রাত ১২টা,,
আকাশ নিজের রুমের বেলকোনির ইজি চেয়ারে বসে সিগারেট টানছে।এই নিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট শেষ করলো সে।তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।এক মনে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে।সে আজকের ঘটনা গুলো মনে করে যাচ্ছে।যত যাই হোক,সে তো ভালোবেসেছিলো,কিন্তু স্নেহা তাকে এভাবে ঠকালো। সে এটা কল্পনাই করতে পারছেনা।সে রাগ জেদের বসে বলেছে সে মিতুকে ভালোবাসে।কিন্তু আসলে তো সে স্নেহার উপর রেগে মিতুকে বিয়ে করেছে।সে কোনোদিন স্নেহার জায়গা মিতুকে দিতে পারবেনা।আর মিতুকে নিজের স্ত্রী হিসেবেও মানতে পারবেনা।হয়তো শুধুই দায়িত্ব পালন করতে পারবে।আজ সকালেও আকাশ অনেক খুশি ছিলো।নিজের ভালোবাসা, নিজের স্নেহাকে নিজের করে পাবে সেই খুশিতে।আকাশ অনেক খুশি ছিলো। সে তার রুমে বসে স্নেহার ছবি দেখছিলো। এমন সময় ওর ফোনে একটা ম্যাসেজ আসে ম্যাসেজে লিখা থাকে,
"যাকে ভালোবেসে নিজের জীবনসঙ্গী করছেন, তার ব্যাপারে আগে পুরো জেনেনিন। নাহলে পরে জেনে হয়তো কস্ট পাবেন।"
আকাশ ম্যাসেজটা দেখে খুব অবাক হলো। আকাশ কোনো রিপ্লে দেবে তার আগেই আরো একটা ম্যাসেজ আসলো
"আমি জানি আপনি অবাক হচ্ছেন। অবাক হবেন না। আপনাদের বাড়ির পাসের পার্কে আজ বিকেলে আসবেন। ওখানে একটা ছেলে আপনাকে একটা পার্সেল দেবে। সেই পার্সেল খুলে নিজেই নাহয় দেখে নিবেন। যে আমি কি বলতে চাচ্ছি। আপনার আমাকে বিশ্বাস না হলে আপনি এসেই দেখে নিবেন।"
আকাশ ম্যাসেজর লোকটার কথা মানবে কিনা ভাবছে। পরক্ষণে ভাবে তার স্নেহা এমন কিছু করবেনা যাতে সে কস্ট পায়। সেটা আকাশ জানে। তাই আকাশ দেখতে চায় কে এই লোক যে আকাশ আর স্নেহার মাঝে দ্বন্দ লাগাতে চায়। তাই আকাশ বিকেলে ম্যাসেজে দেওয়া ঠিকানায় গেলো।কিছুক্ষন পরেই একটা ছেলে এসে আকাশের হাতে একটা পার্সেল দিয়ে চলে গেলো। আকাশ পার্সেল্টা খুলে দেখে একটা খাম। খামটা খুলে দেখে তার ভিতর কিছু ছবি। ছবি গুলো হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যায় আকাশ। স্নেহার সাথে একটা ছেলে,তারা দুজন একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে চুমু দিচ্ছে।তাদের গায়ে কাপড়টাও নেই। আকাশ এসব দেখে থমকে যায়। এর মাঝেই আকাশের ফোনে একটা কল আসলো,
আকাশ ফোন হাতে নিয়ে দেখে একটা unknown নাম্বার থেকে কল এসেছে। আকাশ কল রিসিভ করলে ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কন্ঠে কেউ বলে উঠে,
অপরিচিত: দেখলেন তো তাহলে,যাকে আপনি অনেক ভালোবাসেন সে কিভাবে আপনাকে ঠকালো। আমি জানি আপনি হয়তো এই ছবিগুলো বিশ্বাস করবেন না। তাই একটা ভিডিও দিচ্ছি, সেটা দেখলে বিশ্বাস করবেন।
