সেদিন দোকান বন্ধ করতে আমার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগেছিল। বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি তখনও সেই ছোট নোটবুকটার পাতায় চোখ গেঁথে বসে ছিলাম। প্রতিটা লাইনে আমার নিজের হাতের লেখা, অথচ যেন অন্য কারও গল্প। আমি লিখেছি, আমি কথা বলেছি, আমি মাপ নিয়েছি, আমি কাপড় কেটেছি—সব প্রমাণ সামনে, কিন্তু স্মৃতির ভেতর কিছুই নেই।
মনে হচ্ছিল আমার মাথার ভেতর কেউ ধীরে ধীরে সব আলো নিভিয়ে দিচ্ছে।
বাইরে আজানের শব্দ ভেসে এলো। দোকানের সামনে কয়েকজন মানুষ হাঁটছিল। দূরে ভাজা মুড়ির গন্ধ। সবকিছু স্বাভাবিক, পরিচিত। অথচ আমার বুকের ভেতর তখন একটা ভয় ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে।
আমি নোটবুকটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দোকানের দরজা বন্ধ করলাম। বাড়ি ফেরার পুরো পথজুড়ে একটা প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরছিল।
যদি আমি সত্যিই অসুস্থ না হই?
যদি কেউ আমাকে অসুস্থ বানিয়ে দেয়?
বাড়ির গেট খুলতেই দেখলাম বারান্দার আলো জ্বলছে। মিস্টার ইয়াসিন চেয়ারে বসে ছিল। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। তার মুখে সেই চেনা কোমল হাসি।
“আজ অনেক দেরি করলে।”
আমি জোর করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম।
“কাজ ছিল।”
সে এগিয়ে এসে আমার ব্যাগটা হাতে নিল। তার চোখ দুটো খুব মনোযোগ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আগে এই দৃষ্টি আমাকে নিরাপদ মনে করাত। এখন মনে হচ্ছিল সে আমাকে পড়ে ফেলতে চাইছে।
“তোমার মাথা আবার ব্যথা করছে?”
আমি কিছুক্ষণ থেমে বললাম, “হ্যাঁ, একটু।”
সে মাথা নাড়ল, যেন আগেই জানত।
“আমি তোমার জন্য চা বানিয়েছি।”
আমার বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল।
রান্নাঘরে ঢুকতেই সেই পরিচিত হিবিস্কাস চায়ের গন্ধ নাকে এলো। লালচে বাষ্প ধীরে ধীরে উঠছে। টেবিলে দুটো কাপ রাখা। একটার হাতলে ছোট একটা ফাটল। অন্যটা একদম পরিষ্কার।
আমি থেমে গেলাম।
হঠাৎ মনে পড়ল, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিরাতে একই কাপটা আমার সামনে আসে। আর অন্য কাপটা থাকে তার জন্য।
মিস্টার ইয়াসিন চামচ দিয়ে নিজের কাপ নাড়তে নাড়তে বলল, “তুমি আগে খেয়ে নাও।”
আমার আঙুল কাপে ছোঁয়ানো মাত্র একটা অদ্ভুত শীতলতা অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল কাপটা হাতে নয়, সরাসরি আমার ভেতরে ঠান্ডা ঢেলে দিচ্ছে।
আমি হাসলাম।
“আজ একটু পরে খাব।”
সে চোখ তুলল।
“কেন?”
