বাড়ির প্রতিটি তলার ঝাড়বাতিগুলো এখন নি'স্তেজ হয়ে এসেছে। কোলাহলপূর্ণ ড্রয়িংরুমটা এখন নিঝুম, কেবল ঘড়ির কাঁটার নিরবচ্ছিন্ন শব্দই জানান দিচ্ছে সময় থমকে নেই। নাভিয়ান আর তুহিন তাদের কফি শেষ করে সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল। সারাদিনের ধকল, মেহমান সামলানো আর মানসিক টানাপোড়েনের পর শরীর যেন এখন আর সায় দিচ্ছে না। নাভিয়ান আড়মোড়া ভে ঙে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। তার চোখেমুখে গাম্ভীর্য থাকলেও ঠোঁটের কোণে বিনিতার দেওয়া কফির সেই অদ্ভুত তৃপ্তিটা লেগে ছিল। ওদিকে বিনিতা এখন নিজের ঘরে ব'ন্দি। মুখে যাই বলুক না কেন। সে ঠিকই রুমে এসে পড়তে বসেছে। তার নাভিয়ান ভাই এর সেই ক'ড়া শাস'নের বাণী— 'আড্ডা শেষ হলে সোজা পড়তে যাবি!'—এখন তার মাথার ওপর খড়গের মতো ঝুলছে।
বাইরের প্রকৃতিতে তখন এক অন্যরকম ব্যাকুলতা। বৈশাখের আসন্ন আগমনের বার্তা নিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে ঝোড়ো হাওয়া বইছে। জানালার কাঁচগুলো বাতাসের ঝাপটায় মাঝে মাঝে কেঁ'পে উঠছে। আকাশে মেঘ আর চাঁদের লুকোচুরি খেলা চলছে। এক এক বার মেঘের আড়াল থেকে যখন রুপালি চাঁদ উঁকি দিচ্ছে, তখন চারপাশ এক অপার্থিব স্নিগ্ধতায় ভরে উঠছে। গাছের পাতাগুলো বাতাসের তালে তালে ম'রণ-পণ নাচে মত্ত। এমন মায়াবী রাতে কার মন চায় চার দেয়ালের মাঝে পাঠ্যবইয়ের নিরস পাতায় চোখ বুলিয়ে রাখতে?
বিনিতা পড়ার টেবিলে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু বইয়ের অক্ষরগুলো যেন আজ তার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে। সে বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছে অবিরত, কিন্তু মস্তিষ্ক কোনো তথ্য গ্রহণ করতে রাজি নয়। তার চোখের সামনে কেবল ভেসে উঠছে বিকেলে নাভিয়ান ভাইয়ের সেই পাগলামি মাখানো স্পর্শ। পরম যত্নে চুলগুলো এলোমেলো করে দেওয়া, আর ওই গভীর মায়াবী চাহনি—সবটা মনে পড়তেই সপ্তদশীর ফর্সা গাল দুটোতে ল'জ্জার লাল আভা ফুটে উঠল। বিনিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল— ‘ইশশ! লোকটা কেন যে এমন! একদিকে শা'সন করে হাড় কাঁ'পিয়ে দেয়, আবার অন্যদিকে এমন আদুরে চাহনিতে মনটা কেড়ে নেয়। এই প্রণয় পুরুষের আধো-আধো ছোঁয়া যে তাকে বড্ড টানে! ইচ্ছে করে সারাজীবন ওই বলিষ্ঠ বুকের প্রশস্ত আঙিনায় একটু শান্তির আশ্রয় খুঁজে নিতে। সেখানে আজীবন লুকিয়ে থেকে তাকে জাপ্টে ধরে থাকতে।’
ঠিক সেই মুহূর্তে রিমিতা পা টিপে টিপে বিনিতার ঘরের দরজায় এসে উঁকি দিল। দেখল বিনিতা টেবিলে মাথা নিচু করে বসে আছে। রিমিতার পিত্তি জ্ব'লে গেল। সে ভাবল বিনিতা বুঝি এখনো মনোযোগ দিয়ে পড়ছে, যা তার মোটেও পছন্দ হলো না। বি'রক্তিতে সে এক প্রকার অবজ্ঞা মিশ্রিত 'চ' বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে ভেতরে ঢুকল। বিনিতা কারও উপস্থিতি টের পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। দেখল রিমিতা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিনিতা এক ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল,
বিনীতা অভিমানি স্বরে,
— “কী, কী চাই?”
