শাশুড়ি মারা যাওয়ার আগে আমার জাকে দিয়ে গেলেন দুইটা দোতলা বাড়ি... আর আমার হাতে তুলে দিলেন মাত্র ৫০ হাজার টাকার একটা সঞ্চয়পত্র!
মনে মনে হেসেই ব্যাংকে ঢুকেছিলাম। ভেবেছিলাম টাকাটা তুলে নিয়ে জীবনের এই অধ্যায়টাই চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেব।
কিন্তু এক মিনিটও পেরোয়নি, ব্যাংকের কর্মকর্তা বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "আপনি কি নিশ্চিত, এই টাকাটা এখনই তুলতে চান? কারণ এই হিসাবের সঙ্গে এমন একটা বিষয় জড়িয়ে আছে, যেটা আগে আপনার জানা দরকার..."
সেদিনই বুঝেছিলাম, আমার শাশুড়ি মৃত্যুর আগে একটা গোপন সত্য লুকিয়ে রেখে গেছেন। আর সেই সত্য পুরো পরিবারকে ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রথম পর্ব
হাসপাতালের কেবিনজুড়ে শুধু ভেন্টিলেটরের টানা শব্দ।
টিট... টিট... টিট...
শব্দটা যেন কাউকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং শেষ কয়েকটা মুহূর্ত গুনে চলেছে।
কেবিনের ভেতরে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিলাম। শাশুড়ি রওশন আরা বেগম-এর শ্বাস তখন খুবই ক্ষীণ। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আইনজীবী ধীরে ধীরে তাঁর রেখে যাওয়া উইল খুলছিলেন।
আমার নাম মেহরীন।
এই বাড়ির বড় ছেলে রাশেদ-এর স্ত্রী আমি। পাঁচ বছর ধরে এই সংসারে আছি। কখনো নিজের জন্য কিছু চাইনি। সংসারের মানুষগুলোর জন্য যতটা পেরেছি করেছি। শাশুড়ির ওষুধ থেকে শুরু করে হাসপাতাল, আত্মীয়-স্বজনের আপ্যায়ন—সবকিছু নিজের দায়িত্ব ভেবেই সামলেছি।
কিন্তু সেই পাঁচ বছরের হিসাবের শেষ প্রাপ্তি হলো—
মাত্র ৫০ হাজার টাকার একটি সঞ্চয়পত্র।
আর আমার জা সাবিহা, যে এই বাড়িতে এসেছে মাত্র দুই বছর আগে, সে পেল ঢাকার অভিজাত এলাকায় থাকা দুটি দোতলা বাড়ি।
আইনজীবী উইল পড়া শেষ করতেই পুরো কেবিনে এমন নীরবতা নেমে এল, যেন কেউ নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে।
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হঠাৎ অনুভব করলাম, আশেপাশের সবাই আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
কেউ করুণা নিয়ে।
কেউ কৌতূহল নিয়ে।
আবার কারও চোখে লুকোনো আনন্দও স্পষ্ট।
ওদিকে সাবিহা যেন অভিনয়ের মঞ্চে উঠে গেছে।
সে দৌড়ে গিয়ে শাশুড়ির হাত ধরে কান্না শুরু করল।
— "আম্মা... আপনি আমাকে এত কিছু দিয়ে গেলেন কেন? আমি তো এসবের যোগ্যই না..."
তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে।
শাশুড়ি শেষ শক্তিটুকু দিয়ে কাঁপা হাতে সাবিহার হাত স্পর্শ করলেন। সেই স্পর্শে এমন মমতা ছিল, যা আমি কোনোদিন নিজের জন্য পাইনি।
আমি শুধু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হাতে শক্ত করে ধরা সেই সঞ্চয়পত্র।
কাগজটা যেন হঠাৎ করেই অনেক ভারী হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই আমার স্বামী রাশেদ পাশে এসে দাঁড়াল।
নরম গলায় বলল,
— "মেহরীন, মন খারাপ করো না। আমি জানি তোমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। কিন্তু মা ছোটবেলা থেকেই আমার ছোট ভাইকে বেশি ভালোবাসতেন। তাই হয়তো সাবিহাকেও বেশি আপন মনে করেছেন।"
সে আমার কাঁধে হাত রাখল।
— "আমি পরে ইমরানের সঙ্গে কথা বলব। দুইটা বাড়ির ব্যাপারে নিশ্চয়ই একটা সমাধান হবে। আর এই ৫০ হাজার টাকা... এটাকে আপাতত একটা উপহার হিসেবেই রাখো। নিজের জন্য যা ইচ্ছা কিনে নিও।"
আমি কিছু বললাম না।
শুধু মনে মনে একটা কথাই ঘুরছিল।
পাঁচ বছরের ভালোবাসা, ত্যাগ আর সম্মানের দাম কি সত্যিই মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা?