আকাশ কল কে'*টে দেখে তার what'sapp এ একটা ভিডিও এসেছে। সেই নাম্বারটা থেকে। যেখানে দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ে আর একটা ছেলের আপত্তিকর মেলামেশা। যদিও মেয়েটার মুখ স্পস্ট না, কিন্তু ছেলেটার মুখ,ওই ছবির মুখটা একই। তাই আকাশ মেনে নিলো যে মেয়েটাও হয়তো স্নেহা'ই। আকাশ রাগে ফোনটা ছুড়ে মা'*র*লো। আর বেরিয়ে পরলো পার্ক থেকে উদ্দ্যেশ্য স্নেহার কাছে যাওয়ার,আর জবাব চাইবে,কেনো সে এমন করলো? পথেমধ্যে আকাশের সাথে দেখা হয় মিতুর।মিতু মেয়েটা স্নেহার ক্লাসমেট। তাছাড়া মিতুর বাড়িও আকাশদের বাড়ির এড়িয়াতেই। তাই প্রায় মিতুকে সে দেখে। স্নেহার ক্লাসমেট দেখে মাঝে মাঝে সে কথা বলতো। তবে সেটাও মিতু বললে সে বলতো। মিতুদের বাসা আকাশদের বাসার পাশাপাশি হওয়ায় মিতু রোজ আকাশকে দেখতো। দেখতে দেখতেই আকাশকে মিতুর ভালো লেগে যায়,যা একদম ভালোবাসার পরিণত হয়। কিন্তু মিতু তার মনের কথা আকাশকে বলার আগে একদিন কলেজে আকাশ আর স্নেহাকে একসাথে দেখে। পরে সে জানতে পারে আকাশ স্নেহাকে ভালোবাসে। এরপর থেকেই মিতুর স্নেহার প্রতি এক চাপা রাগ থাকে। সে স্নেহাকে সহ্য করতে পারতোনা।
মিতু আকাশকে এভাবে রাস্তায় দেখে অবাক হয়ে যায়। মিতু যতদূর জানে আজ আকাশ আর স্নেহার এংগেজমেন্ট। তাহলে আকাশ রাস্তায় কি করছে। এরপর মিতুর চোখ যায় আকাশের হাতের ছবি গুলার দিকে। আকাশের থেকে ছবি গুলা নিয়ে সে অবাক। আকাশ এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো মিতুকে দেখে। কারণ মিতু একদম আকাশের সামনে একটা দেয়ালের মতো দাঁড়ানো। তাকে পার করে সে যেতে পারছেনা। আকাশ যেতেই নেবে এর মধ্য মিতু ছবি গুলা ওর হাত থেকে নিয়ে নেয়। এবার আকাশের রাগ উঠে যায় আকাশ কিছু বলবে তার আগেই মিতু বলে,
মিতু: আকাশ ভাইয়া এটা স্নেহা আর ঐ ছেলেটাই তো। যাকে প্রায় স্নেহার সাথে দেখি আপনার অবর্তমানে।
আকাশ মিতুর কথা শুনে আরেকদফা অবাক হলো।
আকাশ: মানে?
মিতু এবার একটু জোর গলায় বললো...
মিতু: এই ছেলের সাথেও মনে হয় স্নেহার সম্পর্ক ছিলো আপনি থাকা অবস্থায়। তাই তো এত মেলামেশা করতো। আমি তো ভাবতাম হয়তো ওর বন্ধু। কিন্তু এই ছবিগুলো দেখে তো আমার সন্দেহ একদম সত্যি মনে হচ্ছে
মিতু ইচ্ছা করেই এই মিথ্যা কথা গুলা বলছে। আসলে সে জানেই না এই ছেলে কে বা এর সাথে স্নেহার কি রিলেশন। সে শুধু ছবি গুলা দেখেই একটা ফন্দি আটলো আকাশকে স্নেহার থেকে দূর করার আর তাকে নিজের করে নেওয়ার।
আকাশের রাগে গা থরথর করে কাপছে। আকাশ নিজেক কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মিতুর হাত ধরে নিয়ে গেলো কাজি অফিসে। সেখানেই তারা বিয়ে করে নিলো। মিতু খুব খুশি। আজ সে তার ভালোবাসাকে নিজের করে পেয়েছে। কিন্তু সে যে মিথ্যা বলেছে, তা যদি আকাশ কোনোদিন জানে তবে সেদিন কি হতে পারে তা তার জানা নেই।
এভাবেই মিতুর বিয়ে হয় আকাশের সাথে। তারপর আকাশ মিতুকে নিয়ে চলে যায় ওদের বাড়ি।
আকাশ এগুলো বেলকনিতে বসে ভাবছিলো। হঠাৎ ওর কাধে কারো হাতের স্পর্শ পায়। আকাশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখে মিতু দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ ঝাঝালো কন্ঠে বলে,
আকাশ: কি চাই? কিসের জন্য এখানে এসেছো?
