- 'স্যার, ‘মুরগি সালাম’ এসেছে!'
- 'কোথায়?'
- 'গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আপনার সাথে দেখা করতে চায়।'
- 'বলিস কি! কেন?'
- 'মুরগি সালাম বড় মাস্তান! সে কেন আপনার সাথে দেখা করতে চায় সেটা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার হয়নি স্যার।'
- 'ও'
- 'স্যার, তাকে কি ভিতরে আসতে বলবো?'
- 'না, আমিই যাচ্ছি।'
মুরাদ সাহেব বাসা থেকে নেমে গেইটের সামনে আসলেন। পিছনে পিছনে আসলেন বাসার দারোয়ান হামিদও। মুরগি সালাম আরো ১০-১২ জন সঙ্গী সহ গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মুরাদ সাহেবকে দেখেই মুরগি সালাম বললেন,
- 'আসসালামু আলাইকুম, স্যার। আপনার সাথে কিছু প্রয়োজনীয় কথা বলতে এসেছি।'
- 'ঠিক আছে বলো!'
- 'এখানে বলা যাবে না। একটু ভিতরে গিয়ে বসে বলি।'
মুরাদ সাহেব একটু চিন্তিত মনেই মুরগি সালামকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসলেন। মুরগি সালামই প্রথম কথা বলা শুরু করলেন-
- 'স্যার, আমার নাম আব্দুস সালাম। ছোটকালে মুরগির দোকানে কাজ করতাম, তাই সবাই 'মুরগি সালাম' বইলা ডাকে, তবে আমার সামনে কেউ এই নামে ডাকার সাহস পায় না। এখন অবশ্য আমার দিন বদলাইছে, প্রচুর টাকা পয়সা আমার। ঢাকা শহরে আমার একটু দাপটও আছে।'
- 'আমি জানি।। তা কি বলতে এসেছ সেটা বলো।'
- 'স্যার, আমার বয়স ৩০ এর কাছাকাছি। বিয়ে-শাদী এখনো করা হয়নি। তাই ভাবছি এখন বিয়ে শাদী করে সংসারী হবো। আমার আপনজন কেউ নাই, তাই নিজের বিয়ের প্রস্তাবটা নিজেই নিয়ে আসছি।'
- 'মানে!'
- 'মানে হইল স্যার, আপনার মেয়েরে আমি দেখছি। আমার খুব পছন্দ হইছে! তারে আমি বিয়া করতে চাই।'
- 'হোয়াট!'
- 'উত্তেজিত হয়েন না স্যার। ভাইবা দেখবেন। আমি তাহলে এখন আসি। আসসালামু আলাইকুম।'
কথাগুলো বলে চলে গেলেন সালাম। মুরাদ সাহেব সোফায় বসে রইলেন, তার মাথা ঘুরছে। শুধু ভাবছেন, কি বলে গেল ছেলেটা? একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করলেন মুরাদ সাহেব। মিনিট পাঁচেক পর যখন চোখ খুললেন দেখেন হামিদ শুকনো মুখে তার সামনে দাঁড়িয়ে। করুণ চোখে হামিদের দিকে তাকিয়ে বললেন-
- 'শুনেছিস হামিদ?'
- 'হ! এখন কি হবে স্যার?'
- 'ভাবছি! শোন, কথাটা তোর মধ্যেই রাখবি। বাসার কেউ যেন না জানে।'
- 'আচ্ছা!'
বাসার ভেতরে প্রবেশ করে মেয়ের ঘরে উঁকি দিলেন মুরাদ সাহেব। দেখেন মেয়ে মনোযোগ সহকারে পড়ছে। কি ভেবে যেন দরজায় দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর বাবার উপস্থিতি টের পেলো মেয়ে। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল-
- 'বাবা, দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছো কেন?'
- 'এমনি, তোকে দেখছিলাম।'
মেয়ে বাবার কাছে এসে বলল-
- 'বাবা, তোমার মুখটা এমন মলিন দেখাচ্ছে কেন? কি হয়েছে তোমার?'
