অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন

 অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন


বাথটাব ভর্তি বরফ-শীতল পানির মধ্যে শরীরটা ডুবিয়ে রেখে, শূন্য দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একের পর এক সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছে উদ্যান। সে বর্তমানে সোলার এস্টেটে আছে। তার বাবাকে মাটির নিচে রেখে আসার আজ তেরোতম দিন। বাবাকে মায়ের পাশেই দাফন করতে হবে। সেই মনস্তাপ নিয়েই সে মেক্সিকো থেকে তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশে ফিরেছিল। আর সেটা সম্পন্নও করতে পেরেছে।
সেদিন বাবার লাশবাহী গাড়ি নিয়ে যখন সে ‘খানজাদা নিবাস’-এর সামনে গিয়ে পৌঁছেছিল, তখন মাহবুবা সুলতানা, আবেশ আর রেহানা বেগমের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু উদ্যান ছিল জড় বস্তুর মতো নির্বিকার। সে তাদের কারও দিকে তাকায়নি, একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। মাহবুবা সুলতানা এতগুলো বছর পর নিজের স্বামীকে ওই অবস্থায় দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। রেহানা বেগমও নিজের মতো করে সেই কান্নায় তাল মিলিয়েছিলেন। আবেশের যদিও মনে নেই তাশরিফের কথা। শুধু এটুকুই মনে আছে যে সে তাকেই বাবা বলে জেনে এসেছে। আর তাশরিফও তাকে কখনো বুঝতে দেন নি তিনি তার আসল বাবা নন।
উদ্যানের সাথে ফুলকে না দেখে আবেশ মনে মনে বেশ অবাক হয়েছিল। পরক্ষণেই মনে পড়ে গিয়েছিল, ফুল যাওয়ার আগে প্রতিজ্ঞা করে গেছে আর এবাড়িতে আসবে না। তবুও আবেশ নিজেকে দমাতে না পেরে ফুলের কথা জিজ্ঞেস করেই বসেছিল উদ্যানকে। বিপরীতে উদ্যান তার দিকে এক পলক তাকিয়েও কোনো জবাব দেয়নি। বাবাকে শেষ বিদায় জানিয়ে মাটির নিচে দাফন করা শেষে উদ্যান সেই বাড়ির ভেতরে পাও রাখেনি। বাইরের গেট থেকেই সে গাড়িতে উঠে সোজা বেরিয়ে এসেছিল।
উদ্যান যে বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে, এই তথ্য সে এস্টেটের বাকি সদস্যদের একদমই জানতে দেয়নি। লুইস যাতে না জানাতে পারে সেই ব্যবস্থাও নিজের প্রভাব খাটিয়ে সে করে এসেছে। একদিকে বাবার মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে বিশাল শূন্যতা আর একাকিত্ব—সব মিলিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ড্রাগস নিতে নিতে উদ্যানের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এখন চরম পর্যায়ে।
বাথটাব থেকে উঠে ভেজা কাপড়গুলো শরীর থেকে কোনোমতে ছাড়িয়ে বাথরোব জড়িয়ে সে রুমে ফিরে এলো। চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। সেদিকে খেয়াল নেই তার। কাঁপতে কাঁপতেই আবারও ড্রাগসের প্যাকেটটার দিকে হাত বাড়াল কার্টেল বস। নিশ্বাসের সাথে নেশাদ্রব্য টেনে নিতেই চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করল তার। সে শূন্যে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “আমি পারিনি মা… আমি ওনাকে সবটা বুঝিয়ে বলতে পারিনি। আপনার কথা আমি রাখতে পারিনি।”
পহেলা এপ্রিল।
দুপুরের ভ্যাপসা গরমে জনজীবন একেবারে অতিষ্ঠ। রোদের তীব্রতায় পিচঢালা রাস্তাগুলো থেকে যেন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তবুও কারও থেমে থাকার উপায় নেই। জীবিকার তাগিদে সবাই নিজ নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত।
পরিচিত সেই বিলাসবহুল জীবন থেকে অনেক দূরে, ফুল নিজেও এখন ভীষণ ব্যস্ত তার নতুন জীবনে। শহরের একটা সাধারণ শোরুমে ‘সেলস গার্ল’ হিসেবে একটা ছোটখাটো জব জুটিয়ে নিয়েছে সে। এখন আর নিজের অতীত নিয়ে ভাবার ফুরসত নেই তার; সারাটা দিন কেটে যায় কাস্টমারদের সামলাতে আর কাপড়ের হিসাব মেলাতেই। পালিয়ে আসার সময় তার কাছে দু-লাখ টাকা জমানো ছিল, যা দিয়ে কোনো কাজ না করেও কয়েকটা মাস অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যেতো। কিন্তু ফুল অলস বসে থাকতে চায়নি। নিজের উপার্জনে বাঁচার জেদ চেপে বসেছে তার মাথায়।
সারাটা দিন মুখে মাস্ক পরে ডিউটি করতে করতে বিকেল নাগাদ সে বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার ওপর এপ্রিলের এই যে কালান্তক গরম পড়া শুরু হয়েছে, শোরুমের এসিও যেন মাঝে মাঝে হার মেনে যায়। গত কয়েকটা সপ্তাহের ধকলে ফুলের শরীরটা আগের চেয়ে অনেকটাই শুকিয়ে গেছে, তার সেই ডাগর ডাগর ভাসা ভাসা চোখ দুটোও এখন কোটরাগত; চারপাশে কালচে দাগ পড়ে গেছে। বলতে গেলে, আজকাল খাওয়াদাওয়ায় তার প্রচণ্ড অনিয়ম হয়। শরীর এত শুকিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও নিজের ভেতরটা রমণীর কাছে বড্ড ভারী ভারী ঠেকে। কেমন যেন এক অজানা অস্বস্তি আর ক্লান্তি সারাটা ক্ষণ তার শরীরটাকে চেপে ধরে রাখে।
সন্ধ্যাবেলা!
