অন্তহীন_প্রেম_আমার
বিকেলের শেষ রক্তিম আলোটুকু সমুদ্রের নোনাজলে মিলিয়ে গিয়ে সেন্টমার্টিনের বুকে আস্তে আস্তে অলস সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। আর এই দ্বীপে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই চারপাশের রিসোর্টগুলোর আসল মায়াবী রূপ যেন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। নারকেল গাছের মাথায় জড়িয়ে থাকা রঙিন মরিচ বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে, রিসোর্টের প্রতিটি কোণায় কৃত্রিম আলোর সুদৃশ্য আলো-আঁধারি এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছে। সেই সাথে ডাইনিংয়ের দিক থেকে ভেসে আসছে হরেক রকমের চাটনি, গরম সমুচা, আলুর চপ আর সামুদ্রিক মাছ ভাজার সুবাস। প্রতি সন্ধ্যার মতোই আজকেও বসেছে জমজমাট নাস্তার মেলা।
এদিকে বিকেলে ছেঁড়াদ্বীপের সেই তুমুল ঘোরাঘুরি শেষ করে রিসোর্টে ফিরেই সবাই ক্লান্তির কারণে যে যার মতো সময় কাটাতে শুরু করে দিয়েছিল। কেউ নিজেদের রুমে ফিরে গিয়েছে তো কেউ কেউ সমুদ্রের কিনারাতে বসে বিকেলের শেষ সময়টুকুন নিজেদের মতো কাটিয়েছে। কিন্তু সবার মতো কাব্য আর ইমদাদ একটুও সময় নষ্ট করোলো না তারা এসেই অন্যান্য টিচারদের সাথে লবিতে বসে গেল; আগামীকাল যেহেতু তারা শহরে ফিরে যাবে, সেই হিসাব-নিকাশ আর যাতায়াতের বোট ও বাসের ফাইনাল ব্যবস্থা দেখার জন্য তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অন্যদিকে রুবি তার ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে তাদের সাথে চলে যায়, আর রিমু এসেই নিজের রুমে চলে যায় ফ্রেশ হওয়ার জন্য। এদিকে আসার সময়ের সেই মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝির কারণে রুহি যে ফিরেই আসে নি কেউ যে তা করে খেয়াল করেনি, তা এই সন্ধ্যার আলোতে তখনও ঢাকা পড়ে রইল। এদিকে সবাই এতটাই ক্লান্ত ছিল যে, একেবারে নাস্তার সময়ে ডাইনিং এরিয়া থেকে স্যারদের ডাকাডাকির ফলেই যার যার স্থান থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
এদিকে শাহাজ সেই দুপুরের পর যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল, ঠিক এই সন্ধ্যার সময়ে এসে তার ঘুমটা ভাঙল। কড়া পাওয়ারের ওষুধ আর রুহির হাতের সেই মায়াবী বাম মালিশের জাদুতে তার মাইগ্রেনের সেই তীব্র যন্ত্রণাটা এখন একদম গায়েব। সে এখন শরীরে বেশ কিছুটা সুস্থতা আর সতেজতা অনুভব করছে। অতঃপর শাহাজ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গায়ের পাতলা কম্বলটা একপাশে সরিয়ে তার ঘামে ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে একবার ঠিক করে নিল।
এবার বিছানা থেকে নেমে তার চোখ প্রথমেই গেল টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসটার দিকে। দুপুরের সেই আবছা স্মৃতি মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল—কীভাবে চঞ্চলা মেয়েটা ওকে বকে কড়া শাসনে খাবার খাইয়ে এরপরে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল! শাহাজ হালকা হেসে নিজের মাথা ঝাকিয়ে এবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সে ঘুমিয়ে থাকলেও জানে সবার সাথে রুহিও ঘুরতে গিয়েছে, তাইতো শাহাজ তাকে নিষেধ বা বারন করেনি কারন রুহির এডভেঞ্চার সব সময় পছন্দের অতঃপর সে ভাবল, "রুহি নিশ্চয়ই এতক্ষণে ছেঁড়াদ্বীপ থেকে ঘুরে চলে এসেছে। হয়তো এসেই তাকে একবার দেখে গেছে। এখন হয়তো সবার সাথে ডাইনিংয়ে নাস্তা খাচ্ছে।"
এসব ভাবতে ভাবতেই শাহাজের মনটা চট করে রুহির সেই চঞ্চল মুখটা দেখার জন্য আকুল হয়ে উঠল। অতঃপর সে বাহিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করলো।
এদিকে ডাইনিং এরিয়ার চারিদিকে তখন তুমুল হুলস্থুল আর হাসির রোল। প্লেটে ধোঁয়া ওঠা গরম নাস্তা নিয়ে যে যেখানে পেরেছে বসে পড়েছে। কেউ চেয়ারে আরাম করে বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছে, আবার কয়েকজন প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আড্ডা দিতে দিতে খাচ্ছে। পুরো পরিবেশটায় এক ক্লান্তিহীন আনন্দের ছোঁয়া।
ঠিক তখনই আগামীকালের ফেরার সমস্ত তদারকি শেষ করে কথা বলতে বলতে ডাইনিংয়ে ফিরে এলো কাব্য আর ইমদাদ। কাব্য এসেই ক্লান্ত পায়ে রুবিদের পাশের খালি চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ল। অন্যদিকে ইমদাদ তাদের সাথে দাঁড়িয়ে একটু টুকটাক কথা বলল। কে কী নাস্তা খাবে তা জিজ্ঞেস করে নিয়ে সে নিজেই এগিয়ে গেল কাউন্টারের দিকে। কিছুক্ষণ পর ইমদাদ রুবি আর রিমুর জন্য গরম গরম ফিশ ফ্রাই আর চায়ের কাপ এনে তাদের সামনের টেবিলে রাখল। নাস্তার প্লেটগুলো গুছিয়ে রাখার সময় ইমদাদ হঠাৎ চারদিকে একবার চোখ বুলালো। রুহির চঞ্চল অবয়বটা কোথাও না দেখে সে রুবির দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল, “রুবি, রুহি কোথায় ? ও নাস্তা করবে না? এখনো কি রুমে আছে নাকি? ডাকো নি আসার সময়?”
