নীল_জোয়ার

 

নীল_জোয়ার

পরদিন সকাল থেকেই শাহানা বেগমের মন অস্থির।
বারবার মনে হচ্ছে, কামালের সঙ্গে দেখা করা উচিত কি না।
ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে অধ্যায়টাকে তিনি বন্ধ বলে ভেবেছেন, সেটাই হঠাৎ আবার খুলে গেছে।
"নীড়"-এর ছোট্ট বাগানে বসে তিনি চা খাচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই আয়েশা খাতুন এসে পাশে বসলেন।
— "কি হয়েছে? তোমাকে খুব চিন্তিত লাগছে।"
শাহানা মৃদু হেসে বললেন,
— "পুরোনো একটা মানুষ ফিরে এসেছে।"
— "ভালো মানুষ, না খারাপ মানুষ?"
শাহানা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— "জানি না। এত বছর পর মানুষকে বিচার করা কঠিন।"
আয়েশা খাতুন বললেন,
— "তাহলে দেখা করে নাও।"
— "যদি পুরোনো ক্ষত আবার জেগে ওঠে?"
বৃদ্ধা হাসলেন।
— "ক্ষত তো জেগেই আছে, না হলে আজও কষ্ট পেতে?"
কথাটা শুনে শাহানা আর কিছু বলতে পারলেন না।
---
দুদিন পর।
শহরের একটি শান্ত ক্যাফে।
বিকেলের আলো জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে।
শাহানা বেগম ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
কোণের টেবিলে বসে থাকা একজন বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
চুল প্রায় সাদা।
মুখে বয়সের ছাপ।
চোখের নিচে কালি।
কিন্তু সেই চোখ দুটো তিনি চিনতে পারলেন।
এত বছর পরও।
কামাল।
কিছুক্ষণ দুজনেই কোনো কথা বললেন না।
শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
যেন ত্রিশ বছরের দূরত্ব কয়েক সেকেন্ডে মাপার চেষ্টা করছেন।
শেষ পর্যন্ত কামাল বলল,
— "তুমি খুব বদলে গেছ।"
শাহানা মৃদু হাসলেন।
— "বয়স মানুষকে বদলে দেয়।"
— "কিছু মানুষকে না।"
কামালের কণ্ঠে পুরোনো আবেগের ছায়া ছিল।
শাহানা সেটা এড়িয়ে গেলেন।
— "তুমি বলেছিলে কিছু প্রমাণ আছে।"
কামাল মাথা নেড়ে পাশে রাখা পুরোনো চামড়ার ব্যাগ খুলল।
ভেতর থেকে একটি ডায়েরি বের করল।
ডায়েরিটা পুরোনো।
পাতাগুলো হলদেটে হয়ে গেছে।
— "এটা আমার ডায়েরি।"
— "এতে কী আছে?"
— "আমার লেখা সব চিঠির কপি।"
শাহানার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
কামাল ডায়েরির মাঝখানের একটা পৃষ্ঠা খুলে সামনে ধরল।
সেখানে তার নিজের হাতের লেখা।
তারিখ—
১৫ জুলাই, ১৯৯০
"শাহানা, আজ তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হলো। উনি আমাকে স্পষ্ট বলে দিলেন, আমি যদি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি, তাহলে তোমার জীবন থেকে সরে যেতে হবে।"
শাহানার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
কামাল আরেকটা পৃষ্ঠা খুলল।
"আজ বিদেশে যাচ্ছি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, ফিরে এসে তোমাকে খুঁজব।"
আরেকটা পৃষ্ঠা।
"তোমার কোনো উত্তর পাচ্ছি না। জানি না চিঠিগুলো তোমার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না।"
আরেকটা।
"আজ খবর পেলাম তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে পৃথিবী থেমে গেছে।"
শাহানার হাত কাঁপছিল।
এত বছর ধরে তিনি বিশ্বাস করে এসেছেন, কামাল তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
আজ বুঝতে পারছেন—
সত্যিটা হয়তো অন্য ছিল।
---
কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা তখনও বাকি ছিল।
কামাল ডায়েরির শেষ দিকের একটা পৃষ্ঠা খুলল।
সেখানে একটা নাম লেখা।
নামটা দেখেই শাহানা জমে গেলেন।
"আবদুল করিম"
তার প্রয়াত স্বামীর নাম।
শাহানা অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।
— "করিমের নাম এখানে কেন?"
কামাল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "কারণ তোমার স্বামী সব জানতেন।"
— "কি বলছ!"
— "তোমার বিয়ের এক বছর পর তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।"
শাহানার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে গেল।
— "অসম্ভব!"
— "তিনি আমাকে খুঁজে বের করেছিলেন।"
— "কেন?"
কামালের চোখ ভিজে উঠল।
— "কারণ তিনি জানতেন, তুমি আমাকে ভুলতে পারোনি।"
শাহানা নিঃশব্দে বসে রইলেন।
---
কামাল ধীরে ধীরে বলতে লাগল—
— "তোমার স্বামী অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন।"
— "..."
— "তিনি আমাকে বলেছিলেন, 'আমি শাহানাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি জানি, তার হৃদয়ের একটা অংশ এখনও তোমার কাছে আছে। তাই তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি।'"
শাহানার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
কামাল বলল,
— "তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন যেন আমি আর কখনও তোমার জীবনে ফিরে না আসি।"
— "কেন?"
— "কারণ তিনি ভয় পেতেন না।"
— "তাহলে?"
— "তিনি শুধু চেয়েছিলেন তুমি শান্তিতে থাকো।"
কামালের গলা কেঁপে উঠল।
— "তিনি বলেছিলেন, 'যদি শাহানা কখনও তোমার কথা জানতে পারে, তাহলে সে সারা জীবন দ্বিধায় ভুগবে। আমি চাই না সে কষ্ট পাক।'"
---
শাহানা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
চোখের জল থামছিল না।
কারণ তিনি হঠাৎ বুঝতে পারলেন—
যে মানুষটাকে তিনি সারা জীবন শুধু দায়িত্বশীল স্বামী হিসেবে দেখেছেন,
সেই মানুষটি তাকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতেন।
এতটাই ভালোবাসতেন যে নিজের সুখের চেয়েও তার শান্তিকে বড় মনে করেছিলেন।
---
সেই সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় শাহানার মন পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল।
জীবনের এতগুলো বছর পর তিনি যেন নতুন করে নিজের অতীতকে চিনলেন।
কিন্তু তিনি জানতেন না—
ঠিক সেই সময় রাফি তার মাকে খুঁজে বের করার জন্য এমন একটি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে,
যা পুরো শহরের নজর কাড়বে।
আর সেই খবর কয়েক দিনের মধ্যেই শাহানার কাছেও পৌঁছে যাবে।

Post a Comment

0 Comments