সৎবাবা

 সৎবাবা

সৎবাবা



আয়রা কি তোমাকে কিছু বলেছে? খাদিজার প্রশ্নটা ঘরের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলল। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেই চোখে এবার আর আগের মতো নরম ভাব নেই। বরং একটা অদ্ভুত সতর্কতা কাজ করছে। যেন সে বুঝে গেছে, আমি ধীরে ধীরে এমন কিছু জানতে শুরু করেছি যেটা সে বহুদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছে। আমি ধীরে সোফার পাশে দাঁড়ালাম।
“আমি শুধু জানতে চেয়েছি তোমার আগের স্বামীর কী হয়েছিল।”
খাদিজা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর খুব আস্তে হেসে বলল, “এতদিন পর হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?” কারণ আয়রা এখনো তাকে মনে করে।
আমার কথায় তার মুখের পেশি শক্ত হয়ে উঠল।
“বাচ্চারা অনেক কিছুই মনে করে।”
আমি এবার সরাসরি বললাম, “স্কুলের টিচারও চিন্তিত।”
এক মুহূর্তে তার চোখ পাল্টে গেল।
“তুমি স্কুলে গিয়ে এসব আলোচনা করেছ?”
“আমি ওর অভিভাবক। সেটা করার অধিকার আমার আছে।” খাদিজা এবার ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলো। তার ঠোঁটে হালকা হাসি, কিন্তু সেই হাসির নিচে চাপা রাগ ফুটে উঠছে। “ইয়াসিন… তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ?” আমি উত্তর দিলাম না।
ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা ঝুলে রইল।
তারপর খাদিজা ঠান্ডা গলায় বলল, “আমার আগের স্বামী আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এইটাই সত্যি।”
কোথায় গেছে? জানি না। তুমি খুঁজোনি?
সে এবার বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। “সব সম্পর্ক সিনেমার মতো না। কিছু মানুষ একদিন হঠাৎ চলে যায়।
আমি লক্ষ্য করলাম, কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো কষ্ট নেই।
বরং যেন আগেই মুখস্থ করা একটা উত্তর বলছে।
আমি আর কিছু বললাম না।
কারণ বুঝতে পারছিলাম, এখন চাপ দিলে সে আরও গুটিয়ে যাবে। সেদিন রাতটা অদ্ভুতভাবে কেটে গেল।
খাদিজা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল। টিভি দেখল, ফোনে কথা বলল, এমনকি মাঝেমধ্যে হেসেও উঠল।
কিন্তু আমি খেয়াল করলাম, সে বারবার আয়রার দিকে নজর রাখছে। আর আয়রা?
সে যেন পুরোপুরি চুপ হয়ে গেছে।
রাতের খাবারের সময় একবারও চোখ তুলে তাকায়নি।
আমি বুঝলাম, আজ বাড়ির ভেতর কোনো অদৃশ্য উত্তেজনা ছড়িয়ে আছে। রাত দুইটার দিকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। হাসপাতালে বহু বছর নাইট শিফটে কাজ করার কারণে খুব হালকা শব্দেও আমার ঘুম ভাঙে।
প্রথমে মনে হলো রান্নাঘরে কিছু পড়ে গেছে।
তারপর আবার শব্দটা হলো। খুব আস্তে।
টক…
টক…
টক…
আমি বিছানা থেকে উঠে দরজা খুললাম। পুরো করিডোর অন্ধকার। শুধু নিচতলার সিঁড়ির পাশে হালকা হলুদ আলো জ্বলছে। আমি ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগলাম।
আর তখনই দেখলাম আয়রা রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে ছোট্ট গোলাপি নাইটড্রেস। হাতে স্কুটি।
মেয়েটা কাঁপছে। আমি দ্রুত এগিয়ে গেলাম। “আয়রা?”
সে চমকে উঠল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “আমি শব্দ শুনেছি।” কীসের শব্দ?
সে রান্নাঘরের স্টোররুমের দিকে আঙুল তুলল।
আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম।
স্টোররুমটা বাড়ির এক কোণায়। দরজাটা সবসময় বন্ধ থাকে। আমি কখনো ওখানে যাইনি।
আমি শান্ত স্বরে বললাম, “সম্ভবত ইঁদুর।”
আয়রা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না।”
“তাহলে?”
সে ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর খুব আস্তে বলল, ওই ঘরটা মা খুলতে দেয় না।
আমার ভেতরে কেমন অস্বস্তি জেগে উঠল।
কেন? আয়রা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ফিসফিস করে বলল, কারণ ওখানে খারাপ জিনিস আছে। ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে খাদিজার গলা ভেসে এলো। আয়রা! মেয়েটা এমনভাবে কেঁপে উঠল যেন বিদ্যুৎ লেগেছে। খাদিজা সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ অন্ধকারে পুরো বোঝা যাচ্ছে না।
“তুমি নিচে কী করছ?”