ইমদাদের এই সাধারণ প্রশ্নটা শোনা মাত্রই রুবি বলে উঠলো, "রুহি তো রিমুর সাথে ছিলো, কিরে রিমু রুম থেকে আসার সময় ওকে ডাকিস নি তুই?
রুবির এমন কথাতে রিমু চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়েও থেমে গেল। সে প্রচণ্ড অবাক আর বিস্ময় ভরা চোখে রুবির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “মানে? রুহি রুমে থাকবে কেন? ও তো আমার সাথে ছিলো না। আমি তো পুরোটা সময় ভেবেছি ও তোর সাথেই এতক্ষণ ছিল!”
রিমুর মুখে এই কথা শুনে রুবির হাতের চামচটা প্লেটের ওপর পড়ে গেল। তার চোখে-মুখে এক মুহূর্তের মধ্যে তীব্র চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে চোখ বড় বড় করে বলল, “কী বলছিস রিমু! ও তো আমার সাথে ছিলো না আমি তো একাই ছিলাম। আমি তো আরো ভাবলাম রুহি তোর সাথে রুমে আছে !”
আকস্মিক এমন কথাতে রুবি ও রিমু দুজনের চেহারায় তখন হঠাৎ করেই এক আশঙ্কার কালো মেঘ ফুটে উঠল, ঠিক তখনই পাশ থেকে তাদের কথাবার্তা শুনে কাব্য মুচকি হেসে সান্ত্বনার সুরে বলে উঠল, “আহা, তোরা শুধু শুধু এত টেনশন নিস না তো! রুহি কোথায় যাবে আর? ও হয়তো আশে পাশেই আছে আর আশেপাশে না থাকলে শাহাজ ভাইয়ের রুমে আছে। তোরা তো জানিসই, দুপুরে শাহাজ ভাইয়ের কী মারাত্মক মাথা ব্যথাটা উঠেছিল!
বেচারা পুরো কাবু হয়ে ছিল। রুহি ছেঁড়াদ্বীপ থেকে ফিরেই হয়তো সবার অলক্ষ্যে সোজা ভাইয়ের রুমে চলে গেছে ওনার খোঁজ নিতে। দেখ গিয়ে ওখানেই হয়তো বসে আছে।”
কাব্যের এই যুক্তিটা শোনা মাত্রই রুবি আর রিমুর মনের ভেতর জমে থাকা ভয়টা এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল। যেহেতু রুবি আর রিমু দুজনেই শাহাজ আর রুহির মধ্যকার সেই গভীর অনুভূতির কথা খুব ভালো করেই অবগত, তাই কাব্যের কথাটাকে তাদের একদম খাঁটি এবং যুক্তিযুক্ত মনে হলো। তারা মনে মনে ভেবে নিল—তাই তো! মেয়েটা তো শাহাজ ভাইকে এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করতে চায় না, রিসোর্টে পা দিয়েই নিশ্চয়ই ওনার সেবা করতে ওনার ঘরে গিয়ে সেঁধিয়েছে।
এই ভেবেই দুই বোন একদম টেনশন ফ্রি হয়ে গেল। তাদের মনের সব সংশয় দূর হয়ে যাওয়ায় তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবারও প্লেটের নাস্তায় মনোযোগ দিল। তারা বিন্দুমাত্র টের পেল না যে, কাব্যের দেওয়া এই সান্ত্বনা আসলে এক ভয়ানক শান্ত ঝড়ের আগের নীরবতা মাত্র!
এদিকে ডাইনিংয়ে যখন সবাই নাস্তা আর আড্ডায় মশগুল, ঠিক তখনই সেখানে এসে উপস্থিত হলো শাহাজ। তার পরনে তখন কালো শার্ট, আর চুলগুলো হালকা ব্যাকব্রাশ করা। শাহাজকে আসতে দেখেই কাব্য নিজের চেয়ার ছেড়ে ঝটপট উঠে দাঁড়াল এবং তার কাঁধ ধরে টেনে নিজের বসা চেয়ারটায় বসিয়ে দিয়ে বলল, “আসো ভাই বসো। এখন তোমার কেমন লাগছে?”
শাহাজ চেয়ারটায় বসে নিজের কপালে হাত বুলিয়ে বলল, “এখন বেশ ভালো আছি।” তারপর রুবি আর রিমুর দিকে তাকিয়ে তার চিরচেনা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোদের ছেঁড়াদ্বীপের ট্যুর কেমন হলো? এনজয় করেছিস তো?”