সেই রাতেই শাশুড়ি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
পরদিন জানাজা আর দাফন শেষ হলো।
বাসায় মানুষের ভিড়।
সাবিহা সাদা-কালো ওড়না মাথায় দিয়ে এমনভাবে কাঁদছিল, যেন পৃথিবীতে শাশুড়িকে সবচেয়ে বেশি সে-ই ভালোবাসত।
আত্মীয়-স্বজন সবাই তাকে ঘিরে রেখেছে।
— "আহা মা, নিজেকে সামলাও।"
— "রওশন আরা আপা তোমাকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন।"
— "দুইটা বাড়ি তোমার হাতে দিয়ে গেছেন মানে নিশ্চয়ই তোমার ওপর তাঁর ভরসা ছিল।"
সাবিহা চোখ মুছতে মুছতে বলল,
— "আম্মার দোয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমরা সবসময় তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী চলব।"
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার স্বামী ইমরান।
সরল মানুষ।
স্ত্রীর কথাগুলো শুনে তার চোখে গর্ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
আর আমার স্বামী?
সে শুধু অতিথিদের চা-নাস্তা পৌঁছে দিচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল, এই ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।
সবকিছু শেষ হতে রাত হয়ে গেল।
বাসায় ফিরে আমি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম।
রাশেদ ক্লান্ত শরীরে সোফায় বসেই আধো ঘুমে বলল,
— "মেহরীন... তুমি কষ্ট পেও না... সব ঠিক করে দেব..."
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আজ প্রথমবারের মতো মনে হলো, এই মানুষটা আমাকে বোঝে ঠিকই, কিন্তু আমার জন্য দাঁড়ানোর সাহস তার নেই।
পরদিন সকালেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।
এই ৫০ হাজার টাকা তুলে নেব।
তারপর এই অপমানের অধ্যায় চিরদিনের জন্য শেষ করে দেব।
সকালবেলা সঞ্চয়পত্রটা নিয়ে ব্যাংকে গেলাম।
কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম,
— "আসসালামু আলাইকুম। আমি এই সঞ্চয়পত্রের টাকাটা তুলতে চাই।"
ব্যাংকের কর্মকর্তা কাগজপত্র নিয়ে কম্পিউটারে তথ্য দেখতে শুরু করলেন।
প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিকই লাগছিল।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
তিনি বারবার স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছেন।
আবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন।
শেষ পর্যন্ত ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
— "আপনার নাম কি মেহরীন রাশেদ?"
— "জি।"
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— "ম্যাডাম... এই সঞ্চয়পত্রটা আসলে সাধারণ কোনো হিসাবের সঙ্গে যুক্ত নয়। এটা একটা যৌথ হিসাবের অংশ।"
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম,
— "যৌথ হিসাব? কার সঙ্গে?"
তিনি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখেই উত্তর দিলেন,
— "আপনার... আর আপনার জা সাবিহা ম্যাডামের নামে।"
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
আমি তো কোনোদিন এমন কোনো হিসাব খোলার কথা জানিই না!
কর্মকর্তা আবার বললেন,
— "আর একটা বিষয় আছে..."
আমি উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করলাম,
— "কী বিষয়?"
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
— "এই হিসাবে এখন আর ৫০ হাজার টাকা নেই..."
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
গলাটা শুকিয়ে গেল।
কাঁপা কণ্ঠে শুধু বলতে পারলাম,
— "তাহলে... কত টাকা আছে?"

0 Comments