কাজরী

 

কাজরী

"ইশানের দাদীর শরীর ভালো যাচ্ছে না। তুমি একবার তাকে দেখতে গেলে না?"
কাজরীকে প্রশ্নটা করলেন শিরিন। কাজরী চুপচাপ, শান্ত চোখে আছে। ইশান আর আল্পনা ছাড়া এখনো কেউ ওর সত্যিটা জানে না। ইশান বোধহয় কাউকে জানতেও দিতে চায় না৷ কাজরী প্রশ্ন করলো,
"কী হয়েছে ওনার?"
শিরিন হেসে ফেললেন। বললেন,
"ভিমরতি। উনি দু:স্বপ্ন দেখে অসুস্থবোধ করছেন। উনি চাইছেন সবসময় আমি ওনার পাশে থাকে। ওনার পাশের কোনো ঘরে শিফট হয়ে যাই। "
কাজরী তাকালো। শিরিন সন্দিহান গলায় বললেন,
"তুমি কী ওনাকে অপ্রিয় কিছু বলেছ? তাছাড়া মনে হচ্ছিলো তুমি ওনাকে এভয়েড করছ। "
"উনি আপনাকে কেন অপছন্দ করেন?"
শিরিন হাসলেন। কাজরীর মুখোমুখি বসলেন। কথা হচ্ছিলো কাজরীর বেড রুমের এটাচড ড্রইং স্পেসে। শিরিন বললেন,
"উনি ওনার সংসারের সব অশান্তির কারণ হিসেবে আমাকে দায়ী করেন। এটা মূলত ওনার একটা মানসিক রোগ৷ যে সময়ে ওনার সো কলড সংসারে ঝড় ওঠে তখন আমি এদেশে ছিলাম ই না। বাচ্চাদের নিয়ে সুইডেনে ছিলাম। মূলত তার টালমাটাল সো কল্ড সংসারের হাল ধরতেই আমি সুইডেন থেকে ফিরেছিলাম। কিন্তু সবার কাছে উনি ইনিয়েবিনিয়ে আমার কথা বলেন। এটা বলে শান্তি পান। "
"আপনি কেন মেনে নিচ্ছেন?"
"বিকারগস্ত মানুষ তুমি এর আগে দেখেছ কখনো? দেখো নি, তাদেরকে যে কাজ করতে বারণ করা হয়, তারা সেটাই বেশী করে করেন। মিস্টার চৌধুরী তার ভাইয়ের সঙ্গে ভালো টার্মে ছিলেন না। ওয়াজেদ চৌধুরী যতটা বিচক্ষন, বুদ্ধিমান ও বৈষয়িক ছিলেন তার ভাই ছিলেন ততটাই উদাসীন, বোকা, মাতাল ধরনের। শুনেছিলাম....
শিরিন থামলেন। কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। কাজরীকে খেয়াল করলেন ভালো করে। প্রশ্ন করলেন,
"আর ইউ ওকে? "
"আপনি থামলেন কেন? পুরোটা শেষ করুন। "
"না। আমার যদি তোমাকে এই বিষয়ে কিছু বলার থাকতো তবে সেটা আগেই বলতাম। এখন এসব বলে কোনো লাভ নেই। তুমি আর ইশান ভালোভাবে মুভ করে গেছ। আই এম হ্যাপি ফর বোথ অফ ইউ। "
কাজরী মৃদু হাসলো। শিরিন উঠে দাঁড়ালো। বলল,
"দেখে এসো ওনাকে একবার। যদিও দূর্বল হয়ে পড়েছেন খুব। তবে মনে হচ্ছে উনি সারভাইভ করবেন। "
শিরিন পা বাড়ায়। কাজরী ডাকে,
"শুনুন। "
শিরিন থমকে দাঁডান। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকান।
"আপনার স্বামী তার ব্যক্তিগত লকারে ইশানের জন্য একটা চিঠি রেখে গেছেন৷ সেখানে লিখেছে কী জানেন? আমাকে যেন মেরে ফেলা হয়৷ কাজটা যেন ইশান ই করে। "
শিরিনের চোয়াল শক্ত হলো। উনি একটু সময় নিয়ে বললেন,
"আমি অবাক হই নি। উনি ওয়াজেদ চৌধুরী, উনি সব পারতেন। বেঁচে থাকলে এই কাজটা হয়তো নিজেই কৌশলে করে ফেলতেন। হয়তো তুমি প্যালেস থেকে স্বাভাবিক ভাবে গাড়ি করে কোথাও বের হলে , তারপর গায়েব হয়ে যেতে। কেউ খুঁজে পেত না, তোমার অস্তিত্ব সম্পর্কে কেউ জানতোই না। উনি খুবই আনহ্যাপি থেকে সবার সামনে ভিক্টিম সেজে ঘুরে বেড়াতেন। ইশানকে বোঝাতেন যে তুমি বিট্রে করেছ। হি ওয়াজ সাচ এ ব্লাডি ক্রিমিনাল। "