শাহাজের প্রশ্ন করা মাত্রই রুবি আর রিমু একরাশ উচ্ছ্বাস নিয়ে ছেঁড়াদ্বীপের কাঁচের মতো নীল পানি, প্রবাল আর সুন্দর সুন্দর ছবি তোলার গল্প করতে লাগল। শাহাজ তাদের কথায় হালকা মাথা নাড়লেও তার চোখ দুটো তখন ডাইনিংয়ের চারপাশের প্রতিটা টেবিলে চাতক পাখির মতো কাউকে খুঁজে ফিরছিল। তার চেনা সেই চঞ্চলা মেয়েটার অবয়ব কোথাও না পেয়ে সে এবার তার অবাধ্য চোখ জোড়া দিয়ে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল, তখনই কাব্য বাঁকা হেসে ওর মনের অবস্থা ধরে ফেলল। কাব্য তার নাস্তার প্লেটটা শাহাজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “কী রে ভাই, চোখ কাকে খুঁজছে তা আমি খুব ভালো করেই জানি। তা রুহিকে রুমে রেখে এসেছিস কেন? রুহির নাস্তাটা কি তুই রুমে নিয়ে যাবি, নাকি ও এখানেই এসে পরে করবে?”
শাহাজ প্রথমদিকে কাব্যের কথাটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না। সে কাব্যের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “রুমে কেন নাস্তা করবে? ও সবার সাথে এখানে এসে নাস্তা করুক। ডাক ওকে।”
শাহাজের মুখে এমন কথা শুনে রুবি এবার টেবিলের ওপাশ হাতের চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে অবাক হয়ে বলল, "ভাইিা! তুমি এসেছ তো ওকে সাথে করে নিয়ে আসবে না? ও তো বিকেল থেকে তোমার রুমেই একা একা বসে আছে। নিশ্চয়ই এতক্ষণ ফোন ঘাটাঘাটি করছিল, আর তুমিও রুমে একা রেখে ওকে না নিয়ে একাই চলে এলে?”
রুবির এই কথায় শাহাজ এবার সত্যি সত্যিই বেশ অবাক হলো। তার কপালে এবার চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে রুবির দিকে সোজা তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “রুহি আমার রুমে নেই রুবি। তোকে কে বলল ও আমার রুমে আছে? ওকে তো দুপুরের পর থেকে আমি আর দেখিনি কোথাও!”
শাহাজ কখনো কারোর সাথে রসিকতা বা মশকারি করে না—এই সত্যটা খন্দকার বাড়ির ছোট-বড় সবার খুব ভালো করেই জানা। তাই শাহাজের মুখ থেকে এই দুটো বাক্য বের হওয়া মাত্রই পুরো ডাইনিং হলের গমগম করা পরিবেশটা যেন এক নিমেষে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার মুখের হাসি পলকে মিলিয়ে গেল, মুখের খাবার যেন গলায় আটকে আসার উপক্রম হলো। রুহি বড় বড় চোখ করে রুবির দিকে তাকাল, আর ইমদাদ প্লেট হাতে কাব্যের দিকে বোকার মতো চেয়ে রইল।
কাব্য এবার নিজের মুখের সেই চপল হাসিটা মুছে শাহাজের দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। অত্যন্ত শান্ত ও কিছুটা ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল, “ভাই... রুহি কি সত্যিই তোর রুমে যায়নি? আমরা তো ওকে এখানে না পেয়ে নিশ্চিত হয়ে ভেবেছিলাম ও তোর অসুস্থতার কারনে তোর ওখানেই তোর সাথে বসে আছে।”
শাহাজ এবার চেয়ার ছেড়ে ঝটপট সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বরে একরাশ তীব্র চিন্তা ও ভয়ের কাঁপন স্পষ্ট হয়ে উঠল, “না! ও তো আমার রুমে যায়নি! আমি তো ওষুধ খেয়ে সেই দুপুরে ঘুমালাম, এই মাত্র ফ্রেশ হয়ে বাইরে এলাম। ও আমার রুমে নেই। তাহলে কোথায় রুহি?”
শাহাজ এবার ডাইনিংয়ের চারপাশে পাগলের মতো চোখ বুলাতে বুলাতে মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “মেজ চাচ্চু আর ছোট মা কোথায়?”
রিমু এবার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল, “চাচ্চু আর ছোট মা তো অনেকক্ষণ হলো বাইরে একটু হাঁটতে বেরিয়েছেন।”
পাশ থেকে রুবি নিজের ওড়নাটা শক্ত করে চেপে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “রুহি কোন ওনাদের সাথে যায়নি তো শাহাজ ভাই?”