“পেটে অস্বস্তি লাগছে।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর খুব ধীরে সে বলল, “তুমি ইদানীং আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ, নীলা।”
আমি মাথা নিচু করলাম যেন অপরাধী আমি।
কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গেলাম, আমাকে অভিনয় করতে হবে।
সেই রাতেই আমি প্রথমবার চা না খেয়ে বাথরুমে ঢুকে পুরোটা ফেলে দিলাম।
তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার চোখের নিচে কালচে দাগ। গাল কেমন শুকিয়ে গেছে। চুল এলোমেলো। আমি নিজেকেই চিনতে পারছিলাম না।
একটা সময় ছিল, যখন আমি নিজেকে সুন্দর ভাবতাম। দোকানে গ্রাহকরা বলত আমার হাসি নাকি পুরো ঘর উজ্জ্বল করে দেয়। এখন আমি আয়নায় এমন এক নারীকে দেখছি, যার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে জীবন মুছে যাচ্ছে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সেই পরিবর্তন এত ধীরে হয়েছে যে আমি টেরই পাইনি।
পরদিন সকালে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম কাউকে কিছু না বলে আগে সত্যিটা জানব।
দোকানে যাওয়ার আগে রান্নাঘরে ঢুকে আমি দুটো কাপ ভালো করে দেখলাম। আমার কাপের ভেতরের দাগ একটু আলাদা। খুব হালকা সাদা আস্তরণ।
আমি কাপটা ধুয়ে ফেললাম না।
সেটা একটা প্লাস্টিক ব্যাগে লুকিয়ে দোকানে নিয়ে গেলাম।
দুপুরে দোকানের পাশের ফার্মেসিতে কাজ করা বৃদ্ধ লোকটাকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। সবাই তাকে কাকা বলে ডাকে। তিনি একসময় হাসপাতালে ল্যাব টেকনিশিয়ান ছিলেন।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “কাকা, একটা জিনিস পরীক্ষা করে দিতে পারবেন?”
তিনি অবাক হয়ে কাপটার দিকে তাকালেন।
“এটা কী?”
“আমি নিশ্চিত না।”
তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন। হয়তো আমার চোখের ভয়টা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।
“কাল এসে খবর নিও।”
সেই রাতটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাতগুলোর একটা।
মিস্টার ইয়াসিন আগের মতোই চা বানাল। আগের মতোই কোমল গলায় কথা বলল। আগের মতোই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
আর আমি আগের মতোই ভান করলাম।
চা ঠোঁটে ছোঁয়ালাম, কিন্তু গিললাম না।
সে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আমি হাসলাম।
তারপর সুযোগ পেয়ে চুপচাপ চা ফেলে দিলাম।
পরদিন দুপুরে ফার্মেসিতে ঢুকতেই কাকা দরজা ভেতর থেকে টেনে বন্ধ করলেন।
তার মুখ গম্ভীর।
“এই কাপে ঘুমের ওষুধের চিহ্ন আছে।”
আমার শরীর জমে গেল।
“কী?”
“হালকা ডোজ। কিন্তু নিয়মিত খেলে স্মৃতিতে প্রভাব পড়তে পারে। শরীর দুর্বল হয়। মাথা ঝিমঝিম করে।”
আমি কিছু বলতে পারছিলাম না।
শব্দগুলো যেন দূর থেকে আসছিল।
“তুমি এটা কোথায় পেয়েছ?”
আমার ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
আমি মিথ্যে বললাম।
“এক আত্মীয়ের ব্যাপার।”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “সাবধানে থাকবা মা। এই জিনিস কেউ ভুল করে দেয় না।”
বাড়ি ফেরার সময় আমার মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী বদলে গেছে।
রাস্তার মানুষগুলো আগের মতোই হাঁটছে। দোকানগুলো খোলা। বাচ্চারা খেলছে।
শুধু আমি জানি, আমার নিজের ঘরে কেউ আমাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছে।
সেই রাতে আমি প্রথমবার মিস্টার ইয়াসিনকে নতুন চোখে দেখলাম।
সে খাবার খেতে খেতে ফোন দেখছিল। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। এমন একজন স্বামী, যাকে দেখে যে কেউ বলবে সে স্ত্রীকে খুব ভালোবাসে।
কিন্তু এখন আমি তার প্রতিটা নড়াচড়া লক্ষ্য করছিলাম।
সে কখন রান্নাঘরে যায়।
কতক্ষণ থাকে।
কখন আমার কাপটা এগিয়ে দেয়।
কীভাবে নিশ্চিত হয় আমি চা শেষ করেছি।
আমি বুঝতে পারলাম, এটা হঠাৎ শুরু হয়নি।
এটা পরিকল্পিত।
অনেকদিন ধরে।
আমার বুকের ভেতর রাগ উঠছিল, কিন্তু সেই রাগের চেয়েও বড় ছিল একটা প্রশ্ন।
কেন?
আমি কী করেছি?
