বিধবা_স্ত্রীর_প্রতিশোধ

বিধবা_স্ত্রীর_প্রতিশোধ


পরদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, কিন্তু আমার ভেতরের পৃথিবীটা আর আগের মতো ছিল না। রাতের সেই কথোপকথন, তাদের পরিকল্পনা,
আর “ভাড়া” শব্দটা—সবকিছু আমার মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল, যেন কেউ ইচ্ছে করে ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আমি জানতাম, এখন আর শুধু নীরব থাকার সময় নেই।
সকালের আলো বারান্দা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই আমি বুঝলাম, এই বাড়িটা যতটা শান্ত দেখায়, ভেতরে ততটাই বিষ জমে আছে। রান্নাঘর থেকে বাসন ধোয়ার শব্দ আসছে,
সম্ভবত কাজের মেয়ে এসেছে। শাশুড়ি তরুলতা রহমান তার নিয়মিত জায়গায় বসে আছেন, হাতে চা।
তার চোখে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং একধরনের অদ্ভুত স্বস্তি, যেন তিনি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন আমি এখানে আর বেশিদিন থাকব না।
আমি ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হলাম।
আমার পায়ের শব্দ শুনেই সায়ন্তিকা ঘুরে তাকাল। তার মুখে সেই একই ভদ্র, মিষ্টি হাসি, যেটার আড়ালে বিষ লুকানো থাকে।
“ওহ, তুমি উঠেছ?” সে এমনভাবে বলল যেন আমি এই বাড়ির অতিথি, স্থায়ী কেউ না।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম, নিজের জন্য চা বানাতে।
সায়ন্তিকা পেছন থেকে বলল, “আসলে আজ একটা কথা ছিল… মা একটু কথা বলবেন তোমার সঙ্গে।”
আমি চুলায় চা বসিয়ে ধীরে ধীরে বললাম, “বলতে বলো।”
তার গলায় মিষ্টতা থাকলেও চোখে ছিল হিসেবি ঠান্ডা ভাব।
“দেখো তুলি, আমরা সবাই চাই তুমি ভালো থাকো। কিন্তু পরিস্থিতি তো বদলেছে। বাড়ির খরচ, রাইসার পড়াশোনা—সব মিলিয়ে… একটু adjustment দরকার।”
আমি চামচ নাড়াতে নাড়াতে বললাম, “Adjustment মানে কী?”
সে একটু থেমে গেল। যেন শব্দটা বেছে নিচ্ছে।
“মানে… তুমি যদি এখানে থাকতে চাও, তাহলে কিছু contribution করতে হবে। মানে ভাড়া।”
এই শব্দটা আবার।
আমি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলাম।
ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালাম।
“এটা কার সিদ্ধান্ত?” আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
সায়ন্তিকা এক মুহূর্ত চোখ সরিয়ে নিল, তারপর বলল, “সবাই মিলে।”
ঠিক তখনই শাশুড়ি তরুলতা রহমান চা হাতে ঘরে ঢুকলেন।
“হ্যাঁ,” তিনি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, “বয়স তো কম হলো না। এখন তো নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে।”
আমি এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম।
এই মানুষটা, যাকে আমি নিজের মা ভেবে এতদিন সম্মান করে এসেছি, সে এখন এমনভাবে কথা বলছে যেন আমি এই বাড়ির বোঝা।
আমি হালকা হেসে বললাম, “ঠিক আছে। ভাড়া দেব।”
সায়ন্তিকার চোখে মুহূর্তে জ্বলে উঠল একধরনের জয়।
রায়হান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে প্রথমবার মাথা তুলল। সম্ভবত সে ভাবেনি আমি এত সহজে রাজি হয়ে যাব।
কিন্তু তারা জানত না, আমি কখনো সহজে হারি না।
আমি চুপচাপ নিজের ঘরে ফিরে এলাম।