শাহাজ আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ফটাফট পকেট থেকে মোবাইল বের করে ছোট চাচ্চু শাহাবুদ্দিন সাহেবের নাম্বারে ফোন দিতে শুরু করলো । কিন্তু ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বারবার বলতে লাগল, “আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছে।”
বার বার একই কথা শুনে শাহাজের হাতের রগগুলো রাগে আর আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। সে ফোনটা পকেটে পুরে রুবি, রিমু, কাব্য আর ইমদাদকে হুংকার দিয়ে বলল, “তোরা সবাই এখনই রিসোর্টের আশেপাশে খোঁজ কর! জলদি। ” এই বলে সে নিজে এক ছুটে রিসোর্টের বাইরে সৈকতের দিকে ধাবিত হলো।
শাহাজের কথা শুনেই রুবি আর রিমু দৌড়ে গিয়ে তাদের সাথে ট্যুরে আসা ভার্সিটির সমস্ত ক্লাসমেট আর ফ্রেন্ডদের হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল, “তোরা কেউ রুহিকে দেখেছিস? ফেরার সময় ও কার বোটে ছিল?” কিন্তু সবাই একবাক্যে মাথা নেড়ে বলতে লাগল, “না রে, আমরা তো খেয়াল করিনি। আমরা ভেবেছি ও তোদের সাথেই আছে।”
ওদিকে শাহাজ পাগলের মতো সমুদ্রের পাড়ে, রিসোর্টের ভেতরের বাগানে, সুইমিং পুলের পাশে—সব জায়গায় ‘রুহি’ ‘রুহি’ বলে চিৎকার করে খুঁজল। কিন্তু কোথাও তার সেই মায়াবী চঞ্চলা তার চোখে পড়ল না। একসময় পুরো ট্যুরের সবাই আর রিসোর্টের স্টাফরা পর্যন্ত রুহিকে খোঁজার কাজে নেমে পড়ল। এদিকে রুহিকে বাহিরে না পেয়ে শাহাজ ছটফট করতে করতে রিসোর্টের ভেতরের কফি শপের দিকে এগিয়ে গেল, সেখানে থাকা বয়দের জিজ্ঞেস করতেই তারা হাত জোড় করে জানাল যে তারা কেউ রুহিকে সকালের পর দেখেনি। শাহাজের মাথার ভেতর এতক্ষণের সেই মাইগ্রেনের ব্যথার চেয়েও হাজার গুণ তীব্র এক রাগ আর আতঙ্ক চাড়া দিয়ে উঠল। তার চোখ দুটো যেন রক্তবর্ণ ধারণ করল। সে আবারও পকেট থেকে ফোন বের করে শাহাবুদ্দিন সাহেবের নাম্বারে কল করল, কিন্তু এবারও নাম্বারটি ব্যস্ত দেখাচ্ছে।
একসময় শাহাজ প্রচণ্ড রাগে পেছনে ফিরে কাব্য, রুবি, ইমদাদ আর রিমুর দিকে তাকাতেই—ঠিক সেই মুহূর্তে লবির প্রবেশদ্বারে শাহাবুদ্দিন সাহেবের চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সামনে তাকাতেই দেখা গেল শাহাবুদ্দিন সাহেব ফোনে কারোর সাথে হেসে হেসে কথা বলতে বলতে ডাইনিংয়ের দিকে আসছেন, আর ওনার ঠিক পেছনেই পায়ে পায়ে হেঁটে আসছেন ছোট মা রূপাঞ্জলি । ওনাদের দুজনকে অক্ষত আর শান্তভাবে আসতে দেখে শাহাজের ডুবন্ত মনে হঠাৎ যেন একটা আশার আলো জ্বলে উঠল—হয়তো রুহি ওনাদের সাথেই বাইরে কোথাও হাঁটতে গিয়েছিল!
শাহাজ আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে প্রায় এক লাফে শাহাবুদ্দিন সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার মুখে আর কোনো সৌজন্যতা রইল না, সে ছিটকে গিয়ে শাহাবুদ্দিন সাহেবের হাত থেকে ফোনটা এক ঝটকায় টান দিয়ে কেড়ে নিল। শাহাজের এমন আকস্মিক ও রুক্ষ কাণ্ডে শাহাবুদ্দিন সাহেব চরম ঘাবড়ে গেলেন। তিনি শাহাজকে কিছু বলবেন তার আগেই শাহাজ হিংস্র গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “এতক্ষণ ধরে কার সাথে কথা বলছ তুমি চাচ্চু? কখন থেকে তোমাকে আমি ফোন করার চেষ্টা করছি, অথচ তোমার নাম্বার অনবরত ব্যস্ত! এখন বলো রুহি তোমাদের সাথে গিয়েছিল? ও কি তোমাদের সাথে আছে?”
শাহাজের এমন বিধ্বংসী রূপ দেখে শাহাবুদ্দিন সাহেব আমতা আমতা করে হালকা হাসার চেষ্টা করে বললেন, “আরে শাহাজ, কী হয়েছে তোর? আসলে আমার এক পুরোনো ফ্রেন্ড অনেকদিন পর ফোন করেছিল সিলেট থেকে, তাই তার সাথেই কথা বলছিলাম। তা তুই কেন কল করছিলি বল?”
ঠিক তখনই ছোট মা রূপাঞ্জলি পেছন থেকে এগিয়ে এসে ব্যাকুল হয়ে বললেন, “না তো শাহাজ! রুহি তো আমাদের সাথে যায়নি। তুমি ঘুমাচ্ছিলে, কেউ ছিলো না তাই সবাই ছেঁড়াদ্বীপ থেকে আসার আগেই আমরা একটু বাইরে লন ধরে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু যাওয়ার সময় এখানের ম্যানেজারকে বলে গিয়েছিলাম কেন বাবা, কী হয়েছে? রুহি কোথায়?”
রূপাঞ্জলির এই একটি মাত্র বাক্য যেন উপস্থিত সবার মাথায় এক একটা জীবন্ত বাজ হয়ে আছড়ে পড়ল! রুহি ওনাদের সাথেও নেই! তাহলে মেয়েটা গেল কোথায়? পুরো রিসোর্টের ডাইনিং জুড়ে তখন উপস্থিত সবার মাঝে তীব্র কানাঘুষা আর ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। সবাই আরও একবার রিসোর্টের ছাদ থেকে শুরু করে বাথরুম পর্যন্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজলো, কিন্তু না—রুহির কোনো হদিসই মিলল না।
শাহাজ এবার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাব্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতর তখন এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে চলেছে। সে কাব্যের চোখের দিকে তাকিয়ে চিবুক শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোরা ছেঁড়াদ্বীপে কিসে করে গিয়েছিলি কাব্য?”
