স্ত্রীর_লড়াই

 

স্ত্রীর_লড়াই

বাবার ভয়েস মেসেজটা শেষ হওয়ার পরও অনেকক্ষণ আমি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলাম। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা কাজ করছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমি কাঁদছিলাম না। কয়েক বছর আগে হলে হয়তো কাঁদতাম, হয়তো নিজের ভুল খুঁজতে বসতাম, হয়তো ভাবতাম কোথাও না কোথাও আমারই কোনো ত্রুটি আছে। কিন্তু আজ আর সেই অনুভূতি হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, বহুদিন ধরে জমে থাকা একটা পর্দা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে আর আমি প্রথমবারের মতো নিজের পরিবারকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি।
আয়ান তখন শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিল। তার নিঃশ্বাসের মৃদু ওঠানামা দেখতে দেখতে আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখলাম। বছরের পর বছর আর্থিক প্রতারণার তদন্ত করতে করতে একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। কোনো ঘটনাকে কখনো আবেগ দিয়ে বিচার করতাম না। প্রথমে তথ্য, তারপর প্রমাণ, তারপর সিদ্ধান্ত। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।
আমি নতুন ফোল্ডারের নাম দিলাম "ফ্যামিলি রেকর্ড"।
প্রথমে বাবার ভয়েস মেসেজ সংরক্ষণ করলাম। তারপর ব্যাংকের সতর্কবার্তার স্ক্রিনশটগুলো আলাদা ফাইলে রাখলাম। এরপর পুরোনো ই-মেইল, মেসেজ এবং ডকুমেন্ট খুঁজতে শুরু করলাম। যত গভীরে যাচ্ছিলাম, ততই বিস্মিত হচ্ছিলাম।
প্রায় তিন বছর আগে তানহা আমাকে একটি ই-মেইল পাঠিয়েছিল। সেখানে সে বলেছিল পরিবারের সম্পত্তি সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র আপডেট করতে হবে। তখন আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি। কিন্তু সেই ই-মেইলের সংযুক্ত নথিগুলো খুলতেই আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সেখানে আমার স্বাক্ষরের স্ক্যান কপি ছিল।
আমার জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি ছিল।
আমার ব্যাংক সংক্রান্ত কিছু ব্যক্তিগত তথ্যও ছিল।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, সেই নথিগুলোর কিছুতে এমন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল যা আমি কখনো কাউকে দিইনি।
আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, বিষয়টা শুধু একটা ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করার চেষ্টা নয়।
এটা বহু বছরের পরিকল্পনার অংশ।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল মিস্টার ইয়াসিনের নাম।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো।
"রুহানি, তুমি ঠিক আছো?"
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম।
তারপর বললাম, "আমি ভালো আছি।"
"মিথ্যা বলো না। তোমার কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পারছি কিছু একটা হয়েছে।"
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
গত ছয় দিনে আমি কাউকে কিছু বলিনি। কিন্তু ইয়াসিনের কাছে সত্য লুকানোর ইচ্ছে হলো না।
সবকিছু খুলে বললাম।
ব্যাংকের সতর্কবার্তা।
বাবার ভয়েস মেসেজ।
মায়ের উদাসীনতা।
তানহার আচরণ।
সব।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো।
তারপর ইয়াসিন ধীরে ধীরে বলল,
"আমি আগামীকালই দেশে ফিরছি।"
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
"কিন্তু তোমার প্রজেক্ট?"
"প্রজেক্ট অপেক্ষা করতে পারবে। আমার স্ত্রী আর ছেলে অপেক্ষা করবে না।"
কথাটা শুনে প্রথমবারের মতো চোখে জল চলে এলো।
গত কয়েক দিনে অসহায়ত্বের অনুভূতি আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হলো আমি একা নই।