কিছুক্ষণ আগেই শোরুম থেকে ফুলের ছুটি হয়েছে। আজ মাসের প্রথম দিন হওয়ায় সে তার প্রথম স্যালারিটাও হাতে পেয়েছে। স্যালারি পেয়ে মনটা ক্ষণিকের জন্য ভালো হলেও, শরীরের ক্লান্তিটা কমেনি। বাড়িতে ফেরার পথে সে বাজার থেকে বেছে বেছে কয়েক পদের তাজা ফল কিনে নিল; যদি এগুলো খেয়ে শরীরে একটু শক্তি পাওয়া যায়, এই আশায়।
​সে একটা তিন তলা বিশিষ্ট ভবনের নিচ তলার একটা ছোট্ট সিঙ্গেল রুম ভাড়া নিয়েছে। জায়গাটা বেশ ঘিঞ্জি আর কোলাহলপূর্ণ। ফুল ইচ্ছে করেই এমন একটা জনবহুল এলাকা বেছে নিয়েছে, যেখানে সারাক্ষণই মানুষজনের আনাগোনা থাকে। তাছাড়া সেই ফ্ল্যাটের বাকি ঘরগুলোতেও বেশ কয়েক জোড়া মধ্যবিত্ত পরিবার বাস করে। ফুল একাই সেই সিঙ্গেল রুমটায় থাকে, তবে নিরাপত্তার খাতিরে সে প্রতিবেশীদের মাঝে রটিয়ে দিয়েছে যে সে বিবাহিতা। তার স্বামী প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে এসে সে তার সাথে থাকবে।
ব্যাগ ভর্তি ফল নিয়ে ফুল ধীরপায়ে গলির ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল, কেউ একজন তার পিছু নিচ্ছে। তীব্র আতঙ্কে ফুলের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে ভয়ে ভয়ে পেছনে ফিরে তাকানোর সাহসটুকুও করতে পারল না, শুধু পায়ের গতি বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই, চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে তার কানে ভেসে এলো শিস বাজানোর আওয়াজ!
এই বিশেষ সুর, এই শিস দেওয়ার ছন্দ ফুল আগেও শুনেছে; কণ্ঠটাও অতিপরিচিত তার। ভয়ে-আতঙ্কে তার হাত-পা অবশ হয়ে আসতে চাইল। সে আর এক মুহূর্তও না ভেবে হাতের ফলের ব্যাগ, পার্স সব রাস্তায় ফেলে দিয়ে প্রাণপণে দৌড় লাগাল। আর ঠিক তখনই, পেছনের অন্ধকার চিরে ধীরপায়ে হেঁটে এসে এক যুবক নিচে ঝুঁকে বসে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়া ফলগুলো একটা একটা করে কুড়াতে শুরু করল।
ফুল অন্ধের মতো গলির পর গলি ধরে প্রাণপণে ছুটে পালাতে চাইল। কিন্তু নিয়তিকে ফাঁকি দেওয়া কি এতই সহজ? হঠাৎই একটা মোড় ঘুরতেই তার পথ আগলে দাঁড়াল উদ্যানের বানানো এক হিউম্যানয়েড রোবট! ফুল ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। উল্টো ঘুরে অন্যদিকে দৌড় লাগাল সে, কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল আরও একটা রোবট। ফুল দিশেহারা হয়ে পাশের একটা সরু গলি ধরে এগোতেই বুঝতে পারল; দানবটা তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। এভাবে পালাতে পালাতে, লুকোতে লুকোতে রাতের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
শেষমেশ ফুল কোনোমতে ছিটকে নিজের রুমে ঢুকতে সক্ষম হলো। সে তাড়াহুড়ো করে দরজাটা লক করে দিয়ে দেওয়াল ধরে জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। তার পুরো শরীর তখন ঘামে ভিজে একাকার। নিজেকে বাঁচাতে সে ইমার্জেন্সি নম্বরে কল করার জন্য হন্যে হয়ে ফোন খুঁজতে লাগল। কিন্তু তখনই বজ্রাঘাতের মতো মনে পড়ে গেল; আতঙ্কে সে ফোনসহ ব্যাগটা রাস্তাতেই ফেলে রেখে চলে এসেছে!
যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ! ফুল কী করবে, কোথায় যাবে কিচ্ছু বুঝতে পারল না। ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা চিরে দরজায় আছড়ে পড়ল এক বিকট শব্দ! কেউ যেন বাইরে থেকে লাথি মেরে কাঠের শক্ত দরজাটা ভেঙে ফেলতে চাইছে। ভয়ের এমন এক চরম পর্যায়ে ফুল পৌঁছে গেল যে, তার গলা দিয়ে কোনো চিৎকার বা শব্দ পর্যন্ত বেরোচ্ছিল না। সে দুহাতে নিজের কানজোড়া শক্ত করে চেপে ধরে খাটের নিচে গিয়ে কোনোমতে আত্মগোপন করল।
কয়েক মিনিটের মাথায় মড়মড় শব্দে দরজাটা কবজি থেকে ভেঙে ভেতরে আছড়ে পড়ল। ঘরের ভেতর ধীরপায়ে ঢুকে এলো উদ্যান আর তার কালো পোশাকধারী দলবল। উদ্যানের গায়ে ছিল কালো রঙের একটা হুডি, মাথার ক্যাপটা কপাল অব্দি টানা। হাড়হিম করা বিষয় ছিল তার চোখ দুটো; একেবারে রক্তজবা ফুলের মতো লাল টকটকে। সে যে বর্তমানে পুরোদস্তুর ড্রাগসের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে, তা তার ওই উন্মত্ত চোখ আর অস্থির চাউনি দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে ভারী পায়ে এগিয়ে গেল খাটের দিকে।
​ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে উদ্যান যখন খাটের নিচে উঁকি দিল, তার সেই লাল চোখজোড়া নজরে আসতেই ফুলের ভেতরের জমাটবদ্ধ ভয়টা বাঁধ ভাঙল। সে গলা ফাটিয়ে চিল্লিয়ে উঠল, “আয়ায়ায়াহহহহ্!”
উদ্যান এক থাবায় ফুলের হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে খাটের নিচ থেকে তাকে বাইরে বের করে আনল। ফুল রীতিমতো হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করতে শুরু করে দিল, “প্লিজ হেল্প! কেউ বাঁচান আমাকে! ওনার হাত থেকে আমাকে রক্ষা করুন! আপনারা কে কোথায় আছেন, বাঁচান!”
ফুলের আকাশ-বাতাস কাঁপানো চিৎকারে ফ্ল্যাটের আশেপাশের মানুষজন, ভাড়াটিয়ারা এসে দরজার সামনে জড়ো হলো ঠিকই; কিন্তু উদ্যানের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালদেহী বডিগার্ড আর রোবটদের হাতের অস্ত্র দেখে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পেলো না। উদ্যান পকেট থেকে নিজের আর ফুলের একসাথের কিছু ছবি বের করে সবাইকে দেখিয়ে দিল। তারপর হুংকার ছেড়ে বলল, “ও আমার ওয়াইফ। আমাদের পারিবারিক ঝামেলা। কেউ মাঝখানে ইন্টারফেয়ার করতে এলে তার পরিণতি খুবই খারাপ হবে!”
উদ্যানের হিংস্রতা দেখে প্রতিবেশীরা ভয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। ফুল মেঝেতে বসে পড়ে দুই হাত জোড় করে সবার দিকে তাকিয়ে আকুতি-মিনতি করতে লাগল, “উনি আমার স্বামী হলেও আমি ওনার সাথে যেতে চাইনা! আপনারা দয়া করে পুলিশে কল করুন! প্লিজ, কেউ কল করুন!”
ফুলের মুখ থেকে কথাটা শোনা মাত্রই ড্রাগসের ঘোরে থাকা উদ্যান নিজের শেষ নিয়ন্ত্রণটুকুও হারিয়ে ফেলল। কালবিলম্ব না করে ফুলের কানের নিচে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল সে!
