ঘরের দরজায় নক করার শব্দটা খুব মৃদু নয়, বেশ চড়া এবং আ*ত্মবিশ্বাসী। নীল হলে এভাবে নক করত না। ও অপ*রাধীর মতো দুবার আলতো করে টোকা দিয়ে ডাকত—'অনন্যা, প্লিজ দরজাটা খোলো।'
তাহলে দরজার ওপাশে কে? রেহানা বেগম নাকি উনত্রিশ বছরের সেই উটকো 'শাজাহান বাবু'?
আমি বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ঝটকা মেরে দরজাটা খুললাম। ভেবেছিলাম কড়া কিছু কথা শুনিয়ে দেব, কিন্তু দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে আমার কথা আটকে গেল। দরজায় নীল বা আবির কেউ নেই, দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং রেহানা বেগম। ওনার পেছনে ড্রয়িংরুমের সোফায় আবির বেশ আয়েশ করে পা নাচিয়ে বসে মোবাইল ঘাটছে, আর নীল অপ রাধীর মতো ডাইনিং টেবিলের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে।
"কী রে অনন্যা? শাশুড়ি ঘরে এল, আর তুই দরজা বন্ধ করে নাক ডেকে ঘুমানোর অভিনয় করছিস?" রেহানা বেগম আমার মুখের ওপর কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লেন। ওনার গা থেকে চড়া পারফিউমের গন্ধ আসছে, যা এই মুহূর্তে আমার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াল।
আমি নিজেকে যতটা সম্ভব শক্ত করে বললাম, "আমি ঘুমাচ্ছিলাম না মা। শরীরটা ভালো লাগছিল না, তাই নিজের ঘরে চলে এসেছি।"
"শরীর ভালো লাগবে কী করে? মন ভালো না থাকলে কি শরীর ভালো থাকে?" রেহানা বেগম বিছানার এক কোণে বসলেন, ওনার কাতান শাড়ির খড়খড়ে আওয়াজ হলো। "আমি সব বুঝি অনন্যা। তুই আর নীল যে আমার এই বিয়েটা মেনে নিতে পারিসনি, সেটা তোদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, জীবনটা আমার। চুয়ান্ন বছর বয়সে এসে আমি কার সাথে সংসার করব, সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে ওনার মুখোমুখি দাঁড়ালাম। "মা, আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু সমাজ, লোকলজ্জা আর নীলের মানসিক অবস্থাটার কথা কি একবারও ভেবেছেন? আবির নীলের চেয়ে এক মাসের ছোট! ও আপনার ছেলের বয়সী!"
আমার কথা শুনে রেহানা বেগমের চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুললেন। "ছেলের বয়সী হলেই সে ছেলে হয়ে যায় না, অনন্যা। আবির আমাকে বোঝে, যেটা এই তিন বছরে আমার নিজের ছেলেও বোঝেনি। নীল তো তার বউ আর অফিস নিয়ে ব্যস্ত। আমার একাকীত্ব ও দূর করতে পারত? আর সমাজের কথা বলছিস? এই সমাজ কি আমার খোঁজ নিতে আসত?"
আমি বাকরুদ্ধ হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। একজন শিক্ষিত, ব্যাংকের প্রাক্তন কর্মকর্তা মহিলার মুখে এসব যুক্তি শুনলে মাথা ঠিক রাখা দায়। বোঝা যাচ্ছে, আবির ছেলেটা ওনার মগজ ধোলাই খুব ভালোভাবেই করেছে।
"যাক গে, এসব তাত্ত্বিক কথা বাদ দে," রেহানা বেগম শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন। "মূল কথায় আসি। আমি আর আবির আজ রাতে এখানেই থাকছি। তোদের এই ফ্ল্যাটের গেস্ট রুমটা একটু গুছিয়ে দিস। আর হ্যাঁ, আবির কিন্তু ড্রয়িংরুমে বসে আছে, ও এখনো এক গ্লাস পানিও পায়নি। একটা উনত্রিশ বছরের ছেলে, এই রাতে ওর নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে? রান্নাঘরে কী রান্না করেছিস শুনি?"