- 'কিছু না রে মা! কতক্ষণ আগে মাথাটা হালকা ঘুরছিল তো তাই।'
- 'তোমার প্রেশারটা হয়তো বেড়েছে বাবা। আসো চেয়ারটায় বসো। আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।'
- 'নারে,মা। তোর পরীক্ষা চলছে তুই পড় মা।'
- 'পাঁচ-দশ মিনিট না পড়লে কিছু হবে না বাবা। তুমি আসো তো।'
মেয়ে জোর করেই বাবাকে নিয়ে চেয়ারে বসায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মুরাদ সাহেবের বুকটা যেন ফেটে যায়। চোখ বেয়ে ঝরতে থাকে অশ্রু।
মুরাদ সাহেবের আসল নাম মুরাদ পারভেজ খান। অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর উনি ঢাকার উত্তরায় স্থায়ী হয়েছেন। উনার এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে বড়, পড়ছে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে। মেয়েরও ইচ্ছা বাবার মত জজ হওয়ার। মেয়েটির এখন অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। ছেলেও এবছর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে, পদার্থবিজ্ঞানে। সারা জীবন সৎ জীবন যাপন করেছেন তিনি। স্ত্রী সন্তান নিয়ে সাংসারিক জীবনে উনি অনেক সুখী। সেই সুখের সংসারে হঠাৎ ঝড়। কি করবে সে এখন? পুলিশকে জানাবে নাকি অন্য কিছু ভাববে?
(০২)
রাতে ভালো ঘুম হয়নি মুরাদ সাহেবের। সারারাত একটা ভাবনাই কাজ করেছে তার মধ্যে কি করবে সে এখন? অনেক ভেবেচিন্তে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্যাপারটা পুলিশকে জানাবেন।
সকাল দশটা বাজার আগেই তিনি থানায় পৌছলেন। ডিউটিতে থাকা কনস্টেবলকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন-
- 'ওসি সাহেব আছেন?'
- 'জ্বি না স্যার, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন।'
ডিউটি কনস্টেবল মুরাদ সাহেবকে ওসি সাহেবের রুমে নিয়ে বসালেন। ১০ মিনিটের মধ্যেই ওসি সাহেব আসলেন। মুরাদ সাহেবকে দেখে যেন চমকে গেলেন ওসি সাহেব, বললেন-
- 'স্যার আপনি?'
- 'আপনি আমাকে চেনেন?'
- 'চিনবো না স্যার, আপনি যখন সিলেটের জেলা ও দায়রা জজ ছিলেন আমি তখন কোর্ট দারোগা ছিলাম।'
- 'ও আচ্ছা।'
- 'স্যার একটু কফি খাই তারপর কথা বলি।'
- 'ঠিক আছে।'
কফি খেতে খেতে কথা বলা শুরু করলেন মুরাদ সাহেব-
- 'আমি একটা সমস্যা নিয়ে থানায় এসেছি।'
- 'কি সমস্যা স্যার?'
- 'সমস্যাটা বেশ জটিল।'
- 'যত জটিলই হোক আমরা সমাধান করার চেষ্টা করব স্যার।'
- 'সমস্যাটা হচ্ছে 'মুরগি সালাম।'
মুরগি সালামের নাম শুনে কেমন যেন আঁতকে উঠলেন ওসি সাহেব! আতঙ্কিতভাবেই বললেন-
- 'মুরগি সালাম কি করেছে স্যার?'
- 'কিছু করেনি, তবে সে আমাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছে।'
- 'কিসের প্রস্তাব স্যার?'
মুরাদ সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
- 'সে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়!'
- 'বলেন কি! আপনাকে সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছে?'
- 'হ্যাঁ'
- 'তারপর আপনি কি বললেন?'
- 'আমাকে কিছু বলার সুযোগ দেয়নি সে। কথাগুলো বলেই সে চলে যায়।'
- 'ব্যাপারটা বেশ জটিল স্যার। মুরগি সালামের মত লোকেরা সবকিছুই করতে পারে।'
- 'এই কারণেই ব্যাপারটা নিয়ে আমি খুব আতঙ্কিত।'
- 'আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। যারা আইন মানেনা ওরা সব সময় ডেঞ্জারাস। 'মুরগি সালামের' বিরুদ্ধে আমার থানায় কমপক্ষে বিশটি মামলা আছে। মানুষ ভিকটিম হয়ে মামলা করেছে কিন্তু যাদেরকে সাক্ষী মেনেছে তারা ভয়ে সাক্ষী দেয় না। আমরাও মুরগী সালামকে আইনের জালে আটকাতে পারি না।'
- 'তাহলে এখন আমি কি করবো?'