কাব্য ভয়ে ঢোক গিলে বলল, “বোট... স্পিডবোটে করে গিয়েছিলাম। চারটা বোট ছিল আমাদের।”
শাহাজ আবার দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করল, “যাওয়ার সময় ও কোন বোটে করে গিয়েছিল?”
রুবি পাশ থেকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল, “ও আমাদের সাথে... আমাদের বোটে করে গিয়েছিল ভাই।”
শাহাজ এবার তার সেই রক্তবর্ণ চোখ দুটো রুবির দিকে ঘুরিয়ে সিংহের মতো গর্জে উঠল, “তাহলে আসার সময় ও কোন বোটে করে এসেছিল? কারা ছিল ওর সাথে? শেষবার ওকে কে দেখেছে তোদের মধ্যে? বল!” শাহাজ সবার দিকে এক এক করে চাবুকের মতো দৃষ্টি হেনে গেল, কিন্তু পুরো হল জুড়ে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। সবাই অপরাধীর মতো চোখ নিচু করে চুপ করে রইল।
শাহাজ এবার ইমদাদের দিকে তার খুনে দৃষ্টিটা সরালো। শাহাজের এমন ভয়ানক চাউনি দেখে ইমদাদের কলিজা যেন শুকিয়ে গেল। সে আর নিজের ভয় ধরে রাখতে না পেরে এক ছুটে তাদের সাথে আসা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলল, “তোমাদের মধ্যে শেষবার রুহিকে কে দেখেছে? ও কার বোটে বসেছিল, কার পাশে বসেছিল—একটু বলো প্লিজ!”
ইমদাদের এমন আকুল প্রশ্নে শিক্ষার্থীরা একে অন্যের মুখের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। একপর্যায়ে সবাই সমস্বরে বলে উঠল, “না স্যার, ফেরার সময় ও আমাদের কোনো বোটে বসেনি। আমাদের সাথে ও ছিলই না!”
একসাথে সবার মুখে এমন সত্য বেরিয়ে আসতেই পুরো পরিবেশটা নিমিষেই এক চরম ভয়াবহ ও কঠিন রূপ ধারণ করল। শাহাবুদ্দিন সাহেব নিজের বুকে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “বোট থেকে নামেনি মানে কী বলছ তোমরা? যাওয়ার সময় ছিল, আসার সময় ছিল না—তার মানে কী!”
শাহাজ এবার আবারও তার কণ্ঠস্বরকে পৃথিবীর সবচেয়ে গম্ভীর, রাগান্বিত ও মারাত্মক এক হুংকারে রূপ দিয়ে ডাইনিং হল কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল, “এর মানে খুব সহজ চাচ্চু! এই অপদার্থগুলো... ওরা রুহিকে ওখানেই ফেলেই চলে এসেছে!”
শাহাজের এই আকাশ কাঁপানো হুংকারে রুবি, রিমু, কাব্য আর ইমদাদের যেন আত্মা শুকিয়ে গেল। তার চাইতেও বড় ও ভয়ানক সত্য হলো—বাইরে এখন অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে চারপাশ একদম ঘুটঘুটে কালো হয়ে গিয়েছে! সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর নির্জন সেই দ্বীপে একটা মেয়ে একা এতক্ষণ ধরে আটকে আছে, অথচ এই মানুষগুলো একটাও এতক্ষণ তা বুঝতে পারল না!
ঠিক তখনই ভিড়ের মাঝখান থেকে দুজন স্টুডেন্ট সাহস নিয়ে হাত তুলে বলল, “স্যার... আমরা যখন ছবি তুলছিলাম, তখন রুবির বোন মানে রুহিকে ঝিনুক আর কড়ি কুড়াতে কুড়াতে দ্বীপের একদম ভেতরের ওই পাথুরে কোণাটার দিকে যেতে দেখেছিলাম। কিন্তু এরপর আমরা সবাই ছবি তোলায় আর ফেরার তাড়াহুড়োয় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম যে, ও আর ফিরে এসেছে কি না তা খেয়ালই করিনি।”
এই কথা শোনা মাত্রই রিমু আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না, সে হাউমাউ করে জোরে কেঁদে উঠল। রিমুর এমন কান্না দেখে শাহাজ তার দিকে ফিরে এক চরম কর্কশ ও সজোরে একটা ধমক বসাল, “চুপ কর! একদম চুপ।”
তারপর সে এক ঝটকায় এগিয়ে গিয়ে কাব্যের শার্টের কলারটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় খপ করে ধরে ওকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল। শাহাজ তার দাঁত কিড়মিড় করে কাব্যের মুখের ওপর বলতে লাগল, “আমাকে না বলে, আমার অনুমতি ছাড়া ওকে ওই বিপজ্জনক দ্বীপে নিয়ে যাওয়ার দুঃসাহসিকতা দেখালি! তার ওপর মেয়েটা তোদের সাথে ফিরে এলো না—সেটুকু পর্যন্ত তোরা একটা বারও খেয়াল করার প্রয়োজন মনে করলি না? দায়িত্ব যখন তোরা কুলাঙ্গারগুলো নিতে পারিস না, তাহলে এত বড় বড় ট্যুরের প্ল্যান দেখাস কেন শুনি? এতোগুলো মেয়েকে নিয়ে গেলি আর একজনকে ফেলে রেখে এলি, এখন যদি রুহির কিছু হয়ে যায় তোকে আমি ছাড়বো না কাব্য। আই প্রমিচ তোদের কাউকে ছাড়বোনা।”
এমন হুরুস্থুল কান্ডে শাহাবুদ্দিন সাহেব আর ইমদাদ ছুটে এসে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে টেনেটুনে শাহাজকে কাব্যের ওপর থেকে সরিয়ে দিল। কাব্য দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ওভাবেই মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল। এক চরম অপরাধবোধ আর অনুশোচনা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল, হঠাৎই তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে শুরু করলো।
○শাহাজ এবার ইমদাদের কলার লক্ষ্য করে এগোতে নিলে ইমদাদ হাত জোর করে পিছিয়ে গেল। অতঃপর শাহাজ তার দিকে তাকিয়ে হিংস্র গলায় বলল, “সবার দায়িত্ব তো তোদের টিচারদের ওপর ছিল, তাই না? তাহলে কীভাবে একটা জ্যান্ত মানুষকে ওভাবে দ্বীপে ফেলে দিয়ে এলি তোরা? একটা বারও তোদের মাথা গোনার বুদ্ধি হলো না যে সবাই আছে কিনা। সবাই তোদের সাথে ছিলো কিনা?”