রিমিতা ঠোঁট উল্টে করুণ সুরে বলল,
— “সবাই তোমার জন্য ছাদে অপেক্ষা করছে বিনুপু! তোমাকে ছাড়া আড্ডাটা একদম জমছে না। রাইসা আপু বারবার পাঠাচ্ছে আমাকে, তোমার পড়া কতদূর হলো দেখতে। তারপর নাকি রাতে আবার বারবিকিউ পার্টিও হবে। তোমাকে ছাড়া ভালোই লাগছে না! ”
বিনিতার মনটা বি'ষণ্ণতায় ভরে উঠল। সে কি আর ইচ্ছে করে এখানে বসে আছে? তারও তো মন চায় ওই উদ্দাম হাওয়ার মাঝে ছাদে বসে আড্ডা দিতে, গান গাইতে। বেশি খারাপ লাগছে সবাই তাকে ছাড়া বারবিকিউ পার্টি করবে শুনে। সে তো জানে সবাই একসাথে হলে কত মজা হয়। সে মুখ ভার করে বসে রইল।
— “যা, তোরাই মজা কর। আমি যেতে পারব না। জা'দরেল লোকটা একবার না বলে দিয়েছে মানে না!”
রিমিতা বুঝতে পারল তার বিনুপু অভিমান করেছে। তৎক্ষণাৎ ওর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। চট করে বিনীতার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। ফিসফিস করে বিনিতার কাছে গিয়ে বলল,
— “সব পড়া শেষ না?”
বিনিতা মাথা নেড়ে সায় দিল,
— “হু।”
— “তাহলে শোনো, নাভিয়ান ভাইয়ার কাছে গিয়ে ভ্যা ভ্যা করে কেঁ'দে ফেলো। তাহলে রাজি হয়ে যাবে দেখো।”
বিনিতা চোখ ছোট করে রিমিতার দিকে তাকাল। রা'গী স্বরে বলল,
— “কী বললি? কক্ষনো না! আমি ওনার কাছে ওসব বলতে পারব না। দেখলি না তখন সবার সামনে কীভাবে বিয়ে নিয়ে কথা শুনিয়ে দিল? "
এবার চোখ ছোট করে রিমিতার দিকে তাকিয়ে,
"তুইও তো তখন খুব মজা নিচ্ছিলি!”
রিমিতা ধরা পড়ে গিয়ে শুকনো ঢোক গিলল।
— “আরে... আরে না না, কই মজা নিলাম!”
— “থাক হয়েছে। সব কটা এক!” বিনিতার কণ্ঠে এবার কা'ন্নার সুর।
রিমিতা অভিজ্ঞের মতো কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— “আচ্ছা দাঁড়াও, দেখি কী করা যায়।”
বলেই সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বিনিতা উদাস মনে কনুইয়ে ভর দিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে রইল। বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ তাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছে। মনে মনে নাভিয়ানকে শাপশাপান্ত করতে লাগল সে— ‘একদম পচা একটা লোক! সব সময় শুধু শা'সন করা চাই! মনে হয় যেন একদিন মিস করলে ওনার ভাত হজম হয় না।’
ওদিকে রিমিতা পা টিপে টিপে তুহিনের ঘরের সামনে গেল। দেখল তুহিন বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ফোনে মগ্ন। রিমিতা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
— “আসব ভাইয়া?”
তুহিন ফোন থেকে মুখ সরিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
— “আয়।”
রিমিতা তুহিনের পাশে বসে এমন একটা মুখভঙ্গি করল যেন দুনিয়ার সব দুঃখ তার কাঁধে ভর করেছে। তুহিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে পুনরায় ফোনের দিকে মন দিল। রিমিতার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তুহিন আবার তাকাল।
— “কিরে, কিছু বলবি?”
