আড়ালে_ভালোবাসি

 

আড়ালে_ভালোবাসি

🥀🥀নিজের চোখের সামনের নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে অন্য একটা মেয়ের সাথে সদ্য বিয়ে করা অবস্থায় দেখছি। হ্যা, আকাশ তার সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী মিতুকে নিয়ে আমার সামনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।আর আমি পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে ওকে দেখছি।আমি যেনো কিছুর বলার কথাই ভুলে গেছি। আমি শুধু আমার সামনের দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখছি যে গতকাল'ও আমায় জরিয়ে ধরে বলেছিলো, "দুনিয়ার কেউ পারবেনা আকাশকে তার স্নেহার থেকে আলাদা করতে,এই আকাশ শুধু তার স্নেহার আর কারো নয়। আজ সেই মানুষটাই এক রাতের ব্যবধানে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।আমি কিছু বলবো তার আগেই আমার বড় চাচা চেঁচিয়ে বলে উঠলেন,
বড় চাচা: এসব কি আকাশ।তুমি এসব কি শুরু করেছো?আজ তোমার এংগেজমেন্ট স্নেহার সাথে, আর আজ তুমি অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে বাড়িতে এসেছো।এসব কি নাটক শুরু করেছো তুমি?
আকাশ এবার মাথা তুলে বড় চাচার দিকে তাকিয়ে খুব নরম সরে বললো,
আকাশ: আমি কোনো নাটক করছিনা বড় বাবা।আমি মিতুকে ভালোবাসি।তাই মিতুকে বিয়ে করেছি।আমি স্মেহাকে ভালোবাসিনা তাই ওকে বিয়ে করতে পারবোনা,বলেই আমি আমার ভালোবাসা আমার মিতুকে বিয়ে করেছি।
আকাশের কথা শুনে সবাই অবাক।আর তার থেকে বেশি অবাক হয়েছি আমি,এটা শুনে যে আকাশ আমাকে ভালোবাসেনা।সে মিতুকে ভালোবাসে।তাহলে এই চার বছর সব কি ছিলো নাটক।সব মিথ্যা অভিনয় ছিলো?
আকাশের মা আকাশের দিকে তেড়ে গিয়ে ওর গালে পর পর দুইটা থা'*প্পর মা*'র*লো,আর নানা অকথ্য ভাষায় গা*'লাগাল দিতে থাকলেন। এক পর্যায় আকাশ চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,
আকাশ: মা তুমি আমাকে কোন মেয়ের জন্য মা'*রছো। যেই মেয়ে জন্মের পর নিজের মাকে খেয়েছে।যেই মেয়েকে তার নিজের বাপ পরিচয় পর্যন্ত দেয়না।এমন একটা মেয়ের জন্য তুমি আমাকে মা'*র*ছো।হেহ!মা তুমি জানোনা যে এই মেয়ে কতটা চ*রি'*ত্রহীন।এই মেয়ে ছেলেদের সাথে শুধু ঢলাঢলি করে। জানিনা কত ছেলের সাথে ওর সাথে সম্পর্ক আছে। ছিহ্।
আকাশের কথা গুলা শুনে এবার আমার ধৈর্যের বাদ ভেঙে যায়।আমি এবার আকাশের একদম সামনে দাঁড়িয়ে,ওর জামার কলার ধরে অর গালে কষে এক থা'*প্পর মা'*র*লাম।আর চিৎকার দিয়ে বললাম,
স্মেহা: এনাফ ইজ এনাফ। অনেক্ষণ ধরে সয্য করেছি। কিন্তু আর না। তুমি কোন সাহসে কিসের ভিত্তিতে আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলছো।তুমি আমাকে বলছো চরিত্রহীন।তাহলে তুমি নিজে কি?কাল পর্যন্ত তুমি আমাকে বলতে তুমি আমাকে ভালোবাসো।আর আজ? আজকে তুমি বলছো তুমি মিতুকে ভালোবাসো।তাহলে এতদিন সব কি ছিলো,অভিনয়,নাটক ছিলো সব?উত্তর দেও?
