তালাবন্ধ_ভালোবাসা

তালাবন্ধ_ভালোবাসা


মায়া ডেস্কের উপর রাখা ফাইলগুলোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। অফিসের বাইরে তখন বিকেলের ব্যস্ততা, কর্মচারীদের চলাফেরা, ফোনের রিংটোন, মিটিংয়ের শব্দ সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছিল পৃথিবী যেন থেমে গেছে। কারণ কয়েকটি সংখ্যার মধ্যে সে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছে, যা হয়তো পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
ইয়াসিনের কোম্পানিতে সে একসময় বিনিয়োগ করেছিল। ভালোবাসার সম্পর্কের কারণে সে অন্ধ বিশ্বাস করেছিল।
বিস্তারিত হিসাব কখনো যাচাই করেনি। যখনই প্রশ্ন করেছে, ইয়াসিন হেসে বলেছে, "তুমি ব্যবসার চিন্তা করো না, আমি সামলে নেব।" তখন সে বিশ্বাস করেছিল।
আজ সেই বিশ্বাসের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে বুঝতে পারছে, কত বড় ভুল করেছিল।
সে আবার কাগজগুলো খুলল। ব্যাংক ট্রান্সফার, বিনিয়োগকারীদের তালিকা, ব্যয়ের হিসাব। অনেক জায়গায় একই ধরনের অসঙ্গতি। কোথাও টাকা ঢুকেছে কিন্তু তার হিসাব নেই। কোথাও বড় অঙ্কের অর্থ খরচ দেখানো হয়েছে, কিন্তু কোনো রসিদ নেই।
কোথাও আবার এমন কোম্পানির নাম রয়েছে, যাদের অস্তিত্বই সন্দেহজনক।
মায়া ধীরে ধীরে সব স্ক্যান করে নিজের ব্যক্তিগত ড্রাইভে সংরক্ষণ করল। তারপর নাদিয়াকে ডাকল।
নাদিয়া ঘরে ঢুকতেই মায়া বলল, "তোমার এমন কাউকে চেনা আছে, যে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং বোঝে?"
নাদিয়া অবাক হয়ে তাকাল। "কেন?"
"কারণ আমি মনে করি ইয়াসিন শুধু মিথ্যাবাদী নয়। সে আরও বড় কিছু লুকাচ্ছে।"
নাদিয়া চুপচাপ ফাইলগুলো দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর তার মুখের ভাবও বদলে গেল।
"এগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে ব্যাপারটা গুরুতর।"
"আমি জানি।" "খুব গুরুতর।"
সেদিন সন্ধ্যায় নাদিয়া একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করল। তার নাম ফারহান। তিনি বড় বড় কর্পোরেট জালিয়াতির তদন্ত করেছেন।
দুই দিন পরে ফারহান অফিসে এলেন।
চার ঘণ্টা ধরে তিনি নথিগুলো পরীক্ষা করলেন। একবার, দুবার, তিনবার।
শেষ পর্যন্ত তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
"আমি এখনই শতভাগ নিশ্চিত কিছু বলছি না। কিন্তু এখানে যা দেখছি, তা স্বাভাবিক নয়।"
মায়ার বুক ধক করে উঠল।
"কতটা অস্বাভাবিক?"
"এতটাই অস্বাভাবিক যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তদন্ত শুরু করলে কোম্পানির অস্তিত্ব বিপদে পড়তে পারে।"
মায়া ধীরে বলল,
"অর্থাৎ?"
ফারহান সরাসরি তার দিকে তাকালেন।
"আমার ধারণা, অর্থ আত্মসাতের সম্ভাবনা আছে।"
ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এল।
মায়া অনুভব করল তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে।
ইয়াসিন কি সত্যিই এত দূর যেতে পারে?
তার মনে পড়ল, গত দুই বছরে কতবার ইয়াসিন টাকা চেয়েছে।
কখনো নতুন সফটওয়্যার কেনার জন্য।
কখনো নতুন কর্মচারী নিয়োগের জন্য।
কখনো বিনিয়োগকারীদের সামনে কোম্পানিকে বড় দেখানোর জন্য।
প্রতিবার সে সাহায্য করেছে।
প্রতিবার বিশ্বাস করেছে।
এখন তার মনে হচ্ছে, সেই টাকা আসলে কোথায় গেছে?
সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার সময় তার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিল।
ভয়।
রাগ।
ঘৃণা।
আর তার সঙ্গে মিশে ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা।
কারণ যদি সত্যিই ইয়াসিন অপরাধ করে থাকে, তাহলে সে আর শুধু নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শিকার নয়।
সে এমন একজন মানুষের মুখোশ খুলতে যাচ্ছে, যে বহুদিন ধরে সবাইকে প্রতারণা করে এসেছে।
বাড়িতে পৌঁছানোর পর সে দেখল নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। নতুন নিরাপত্তারক্ষীও এসেছে।
আইনজীবী আরিফের পরামর্শেই সে এসব করেছে।
আগের ঘটনার পর আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি।
রাতে খাবার খাওয়ার সময় হঠাৎ তার ফোনে একটি ভিডিও এল।
অচেনা নম্বর।
ভিডিওটি চালু করতেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সে নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ভিডিওটি দূর থেকে গোপনে ধারণ করা হয়েছে।
তারিখ আজকের।
অর্থাৎ কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