— “হু।”
— “কী বল? মন খারাপ? কিছু চাই?”
রিমিতা আরও জোরালোভাবে বলল,
— “হুউউ।”
তুহিন এবার ভ্রু কুঁচকাল। সে জানে বিনিতা আর রিমিতার এই নাটুকেপনা বাড়ির সবার চেনা। আর তুহিন নিজেও তো এই দলেরই একজন দক্ষ খেলোয়াড়! সে সরাসরি বলল,
— “আমার সামনে নাটক করার দরকার নেই। কী চাই বলে ফেল। নইলে ভাগ!”
রিমিতা ধরা পড়ে গিয়ে দাঁত বের করে বোকা হাসি দিল। তারপর একটু আবেগ মিশিয়ে বলল,
— “হয়েছে কী... বিনুপুর মন খুব খা'রাপ। সবাই ছাদে আড্ডা দিচ্ছে, আপনারাও তো যাবে একটু পর। তাহলে আমার বিনুপুটা কী দোষ করল? ও তো এমনিতে খুব ভালো স্টুডেন্ট, দেখবেন ঠিক এ+ পাবেই!”
তুহিন নির্বিকার গলায় বলল,
— “আমি কী করব?”
— “ভাইয়াআআআ! ও ভাইয়া, একটু নাভিয়ান ভাইয়াকে বলুন না বিনু আপুকে যেতে দিতে। আপনি বললে উনি ঠিক শুনবেন, আমি জানি।”
তুহিন আঁতকে ওঠার ভান করে বলল,
— “ও বাবা! না না ভাই, আমি নেই এর মধ্যে। আমি পারব না নাভিয়ান ভাইয়ের মুখের ওপর ওসব বলতে!”
রিমিতার মুখটা মুহূর্তেই অ'ন্ধকার হয়ে গেল। তুহিন সেটা দেখে বলল,
— “তোর ইচ্ছা থাকলে তুই গিয়ে বল। বড়জোর একটা বকা খাবি। আমি বললে তো হয়তো জ্যা'ন্ত পুঁ'তে ফেলবে!”
— “তাহলে একসাথেই যাই? মা রতে আসলে দৌড়ে পালাব?”
তুহিন কিছুক্ষণ ভাবল। আসলে বিনিতার জন্য তার নিজেরও খারাপ লাগছিল। সে রাজি হয়ে গেল। তারা দুজনে মিলে নাভিয়ানের রুমের দিকে এগোলো। দরজা খোলাই ছিল। তারা চোরের মতো উঁকি দিয়ে দেখল রুম খালি। ভেতরে ঢুকে দেখল ওয়াশরুমও বাইরে থেকে লাগানো। ব্যালকনিতেও কেউ নেই। তুহিন আর রিমিতা একে অপরের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো। কিছু একটা ভেবে ওরা রুম থেকে বেরিয়ে গেল ।
বিনিতা পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরে দরজা খুলে কেউ একজন প্রবেশ করল । কিন্তু বিনীতার সেদিকে কোন হুশ নেই। সে আপন চিন্তায় মগ্ন। নাভিয়ান ধিরু পায়ে তার বিনুর পাশে এসে দাঁড়ালো।বিনীতার এবারও কোন হেলদোল নেই। সে যেন এই জগৎ সংসারের সবকিছু ভুলে বসে আছে, নিজের এক আপন জগতে। যখন গভীর গম্ভীর এক জোড়া কন্ঠস্বর কানে এল, তখন তার হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
— “চল।”
পরিচিত কন্ঠে কানে আসতেই,বিনিতা চমকে উঠে তড়িৎবেগে তাকাল। তার নাভিয়ান ভাই দাঁড়িয়ে আছে! বিনিতা দ্রুত সোজা হয়ে বসে কাঁ'পাকাঁ'পা স্বরে শুধাল,
— “কোথায়?”
