আমার শাশুড়িকে একটা কিড'নি দিতে বলেছিল আমার স্বামী। হ্যাঁ, সেই শাশুড়ি—যিনি উনার তিন ছেলের বউয়ের মধ্যে আমাকে সবচেয়ে বেশি অব'হেলা করতেন, সবসময় চোখে হারাতেন বাকি দুজনকে। কিন্তু নিয়তির পরিহাস দেখুন, যখন উনার দুটো কিড'নিই নষ্ট হয়ে গেল এবং হাসপাতালের বিছানায় উনি মৃ*ত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালেন, তখন টাকার অঙ্ক আর নিজের শরীরের ক্ষতির কথা শুনে উনার সেই দুই আদরের ছেলে আর দুই রাজপুত্তুর বউ রাতারাতি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেল।
পুরো ফাঁকা করিডোরে তখন শুধু আমি আর আমার স্বামী শাহেদ। শাহেদ যখন আমার হাত দুটো ধরে তার মায়ের জীবন ভিক্ষা চাইল, আমি আর 'না' করতে পারিনি। তবে আমার এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো মহানুভবতা ছিল না, ছিল একটা অবুঝ আকাঙ্ক্ষা। আমি ভেবেছিলাম, মানুষ তো পাথরের নয়! যে ছেলেরা উনাকে ম*রতে ছেড়ে পালিয়েছে, তাদের চেয়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে মেজো বউ উনাকে নতুন জীবন দিচ্ছে—সুস্থ হয়ে উনি নিশ্চয়ই তাকে এবার একটু বেশি ভালোবাসবেন। উনার বুকের ভেতর আমার জন্য একটুখানি হলেও জায়গা হবে।
এই একটা মাত্র আশায় বুক বেঁধে আমি অপারেশনের টেবিলে শুয়েছিলাম। নিজের শরীরের একটা অংশ কে*টে উনাকে দিয়ে উনাকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে আনলাম।
অপারেশনের ধকল কাটিয়ে ওঠার কয়েকদিন পরের কথা। দুপুরবেলা শাশুড়ি আম্মা বাড়ির সবাইকে বসার ঘরে ডেকে পাঠালেন। উনার ডাক শুনে হাসপাতাল থেকে পালানো সেই দুই ছেলে আর ছেলের বউরা আবার কোথা থেকে যেন উড়ে এসে হাজির হলো।
শাশুড়ি আম্মা সোফায় সোজা হয়ে বসে গম্ভীর গলায় বললেন, "আমি ম*রণমুখ থেকে ফিরে এসেছি। কখন কী হয় বলা যায় না, তাই আমি বেঁচে থাকতেই আমার যা কিছু সম্পদ আর জায়গা-জমি আছে, সব সবাইকে বুঝিয়ে দিতে চাই।"
এই কথা শোনা মাত্রই বড় বউ আর ছোট বউয়ের মুখ খুশিতে গদগদ করে উঠল। তারা যেন হাতে চাঁদ পেল! শাশুড়ি আম্মার চাটুকারিতা করতে করতে তারা একবাক্যে উনার কথায় সম্মতি দিল। আমি আর শাহেদ ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে উনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার বুকটা তখন এক অদ্ভুত আশায় কাঁপছিল—আজ বুঝি আমার অবহেলার দিন শেষ হলো, আজ বুঝি মা সবার সামনে আমার ত্যাগের স্বীকৃতি দেবেন।
শাশুড়ি আম্মা খসড়া দলিলটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলেন। বড় ছেলেকে দিলেন বাজারের বড় দোকান আর জমি, ছোট ছেলের নামে লিখে দিলেন রাস্তার ধারের মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট। তারা তো খুশিতে আ*ত্মহারা।
আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম মেজো ছেলে অর্থাৎ আমার স্বামীর নামের জন্য। কিন্তু ঠিক যখনই শাহেদের নামটা ওঠার উপক্রম হলো, শাশুড়ি আম্মা হঠাৎ কাগজটা মুড়িয়ে ফেললেন। আমাদের দিকে একটা নজরও না দিয়ে, লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, "আজ আর শরীরটা ভালো লাগছে না, বাকিটা পরে হবে।"
বলেই উনি সোজা নিজের রুমে চলে গেলেন। আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। শাহেদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। যারা উনাকে ম*রতে ছেড়ে পালিয়েছিল, তারা পেল সম্পত্তি; আর আমি নিজের জীবন বাজি রেখেও রয়ে গেলাম শূন্য হাতে।
তবুও মনকে বোঝালাম, হয়তো উনি পরে আমাদের ডাকবেন। রাত বাড়ল। চারপাশ নিস্তব্ধ হলে, প্রতিরাতের মতো আমি উনার জন্য এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে উনার রুমে গেলাম। উনি বিছানায় বসে ছিলেন। আমি আলতো করে দুধের গ্লাসটা টেবিল রাখলাম, ভাবলাম এবার অন্তত উনি একা পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছু একটা বলবেন, নিজের অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত হবেন।
কিন্তু না। উনি আমার দিকে তাকালেনও না, একটা কথাও বললেন না। ঘরটায় এক দমবন্ধ করা নীরবতা। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এক বুক কষ্ট নিয়ে উনার রুম থেকে বেরিয়ে এলাম।
এভাবেই চলতে থাকল দিন, তারপর আরও কয়েকদিন। বাড়ির সবার আচরণ একই রকম রইল, আর আমার শাশুড়ির সেই পাথরের মতো নীরবতাও ভাঙল না। নিজের শরীরের অংশ দিয়েও আমি উনার মনের অবহেলাটুকু দূর করতে পারলাম না।

0 Comments