নীল_জোয়ার

নীল_জোয়ার



দিনগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল।
কিন্তু রাফির কাছে প্রতিটা দিন যেন এক একটা দীর্ঘ শাস্তি।
অফিসে বসে থাকলেও বারবার মায়ের চিঠিটার কথা মনে পড়ত।
রাতে ঘুম ভেঙে যেত।
মনে হতো, একবার যদি মায়ের মুখটা দেখতে পেত!
একবার যদি বলতে পারত—
"মা, আমি ভুল করেছি।"
কিন্তু শাহানা বেগম কোথায় আছেন, সেটা কেউ বলছিল না।
রেহানা আপাও শুধু বলেছিলেন,
— "উনি ভালো আছেন। এর বেশি কিছু বলার অনুমতি নেই।"
এদিকে রূপার শরীরের অবস্থাও দিন দিন খারাপ হতে লাগল।
গর্ভাবস্থার শেষ সময়।
ডাক্তার বারবার বিশ্রাম নিতে বলছেন।
কিন্তু একদিন গভীর রাতে হঠাৎ রূপার তীব্র ব্যথা শুরু হলো।
রাফি তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
ডাক্তার পরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে বললেন,
— "অবস্থা একটু জটিল। জরুরি অপারেশন লাগতে পারে।"
রাফির বুক কেঁপে উঠল।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো পৃথিবী যেন ওলটপালট হয়ে গেল।
হাসপাতালের করিডোরে একা বসে সে শুধু একটা কথাই ভাবছিল—
"মা থাকলে কী করতেন?"
ছোটবেলায় জ্বর হলে মা রাত জেগে মাথায় পানি দিতেন।
পরীক্ষার আগে না খেয়ে বসে থাকতেন।
বাবা মারা যাওয়ার পর একা হাতে সংসার সামলেছেন।
আর আজ...
সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে সে সেই মানুষটাকেই দূরে ঠেলে দিয়েছে।
ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলল।
একজন নার্স বেরিয়ে এসে বললেন,
— "রোগীর স্বামী কে?"
রাফি দৌড়ে গেল।
— "আমি।"
— "কিছু জরুরি কাগজে সই করতে হবে।"
কাঁপা হাতে সই করতে করতে তার মনে হচ্ছিল, যদি কিছু হয়ে যায়?
যদি রূপা কিংবা বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়?
হঠাৎ সে বুঝতে পারল—
একজন মায়ের ভয় কেমন হয়।
সন্তানকে হারানোর ভয়।
সন্তানের কষ্ট দেখার ভয়।
সেই ভয়ই তো শাহানা বেগম সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন।
দুই ঘণ্টা পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
মুখে হাসি।
— "অভিনন্দন। আপনার কন্যাসন্তান হয়েছে। মা এবং শিশু দুজনেই সুস্থ আছে।"
কথাটা শুনেই রাফির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে ছুটে গিয়ে কাচের ওপাশে ছোট্ট শিশুটাকে দেখল।
একদম ছোট্ট।
গোলাপি মুখ।
বন্ধ চোখ।
নরম হাত।
হঠাৎ তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।
এই ছোট্ট মানুষটার জন্য সে কী না করতে পারবে?
কোনো কষ্টই তো বড় মনে হবে না।
ঠিক তখনই তার মনে পড়ল—
তার মা-ও তো এমনই অনুভব করেছিলেন।
তার জন্য।
শুধু তার জন্য।
রাফি আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
হাসপাতালের করিডোরেই বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
রূপা যখন জ্ঞান ফিরল, তখন রাফি তার হাত ধরে বলল,
— "রূপা, আমাদের মাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।"
রূপার চোখও ভিজে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— "হ্যাঁ। আমি-ও ভুল করেছি।"
কয়েকদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র মিলল।
বাড়িতে ফিরে ছোট্ট মেয়েটার নাম রাখা হলো—
"আশা"।
কারণ সে যেন নতুন করে আশা নিয়ে এসেছে।
কিন্তু ঠিক এক সপ্তাহ পর—
একটি ঘটনা পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে দিল।
সকালে ডাকপিয়ন একটি খাম দিয়ে গেল।
খামের ওপর লেখা—
"শাহানা বেগমের পক্ষ থেকে।"
রাফির হাত কাঁপছিল।
খাম খুলতেই ভেতর থেকে বের হলো একটি আইনি নোটিশ।
আর সেটা পড়েই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল...
কারণ সেখানে লেখা ছিল এমন একটি সিদ্ধান্তের কথা, যা সে কল্পনাও করেনি।

Post a Comment

0 Comments