ইফতেখারকে সেই তপ্ত রোদে স্তব্ধ করে দাঁড়িয়ে রেখে আমি একটা রিকশা নিলাম। পুরো পথটায় মাথার ওপর জ্যৈষ্ঠের কড়া রোদ এসে পড়ছিল, কিন্তু হিজাবের নিচে আমার ন্যাড়া মাথাটায় আজ কোনো অস্বস্তি হচ্ছিল না; বরং এক চরম স্বস্তি আর স্বাধীনতার অনুভূতি হচ্ছিল।
রিকশা যখন আমাদের বাড়ির গলির মুখে এসে থামল, বুকটা একবার চড়ত করে উঠল। আমি জানি, মূল যু**দ্ধটা মাত্র শুরু হলো। এত বড় একটা কাণ্ড ঘটিয়ে পরীক্ষা দিতে এসেছি, আমার শ্বাশুড়ি নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে বসে নেই।
ধীরপায়ে হেঁটে দরজায় নক করলাম। দরজা খুলতেই দেখলাম ড্রয়িংরুমে এক এলাহী কারবার। শুধু শাশুড়ি নন, পাড়ার সেই কুট''নামি করা তিনজন খালা সোফায় গোল হয়ে বসে আছেন। মাঝখানে আমার শ্বাশুড়ি রাবেয়া বেগম চোখে আঁচল ঠেকিয়ে কান্নার অভিনয় করছেন। আমি ভেতরে ঢুকতেই কান্নার বেগ দ্বিগুণ বেড়ে গেল।
"ঐ যে দেখছেন নি ! ডা*কাত বউ ঘরে আইছে! নিজের মাথা নিজে কামাইয়া এখন সতী সাধ্বী সায়রা বানু সাজছে! ও পাড়ার মানুষ, তোমরা বিচার করো—কোনো ভদ্রঘরের বউ নিজের মাথার চুল এভাবে ক্ষুর দিয়া সাফ করে?" রাবেয়া বেগম আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠলেন।
পাড়ার ফাতেমা খালা নাক সিটকে বললেন, "আহারে রাবেয়া বুবু! তোমার কপালডাই পুড়*ল। এমন অলক্ষ্মী, তেজী মেয়ে এই বংশে আইনা ভুল করছ। এইগুলা হইলো মডার্ন ডাই*নী!"
আমি হিজাবটা না খুলেই সোজা ওনাদের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমার শান্ত স্থির দৃষ্টি দেখে ওনারা যেন কিছুটা থমকে গেলেন। আমি ব্যাগ থেকে ওএমআর শিটের কার্বন কপি আর অ্যাডমিট কার্ডটা বের করে ড্রয়িংরুমের টেবিলে সশব্দে রাখলাম।
"আজকের দিনটা আপনারা যত খুশি গল্প বানিয়ে পার করতে পারেন," আমি শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে তীব্র শ্লেষ জড়ানো গলায় বললাম। "কিন্তু মনে রাখবেন আপনি আমার মাথার চুল কে*টেছেন ঠিকই, কিন্তু আমার মগজটা কে*টে ফেলে দিতে পারেননি। পরীক্ষা আমি দিয়ে এসেছি, আর রেজাল্ট যেদিন দেবে, সেদিন এই পাড়ার মানুষ আপনার মুখে থু*থু দেবে—আমার মুখে নয়।"
"মুখের ওপর বড় বড় কথা! ইফতেখার আসুক আজ, ওর এই ভিটা থেকে তোরে যদি ঘাড় ধইরা না বের করছে, তবে আমার নামও রাবেয়া না!" উনি জাঁতিটা উঁচিয়ে শাসালেন।
ঠিক এই মুহূর্তেই দরজা ঠেলে ইফতেখার ভেতরে ঢুকল। ওর চেহারা ধূলিমলিন, চোখ দুটো লাল। ঘরে ঢুকেই ও এক পলক আমার দিকে তাকাল, তারপর সোফায় বসা পাড়ার মহিলাদের দিকে তাকাল।
রাবেয়া বেগম সঙ্গে সঙ্গে ছেলের হাত ধরে ডুকরে উঠলেন, "বাজান রে! তুই দেখ এই মা**গীর তেজ! ও নাকি আমারে দেখে নেবে! তুই আজই ওরে তা''লাক দে, এই অল'ক্ষ্মীরে আমি এই ঘরে এক মুহূর্তও রাখব না!"