ইমদাদ এবার নিজের অপরাধ ঢাকতে মরিয়া হয়ে তাদের সাথে ঘুরতে আসা একজন ফিমেল টিচার জেরিন ম্যামের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “জেরিন ম্যাম! তখন বোটে ওঠার সময় আমি তো আপনাকে স্পেশালি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সবাই বোটে উঠেছে কিনা দেখার জন্য! আপনি তো নিজের মুখে বলেছিলেন সবাই উঠেছে! তাহলে রুহি কীভাবে সেখানে রয়ে গেল?”
ডাইনিংয়ে থাকা অন্যান্য সিনিয়র টিচাররাও এবার জেরিন ম্যামের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকালেন। জেরিন ম্যাম তখন নিজের ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে আমতা আমতা করে কম্পিত গলায় বললেন, “আসলে... ওরা তো আমাদের ভার্সিটির রেগুলার স্টুডেন্ট ছিল না। তাই আমি তো শুধু আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্টদের কাউন্ট করেছিলাম... ওদেরকে তো আসলে আমি গুনিনি!”
জেরিন ম্যামের মুখ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও স্বার্থপরের মতো কথা শোনা মাত্রই ইমদাদ যেন রাগে ফেটে পড়ল। সে চিৎকার করে বলল, “ওরা আমাদের ভার্সিটির স্টুডেন্ট নয় বলে আপনি ওদেরকে মানুষ বলে গুনবেন না? এটা কেমন কথা ম্যাম!”
এদিকে পরিস্থিতির ক্রমাগত খারাপ থেকে আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করতে লাগল। শাহাজের এই রুদ্রমূর্তি আর হিংস্র অবতার দেখে রিমু ভয়ে জোরে চিৎকার করে কাঁদতেও পারছে না, সে রুবির বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে চলেছে। রুবির অবস্থাও তাই; সে কাঁপতে কাঁপতে প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম। ছোট মা রূপাঞ্জলি কোনোমতে দুজনকে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, ওনার নিজের চোখে-মুখেও এক চরম ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
কাব্য এবার মেঝে থেকে কোনোমতে নিজের শক্তি আর সাহস সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়াল। সে শাহাজের সামনে গিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “শাহাজ... ভাই... বাইরে পুরো অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। রুহি ওই জনমানবহীন দ্বীপে একা... এখন আমরা কী করব বল?”
কাব্যের এমন কথাতে শাহাজ এবার তার দিকে ফিরে এক ঝংকার দিয়ে বলে উঠল, “আমি এখন, এই মুহূর্তেই ছেঁড়াদ্বীপে যাব! গিয়ে আমার রুহিকে নিজে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো!”
ঠিক তখনই পুরো শোরগোল শুনে রিসোর্টের ম্যানেজার তাড়াহুড়ো করে লবিতে এগিয়ে এলেন। তিনি শাহাজের সব কথা শুনে বললেন, “স্যার! যা করার তাড়াতাড়ি করেন। কারণ সাগরের আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে, যেকোনো সময় তীব্র ঝড় চলে আসতে পারে সেই সাথে জোয়ার ! আর এত রাতে, এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোনো স্পিডবোট বা ট্রলারের চালক ছেঁড়াদ্বীপে যেতে রাজি হবে কি না, তা নিয়ে আমার চরম সন্দেহ আছে!”
ম্যানেজারের এই কথা শোনা মাত্রই শাহাবুদ্দিন সাহেবের মুখটা শুকিয়ে চুন হয়ে গেল। তিনি ভাবলেন, এই মাঝরাতে সাগরে যাওয়া মানে তো নিশ্চিত মৃত্যু! কিন্তু শাহাজ ওনার কোনো কথা শুনল না। সে ম্যানেজারের কলার চেপে ধরে বলল, “আমাকে এখনই একটা বোটের ব্যবস্থা করে দিন, নয়তো এই রিসোর্ট আমি এখনই জ্বালিয়ে দেব!”