আমি আকাশের কলার ধরে ঝাকাচ্ছি আর কথাগুলো বলছি।এক পর্যায়ে আকাশ আমাকে ধা'*ক্কা মে'*রে সরিয়ে দিলো।আর এত জোরেই ধা'*ক্কা দিলো যে আমি ছিটকে মাটিতে পড়ে যাই। আকাশ এবার আমার মুখের উপর কতগুলো ছবি ছু'*ড়ে মা'*র*লো।আর বলতে লাগলো,
আকাশ: তোর সাহস হয় কি করে আমার গালে থা'*প্পর মা'*রার।তুই যে চরিত্রহী'না তার যথেস্ট প্রমাণ আছে বলেই তোকে চরিত্রহীনা বলেছি।আমার আগেই বুঝা উচিত ছিলো যার নিজের বাপ তাকে পরিচয় দেয়না সেই মেয়ে কতটা ভালো হবে।আর তোমরা যেই মেয়ের জন্য আমার সাথে চিল্লাচ্ছো,এই ছবি গুলা দেখে নেও তাহলে বুজবে কার জন্য আমার সাথে চিল্লাচ্ছো।
আমি আকাশের কথা শুনে ছবিগুলো হাতে নিলাম। ছবিগুলো হাতে নিয়ে আমার মাথা পুরা ঘুরে গেলো। আমার সাথে একটা ছেলের খুব বাজে কিছু ছবি।কিন্তু এই ছেলেটা কে আমি জানিনা।আর এই সব ছবিও আমি কোনোদিন তুলিনি।আর না এই ছেলের সাথে আমার ভুলেও দেখা হয়েছে।
মেঝ চাচী আমার হাত থেকে ছবিগুলা নিয়ে দেখে বলতে লাগলো...
মেঝ চাচী :ছিহ্ ছিহ্ দেখছো তোমরা।তোমরা শুধু শুধু আকাশকে ব'*কা দিচ্ছো।এই মেয়েই তো ভালোনা। কিভাবে একটা ছেলের সাথে ছিহ্।দেখেন ভাইজান দেখেন যেই মেয়েকে আপনারা সব ভাই মাথায় তুলে রাখতেন।আজ সেই মেয়ে আপনাদের মান সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
কাকির কথা শুনে সবাই ছবিগুলা হাতে নিয়ে দেখে অবাক।বড় বাবা ঠাস করে সোফায় বসে পড়লেন।বড় মা তাকে গিয়ে সামলালেন।মেঝো কাকাও হতাশ চোখে তাকালেন আমার দিকে।সেঝো কাকা ঠায় হয়ে আছেন।আর আমি একদম চুপ করে বসে আছি।হঠাৎ গালে একটা থা'*প্পর পরলো।আমি তাকিয়ে দেখি আকাশ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমার দুই গাল জোরে চিপে ধরে বললো...