পাড়ার মহিলারাও সুর মেলালেন, "হ ইফতেখার, মায়ের কথাই ঠিক। এমন জেদ্দি বউ ঘরে রাখলে সংসারে আ*গুন লাগব।"
আমি কোনো কথা না বলে ইফতেখারের উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগলাম। দেখতে চাইছিলাম, আজ অন্তত এই চরম অপমা*নের পর ওর পুরুষত্ব আর মেরুদণ্ডটা জেগে ওঠে কি না। ইফতেখার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, ওর হাত দুটো কাঁপছিল। তারপর ও আস্তে করে মায়ের হাতটা ছেড়ে দিল।
"তোমায় অনেকবার বলেছি না মা, আমাদের ঘরের ব্যাপার নিয়ে পাড়ার মানুষকে ডাকবে না?" ইফতেখারের গলা কাঁপছিল, তবে তাতে আজ অন্যদিনের চেয়ে কিছুটা জেদ ছিল। ও খালাদের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনারা দয়া করে এখন আমাদের ঘর থেকে যান। এটা আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার।"
মহিলারা মুখ কালো করে বিড়বিড় করতে করতে বিদায় হলেন। তারা চলে যেতেই রাবেয়া বেগম ফেটে পড়লেন, "কী বললি তুই? মায়ের চেয়ে তোর ওই ন্যাড়া বউ বড় হইলো? ও তোরে তাবিজ করছে রে বাজান, ও তোরে ভেড়া বানাইয়া ছাড়ছে!"
আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালাম না। সোজা নিজের বেডরুমে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে লক করে দিলাম। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার কালো হিজাবটা আলগা করলাম। হিজাবটা সরতেই আয়নায় ভেসে উঠল আমার সম্পূর্ণ চুলহীন মাথাটা। নিজের হাতটা মাথার ওপর বোলালাম। একটুও খারাপ লাগল না, বরং মনে হলো এটা কোনো পরাজয়ের ক্ষ*ত নয়, এটা একটা নতুন ভোরের স্মারক।
পরের একটা সপ্তাহ এই বাড়িতে আমার জন্য ন*রক নেমে এসেছিল। শাশুড়ি রান্নাঘরে তালা মে*রে রাখতেন, ইফতেখারের অনুপস্থিতিতে আমাকে এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত খেতে দিতেন না। সারাদিন ওনার অভি*শাপ আর গালমন্দ ঘরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতো। ইফতেখার বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে লুকিয়ে আমার রুমে দিয়ে যেত। ও আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করত, কিন্তু আমি ওর দিকে তাকাতামও না। যে স্বামী নিজের মায়ের এমন পৈশা*চিক রূপ দেখেও মাকে একটা কড়া শাসন করতে পারে না, তার দেওয়া অন্ন বা ভালোবাসা—কোনোটার প্রতিই আমার আর মোহ ছিল না। আমার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান আটকে ছিল শুধু একটা ওয়েবসাইটের রেজাল্ট পেজে।
দেখতে দেখতে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলে এল।
দুপুর দুইটা বাজতেই আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল। ড্রয়িংরুমে তখন শাশুড়ি উচ্চস্বরে টিভি দেখছেন, যেন আমার ভেতরে কী চলছে তা ওনার গায়েই লাগছে না। আমি রুমে বসে ল্যাপটপের সামনে আঙুল কাঁপিয়ে রোল নাম্বারটা টাইপ করলাম। সাবমিট বাটনে ক্লিক করার পর স্ক্রিনটা দুই সেকেন্ডের জন্য বাফারিং হলো।
আমার হার্টবিট যেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
পরের মুহূর্তেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল রেজাল্ট। বড় বড় অক্ষরে লেখা—"Selected"। পাশে কলেজের নাম: ঢাকা মেডিকেল কলেজ। মেধা তালিকায় আমার স্থান প্রথম একশোর মধ্যে!
আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। কিন্তু সে জল কষ্টের নয়, সে জল এক চরম বিজয়ের, এক দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসানের। আমি ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে সটান ড্রয়িংরুমে চলে গেলাম।
টিভিটা এক ঝটকায় বন্ধ করে দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা রাবেয়া বেগমের মুখের সামনে ধরলাম। উনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, "কী এইগুলা? জিলিপির মতো ইংরেজি দেখাও ক্যান?"
"এই জিলিপির মতো লেখাটার নাম সাকসেস, রাবেয়া বেগম," আমি গর্জে উঠলাম। "আপনার এই অশিক্ষিত চক্রা*ন্তের মুখে চপেটাঘাত করে আপনার বউ আজ বাংলাদেশের এক নম্বর মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছে। আমি এখন সরকারি মেডিকেলের ডাক্তার!"
ঠিক তখনই দরজার লক খুলে ইফতেখার ঘরে ঢুকল। ও আমার হাতে ল্যাপটপ আর আমার চিৎকার শুনে থমকে দাঁড়াল।
আমি ইফতেখারের দিকে তাকালাম। ও আমার চোখের জল দেখে বুঝতে পারল কী ঘটেছে। ওর মুখটা এক লহমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল, "অনন্যা! তুমি... তুমি চান্স পেয়েছ?"
"হ্যাঁ, আমি চান্স পেয়েছি। ঢাকা মেডিকেল কলেজে," আমি অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় বললাম। "কিন্তু এই আনন্দের দিনে আমার একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তোমাকে জানানোর আছে।"
ইফতেখার আর শাশুড়ি দুজনেই আমার দিকে চাতকের মতো তাকিয়ে রইলেন। ঘরের ভেতরের বাতাস তখন টান টান উত্তেজনায় কাঁপছে।
আমি ব্যাগ থেকে একটা আগেই সই করা সাদা কাগজ বের করে ইফতেখারের সামনে টেবিলের ওপর রাখলাম।

0 Comments