শিরিনের চোখে স্পষ্ট ঘৃনা মৃত স্বামীর জন্য। কাজরী নির্লিপ্ত চোখে দেখলো৷ শিরিন আরও বললেন,
"বাই দ্য ওয়ে, তুমি ভীষণ লাকি। বিপদ কিংবা অঘটন তোমাকে ছুঁতে পারে না। তোমার মায়ের মতো ভাগ্য না তোমার। "
কাজরী তাকিয়ে রইলো। শিরিনের ঠোঁটের কোনায় ঈষৎ হাসি। কাজরী প্রশ্ন করলো,
"আপনি আমার মা'কে অপছন্দ করতেন। কেন করতেন?"
"নট এট অল। উই হ্যাড ভেরি ডিফারেন্ট পার্সোনালিটি। আর সত্যি বলতে আমার ছেলেমেয়েরা ছাড়া আর কাউকেই পছন্দ করতাম না। তোমার মা'কে অপছন্দ করার স্পেসিফিক কারণ ছিলো না, আমরা একই ছাদের নিচে একসঙ্গে বেশীদিন থাকার সুযোগও পাই নি। আর মন্যুজান খাতুনের সব কথা গুরুত্ব দিও না, উনি আমাকে দেখানোর জন্য তোমার মা'কে নিয়ে খুব আহ্লাদ করতেন। তিনিও তার ছেলের মতোই ফেক পার্সোনালিটি ক্যারি করতেন। "
কাজরী বোধহয় এই প্রথম শিরিনের সঙ্গে তিক্ততা ছাড়া কথা বলছে। শিরিনও কোনো ভান কিংবা ভনিতা করছেন না। একদম সহজ গলায় কথাগুলো বলল। কোনো অস্বস্তি নেই।
"আরেকটা প্রশ্ন করব আপনাকে। জাস্ট কিউরিওসিটি থেকে। আপনি সচেতন ভাবেই নিশান আর ইশানের দ্বৈরথ সৃষ্টি করেছিলেন। কারণ মিস্টার চৌধুরী তার ভাইয়ের সঙ্গে ভালো টার্মে ছিলেন না। এই ব্যাপার টা আপনার মাথায় ক্লিক করেছিল। "
শিরিন নরম হাসি দিয়ে বললেন,
"শুরুতে ওরকম ভাবি নি। পরে মনে হলো যা হচ্ছে ভালো। আফটার অল ওদের বাবাও তো এক নন। এন্ড আই হ্যাভ গিল্ট। ওরা যদি ভালো বন্ডিং শেয়ার করতো তাহলে আজকে নিশানকে ইশানের অনুগ্রহ নিতে হতো না। আই এম এ ব্যাড মাদার। "
শিরিন তার হতাশা, অসহায়ত্ব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করলেন কাজরীর সামনে। যাবার আগে বলে গেলেন,
"তুমি বোধহয় আপসেট। তবে তোমার একটা বিষয় চমৎকার। বাইরে থেকে তোমাকে দেখলে বোঝা যায় না যে ভেতরে যুদ্ধ চলছে। বয়স কম হলেও এই ব্যাপার টা ভালোভাবে রপ্ত করেছ। এটা একদিক থেকে ভালো। কারণ মানুষ যখন জানবে তুমি ভাঙাচোরা, তখন আরও বেশী ভেঙে দেবার চেষ্টা করবে৷ "
****
কাজরী আল্পনার মুখোমুখি হয়েছে ঠিকই কিন্তু আল্পনাকে কোনো প্রশ্ন করে নি। একই ডাইনিং টেবিলে বসে ডিনার করেছে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কোনো কথা হয় নি। আল্পনা ভেবেছিল কাজরী ও'কে ডাকবে, সরাসরি প্রশ্ন করবে কিন্তু সেসব কিছু করলো না। বরং কাজরী নিজেকে আড়াল করে নিলো সূক্ষ্মভাবে। খুব স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করছে তবে ও'কে যারা কাছ থেকে চিনে তারা ঠিকই বুঝতে পারে যে একটা কিছু চলছে মনের ভেতর।