আকাশ: আমাকে থা'*প্পর দিয়েছিলি না।নে ফেরত দিয়ে গেলাম তোর থা'*প্পর তোকেই। আর কোনোদিন যেনো তোকে আমার সামনে না দেখি।
আমি পাল্টা কোনো আর জবাব দেবো তার আগেই দেখলাম আমার চোখের সামনে সব ঝাপসা।এরপর আর কিচ্ছু মনে নেই।
আমি রুবাইদা ইসলাম স্নেহা।এস এস সি শেষ করে সদ্য কলেজে উঠেছি।আমার নিজের বলতে আমার চাচারা আর ফুপিরা ছাড়া কেউ নেই।আমার মা আমার জন্মের সময় মা'*রা যান।শুনেছি অতিরিক্ত র'*ক্তক্ষরনের কারনে মায়ের মৃ'*ত্যু হয়।আমার বাবা আমার মাকে খুব ভালোবাসতেন।প্রেমের বিয়ে ছিলো তাদের।মা যখন কন্সিভ করে তখন থেকেই অনেক কমপ্লিকেশন দেখে দিয়েছিলো মায়ের প্রেগ্নেন্সিতে।বাবা বলেছিলো তার এখন বেবির দরকার নেই কিন্তু মায়ের আমাকে চাই,তাই মা বাবার কথা শুনেনি।যখম ডেলিভারির পর বাবা জানতে পারলো মা মা'*রা গেছে সেদিন আমার মুখ একটাবার দেখার বদলেই আমাকে অপয়া বলে দূরে করে দিলেন!আমার সব দায়িত্ব ফেলে তিনি চলে গেলেন সিডনিতে (অষ্ট্রেলিয়া)।তখন আমি দুধের শিশু!কে আমায় দেখবে এইসব চিন্তা করে আমার বড় চাচা আমায় তার মেয়ে করে নিলেন।নিজের মেয়ের পরিচয় দিলেন আমায়।আমার বাবারা চার ভাই এক বোন।আমার বাবা সবার ছোট,বড় চাচা জাফর হাসান,মেঝ চাচা,ইমরান হাসান,সেঝ চাচা,মোতালেভ হাসান,আর আমার বাবা ইকবাল হাসান।আর তাদের আদরের ছোট বোন নাজমা হাসান।আমার বড় চাচার ঘরে দুই মেয়ে,মেঝ চাচার ঘরে এক মেয়ে এক ছেলে,সেঝ চাচার ঘরে দুই ছেলে,আর আমার বাবার ঘরে আমি।যেহেতু বাবা আমাকে নিতে নারাজ তাই বড় চাচাই আমাকে আপন করে নিলেন।তিনি আর চাচী আমায় বড় করলেন।আমিও তাদের বড় বাবা বড় মা ডাকি তাছাড়া আমার অন্য ভাই বোনরাও তাদের এটাই ডাকে।এত কিছুর পরেও আমি কোনোদিন বাবার আদর পাইনি।বাবাকে একবার সামনাসামনি দেখিনি। দেখবো কি করে,বাবা তো আসেইনি আর বাংলাদেশে।
এভাবেই আমি বড় হতে থাকলাম।আমার বড় বাবার দুই মেয়ে রিতু,নিতু আমাকে খুব ভালোবাসে কোনোদিন মনেই করেনি আমি তাদের এক মায়ের পেটের বোন নই।আমি আর নিতু পিঠাপিঠি,রিতু আপু আমাদের বড় এবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে।আমার মেঝ কাকার মেয়ে জুঁই আর ছেলে জুনায়েদ তারা আমার বড়,সেঝ কাকার দুই ছেলে আকাশ আর আরাফ ভাইয়া।
আকাশ এবার ভার্সিটিতে উঠেছে।আমার সাথে আকাশের রিলেশন পুরাপুরি হয় আমি যখন ক্লাস টেনে উঠি।এর আগে আকাশ আমার মাঝে অতটাও মেলামেশা হতনা।আরাফ ভাইয়া দেশের বাহিরে কানাডাতে থাকেন।বছরে একবার দেশে আসেন।কানাডাতে তিনি তার স্টাডি শেষ করেছেন,তিনি একজন প্রফেসনাল ডাক্তার।
আমার আর আকাশের কথা আকাশ নিজেই বাড়িতে জানায়।বাড়ির সবাইও তাতে সায় দেয়।তারাও চায়নি বাড়ির মেয়ে বাহিরে যাক।তাই বড় বাবা রাজি হয়ে যান।সেঝ বাবাও রাজি থাকেন।আকাশের ইচ্ছেতেই আজ আমাদের এংগেজমেন্ট রাখা হয়েছিলো।আজ সকাল পর্যন্ত সব ভালো ছিলো কিন্তু হঠাৎ করেই সব এলোমেলো হয়ে গেলো।আকাশ যাকে বিয়ে করেছে মিতু সে আমার ক্লাসেই পড়ে।খুব বেশি একটা পছন্দ করতোনা মিতু আমায়।কেনো তা আমার জানা ছিলোনা,কিন্তু আজ এই মিতুই আমার ভালোবাসার মানুষটার স্ত্রী ভাবতেই অবাক লাগছে।
মাথায় কারো শীতল স্পর্শে ক্লান্ত চোখ দুটো মেলে তাকালাম,দেখলাম বড় বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।আমিও আবেশে চোখ বন্ধ করে নিলাম।বাবা মায়ের স্পর্শে এক আলাদা ভালোলাগা আছে যা সন্তানের হাজার মন খারাপের ঔষধ হতে পারে।আমি চোখ বন্ধ রেখেই বললাম,
"বাবাই রাগ করে আছো আমার উপর?সবার মতো তুমিও কি মেনে নিলে অই ছবিগুলা সত্যি?"
