আড়ালে_ভালোবাসি

আড়ালে_ভালোবাসি


নিজের শরীল কি সবাই কে দেখিয়ে বেরাতে ভালো লাগে নাকি তোর?
হঠ্যাৎ পিছন থেকে কারো কর্কশ গলায় এমন কথা শুনে, অবাক হয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি আরাফ ভাইয়া দুইহাত ভাজ করে ব্রু কুচকিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।আমি আরাফ ভাইয়ার এমন কথা শুনে নিজের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যাই। আমি প্লাজু আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই নিচে নেমে এসেছি। একটা ওড়নাও নেয়নি সাথে করে। লজ্জায় আমার জান বের হয়ে যায়। আমি আর কোনো কথা না বলে সোজা এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে আসলাম।রুমে এসে হাপাচ্ছি বুকে হাত দিয়ে। ইসসস কি লজ্জা কি লজ্জা। আমি এভাবে নিচে আরাফ ভাইয়ার সামনে ছিহ্। আরাফ ভাইয়া না জানি আমাকে কি ভাবলেন।উফফফ সত্যি আমার মাথা পুরাই গেছে দূর!
আসলে তখন স্নেহা আরাফকে গার্ডেনে দেখে অবাক হয়ে যায়।আরাফ দেশে আসবে সেটা সে জানতোনা। কারণ আরাফ প্রতি বছর এক বারই দেশে আসে তাও তখন যখন স্নেহার এক্সাম থাকে। সে বাড়িতে বেশি থাকতে পারেনা। কোচিং, এক্সট্রা ক্লাস সব করে একদম রাত হয় বাড়ি আসতে।আরাফের এই ব্যাপারটা স্নেহা একদম বুঝেনা কেনো সে অন্য সময় আসেনা।আরাফ গত দুইবছর হলো একজন প্রফেশনাল ডাক্তার হয়েছে।এই দুইবছর সে এক বারও আসেনি দেশে সেঝো চাচী অনেক মন খারাপ করতো তার জন্য।কিন্তু এখন হঠাৎ কি করে এলো আরাফ সেটাই ভাবছে স্নেহা।স্নেহা ভালো করে দেখার জন্য দৌড়ে গার্ডেনে যায় কিন্তু গিয়ে দেখে সেখানে আরাফ নেই।
স্নেহা চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলো।এর মধ্যেই পিছন থেকে আরাফ কথাটা বলে উঠলো।
উফফ এখন আমি আরাফ ভাইয়ের সামনে যেতেই পারবোনা লজ্জায়।স্নেহা এরকম আকাশ পাতাল ভাবছে এর মধ্য স্নেহার মা তার জন্য খাবার নিয়ে রুমে আসলো।তিনি স্নেহাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে বলেন,
মা:কিরে কি ভাবছিস এভাবে?
স্নেহা মায়ের কথায় ধ্যান ভাঙে।
স্নেহা:না মা কিছুনা।আচ্ছা মা শুনো,আরাফ ভাইয়াকে দেখলাম উনি কখন আসলেন?
মা: আরাফ তো কাল রাতে এসে বাংলাদেশে পৌছেছে। তোর মেঝো কাকা আর সেঝো কাকা গেছিলো ওকে আনতে। ওই তো এসে তোর ট্রিটমেন্ট করলো। নাহলে ওতো রাতে কই পেতাম ডাক্তার। আল্লাহর রহমত আল্লাহ ওকে পাঠিয়েছিলো।
স্নেহা: ওহ আচ্ছা।
মা: আচ্ছা এইনে তোর খাবার।খেয়ে মেডিসিন খেয়ে নে। আমার আবার ওদিকে অনেক কাজ পরে আছে। আকাশের বউয়ের বাড়ির লোকেরা আসছে। আকাশের আক্কেল একদম চলে গেছে,বিয়ে করেছে যেই মেয়েকে তার বাড়িতে এখনো জানাইনি।মেয়েটার বাড়ির লোকেরা যে চিন্তা করে সেটা কি ও বুঝে না।
মায়ের কথা শুনে গতকালকের সব ঘটনা মনে পরে গেলো। নিমিষেই মনের আকাশে আবার মেঘ জমাট বাধতে লাগলো।
স্নেহা: মিতুর বাড়ির লোকেরা কখন আসবে?
মা: এইতো কিছুক্ষনের মধ্যেই আসবে। আর শোন।তুই নিচে যাস না কেমন।এসব সহ্য করতে পারবিনা তুই।
স্নেহা:আমি এসব সহ্য করতে পারবোনা? নাকি আমাকে নিচে কেউ সহ্য করতে পারবেনা কোনটা মা?