মিতু ভয়ে ভয়ে বলে: আপনি ঘরে আসছিলেন না দেখে দেখতে এলাম আপনাকে।
আকাশের মিতুর এসব আদিক্ষ্যেতা সহ্য হচ্ছিলনা। তাই আকাশ মিতুর হাত নিজের কাধ থেকে সড়িয়ে শান্ত গলায় বলল
আকাশ: দেখো মিতু আমি তোমাকে ভালোবেসে বিয়ে করিনি। ইভেন কোনোদিন বাসতেও পারবোনা। আমি বিয়েটা শুধু স্নেহার প্রতি রাগ ক্ষোভে করেছি। স্নেহা যা'ই করুক,আমি তো স্নেহাকে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু ও আমায় ঠকালো।সুতরাং নিজেকে আমার স্ত্রী ভাবা বন্ধ করো। আমরা স্বামী স্ত্রী শুধুই এই বাড়ির লোক আর সমাজের লোকের চোখে। তাদের সামনে আমরা হ্যাপি কাপলের অভিনয় করবো। কিন্তু এই চার দেওয়ালের মাঝে তোমার আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই আমার কাছে কোনো অধিকার আশা করোনা। তোমার সব দায়িত্ব আমি পালন করবো।আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমায় ডি'*ভো*'র্স দিয়ে দেবো। তারপর আমি চলে যাবো ইতালি।
আকাশ কথাগুলো বলে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে। যাওয়ার আগে দেখলোনা একজোড়া অশ্রুভেজা চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। মিতু মাটিতে বসে কেঁদে যাচ্ছে আর ভাবছে সে কি আকাশের ভালোবাসা কোনোদিন পাবে না?তাকে পাওয়ার জন্য কত বড় মিথ্যা সে স্নেহার বিরুদ্ধে বলল। আর সেই আকাশ তাকে আজ প্রত্যাখ্যান করছে।
__________
ভোরের দিকে হালকা হালকা করে চোখ মেলে তাকালো। স্নেহা চোখ খুলেই দেখে তার মাথার কাছেই তার মামনি বসে বসে ঘুমাচ্ছে। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখে বাবাই নামাজ পড়ছে। স্নেহা নিজের মাথায় হাত দিয়ে দেখে মাথায় জল পট্টি দেওয়া। স্নেহা বুঝতে পারছেনা,সে তো ওয়াশরুমে ছিলো তাহলে এখানে আসলো কেমন করে।স্নেহাকে লড়তে দেখে ওর মায়ের ঘুম ভেঙে গেলো। সে তাড়াতাড়ি করে উঠে স্নেহার মাথায় হাত দিয়ে দেখলেন জ্বর কমে গেছে। তিনি তার স্বামীকে ডাকলেন,,,
মা: স্নেহার বাবা দেখেন,স্নেহার জ্বর কমেছে। স্নেহা চোখ খুলেছে।
নামাজে মোনাজাত করা অবস্থায় কথাটা শুনেই মোনাজাত শেষ করেই স্নেহার পাশে বসলেন তিনি।অভিমান কন্ঠে বললেন,
বাবা: মামনি কেনো এভাবে নিজেকে কস্ট দিচ্ছো বলো তো। তুমি কি জানো কাল সারারাত তুমি জ্বরে অজ্ঞান হয়ে ছিলে। তোমার মা আমি কতটা অস্থির হয়েছিলাম। গোসলে গিয়ে কেউ এভাবে বসে থাকে পানির নিচে। আজ যদি কিছু একটা হয়ে যেতো তোমার তাহলে আমরা কিভাবে থাকতাম বলো তো?
বাবার কথা শুনে স্নেহা বুজতে পারলো সে কাল রাতে ঝর্ণার নিচেই অজ্ঞান হয়ে গেছিলো। স্নেহা খুব আস্তে করে বল্লো,
স্নেহা: সরি বাবাই সরি মা এমন আর হবেনা প্রমিস।
স্নেহার মা মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বলেন,
মা: এখন ভালো লাগছে মা তোর শরীলটা? কাল থেকে কিছু খাসনি তুই,এখন কিছু খেয়ে নে। তারপর ঔষধ খেতে হবে।
স্নেহার মা স্নেহার জন্য খাবার আনতে চলে যান। একটু পর খাবার এনে স্নেহাকে দুজনে ধরে বসিয়ে খাবার অল্প করে খাইয়ে মেডিসিন খাইয়ে দেয়।স্নেহার শরীল ক্লান্ত থাকায় ও আবার ঘুমিয়ে যায়।
সকাল ৯টা
স্নেহার ঘুম ভাঙে রোদের আলো ওর চোখে পড়ায়। স্নেহা আড়মোড়া দিয়ে উঠে বসে। আস্তে করে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। চারিপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে হঠাৎ চোখ যায় গার্ডেনে একজনের দিকে। তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় স্নেহা। মুখ থেকে আপনাআপনি বেড়িয়ে আসে "আরাফ ভাইয়া"।

0 Comments