কথাটা বলতে গিয়ে চোখ থেকে গড়িয়ে পানি পরে গেলো।বাবাই খুব যত্নে পানি মুছে দিয়ে কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো,
বাবাই: আমি জানি আমার মেয়ে কোনোদিন কোনো খারাপ কাজ করতেই পারেনা।আমার মা টাতো একদম লক্ষী মেয়ে।আর কোনো ছেলে কি পারে তার মায়ের উপর রাগ করে থাকতে।
বাবাইয়ের কথা গুলো শুনে কান্নার মাঝেও মুখে হাসি ফুটে উঠলো।এই দুনিয়ায় বাবাই মা'ই (বড় চাচা/চাচী) আছে আমাকে এত ভালোবাসে।আমি বাবাইয়ের হাত ধরে কেদেঁ দিয়ে বললাম,
বিশ্বাস করো বাবাই আমি এমন কিছু করিনি।আমি ঐ ছবির ছেলেটাকে চিনিওনা পর্যন্ত।তাহলে তার সাথে আমি কিভাবে ওসব।
বলেই আবার কান্নায় ভে'*ঙে পড়লাম।
বাবাই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর আমাকে শান্ত করছে।
বাবাই: শান্ত হ মা এভাবে কাদিস না।বাবাই মা আছি তো তোর পাশে।আমরা ঠিক সত্যটা বের করে আনবো।এখন তুই উঠে কিছু একটু খেয়ে নে মা।সেই বিকালে জ্ঞান হারিয়েছিস এখন জ্ঞান ফিরলো তোর।আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।নে মা ওঠ।
বাবাইয়ের কথায় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত নয়টা বাজে।এতক্ষণ জ্ঞান হারিয়েছিলাম আমি।এবার নিজের দিকে তাকালাম বিকালের সেই জামাটাই গায়ে।আমি বাবাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
"না বাবাই।আমি এখন খাবোনা।আগে আমি ফ্রেশ হবো তুমি মাম্মাকে বলো খাবার পরে দিতে"
বাবাই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে রুম থেকে চলে গেলো।আমি আস্তে করে উঠে বসলাম।
রুমে একবার চোখ বুলালাম।কাল রাতেও এই রুমে বসে আকাশের সাথে কলে কত স্বপ্ন বুনছিলাম। আজ সেই আকাশ অন্য কারো বুকে শুয়ে অন্য কারো সাথে সপ্ন বুনছে।
আমি আস্তে করে বিছানা থেকে নেমে আলমারির কাছে গেলাম। সেখান থেকে একটা সুতির জামা নিয়ে ওয়াসরুমে গেলাম।ঝর্নার পানির সাথে চোখের পানিও বাধ মানছেনা।বার বার শুধু আজকের ঘটনা গুলো মনে পরছে। আমি দেয়াল ঘেষে বসে পরলাম। শরীলের ভার আবার যেনো ছেড়ে গেলো।আমি আবার ও তলিয়ে যাচ্ছি হয়ত আবার আমি জ্ঞান হারাচ্ছি,,,।

Post a Comment

0 Comments