ফোন রাখার পর আমি আবার কাজে মন দিলাম।
রাত বাড়তে লাগল।
একসময় পুরোনো একটি ফোল্ডারে এমন কিছু নথি পেলাম যা দেখে আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
সেগুলো ছিল দাদির সম্পত্তির কাগজপত্র।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, দাদির মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে কিছু মালিকানা পরিবর্তনের আবেদন করা হয়েছিল।
আর সেই আবেদনের সাক্ষী হিসেবে যে স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে, তা দাদির আসল স্বাক্ষরের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
আমি বছরের পর বছর জাল স্বাক্ষরের কেস নিয়ে কাজ করেছি।
চোখের ভুল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
সঙ্গে সঙ্গে নথিগুলোর কপি আলাদা করে রাখলাম।
তারপর দাদির পুরোনো চিঠিগুলো খুঁজতে শুরু করলাম।
দাদি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় প্রায়ই হাতে লেখা চিঠি পাঠাতেন।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা পুরোনো স্ক্যান কপি পেলাম।
সেখানে দাদির আসল স্বাক্ষর ছিল।
দুইটি নথি পাশাপাশি রেখে তুলনা করতেই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে গেল।
আমার বুক ধক করে উঠল।
যদি আমার সন্দেহ সত্যি হয়, তাহলে শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়, সম্পত্তি আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে।
রাত প্রায় দুইটা।
আমি ল্যাপটপ বন্ধ করে আয়ানের পাশে শুয়ে পড়লাম।
কিন্তু ঘুম এলো না।
মনে হচ্ছিল বহু বছরের অস্পষ্ট স্মৃতিগুলো নতুন অর্থ নিয়ে সামনে আসছে।
হঠাৎ মনে পড়ল, দাদির মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তিনি আমাকে একবার ফোন করেছিলেন।
সেদিন তিনি অদ্ভুত একটা কথা বলেছিলেন।
"রুহানি, মানুষকে বিশ্বাস করবি, কিন্তু নিজের অধিকার কখনো অন্যের হাতে তুলে দিবি না।"
তখন কথাটার অর্থ বুঝিনি।
আজ বুঝতে শুরু করেছি।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি ফোনে বিশটিরও বেশি মিসড কল।
সবগুলোই মা, বাবা আর তানহার।
আমি কোনো কল রিসিভ করিনি।
কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজ এলো।
বাবা লিখেছেন,
"তুমি কি ইচ্ছে করে আমাদের অপমান করছ?"
আরেকটি মেসেজ।
"কার্ডটা জরুরি দরকার।"
তারপর তানহার মেসেজ।
"আমরা সমুদ্রে এসেছি বলে এত রাগ করার কী আছে? তোমার জীবনটা সবসময় নাটক দিয়ে ভরা।"
আমি মেসেজগুলো পড়ে শান্তভাবে স্ক্রিন বন্ধ করে দিলাম।
এরপর ব্যাংকের নিরাপত্তা বিভাগের এক সহকর্মীকে ফোন করলাম।
তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হলো।
আমি তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিলাম।
সে রেকর্ড দেখে নিশ্চিত করল, গত কয়েক মাসে আমার অ্যাকাউন্টে একাধিকবার অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টা হয়েছে।
সবগুলো একই অঞ্চল থেকে।
আর সেই অঞ্চলই বর্তমানে বাবা-মায়ের অবস্থান।
ফোন রাখার পর আমার সন্দেহ আরও দৃঢ় হলো।
দুপুরের দিকে দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
এক হাতে আয়ানকে ধরে দরজা খুলতেই আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার প্রতিবেশী আনিসা আপা।
হাতে বড় একটা ব্যাগ।
মুখে মায়াভরা হাসি।
"শুনলাম তুমি একা আছো। তাই একটু খাবার নিয়ে এলাম।"
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
যাদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার কথা ছিল, তারা কেউ পাশে নেই।
আর যে মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় মাত্র কয়েক মাসের, তিনি খাবার নিয়ে হাজির।
আমি ধন্যবাদ দিতে গিয়েও গলা ভারী হয়ে আসতে অনুভব করলাম।