- 'ওসি হিসেবে আমি বলবো মুরগি সালামের বিরুদ্ধে আপনি একটি সাধারণ ডায়েরি করুন। আর শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলব- যত দ্রুত সম্ভব মেয়েকে বিদেশ পাঠিয়ে দেন। তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে একটি ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দেন।
থানায় মুরগি সালামের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি করলেন মুরাদ সাহেব। থানা থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন আর ভাবছেন, হঠাৎ করেই তার পৃথিবীটা বদলে গেল! মনকে শক্ত করলেন তিনি, অনুচ্চস্বরে বললেন, ‘না, আমি হার মানবো না। নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও মুরগি সালামের কাছ থেকে নিজের মেয়েকে বাঁচাবো আমি।’
ওসি সাহেবের দুটো প্রস্তাব নিয়েও ভাবলেন তিনি। বিয়ে অথবা বিদেশ পাঠানো। বিদেশ পাঠানোর সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তার চেয়ে ভালো যত দ্রুত সম্ভব মেয়েকে বিয়ে দেওয়া।
***
বাসায় প্রবেশ করতেই মুরাদ সাহেবের স্ত্রী একটু রাগান্বিত স্বরেই বললেন,
- 'সাত সকালে নাস্তা না খেয়েই কোথায় গিয়েছিলে বলতো?'
- 'একটু কাজ ছিল।'
- 'এত কি জরুরি কাজ যে নাস্তা না খেয়েই চলে যেতে হবে।'
- 'আসলে একজনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।'
- 'কার সাথে?'
কি উত্তর দিবে স্ত্রীকে? বলবে, 'ওসি সাহেবের সাথে।' তাহলে স্ত্রী আরও কয়েকটা প্রশ্ন করবে। তার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো। মুরাদ সাহেব কোন কথা না বলে রুমে গেলেন ড্রেস চেঞ্জ করতে। ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে আসলেন নাস্তা খেতে।
নাস্তা খেতে খেতে স্ত্রীকে বললেন,
- 'রুপা এখন অনার্স ফাইনাল দিচ্ছে। আমার মনে হয় এখন ওর বিয়ের ব্যাপারটা ভাবা উচিত।'
- 'আমি তো অনেক আগে থেকেই তোমাকে বলছি। তুমিই তো বারবার বলো মেয়ের পড়া শেষে হোক।'
- 'হ্যাঁ বলতাম। কিন্তু এখন কেন জানি মনে হচ্ছে বিয়েটা দিয়ে দেওয়া দরকার।'
- 'তাহলে ভাইয়াকে বলি পাত্র দেখতে?'
- 'ঠিক আছে বলো।'
মুরাদ সাহেব নাস্তা সেরে বেলকনিতে গিয়ে বসলেন। বেলকনির টবে কয়েকটা ফুল গাছ, গাছগুলোর পরিচর্যা মেয়ে রুপাই করে। বেশ কয়েকটা ফুল ফুটেছে গাছগুলিতে! একটা ফুল কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে! নেতিয়ে পড়া ফুলটা দেখে বুকটা ধক্ করে উঠলো মুরাদ সাহেবের।
লম্বা দম নিয়ে চোখ বন্ধ করলেন তিনি। এমন সময় দু'কাপ চা নিয়ে মুরাদ সাহেবের স্ত্রী আসলেন ব্যালকনিতে। চা খেতে খেতে মুরাদ সাহেবকে বললেন-
- 'শোন, রুপা আমাদের একমাত্র মেয়ে। ওর বিয়েটা একটু ধুমধামের সাথে দেব।'
- 'আচ্ছা।'
- 'কি ব্যাপার, তুমি মনমরা হয়ে 'আচ্ছা' বলছো কেন?'
- 'দেখো, সবেমাত্র সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে দেওয়ার। পাত্র খুঁজতে হবে। পাত্র পছন্দ হওয়ার পর কিভাবে বিয়ে দিব সেই ব্যাপারটা আসবে।'

0 Comments