আল্পনা নিজেই কাজরীর কাছে এলো। বিকেলে দরজায় নক করলো,
কাজরী ম্যাগাজিনের পাতা উল্টেপাল্টে দেখছিল৷ আড়চোখে দেখে বলল,
"এসো আল্পনা। "
আল্পনা আসলো। কাজরী তাকালো ওর দিকে সংকোচে। আল্পনা একটা সাদা রঙের খাম এগিয়ে দিয়ে বলল,
"বাবা পাঠালেন৷ তুমি বোধহয় তার কল রিসিভ করছ না। "
কাজরী হাত বাড়িয়ে খাম টা নেবার সময় বলল,
"একটু বসো আল্পনা। "
আল্পনা বসলো। সময় ও পরিস্থিতির কারণে আজ ওদের অবস্থান আলাদা। আল্পনাকে এই মুহুর্তে যেরকম আত্মবিশ্বাসী লাগছে, কাজরীকে সেই তুলনায় দূর্বল লাগছে। কাজরী বলল,
"আখতারউজ্জামান সাহেব কে তুমি এখনো বাবা ডাকতে পারছ?"
আল্পনা মৃদু হেসে বলল,
"আমি ওনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি কাজরী। শুধু একটা কারণে, ওনার স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী থাকা স্বত্তেও উনি সেভাবে নিষ্ঠুর আচরণ করেন নি। অস্বীকার করবার উপায় নেই যে উনি আমাদের সঙ্গে যা কিছু করেছে সেটা অন্যায় ছিলো। তবুও ক্ষমা করে দিয়ে আমি তার সঙ্গে সকল বন্ধন ছিন্ন করতে চাইছি। "
কাজরী ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু ভাবলো।
"আল্পনা তুমি যখন প্রথম জানতে পারলে তখন তোমার ফিলিংস টা কেমন হয়েছিল?"
আল্পনা স্মিত হাসলো। বলল,
"আমার সঙ্গে যা কিছু আগে ঘটেছিল সেগুলো সহ্য করতে করতে এমন হয়ে গিয়েছি যে এই ধাক্কাটা হজম করতে তেমন অসুবিধে হয় নি৷ বুকটা ফাঁকা লাগছিলো ভীষণ। এখনো মনে আছে যেদিন ইশান আমাকে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট টা হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল তুমি আর কাজরী দুই বোন। তোমাদের মা এক হলেও বাবা ভিন্ন। রিপোর্ট টা আমি দেখিনি। সেটা হাতে নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম। আমার চোখের সামনে পুরো ছোটবেলাটা ভেসে উঠলো। আমি, মা, তুমি, বাবা সবাই। "
কাজরী তাকিয়ে রইলো শান্ত চোখে। আল্পনা বড় করে নি:শ্বাস ফেলে বলল,
"আমাদের চোখের সামনেই সব প্রশ্নের উত্তর ছিলো। কাউন্সিলিং করার সময় যখন আমাকে বলল ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করতে তখনই মাথায় একটা কথা এলো। কাজরী কী একটা ব্যাপার ভুল জানে! মোস্ট প্রবাবলি আমি বাবার মেয়ে নই, বরং কাজরীর প্রতি তার যে সফটনেস আছে তাতে ও তার মেয়ে হবে। বাবার আলমারিতে একটা ছবি খুঁজে পেলাম। তার স্ত্রী ও মেয়ের। খুব যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছেন। মানুষ তো তার স্মৃতিই লুকিয়ে রাখে যে আর আমাদের মধ্যে থাকে না। আমি তার চোখের সামনে, অথচ আমার স্মৃতিটুকু যত্ন করে রাখলেন! কই আমাকে তো এতো যত্ন তিনি কখনো করেন নি। "
"আল্পনা আই এম সরি। আমি তোমাকে বোকা মনে করতাম। কিন্তু তুমি বোকা না। আই এম রিয়েলি সরি। "