নাকি সে কিছু চায়?
পরবর্তী কয়েকদিন আমি আরও সতর্ক হয়ে গেলাম। আমি চা খাওয়ার ভান করতাম, তারপর ফেলে দিতাম। আর আশ্চর্যজনকভাবে, ধীরে ধীরে আমার মাথাব্যথা কমতে শুরু করল।
আমি সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে পারছিলাম।
পুরোনো স্মৃতিগুলো পরিষ্কার হতে শুরু করল।
আর তখনই আমি এমন কিছু খেয়াল করলাম, যা আগে চোখেই পড়েনি।
আমার আলমারির ফাইলগুলো এলোমেলো।
কিছু ব্যাংক কাগজপত্র উধাও।
আমার দোকানের আয়ের হিসাব মিলছে না।
একদিন দুপুরে আমি ব্যাংকে গেলাম।
সেখানে বসে যখন স্টেটমেন্ট দেখছিলাম, আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
গত তিন মাসে আমার অ্যাকাউন্ট থেকে ধীরে ধীরে অনেক টাকা তোলা হয়েছে।
সব অনুমোদিত লেনদেন।
আমার স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু আমি সেই কাগজগুলো জীবনে দেখিনি।
ব্যাংক কর্মকর্তা বললেন, “আপনি তো আপনার স্বামীকে অনুমতি দিয়েছিলেন।”
আমি চুপ করে রইলাম।
হ্যাঁ, দিয়েছিলাম।
কারণ আমি তাকে বিশ্বাস করতাম।
সেদিন বাড়ি ফিরে আমি প্রথমবার কাঁদলাম না।
বরং অদ্ভুত শান্ত হয়ে গেলাম।
মিস্টার ইয়াসিন তখনও জানে না আমি সত্যিটা জেনে গেছি।
আর সেই কারণেই আমি শক্তিশালী।
সেই রাতেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি এখনই তাকে কিছু বলব না।
আমি দেখতে চাই সে কতদূর যেতে পারে।
আমি জানতে চাই সে আসলে কী লুকাচ্ছে।
এরপরের দিনগুলোতে আমি অভিনয় আরও নিখুঁত করলাম। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ভুলে যাওয়ার ভান করতাম। একই প্রশ্ন দুবার করতাম। কখনো বলতাম মাথা ঘুরছে।
আর আমি লক্ষ্য করলাম, এতে মিস্টার ইয়াসিন স্বস্তি পায়।
সে ভাবছে তার পরিকল্পনা কাজ করছে।
এক রাতে আমি ইচ্ছে করে বললাম, “আমার মনে হয় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
সে আমার হাত ধরে খুব নরম গলায় বলল, “না নীলা, আমি আছি তো।”
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
একটা সময় ছিল, যখন এই চোখের জন্য আমি সবকিছু ছেড়ে দিতে পারতাম।
আজ সেই একই চোখের ভেতর আমি অন্ধকার দেখছি।
সেই রাতেই সবকিছু বদলে গেল।
আমি ঘুমানোর ভান করছিলাম।
হঠাৎ গভীর রাতে বিছানা নড়ার শব্দ পেলাম।
মিস্টার ইয়াসিন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
আমি চোখ বন্ধ রেখেই শ্বাস ধীর করলাম।
সে আলমারি খুলল।
তারপর খুব আস্তে ড্রয়ার টানল।
কাগজের শব্দ।
কয়েক মিনিট পর দরজা বন্ধ হওয়ার ক্ষীণ আওয়াজ পেলাম।
আমি উঠে বসলাম।
ঘর অন্ধকার। শুধু জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে।
আমার বুক ধুকপুক করছে।
আমি ধীরে ধীরে আলমারির কাছে গেলাম।
ড্রয়ার খুলতেই বুঝলাম, আমার জমির কাগজ নেই।
মায়ের রেখে যাওয়া শেষ সম্পদ।
আমার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
আর তখনই প্রথমবার একটা ভয়ংকর সত্য পুরোপুরি পরিষ্কার হলো।
সে শুধু আমাকে দুর্বল করছে না।
সে আমাকে শেষ করে দিতে চাইছে।

0 Comments