ওনার এই অদ্ভুত আবদার শুনে আমার ভেতরের রাগটা এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। আমি সোজা ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "আমি কোনো রান্না করিনি, মা। আর আজ এই ডাইনিং টেবিলে আমি কোনো খাবারও সাজাতে পারব না। নীলকে বলেছি বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নিতে। আপনারা দয়া করে ওটাই খেয়ে নিন।"
রেহানা বেগমের ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। তিনি কিছু একটা বলতে চাইলেন, কিন্তু ঠিক তখনই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল আবির।
"আরে তুমি শুধু শুধু অনন্যার সাথে রাগ করছ কেন?" আবির অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায়, চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল। ও আমাকে 'অনন্যা বলে সম্বোধন করল! আমার কান দুটো যেন ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল।
আবির ঘরের ভেতরে এক পা বাড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। "অনন্যা, আই অ্যাম রিয়ালি সরি।
আমাদের হুট করে এভাবে আসাটা হয়তো আপনার পছন্দ হয়নি। আসলে রেহানাই বলল, নিজের ঘরে পর হয়ে থাকার কী দরকার? তাই চলে এলাম। আপনি কষ্ট করে রান্না না করলে কোনো সমস্যা নেই, আমি নীলকে নিয়ে নিচে যাচ্ছি। গলির মোড়ের রেস্টুরেন্ট থেকে বিরিয়ানি প্যাক করে নিয়ে আসি? আপনার জন্য আনব?"
ওর এই অতি-ভদ্রতা এবং 'রেহানা' বলে আমার শাশুড়িকে সম্বোধন করার ধরণটা এতটাই কুরুচিপূর্ণ লাগছিল যে আমার গা রি রি করে উঠল। চুয়ান্ন বছরের একজন মহিলাকে উনত্রিশ বছরের একটা ছেলে নাম ধরে ডাকছে, আর ভদ্রমহিলা তাতে লজ্জার বদলে গর্ব বোধ করছেন!
নীল ততক্ষণে দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। ও আবিরের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু গলায় বলল, "তোমাকে নিচে যেতে হবে না আবির। আমি খাবার অর্ডার করে দিচ্ছি।"
"আরে না নীল, অর্ডার করলে আসতে দেরি হবে। চলো, তুমি আর আমি একসাথেই যাই। বাইকে করে গিয়ে নিয়ে আসি। শোনো, এখন থেকে তো আমরা একই পরিবারের, তাই না? এত ফরমালিটির কী আছে!" আবির নীলের কাঁধে হাত দিতে গেল।
নীল ঝটকা মে*রে আবিরের হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল। ওর ফর্সা মুখটা তখন রাগে আর অপ*মানে থরথর করে কাঁপছে। "আমার কাঁধে হাত দেবে না, আবির! নিজের সীমার মধ্যে থাকো।"
ড্রয়িংরুমের আবহাওয়া মুহূর্তের মধ্যে জমে বরফ হয়ে গেল। রেহানা বেগম সোফা থেকে প্রায় বাঘি*নীর মতো গর্জে উঠলেন, "নীল! কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই শিক্ষা তোকে আমি দিইনি? ও তোর নতুন বাবা, তোকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে!"
"মা!" নীল এবার চিৎকার করে উঠল, যা ও সচরাচর কখনোই করে না। "সবকিছুর একটা সীমা থাকে। উনি আমার চেয়ে এক মাসের ছোট, ওনাকে আমি বাবা বলে ডাকব? তুমি পাগ*ল হয়ে গেছ মা, তুমি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেছ!"
নাটকটা যে এই স্তরে পৌঁছাবে, তা আমি ভাবিনি। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কীভাবে একটা সাজানো গোছানো পরিবার স্রেফ এক রাতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। আবিরের মুখে কিন্তু কোনো রাগের অভিব্যক্তি নেই। ও বেশ উপভোগ করছে এই পারিবারিক অশান্তিটা। ওর চোখের কোণের ধূর্ত হাসিটাই বলে দিচ্ছে, ও এটাই চেয়েছিল—নীল আর ওর মায়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা।
রেহানা বেগম নীলের দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় বললেন, "ঠিক আছে। তোরা যখন আমাদের এই বাড়িতে সহ্য করতে পারছিস না, তখন আমরাও এখানে এক মুহূর্ত থাকব না। তবে মনে রাখিস নীল, এই ফ্ল্যাটের অর্ধেক শেয়ার কিন্তু আইনিভাবে আমার। আমি কালকেই উকিলের সাথে কথা বলব। আমার ভাগের অংশটা আমি আবিরের নামে লিখে দেব!"
কথাটা শুনে আমার আর নীলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আবিরের আসল রূপটা এবার পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে গেল আমাদের সামনে।

0 Comments