আল্পনা আবারও হেসে বলল,
"বোকা না হলেও আমি দূর্বল। তুমি শক্ত, ইস্পাতের মতো। আমি তেমন নই৷"
কাজরী বিড়বিড় করে বলল,
"বোকা তো আমি।"
আল্পনা ওর পাশে এসে বলল,
"বোকা না। তুমি বাবাকে বিশ্বাস করেছ, ভরসাও করেছ৷ তুমি বলো কাউকে বিশ্বাস করো না, অথচ অজান্তেই তাকে সবচেয়ে বেশী ভরসা করো। এই ক্রাইসিস কাটিয়ে উঠবে তুমি কাজরী। আমি তোমাকে একটা এডভাইজ দেই, তুমি সবকিছু ভুলে নিজের জন্য ভাবো। এখনো পর্যন্ত তুমি অন্যের ভাবনা, ইচ্ছেকে প্রায়োরিটি দিয়েছ। এবার নিজেকে প্রায়োরিটি দাও। "
কাজরী আল্পনাকে বলতে পারছে না ওর মনে কী চলছে৷ কাউকে বোঝাতেও পারবে না। আল্পনা ওর হাত চেপে ধরে বলে,
"আমি যাচ্ছি এখন। আর এসব কনভার্সেশন আর বাড়তে দেয়া যাবে না কাজরী। "
কাজরী কিছু বলে না। আল্পনা বেরিয়ে যায় ও'কে একা রেখে। কাজরী অবাক হয়, আল্পনা কতো সহজভাবে সব মেনে নিতে পারছে। কিংবা ওর দেখার ভুল! আল্পনা তো ওর জীবনের নিষ্ঠুর সত্যিটা আগেই জেনেছে। তাই এখনো শক্ত থাকতে পারছে৷
****
আখতারউজ্জামান এর লেখা চিঠিটা কাজরী পড়তে শুরু করলো।
কাজরী,
এই চিঠি লিখতে হচ্ছে কারণ তোমার সামনে চোখে চোখ রেখে কথা বলার ক্ষমতা আমার নেই। আমি বরাবরই তোমার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ভয় পাই। আমার সবসময় ই মনে হতো বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতি এই মেয়েটি আমার চতুরতা বুঝে ফেলবে। তুমি এখন আমাকে ভীষণ ঘৃনা করো জানি। হয়তো তোমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃনিত মানুষটাও আমি। এরচেয়ে বড় আফসোস বোধহয় আমার এই জীবনে কোনোদিন হবে না।
তোমার মা আমাকে ভাই বলে ডাকতেন। আমিও তাকে বোনের চোখেই দেখেছি সবসময়। তিনি যখন আল্পনাকে আমার হাতে তুলে দিলেন তখন আমি প্রবল বিস্ময়ে বাকহারা হয়ে যাই। তিনি কী ছিলেন তা আমি হয়তো ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। এমন মানুষ এই জীবনে আমি দ্বিতীয়জন দেখিনি। তার কথাবার্তা, চাল, চলনে যেমন আভিজাত্য ছিলো তেমনি মন ছিলো স্বচ্ছ জলের মতো। একটা কালো রাত আমাদের সবার জীবন এক নিমিষেই বদলে দিলো। ওয়াজেদ চৌধুরী যখন তার বিজনেস পার্টনার এর মা*র্ডার কেসে ফেঁসে গেলেন তখন তিনি আমার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। আমার শ্বশুর সেই সময়ে বেশ প্রভাবশালী লোক ছিলেন। উঁচু তলার মানুষজনের সঙ্গে তার ওঠাবসা। ওয়াজেদ চৌধুরীর তখন নামঢাক তৈরী হয় নি। তিনি চেয়েছিলেন আমার স্ত্রী আয়েশার বাবা তার প্রভাব খাটিয়ে ওয়াজেদ চৌধুরীকে নির্দোষ প্রমাণ করুক। কারণ ইফতেখার এর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে চৌধুরী বাড়ির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরী হয়েছিল। মন্যুজান খাতুন আমার দু:সম্পর্কের আত্মীয়াও ছিলেন। দু:সময়ে তারা আমার পরিবারকে সাহায্যও করেছিলেন। কিন্তু ওয়াজেদ চৌধুরীকে সাহায্য করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আয়েশার বাবা নীতিবান মানুষ ছিলেন। তিনি সাহায্য করতে অস্বীকার করেছিলেন। এরপর অনেকটা সময় কেটে যায়। বহুদিন পরে ইফতেখার এর আহবানে তার আতিথেয়তা গ্রহণ করতে স্বপরিবারে সুবর্ণনগর যাওয়া হয়। সুবর্ণনগর আমার পিতৃভূমি ছিলো। কাছের বন্ধুর আতিথেয়তা ও পরিবার সহ নিজের গ্রামে গিয়ে আমার জীবনটা এক লহমায় বদলে গেল।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো সেই রাতের দুর্ঘটনা কাকতালীয় ছিলো না৷ সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনা করে ঘটানো হয়েছিল। ডাকাতদল ইচ্ছে করেই প্রথমে আয়েশাকে টার্গেট করে। একটা বদনাম গায়ে লেগে গেলে আয়েশার বাবাকে অনেক অসম্মান সহ্য করতে হবে৷ উনি এটাই চেয়েছিলেন। হ্যাঁ আমি বিশ্বাস করি যে এই কর্মকান্ডের পিছনে ওয়াজেদ চৌধুরীই ছিলেন। তোমার মা'কে টার্গেট করা হয়েছিল কারণ তার গর্ভের সন্তান যেন পৃথিবীতে না আসে। ইফতেখার এর সন্তান পৃথিবীতে আসা মানে আরেকটা উত্তরাধিকার তৈরী হওয়া। তাছাড়া এই সন্তানের আগমনের খবরে ইফতেখার এর অভাবনীয় পরিবর্তনও এসেছিল। ওয়াজেদ চৌধুরী সবসময় ই চেয়েছিলেন রাজত্ব তার একার হবে। সৎ ভাইকে তিনি কোনোভাবেই ভালো অবস্থানে পৌছাতে দিতেন না৷
তোমার মা এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি চৌধুরী পরিবার ছেড়েছিলেন ঘৃনায়। কোনোপ্রকার দু:খ তাকে কখনো কাবু করে নি৷ কিন্তু যখন নিজের সম্মানের প্রশ্ন এসেছিল তখন স্বেচ্ছায় তিনি অসম্মানের পথ বেছে নেয়।
আমি ভেবেছিলাম ডাকাতচরে কোমল গেলে সেখান থেকে আর কখনো ফিরে আসতে পারবে না। কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আল্পনার জন্মের পর যখন ফিরে যাচ্ছিলেন তখন শুধু বলেছিলেন, ওখানে তিনি ভালো আছেন। ওই জীবনটা সহজ না, কিন্তু শান্তির। দালানকোঠায় থাকা মানুষজনের চেয়ে ওরা ভালো। ব্যস এতটুকুই। এরপর দীর্ঘসময় আমি তার কোনো খোঁজ পাই নি। দেশে সরকার বদলের পর যখন উত্তাল সময় চলছে তখন তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। তোমাকে আমার হেফাজতে রেখে গিয়েছিলেন৷ কথা ছিলো পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলেই তোমাকে নিয়ে যাবেন। দুই, চার, ছয় মাস হয়ে গেলেও তিনি যোগাযোগ করেন নি৷ আমি খবর নিয়েছিলাম। লোকবল ব্যবহার করে বর্ডার এড়িয়া, আগরতলা সহ আরও কয়েক জায়গায় খোঁজ করেছি তাকে আর পাওয়া যায় নি৷ ডাকাতচরের বেশ কিছু লোক খু*ন হয়েছিল তৎকালিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তাল সময়ে। এছাড়া যারা ছিলেন তাদের খোঁজ পাওয়া যায় নি৷ সেই দলে তোমার মা, বাবা দুজনেই ছিলেন।