শাহাজের এই মারাত্মক জেদ আর রূপ দেখে ম্যানেজার বাধ্য হয়ে ঘাটে ফোন করলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে এক চরম বিপত্তি বাঁধল। এই গভীর রাতে কোনো স্পিডবোট সাগরে নামতে রাজি হলো না। ঘাটে তখন মাত্র একটা কাঠের হেভি ইঞ্জিন ট্রলার নোঙর করা ছিল। আর সেই ট্রলার দিয়ে ছেঁড়াদ্বীপে যেতে নরমাল স্পিডবোটের চেয়ে অনেক বেশি, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগবে।
কোনো উপায় না দেখে শাহাজ, কাব্য আর ইমদাদকে সাথে নিয়ে এক ছুটে জেটি ঘাটের দিকে দৌড় লাগাল। শাহাবুদ্দিন সাহেবও ওনাদের সাথে ট্রলারে উঠতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শাহাজ ওনাকে এক ধাক্কায় থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “তুমি এখানে থেকে ছোট মা আর রুবিদের সামলাও চাচ্চু! ওখানে গিয়ে বিপদ বাড়ানোর দরকার নেই।”
একসময় ট্রলারের চালক অনেক টাকার বিনিময়ে এই বিপজ্জনক রাতে ইঞ্জিন চালু করল। ঘুটঘুটে অন্ধকারের বুক চিরে, সাগরের দানবীয় ঢেউগুলো ভেঙে ট্রলারটি তার সর্বোচ্চ গতি নিয়ে ছেঁড়াদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ট্রলারে বসে শাহাজ এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বুজতে পারল না। তার মনের ভেতর শুধু রুহির সেই চঞ্চল হাসিমাখা মুখটা ভেসে উঠছিল আর বারবার মনে হচ্ছিল—অন্ধকারে মেয়েটা কতটা ভয় পাচ্ছে! কতোটা একা! কি করছে মেয়েটা, কাঁদছে কি? এসব ভাবতে ভাবতেই তার নিজের হাত দুটো কামড়ে রক্ত বের করে ফেলার উপক্রম হলো রাগে।
একসময় প্রায় দীর্ঘ ৪০ মিনিটের এক রুদ্ধশ্বাস ও ভয়ানক জার্নি শেষে ট্রলারটি একসময় ছেঁড়াদ্বীপের নির্জন কূলে এসে ভিড়ল। ট্রলারের তলা বালুতে ঠেকতেই শাহাজ কোনো কিছুর পরোয়া না করে হাঁটু সমান নোনা পানিতে লাফিয়ে পড়ল এবং এক দৌড়ে দ্বীপের মূল ভূখণ্ডের দিকে ছুটতে শুরু করল। তার পেছনে পেছনে কাব্য আর ইমদাদও বড় বড় টর্চলাইট জ্বালিয়ে দৌড়াতে লাগল।
টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে ছেঁড়াদ্বীপের একটুখানি সামনে এগোতেই শাহাজের চোখ গেল একটা পাথুরে খাঁজের ওপর। সে টর্চ মারতেই দেখতে পেল—সেখানে একটা জায়গায় অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর ঝিনুক আর সামুদ্রিক শামুক ও কড়ি এক জায়গায় জড়ো হয়ে পড়ে আছে, যেন কেউ পরম যত্নে কুড়িয়ে ওগুলো ওখানে সাজিয়ে রেখে দিয়েছিল! ওগুলোর দিকে এক পলক তাকিয়েই শাহাজের বুকটা ধক করে উঠল। সে নিশ্চিত হলো—তার রুহি এই পথ দিয়েই গিয়েছে!
শাহাজ এবার দ্বীপের আরও ভেতরের দুর্গম পাথুরে এলাকার দিকে যেতে যেতে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, “রুহি! রুহি কোথায় তুই? জাস্ট বেরিয়ে আয় জান! দেখ... দেখ তোর শাহাজ ভাই এসেছে! একটু সাড়া দে রুহি!”
শাহাজের সেই চিরকালের গম্ভীর ও ইস্পাতকঠিন কণ্ঠস্বর আজ প্রথম এক অদৃশ্য ভয়ে আর আতঙ্কে কাঁপছিল। ওর কণ্ঠে তখন স্পষ্ট এক কান্নার সুর জড়িয়ে ছিল। সে পাগলের মতো টর্চের আলো এদিক-সেদিক মারতে লাগল। কাব্য আর ইমদাদও ওপাশে ‘রুহি’ ‘রুহি’ বলে চিৎকার করে খুঁজতে লাগল।
প্রায় অনেকটা সময় ধরে পুরো দ্বীপের প্রবাল প্রাচীর তন্ন তন্ন করে খোঁজাখুঁজির পরও যখন কোনো সাড়া মিলল না, তখন শাহাজ আরও কিছুটা সামনের সেই নিষিদ্ধ চোরা গর্তের পাথুরে খাঁজের দিকে এগোতে থাকল। সে আবারও এক বুক হাহাকার নিয়ে চিৎকার করে উঠল, “রুহি...!”
ঠিক তখনই... সাগরের তীব্র গর্জন আর বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দের মাঝখান থেকে, একটা পাথরের ঢালু ফাটলের ওপাশ থেকে খুব ক্ষীণ ও দুর্বল একটা কণ্ঠের মৃদু শব্দ শাহাজের কান ঘেঁষে চলে গেল, “শা...হাজ ভাই...!”