নাভিয়ান ভাবলেসহীন ভাবে ,
— “জা'হান্নামে! যাবি?”
বিনিতা কপাল কুঁচকাল। মনে মনে বলল, ‘এই লোকের মুখে কি কখনো ভালো কথা আসবে না? তবে আপনি বললে এই বিনু সত্যি সত্যিই আপনার সাথে ওখানেও যেতে রাজি।’ কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করল না।
নাভিয়ান আবার তাগাদা দিল,
— “যাবি কি না বল?”
— “হু।”
নাভিয়ান আড়চোখে বিনিতার দিকে একবার তাকাল। দেখল মেয়েটার চোখেমুখে বি'স্ময় আর কৌতূহল খেলে যাচ্ছে। আবার গোপনে মুখ ভেংচিও কা'টছে। এটা দেখে নাভিয়ান আড়ালে একটু মুচকি হাসল। তার বিনুর এই অবুঝ রূপটা সে ভীষণ উপভোগ করে। তাইতো বারবার এভাবেই তাকে খুঁ'চিয়ে যায়, আর বোকা বিনুটা কিছু না বুঝেই মুখটা ভার করে ফেলে। এটাই তো নাভিয়ানের খুব ভালো লাগে।কি সুন্দর তোর মতন গাল দুটো লাল হয়ে থাকে। একদম মন চায় গাল দুটো টে'নে দিতে । নাভিয়ান ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে চলতে চলতে বলল,
— “ছাদে যাচ্ছি, তবে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। আমার সাথেই আবার ফিরে আসবি!”
বিনিতার আনন্দের সীমা রইল না। তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এই মানুষটা তাকে ছাদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে!
— “সত্যি যাচ্ছি?”
নাভিয়ান ধম'ক দেওয়ার স্বরে বলল,
— “না, মিথ্যে মিথ্যে!”
বিনিতা হাসল। সে জানে নাভিয়ান ভাই এমনটাই বলবে। তবে এখন তার এর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছাদে যাওয়াটা। তাই সে তার নামিয়ান ভাইয়ের বলা ত্যা'ড়া কথাটাও এই মুহূর্তে গায়ে মাখল না। তার চোখেমুখে এখন আনন্দের ঝিলিক। এখন ছাদে কোনভাবে ছাদে যাওয়াটাই তার কাছে মুখ্য। এমনিতেও সে খুব চি'ন্তায় ছিল ওই ইয়ানাটা ও তো আছে নিশ্চয়ই। নাভিয়ান ভাইও তো একটু পরে ছাদে যেতেন, গেলেই ওই ইয়ানাটা কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকতো তার দিকে। তাও এখন ও নিজেই একটু দেখে শুনে রাখতে পারবে।
বিনিতার ভাবটা এমন যেন সে তার নাভিয়ান ভাই এর গিন্নি। কি অভিজ্ঞ ব্যক্তি উনি সব দেখে রাখবেন! ওকে পর নাভিয়ান ভাই পাত্তা দেয়? সেই তো কিছু বললেই ভ্যা ভ্যা করে কে'দে ভাসায়।মৃদু স্বরে বলল,
— “থ্যাঙ্ক ইউ!”
তারা রুম থেকে বের হয়ে করিডোরে পা রাখতেই দেখল দুজোড়া চোখ বাঁকা ভাবে তাদের দেখছে। তুহিন আর রিমিতা হাত আড়াআড়ি করে বুকে বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে বি'দ্রূপের হাসি। যেন তারা আগে থেকেই জানত এমন কিছুই দেখবে।
নাভিয়ান এদিক ওদিক চেয়ে ভাবলেসহীন ভাবে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“কিরে, তোরা এখানে? ছাদে যাসনি?”
নাভিয়ান আর বিনিতা যেন চু'রি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছে।
তুহিন আর রিমিতা দুজন দুজনের দিক এক পলক চেয়ে চোখ ছোট করে একসাথে বলে উঠলো,
" তাই.. না?! "
নাভিয়ান আমতা আমতা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল।
— “কী এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? চল চল, ওপরে চল!”