তোমার বাবাকে আমি স্বচোক্ষে দেখিনি। তবে তোমার জেনে ভালো লাগবে যে তুমি একজন সাহসী লোকের সন্তান। তোমার বাবা মানুষের জন্য লড়াই করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে তিনি অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি ছিলেন একজন সত্যিকার এর যোদ্ধা, যে অনেকগুলো পরিবার আর মানুষের নায্য অধিকার এর জন্য লড়েছিলেন। আর তোমার মা'কে দিয়েছিল শান্তির জীবন।
নিজেকে তুমি ছোট ভাববে না। তোমার পূর্বপুরুষ এর বংশ, মর্যাদা, প্রতিপত্তির কাছে চৌধুরীরা কিছুই না। ওয়াজেদ চৌধুরী তার বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছিলেন নিজ পরিশ্রম ও মানুষের রক্তবিন্দু দিয়ে। আর তোমার বাবা! তারা বিশাল মাপের মানুষ ছিলেন। নিজেদের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন তারা দেশের মানুষের জন্য। তাদের সঙ্গে কারোর তুলনা হয় না।
জানিনা তোমার আমার আর দেখা হবে কী না। তবে আমার সকল প্রার্থনায় তুমি থাকবে। ইশান ওয়াজেদ চৌধুরীর সন্তান। সে আসলে তোমার ভরসার যোগ্য কী না এই বিষয়টা নিয়ে ভাবার অনুরোধ।
সবশেষে আমি আমার দোষ স্বীকার করে নিচ্ছি। হ্যাঁ আমি রিভেঞ্জের কথা ভেবেছি। তোমরা দুই বোন ছিলে আমার অস্ত্র। আমি সেই অস্ত্রের ব্যবহার করতে চেয়েছি। আমি ওয়াজেদ চৌধুরীকে তোমার জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে হিন্টস দিয়েছিলাম তোমার বিয়ের পর। দেখতে চেয়েছিলাম ওনার ছটফটানি, ওনার মানসিক কষ্ট। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো তোমার ক্ষতি করার সাধ্য কারোর নেই৷ ওয়াজেদ চৌধুরীরও না। তিনি যা কিছু পূর্বে করেছিলেন তার জন্য অনেক অসম্মান ভোগ করেছিলেন। ভদ্রলোক আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগতেন। ওনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো ওনার খানদান, বংশ মর্যাদা। সেটা অক্ষুণ্ণ করে আমি স্বস্তি পেয়েছিলাম। এতো বছরের ছাইচাপা আগুনকে শেষ পর্যন্ত নিভিয়ে ফেলার সুযোগ পেয়ে সেটা হেলায় হারাতে দেই নি।
আমি তোমার আর আল্পনার কাছে অপরাধী। ক্ষমা চাইবার মতো মুখও নেই। তবুও আমার সবটুকু দোয়া ও প্রার্থনা তোমাদের জন্য রইলো। তোমরা ভালো থাকো।
ইতি,
আখতারউজ্জামান
কাজরী খামে আরও একটা জিনিস পেল। একটা ছবি। একজন ভদ্রমহিলা তাকিয়ে আছেন শান্ত চোখে৷ কপালে বড় একটা টিপ, মাথায় ঘোমটা দেয়া। এ যেন ওর ই প্রতিচ্ছবি। প্রথমবার কাজরী নিজের মা'কে দেখলো। চোখ ভরে গেল মুহুর্তেই। এই মানুষটাকে দেখার জন্য কতটা তৃষিত ছিলো তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

Post a Comment

0 Comments