আয়রা তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করল। “আমি পানি খেতে এসেছিলাম।”
খাদিজা ধীরে ধীরে নিচে নামল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ও রাতে ঘুমের মধ্যে হাঁটে।”
আমি অবাক হলাম। ও আগে কখনো “অনেক কিছুই তুমি এখনো জানো না।”
কথাটা বলে সে আয়রার হাত ধরে ওপরে নিয়ে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
কিন্তু আমার মাথায় বারবার ঘুরতে লাগল স্টোররুমটার কথা। পরদিন সকাল। খাদিজা বাজারে গেছে।
আয়রা নিজের ঘরে বসে ছিল। আমি নিচে নেমে স্টোররুমের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
দরজায় তালা নেই।
কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে যেন আটকে আছে।
আমি ধীরে হাত রাখলাম।
দরজাটা কিঞ্চিৎ শব্দ করে খুলে গেল।
ভেতরে ধুলোমাখা গন্ধ।
ছোট্ট একটা ঘর। পুরোনো বাক্স, ভাঙা চেয়ার, কিছু কার্টন।
প্রথম দেখায় খুব সাধারণ লাগল।
আমি ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকালাম।
হঠাৎ চোখ পড়ল দেয়ালের দিকে।
দেয়ালের নিচের অংশে অদ্ভুত কালচে দাগ।
যেন কোনো সময় সেখানে কিছু পুড়েছিল।
আমার বুকের ভেতর হালকা চাপ অনুভব হলো।
আমি আরও এগিয়ে গেলাম।
এক কোণায় একটা পুরোনো কাঠের আলমারি।
আলমারির দরজা আধখোলা।
আমি খুলতেই ভেতর থেকে একটা ছোট্ট বাক্স পড়ে গেল।
মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল কিছু কাগজ আর কয়েকটা ছবি।
আমি নিচু হয়ে একটা ছবি হাতে নিলাম।
ছবিতে খাদিজা। তার পাশে এক লোক দাঁড়িয়ে।
লোকটার মুখে হাসি। কোলে ছোট্ট আয়রা।
আমার ধারণা এটাই তার আগের স্বামী।
ছবিটার পেছনে লেখা আমাদের প্রথম ঈদ। রাফিন, খাদিজা আর আয়রা। রাফিন।
প্রথমবার আমি নামটা জানলাম।
আমি আরও কিছু ছবি দেখলাম।
সবগুলোতেই রাফিন আর আয়রা খুব কাছাকাছি।
কিন্তু একটা জিনিস অদ্ভুত লাগল। শেষের দিকের ছবিগুলোতে রাফিনের মুখ ক্রমশ ক্লান্ত আর চিন্তিত দেখাচ্ছে। যেন সে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল।
আমি বাক্সটা আবার দেখতে গিয়ে একটা কাগজ পেলাম।
ভাঁজ করা। হালকা হলদেটে হয়ে গেছে।
আমি খুললাম। এটা একটা হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন।
রোগীর নাম খাদিজা রহমান।
ডাক্তারের নোটে লেখা উচ্চ মাত্রার রাগ নিয়ন্ত্রণ সমস্যা, আচরণগত অস্থিরতা, আবেগজনিত বিস্ফোরণ।
আমার বুক ধক করে উঠল।
আরও নিচে লেখা চিকিৎসা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া জরুরি। আমি স্থির হয়ে গেলাম।
ঠিক তখনই পেছনে দরজার শব্দ হলো।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। দরজায় খাদিজা দাঁড়িয়ে।
তার হাতে বাজারের ব্যাগ।
কিন্তু তার চোখ…সেই চোখে এবার এমন কিছু ছিল যা আমি আগে কখনো দেখিনি। ঠান্ডা। ভয়ংকর ঠান্ডা।
সে ধীরে বলল, “তুমি এখানে কী করছ?”
আমার হাতে তখনো প্রেসক্রিপশনটা।
কয়েক সেকেন্ড কেউ নড়ল না। তারপর খাদিজা দরজা বন্ধ করে দিল। খট করে লকের শব্দ হলো।
আমার বুকের ভেতর কেমন শক্ত হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলো।
“তুমি আমার জিনিসপত্রে হাত দিয়েছ?”
আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করলাম। “আমি শুধু ”
“শুধু কী?”
তার কণ্ঠ এবার বদলে গেছে।
আগের সেই নরম, নিয়ন্ত্রিত স্বর নেই।
আমি বুঝলাম, এই প্রথমবার আমি তার আসল রূপের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
খাদিজা আমার হাত থেকে প্রেসক্রিপশনটা টেনে নিল।
তারপর কয়েক সেকেন্ড সেটা দেখে হেসে উঠল।
কিন্তু সেই হাসি স্বাভাবিক না।
তুমি ভাবছ আমি পাগল?
আমি ধীরে বললাম, “আমি সেটা বলিনি।
সে আরও কাছে এলো। “রাফিনও এটাই ভাবত।”
আমার বুক কেঁপে উঠল। “রাফিন কোথায়?”
খাদিজার চোখে অদ্ভুত ঝিলিক ফুটে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ফিসফিস করে বলল, “মানুষ যখন বেশি প্রশ্ন করে, তখন একসময় হারিয়ে যায়।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে আয়রার কণ্ঠ ভেসে এলো।
“বাবা…?”
খাদিজার মুখ মুহূর্তে বদলে গেল। আবার সেই স্বাভাবিক শান্ত চেহারা। সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে।
কারণ এখন আমি নিশ্চিত এই বাড়িতে শুধু নির্যাতন না…
আরও ভয়ংকর কিছু লুকিয়ে আছে।

Post a Comment

0 Comments