আমার কথা শুনে মা চুপ হয়ে গেলো।তারপর আসতে করে রুম থেকে চলে গেলো।আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেলকনিতে গেলাম।এই বেলকনিতে বসেই অনেক হাজার শত মান অভিমান ভালোবাসার ঘর বেধেছিলাম আকাশের সাথে। আর আজ সেই আকাশ....
নাহ আমি কাঁদবোনা আকাশের জন্য।কেনো কাঁদবো ওই বেইমানের জন্য।যে আমাকে সবার সামনে চরিত্রহীনা বলে।যে আমাকে বিশ্বাস না করে ঐ ছবি গুলোকে বিশ্বাস করেছে। যে আমার ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে অন্য কাউকে নিজের আপন করে নিয়েছে।তার জন্য আমি কাঁদবোনা।আমি ঠিক নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবই।সেদিন আকাশ বুঝবে ও কি হারিয়েছে।না অভিশাপ না।আমি চাই ও ভালো থাক।কিন্তু ওর জানা দরকার কারো মনে আঘাত করে কেউ ভালো থাকতে পারেনা।
মিতু সেই সকাল থেকে রুমে বসে আছে।আর আকাশ এক মনে ল্যাবটপে কি জানি করছে।মিতু বারবার আড়চোখে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে।মিতু জানেনা এই ছেলেটার মাঝে কি যাদু আছে,যা তাকে ওর দিকেই টানে।তার সামনে থাকা এই মানুষটাকেই সে ভালোবাসে আর যেকোনো কিছুর বিমিময়ে সে তার কাছেই থাকবে।আর তার মন জয় করবেই।মিতু কাল রাতেই ভেবে নিয়েছে একবার যখন আল্লাহর কালিমা পরে তার স্ত্রী হয়েছে।সে ম'*রন ছাড়া আর কোনোদিন তার থেকে সে আলাদা হবেনা।সে আকাশের মনে তার জন্য জায়গা তৈরি করবেই।মিতু খুব টেনশনে আছে, কিছুক্ষন পর তার মা বাবা আর বড় ভাই আসবে। সে কিভাবে তাদের মুখামুখি হবে।কাল হুট করে সে বিয়ে করে নিলো। তাদের জানালো না। কাল সারারাত হয়তো তার জন্য চিন্তা করেছে।মিতুর বড় ভাই বেশ রাগি।যদি রাগের বসে কিছু করে বসে?মিতু এই নিয়ে খুব চিন্তিত।
আকাশ অনেক্ষন যাবত মিতুকে এভাবে চিন্তিত দেখে ল্যাবটপের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল..
আকাশ: এত চিন্তার কিছু নেই।তোমার ফ্যামিলিকে আমি সামলে নেবো। তুমি শুধু ঠিক ভাবে ওদের সামনে থেকো।
মিতু মাথা নিচু করে বলল... আচ্ছা।
এর মধ্য জঁবা আকাশের রুমে আসলো
জঁবা: আকাশ ভাইয়া মিতু ভাবিকে নিয়ে সেঝো মা তোমায় নিচে আসতে বলেছে। ভাবির বাবা মা আর ভাই এসেছে।
জঁবার কথা শুনে আকাশ মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল..
আকাশ: আচ্ছা তুই যা আমরা আসছি।
জবা চলে যাওয়ার পর আকাশ সোফা থেকে উঠে মিতুর কাছে এসে বলল..
"চলো। আর হ্যা যা বলতে বলেছি তা'ই বলবে!মনে থাকে যেনো।"
মিতু: জি।
ডাইনিং রুমে সোফায় বসে আছে মিতুর বাবা মা আর বড় ভাই মারুফ।
তাদের সামনে বসা সেঝো চাচা আর বড় চাচা।
মিতুর বাবা: আমি বুঝতে পারছিনা কাল পর্যন্ত যেই ছেলের অন্য একজনের সাথে এংগেজমেন্ট ছিলো। সে এভাবে হুট করে আমার মেয়েকে বিয়ে করলো কেনো?