শব্দটা এতটাই ক্ষীণ আর অস্পষ্ট ছিল যে কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা অসম্ভব ছিল। কিন্তু শাহাজের প্রেমিক হৃদয় আর কান শুধু এই একটি শব্দের জন্যই ব্যাকুল হয়ে ছিল। তাই তার কানে শব্দটা বাড়ি খাওয়া মাত্রই সে এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে টর্চের আলোটা সরাসরি সেই পাথরের গভীর ফাটলটার দিকে তাক করল।
ভেতরের দিকে লাইট মারতেই শাহাজের কলিজা যেন জুড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এক তীব্র কষ্টে ফেটে পড়ল! সে দেখতে পেল—পাথরের সেই অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে খাঁজের ভেতর নিজের হাঁটু দুটো বুকের সাথে লেপ্টে ধরে, একদম জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে রুহি। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বাতাস, সাগরের গর্জন আর একাকীত্বের ভয়ে মেয়েটার চোখ-মুখ পুরো ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে প্রায় নিজের জ্ঞান হারানোর অন্তিম অবস্থায় চলে এসেছে।
রুহিকে এভাবে দেখেই শাহাজ এক লাফে সেই পাথরের খাঁজে নেমে গেল। সে কোনো কথা না বলে, কোনো বাছবিচার না করে রুহিকে এক ঝটকায় নিজের শক্ত ও চওড়া বুকের মাঝে জাপটে ধরল। তার সেই তীব্র আলিঙ্গনে যেন পৃথিবীর সমস্ত উপশম আর নিরাপত্তা ঢেলে দেওয়া ছিল। সে রুহিকে ওখান থেকে আলতো করে পাঁজাকোলা করে তুলে বাইরের আলোতে বের করে নিয়ে এল।
এদিকে সাগরে তখন জোয়ার চলে আসার সময় হয়ে গিয়েছে, পানির উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। কাব্য আর ইমদাদ ওপাশ থেকে শাহাজের চিৎকার শুনে দৌড়ে এলো। কাব্য দূর থেকে লাইট মেরে শাহাজকে রুহির সাথে দেখে স্বস্তিতে চিৎকার করে উঠল, “শাহাজ ভাই! পেয়েছো ওকে? জলদি এদিকে এসো পানি বাড়ছে!”
শাহাজ রুহিকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে কোনোমতে পাথুরে পথ পার হয়ে দৌড়ে এসে ট্রলারে উঠে বসল। কাব্য আর ইমদাদ তাকে ট্রলারে উঠতে সাহায্য করলো। তারা উঠে বসা মাত্রই ট্রলারের চালক আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ট্রলারের সর্বোচ্চ গতি বাড়িয়ে দিয়ে সেন্টমার্টিন মূল দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
এদিকে চলন্ত ট্রলারের ভেতরেই শাহাজ রুহিকে নিজের কোলের ওপর শুইয়ে রাখল। সে তারর গায়ের সেই ভেজা কাপড় আর অবিন্যস্ত চুলের তোয়াক্কা না করে নিজের শার্টের হাতা দিয়ে রুহির মুখের ঘাম আর নোনা জল মুছে দিল।
অন্যদিকে কাব্য ঝটপট একটা পানির বোতল এগিয়ে দিল। কাব্যের থেকে বোতলটি নিয়েই শাহাজ রুহির ফ্যাকাশে ঠোঁটে আর মুখে হালকা পানির ছিটা দিল এবং তার মাথাটা আলতো করে তুলে সামান্য পানি খাইয়ে রুহির হুঁশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল।
পানির ছোঁয়া পেতেই রুহি আস্তে আস্তে তার ভারী চোখের পাতা দুটো মেলল। চোখের সামনে শাহাজের সেই পরিচিত ও ভালোবাসার মুখটা দেখতে পেয়েই রুহির চোখে-মুখে এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সমস্ত আতঙ্ক আর তীব্র ভয়ের বন্যা আছড়ে পড়ল। সে দুই হাতে শাহাজের শার্টের কলারটা খপ করে ধরে ওতার বুকে মুখ লুকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠল।
এদিকে শাহাজ পুরোটা সময় রুহিকে নিজের দুই বাহুর খাঁচায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল, সেই সাথে তার মাথায় পরম মমতায় চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “কিচ্ছু হয়নি রুহি, এই তো আমি আছি। তোর শাহাজ ভাই তোর কাছে আছে। কোনো ভয় নেই।”
অবশেষে দীর্ঘ এক রুদ্ধশ্বাস অধ্যায়ের পর ট্রলারটি এসে রিসোর্টের ঘাটে পৌঁছাল। রুহিকে ফিরে পাওয়ার খবরটা রিসোর্টে পৌঁছানো মাত্রই পুরো পরিবেশের সবার মাঝে যেন এক নতুন জীবনের সঞ্চার হলো। ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা রুবি আর রিমু রুহিকে শাহাজের কোলে অক্ষত অবস্থায় দেখতে পেয়েই কান্নায় ভেঙে পড়ল। ছোট মা রূপাঞ্জলিও আকাশের দিকে হাত তুলে খোদার কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন। অপরদিকে শাহাবুদ্দিন সাহেব নিজের চোখ মুছে শাহাজের কাঁধে হাত রাখলেন।
কাব্য আর ইমদাদও এক পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আজ যদি রুহির কোনো ক্ষতি হয়ে যেত, তবে এই লোকটা যে পুরো দুনিয়াটা ছারখার করে দিত—তা তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না।
এদিকে শাহাজ রুহিকে নিজের কোল থেকে এক মুহূর্তের জন্যও নামাল না, সে ওভাবেই রুহিকে আগলে নিয়ে সোজা রিসোর্টের ভেতরের দিকে হেঁটে গেল। সেন্টমার্টিনের সেই কালরাত্রির অন্ধকার যেন খন্দকার বাড়ির এই জুটির ভালোবাসাকে আরও একবার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বেঁধে দিয়ে বিদায় নিল।

0 Comments