ড্রইংরুমের বাতাস যেন হঠাৎ জমে বরফ হয়ে গেল। কেউ কোনো কথা বলছে না। রাফির হাতে থাকা গ্লাসটা কাঁপছিল। তার মুখের আত্মবিশ্বাস মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেছে। কয়েক মিনিট আগেও যে মানুষটা নিজেকে এই বাড়ির রাজা মনে করছিল, এখন তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।
মেহেরিন ধীরে ধীরে উঠে বসল। আমার কোটটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে। তার চোখ লাল, মুখ শুকিয়ে গেছে। আমাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
"আপু... তুমি?"
তার কণ্ঠ এতটাই দুর্বল ছিল যে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
আমি নিচু হয়ে তার হাত ধরলাম।
"আমি এসেছি, মেহেরিন। এবার আর কেউ তোমাকে একা পাবে না।"
মেহেরিনের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। গত তিন বছরে সে কতবার কেঁদেছে জানি না, কিন্তু আজকের কান্নাটা ছিল মুক্তির কান্না।
রাফি হঠাৎ গলা পরিষ্কার করে বলল, "দেখুন, ব্যাপারটা আপনারা যেভাবে ভাবছেন সেভাবে নয়।"
আমি তার দিকে তাকালাম।
"তাহলে কিভাবে?"
"মেহেরিন মানসিকভাবে অসুস্থ। ও অনেক কিছু ভুলে যায়। মাঝে মাঝে নিজেই বাইরে গিয়ে শুয়ে থাকে।"
কথাটা শুনে আমার হাসি পেল।
এমন নির্লজ্জ মিথ্যা আমি বহু অপরাধীর মুখে শুনেছি, কিন্তু নিজের বোনের স্বামীর মুখে শুনব ভাবিনি।
আমি ধীরে ধীরে মোবাইল বের করলাম।
"মজার কথা বললে, রাফি।"
তারপর ভিডিও চালু করলাম।
ভিডিওতে দেখা গেল, বাড়ির বাইরে লাগানো নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ। রাফি নিজেই মেহেরিনকে টেনে এনে দরজার সামনে ফেলে দিচ্ছে।
ভিডিও চলতেই রাফির মুখের রং বদলে গেল।
লাল পোশাকের মেয়েটা অবাক হয়ে বলল, "তুমি আমাকে বলেছিলে ও নিজের ইচ্ছায় বাইরে থাকে।"
রাফি কিছু বলার চেষ্টা করল কিন্তু শব্দ বের হলো না।
আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, "এই ফুটেজ শুধু আমার কাছে নেই। আদালতের কাছেও আছে।"
ঘরে উপস্থিত অতিথিরা একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল।
কেউ কেউ ইতোমধ্যে মোবাইল বের করে ভিডিও করতে শুরু করেছে।
যে মানুষগুলো কয়েক মিনিট আগেও রাফির সঙ্গে হাসাহাসি করছিল, তারাই এখন তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে।
আমি টেবিলের ওপর আরেকটা ফাইল রাখলাম।
"এখানে ব্যাংক স্টেটমেন্ট আছে।"
রাফির কপালে ঘাম জমল।
"তুমি গত আঠারো মাসে মেহেরিনের ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা সরিয়েছ।"
ঘরের মধ্যে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
মেয়েটা এবার পুরোপুরি রাফির থেকে দূরে সরে গেল।
"তুমি আমাকে বলেছিলে তোমার নিজের ব্যবসা আছে।"
রাফি রেগে গিয়ে বলল, "চুপ করো।"
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, "তোমার ব্যবসা ছিল। তারপর ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর মেহেরিন তার সব সঞ্চয় তোমাকে দিয়েছিল।"
মেহেরিন মাথা নিচু করে ফেলল।
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, "তুমি আমাকে তখন কিছুই বলোনি।"
মেহেরিন ফুঁপিয়ে উঠল।
"আমি ওকে ভালোবাসতাম, আপু। ভাবতাম একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।"
কথাটা শুনে আমার চোখও ভিজে উঠল।
এই মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই এমন। সবাইকে বিশ্বাস করে। সবাইকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসে।
আর সেই সরলতার সুযোগ নিয়েছে রাফি।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
"পুলিশ আসতে আর দশ মিনিট বাকি।"
রাফি চমকে উঠল।
"পুলিশ?"
"হ্যাঁ।"
"তুমি পুলিশ ডেকেছ?"
"শুধু পুলিশ না। ফরেনসিক অডিট টিমও আসছে।"
এই প্রথম রাফিকে সত্যিকারের ভয় পেতে দেখলাম।
সে দ্রুত আমার কাছে এসে নিচু গলায় বলল, "জেরিন, আমরা বসে কথা বলতে পারি।"
"কেন?"
"ভুল হয়েছে।"
"ভুল?"
আমি তার চোখের দিকে তাকালাম।
"জুতা মুছতে গিয়ে ভুল হয়েছিল?"
সে মাথা নিচু করল।
আমি বললাম, "মানুষ একবার ভুল করে। তুমি তিন বছর ধরে অপরাধ করেছ।"
ঠিক তখন বাইরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল।
ঘরের সবাই চমকে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
দুজন অফিসার ভেতরে ঢুকলেন।
তারা আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন।
আমি ফাইলগুলো তাদের হাতে তুলে দিলাম।
রাফি এবার সত্যিই ভেঙে পড়ল।
"জেরিন, প্লিজ।"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
মেহেরিনের কাঁধে হাত রেখে বললাম, "চলো।"
সে অবিশ্বাস নিয়ে আমার দিকে তাকাল।
"কোথায়?"
"বাড়ি।"
"আমার কি এখনও কোনো বাড়ি আছে?"
প্রশ্নটা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল।
আমি তার হাত শক্ত করে ধরলাম।
"যতদিন আমি বেঁচে আছি, তোমার বাড়ি থাকবে।"
মেহেরিন হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
তিন বছর ধরে জমে থাকা কষ্ট যেন একসাথে বেরিয়ে এলো।
আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
পেছনে পুলিশ রাফিকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন সকাল।
মেহেরিন তখনও জানে না, তার জন্য আরও বড় একটা সত্য অপেক্ষা করছে।
যে সত্যটা তার পুরো জীবন বদলে দেবে।

0 Comments