আনিসা আপা ঘরে ঢুকে আয়ানকে কোলে নিলেন।
তারপর বললেন,
"মা হওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ সবচেয়ে কঠিন। কাউকে যদি দরকার হয়, আমাকে বলবে।"
আমি শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।
সেদিন বিকেলে প্রথমবারের মতো কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে পেরেছিলাম।
ঘুম ভাঙতেই দেখি ফোনে একটি নতুন ই-মেইল এসেছে।
প্রেরকের নাম দেখে আমি চমকে উঠলাম।
দাদির পুরোনো আইনজীবী।
মোস্তাফিজুর রহমান।
আমি দ্রুত মেইল খুললাম।
ভেতরে মাত্র কয়েকটি লাইন লেখা।
"রুহানি, অনেকদিন ধরে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি তোমার দেখা প্রয়োজন। তোমার দাদির শেষ ইচ্ছাপত্র সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য আছে যা তুমি জানো না।"
আমার হাত কেঁপে উঠল।
দাদির শেষ ইচ্ছাপত্র?
আমি যতদূর জানতাম, সব সম্পত্তির দায়িত্ব বাবার হাতে ছিল।
তাহলে নতুন তথ্য আবার কী?
মেইলের শেষে আরও একটি লাইন ছিল।
"যত দ্রুত সম্ভব আমার সঙ্গে দেখা করো। দেরি হলে কিছু প্রমাণ হারিয়ে যেতে পারে।"
আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইলাম।
মনে হচ্ছিল পাজলের হারিয়ে যাওয়া টুকরোগুলো একে একে সামনে আসছে।
কিন্তু একই সঙ্গে ভয়ও কাজ করছিল।
যদি সত্যিই বড় কোনো প্রতারণা ঘটে থাকে?
যদি বাবা শুধু আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয়, দাদির সম্পত্তিও অবৈধভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে থাকেন?
ঠিক তখনই ফোন আবার বেজে উঠল।
এবার একটি অজানা নম্বর।
আমি কিছুক্ষণ দ্বিধায় থেকে কল রিসিভ করলাম।
ওপাশে একজন পুরুষের কণ্ঠ।
কণ্ঠটা পরিচিত লাগছিল।
"আপনি কি রুহানি বলছেন?"
"জি।"
"আমি সাইফুল। আপনার বাবার পুরোনো ব্যবসায়িক সহযোগী।"
আমার ভ্রু কুঁচকে গেল।
লোকটিকে আমি চিনতাম।
ছোটবেলায় কয়েকবার দেখেছি।
তিনি নিচু গলায় বললেন,
"আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। ফোনে বলা নিরাপদ নয়।"
আমার বুকের ভেতর ধকধক শুরু হলো।
"কী বিষয়ে?"
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বললেন,
"আপনার দাদির সম্পত্তি আর কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে।"
আমার হাত শক্ত হয়ে গেল।
তিনি আবার বললেন,
"আপনার বাবার বিরুদ্ধে যে সন্দেহ করছেন, সেটা হয়তো বাস্তবের তুলনায় অনেক ছোট।"
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
"আপনি কী বলতে চাইছেন?"
ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
"আমি প্রমাণ দেখাতে পারব। কিন্তু সাবধানে থাকবেন। কারণ আপনার বাবা জানলে তিনি চুপ করে বসে থাকবেন না।"
কথা শেষ করেই তিনি ফোন কেটে দিলেন।
আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম।
আয়ান তখন পাশে শান্তভাবে ঘুমাচ্ছিল।
তার ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, এখন আর শুধু নিজের জন্য লড়াই করার সময় নয়।
আমাকে আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যও দাঁড়াতে হবে।
কারণ বহু বছর ধরে যে সত্য চাপা পড়ে ছিল, সেটি ধীরে ধীরে সামনে আসছে।
আর সেই সত্য প্রকাশ পেলে শুধু একটি পরিবার নয়, অনেক মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে।
ঠিক তখনই ফোনে নতুন একটি বার্তা এলো।
প্রেরক: মাহবুবুর রহমান।
বার্তায় মাত্র একটি বাক্য।
"তুমি যদি আজ রাতের মধ্যে কার্ডের লক না খোলো, তাহলে কাল সকাল থেকে তোমার জীবনে এমন কিছু ঘটবে যা তুমি কল্পনাও করোনি।"
বার্তাটি পড়ে আমার ঠোঁটের কোণে ধীর একটা হাসি ফুটে উঠল।
কারণ এই প্রথমবার আমি ভয় পাইনি।
বরং মনে হচ্ছিল, খেলার আসল শুরু এখন।

Post a Comment

0 Comments