মারুফ: আপনাদের বাড়ির ছেলের সাহস কি করে হয়, সে মাঝ রাস্তা থেকে আমার বোনকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। আপনারা জানেন আমরা মিতুর বিয়ে অন্য এক জায়গায় ঠিক করেছিলাম। সব কথা ফাইনাল হয়ে গেছিলো। শুধু আপনাদের ছেলের জন্য সব ভন্ডুল হয়ে গেলো। আমাদের পুরা পরিবারকে অপমানিত হতে হয়েছে।
কথা বলার মাঝেই আকাশ আর মিতু নিচে নেমে এলো,
মিতুকে দেখে ওর মা ওর কাছে এসে জড়িয়ে ধরলো। মিতুও মাকে পেয়ে জরিয়ে ধরে কেঁদে দিলো। আকাশ এসব দেখে মিতুকে ছেড়ে ওর বাবা ভাইয়ের কাছে গেলো।
আকাশ: আসসালামু আলাইকুম।ভালো আছেন আপনারা?
মারুফ: ওলাইকুমুস সালাম।ভালো কি তুমি আমাদের রেখেছো?কোন সাহসে তুমি আমার বোনকে জোর করে বিয়ে করে এ বাড়িতে নিয়ে এলে?
আকাশ: ভালোবাসার অধিকারে।আমি মিতুকে ভালোবাসি মিতু আমাকে ভালোবাসে।তাই বিয়ে করে নিয়েছি।
মারুফ: কিন্তু কাল তোমার একটা মেয়ের সাথে এংগেজমেন্ট ছিলো।আর আমার জানা মতে তার সাথে তোমার সম্পর্ক ছিলো।তাহলে তাকে ছেড়ে একদিনে কিভাবে আজকে আমার বোনকে ভালোবাসো বলছো?
আকাশ: দেখুন আমার ফ্যামিলি আমার সাথে আমার চাচাতো বোনের বিয়ে দিতে চেয়েছে।আমরা দুইজনেই বিয়েতে রাজি ছিলাম না। কারন আমি মিতুকে ভালোবাসি।আর স্নেহা অন্য একজনকে।আর রইলো সম্পর্ক,স্নেহার সাথে আমার শুধু ভাই বোনের সম্পর্ক। এর বাহিরে কিছুই নেই।
মারুফ এবার মিতুর কাছে এগিয়ে এসে বলল..
মারুফ: তুই কি সত্যি ওকে ভালোবাসিস?
মিতু এবার মায়ের থেকে সরে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল..
মিতু: হ্যা ভাইয়া আমি আকাশকে অনেক ভালোবাসি। আমি ওকে ছাড়া অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে মানতে পারবোনা।তোমরা আমার বিয়ে অন্য কোথাও দিয়ে দিচ্ছিলে। আর আমিও ভয়ে তোমাদের কিছু বলতে পারছিলাম না। তাই কাল আমরা বিয়ে করে ফেলেছি। যাই হোক আমি আকাশকে অন্য কারো হতে দিতে পারতাম না। তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস প্লিজ ভাইয়া।
মারুফ আর কিছুই বললনা।সে বুজতে পারছে তার বোন সত্যিই আকাশকে ভালোবাসে।
এরপর মিতুর পরিবার আর আকাশদের পরিবার মিলে আলোচনা করে ঠিক করলেন তারা ওদের আবার বিয়ে দেবে। এটা শুনে আকাশ অনেক ভড়কে যায়। যত যাই হোক।সে সারাজীবন মিতুকে নিজের স্ত্রী করে রাখবেনা। একসময় তাকে মুক্ত করে দেবেই সে। তাই আকাশ এখন নানা অজুহাত দেখিয়ে বিয়ে আটকে দিলো। তবে সবাই বলে দিয়েছে আকাশ নিজের পায়ে দাড়ালেই ওদের ধুমধাম করে বিয়ে দেবে।
এত্তক্ষণ উপরে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে আকাশের কথা গুলো শুনছিলাম। কতটা নিখুত ভাবে মিথ্যা বলতে পারে আকাশ,সেটাই দেখছি। এতোদিনের সম্পর্ক এক নিমিষেই মিথ্যা বানিয়ে দিলো। হাহ্! আর এই লোকটাকেই নাকি আমি ভালোবেসেছিলাম। নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা হচ্ছে।
আমি আর ওখানে না দাঁড়িয়ে রুমে চলে আসলাম।গিয়ে বেলকনিতে গিয়ে আবার দাঁড়ালাম।এটাই আমার একমাত্র জায়গা,যেখানে বসে কাঁদলেও কেউ দেখবেনা।চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পরেই যাচ্ছে। যত চাই আকাশকে ভুলতে আর'ও বেশি মনে পড়ে যায় ওকে।দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম।তখন পিছন থেকে কেউ বলে উঠে..
"কি কস্ট হচ্ছে খুব?"

Post a Comment

0 Comments