মায়ার হাত কেঁপে উঠল।
এরপর আরেকটি মেসেজ।
"তুমি যা খুঁজছ, তা খোঁজা বন্ধ করো।"
তারপর আরেকটি।
"নইলে এর ফল ভালো হবে না।"
এই প্রথমবার তার শরীরে সত্যিকারের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
এটা আর কেবল ব্যবসায়িক প্রতিশোধ নয়।
কেউ তাকে নজরদারিতে রেখেছে।
কেউ তার প্রতিটি পদক্ষেপ দেখছে।
সেই রাতেই সে সবকিছু আরিফকে পাঠাল।
আরিফ ফোন করে বললেন,
"এটা সরাসরি ভয় দেখানোর চেষ্টা।"
"আমি কী করব?"
"প্রথমত, একা কোথাও যাবেন না। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাড়ান। তৃতীয়ত, যাই হোক না কেন, পিছু হটবেন না।"
মায়া জানালার বাইরে তাকাল।
অন্ধকার রাত।
নিস্তব্ধ রাস্তা।
কিন্তু কোথাও যেন অদৃশ্য চোখ তাকিয়ে আছে।
সে বুঝতে পারছিল, পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
পরদিন সকালে আরেকটি বিস্ময় অপেক্ষা করছিল।
অফিসে ঢুকতেই রিসেপশনিস্ট জানাল,
একজন ভদ্রলোক তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
মায়া ভেবেছিল হয়তো কোনো ক্লায়েন্ট।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে সে থমকে গেল।
প্রায় ষাট বছরের একজন মানুষ।
চুলে পাক ধরেছে।
চোখে ক্লান্তি।
লোকটি উঠে দাঁড়াল।
"আপনি কি মায়া?"
"জি।"
"আমি কামরুল হক।"
নামটি শুনে মায়ার কিছুই মনে পড়ল না।
লোকটি ধীরে বসে বললেন,
"আমি একসময় ইয়াসিনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছিলাম।"
মায়ার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।
"তারপর?"
"আমি আমার জীবনের সঞ্চয়ের বড় অংশ হারিয়েছি।"
মায়া চুপ করে রইল।
লোকটির চোখে গভীর হতাশা।
"আমি ভেবেছিলাম শুধু আমিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কিন্তু কিছুদিন আগে জানতে পারলাম, আরও অনেকে একই অবস্থার শিকার।"
"আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন?"
কামরুল হক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
"কারণ গত সপ্তাহে আমি শুনেছি আপনি ইয়াসিনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।"
মায়া ধীরে শ্বাস নিল।
"আপনার কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে?"
লোকটি ব্যাগ খুললেন।
ভেতর থেকে একটি মোটা ফাইল বের করলেন।
"এগুলো আমি বহু বছর ধরে জমিয়েছি।"
মায়া ফাইল খুলে দেখল।
ইমেইল।
চুক্তিপত্র।
ব্যাংক নথি।
অভিযোগ।
আরও অভিযোগ।
আরও প্রমাণ।
তার চোখ বড় হয়ে গেল।
কারণ এখানে শুধু আর্থিক অনিয়মের তথ্য নয়।
এখানে এমন কিছু নামও আছে, যাদের সে আগে কখনো শোনেনি।
আর তাদের মধ্যে একজনের নাম দেখে তার শরীর অবশ হয়ে গেল।
রেহানা।
ইয়াসিনের মা।
তার স্বাক্ষর।
একাধিক নথিতে।
একাধিক লেনদেনে।
অর্থাৎ রেহানা শুধু জানতেন না।
তিনি জড়িতও ছিলেন।
মায়া ধীরে ধীরে ফাইল বন্ধ করল।
তার মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে।
এতদিন সে ভাবছিল রেহানা শুধু লোভী।
শুধু নিয়ন্ত্রণপ্রিয়।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বিষয়টা আরও গভীর।
অনেক গভীর।
কামরুল হক উঠে দাঁড়ালেন।
"আমি জানি না আপনি কী করবেন। কিন্তু কেউ একজনকে সত্যিটা প্রকাশ করতে হবে।"
লোকটি চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ মায়া নড়ল না।
তারপর ধীরে নিজের পেটের উপর হাত রাখল।
তার সন্তান।
তার ভবিষ্যৎ।
তার জীবন।
এই লড়াই এখন শুধু তার ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়।
এটা সত্যের লড়াই।
এটা এমন মানুষদের বিরুদ্ধে লড়াই, যারা বছরের পর বছর অন্যদের ব্যবহার করেছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে একটি নাম ভেসে উঠল।
ইয়াসিন।
মায়া কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কল রিসিভ করল।
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর ইয়াসিন বলল,
"তুমি যা খুঁজছ, তা খোঁজা বন্ধ করো।"
মায়ার চোখ সরু হয়ে গেল।
"তুমি ভয় পাচ্ছ?"
ওপাশে আবার নীরবতা।
তারপর ধীরে ধীরে ইয়াসিন বলল,
"তুমি জানো না তুমি কী নিয়ে খেলছ।"
মায়ার ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল।
"হয়তো।"
সে থামল।
তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
"কিন্তু আমি খুব শিগগিরই জেনে যাব।"
কল কেটে গেল।
আর সেই মুহূর্তে মায়া বুঝতে পারল
যুদ্ধ এখন সত্যিকার অর্থেই শুরু হয়েছে।

Post a Comment

0 Comments