চমকে উঠলো নিজেকে সামলাতে না পেরে আর মেঝেতে ফেলে রাখা তেলে স্লিপ কেটে উপর হয়ে পড়লো সে। প্রচন্ড ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো,সারা ফ্লোর রক্তে ভেসে যেতে লাগলো।

0 Comments