ঘরের দরজা বন্ধ করতেই আমার ভেতরের সব শান্ত ভাব একটু একটু করে বদলাতে শুরু করল।
আমি জানতাম, এখন তারা আমাকে ছোট করে দেখবে। আমাকে দুর্বল ভাববে। আমাকে চাপে ফেলতে চাইবে।
কিন্তু তারা একটা জিনিস ভুলে গেছে—
আমি আগেই সব প্রস্তুত করে রেখেছি।
দুপুরের দিকে আমার ফোনে একটা মেসেজ এল।
মেহরিন: “সব কাগজপত্র আমি আবার চেক করেছি। পুরো মালিকানা ১০০% তোমার নামে। কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না।”
আমি শুধু লিখলাম: “ভালো।”
এই একটা শব্দেই আমার ভেতরের সিদ্ধান্ত আরও শক্ত হয়ে গেল।
বিকেলের দিকে সায়ন্তিকা আবার আমার ঘরে এল।
“তুমি ভেবে দেখেছ?” সে দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে বলল।
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে বললাম, “কি?”
“ভাড়া কত দিতে পারবে?”
আমি এবার তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম।
“তুমি কত চাও?”
সে একটু ভেবেই বলল, “মাসে ত্রিশ হাজার হলে ভালো হয়।”
আমি হেসে ফেললাম।
“আচ্ছা।”
সে অবাক হলো।
“তুমি সিরিয়াস?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। আমি সিরিয়াস।”
সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না আমি এত সহজে রাজি হচ্ছি। তার চোখে সন্দেহ, আবার লোভ—দুটোই একসাথে কাজ করছিল।
“ঠিক আছে,” সে দ্রুত বলল, “তাহলে আমরা কাল থেকে হিসাব শুরু করব।”
আমি মাথা নাড়লাম।
“ঠিক আছে।”
সে চলে যেতেই আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম।
এইবার আমি আর হাসি থামাতে পারলাম না।
কারণ তারা যে খেলা শুরু করেছে, সেটা তারা নিজেরাই শেষ করতে পারবে না।
রাত নামতেই বাড়ির পরিবেশ আবার সেই আগের মতো হয়ে গেল।
খাওয়ার টেবিলে সবাই ছিল, কিন্তু কেউ কারও দিকে ঠিকভাবে তাকাচ্ছিল না।
রায়হান বলল, “ভাড়া ঠিক হয়েছে তো?”
সায়ন্তিকা মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ। ত্রিশ হাজার।”
তরুলতা রহমান হালকা গলায় বললেন, “ঠিক আছে। দেখো, বেশি বাড়াবাড়ি যেন না হয়।”
আমি চুপচাপ ভাত খাচ্ছিলাম।
তাদের কথার ভেতরে আমি শুধু একটা জিনিস দেখছিলাম—লোভ আর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
খাওয়া শেষে আমি উঠে দাঁড়ালাম।
“আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।”
সায়ন্তিকা অবাক হয়ে বলল, “এই সময়ে?”
“হ্যাঁ।”
আমি আর কিছু না বলে বের হয়ে গেলাম।
বাড়ির বাইরে রাতের বাতাস ঠান্ডা ছিল।
আমি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে একবার আকাশের দিকে তাকালাম।
তারপর ফোন বের করে একজনকে কল করলাম।
“মেহরিন, কাল সকালেই আইনজীবীর সঙ্গে মিটিং সেট করো। এখন সময় এসেছে।”
ওপাশ থেকে শুধু একটা কথা এল—
“তুমি কি নিশ্চিত?”
আমি ধীরে ধীরে বললাম—
“আমি তখনই নিশ্চিত ছিলাম, যেদিন তারা আমাকে ভাড়া দিতে বলেছিল আমার নিজের বাড়িতে।”
কল কেটে গেল।
আমি আবার বাড়ির দিকে তাকালাম।
অন্ধকার বাড়ির ভেতরে আলো জ্বলছে।
ওরা ভাবছে, আমি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছি।
কিন্তু তারা জানে না—ভাঙার আগে ঝড় আসে।
আর সেই ঝড় এখন শুধু শুরু হচ্ছে।

Post a Comment

0 Comments