থাপ্পড়ের তীব্রতায় ফুলের মাথাটা ঘুরে গেল, চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। সে জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার আগেই উদ্যান তার অবশ শরীরটাকে এক ঝটকায় নিজের চওড়া ঘাড়ে তুলে নিল। তারপর ভাঙা দরজাটা মাড়িয়ে, উপস্থিত স্তব্ধ জনতাকে উপেক্ষা করে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল।
,
,
,
ফুলের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন মধ্যরাত। চোখ মেলে ঝাপসা দৃষ্টিতে সে আশেপাশে তাকাল। কংক্রিটের স্যাঁতসেঁতে দেয়াল আর ওপরে জ্বলতে থাকা টিমটিমে পাওয়ারের লালচে আলোয় ঠাহর করতে পারল; সে এখন সোলার এস্টেটের ‘পানিশমেন্ট সেল’-এ বন্দি।
​তার হাত দুটো একটা কাঠের চেয়ারের সাথে শক্ত দড়ি দিয়ে পেছনমোড়া করে বাঁধা। মুখেও মোটা স্কচটেপ সেঁটে দেওয়া হয়েছে। এই চরম অসহায়ত্বে ফুলের চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
এভাবে আরও ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর, দরজাটা খুলে গেল। এদিক ওদিক দুলতে দুলতে ঘরের ভেতর উপস্থিত হলো উদ্যান। দানবটার হুডির ক্যাপটা এখন নামিয়ে রাখা; ড্রাগসের প্রভাবে সে ক্রমান্বয়ে নাক আর ঘাড় ঘষে যাচ্ছে অস্থিরভাবে।
ফুলের অশ্রুসিক্ত, আতঙ্কিত চোখজোড়ার নজরে আসতেই উদ্যানের শরীরটা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। সে সহ্য করতে না পেরে গলা চড়িয়ে হুকুম দিল, “ফ্লোরা! এই ফ্লোরা! ওর চোখ দুটোও বেঁধে দে! আমি ওর চোখ দেখতে চাই না!”
ফ্লোরা একটা কালো কাপড় নিয়ে ফুলের দিকে এগিয়ে যেতেই, ফুল মরিয়া হয়ে মাথা নেড়ে তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল। সে হয়তো মুখেও কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু স্কচটেপের কারণে কেবল গোঙানির শব্দই ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো। চোখের পলকে ফুলের চোখ দুটোও কালো কাপড়ে বেঁধে দিয়ে ফ্লোরা একপাশে সরে দাঁড়াল।
চারপাশটা ফুলের কাছে এখন সম্পূর্ণ অন্ধকার। সে শুধু শুনতে পাচ্ছিল উদ্যানের ভারী জুতোর আওয়াজ, যা ধীরলয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছিল। ঠিক ফুলের সামনে এসে উদ্যান নড়বড়ে পায়ে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এদিকে তীব্র আতঙ্কে ফুলের মনে হচ্ছিল তার ফুসফুসের বাতাস ফুরিয়ে আসছে, দমটুকু যখন-তখন বেরিয়ে যাবে। ভয়ে-কষ্টে সে ছটফট করতে লাগল।
উদ্যান কোনোরূপ ভূমিকা ছাড়াই ধীরলয়ে ফুলের কোলের ওপর নিজের মাথাটা নামিয়ে রাখল। দুই হাত দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো জড়িয়ে ধরল ফুলের কোমর। উদ্যানের এই অদ্ভুত আচরণে অজানা আশঙ্কায় ফুলের ছটফটানি আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। কিন্তু উদ্যান সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করল না। সে ফুলের কোলে মুখ গুঁজে বিড়বিড়িয়ে বলতে লাগল, “তুই… তুই মে`রে ফেললি আমার বাবাকে। তিনি মা`রা গেলেন। কেন এমন হলো? তুই কেন এতোবড় ক্ষতি করলি আমার?”
ফুল ফোপাঁতে লাগল। তার ছটফটানিতে উদ্যান বিরক্ত হলো। সে রাগে আরও শক্ত করে, প্রায় হাড় গুঁড়ো করে দেওয়ার মতো তীব্রতায় চেপে ধরল ফুলের কোমর। ফুল আর সহ্য করতে পারল না; সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে বহুকষ্টে উদ্যানের বুক বরাবর পা উঠিয়ে তাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইল।
আকস্মিক আক্রমণে উদ্যান একটু হড়বড়িয়ে গেল। তাদের মাঝে দূরত্ব বাড়তেই, লালচে আলোয় উদ্যানের চোখ পড়ল ফুলের পেটের ওপর। বোরকার ওপর দিয়েও জায়গাটা কেমন যেন অস্বাভাবিক রকমের ফোলা ফোলা ঠেকল। সে নেশার ঘোরে আনমনেই নিজের তর্জনী আঙুলটা ছোঁয়াল ফুলের পেটে। তারপর বেশ জোরে জোরেই, চেপে চেপে দেখতে লাগল জায়গাটা; যেন সে কোনো এক জটিল মেকানিজম বোঝার চেষ্টা করছে।
উদ্যানের এই অদ্ভুত স্পর্শে ফুল মারাত্মক ভয় পেয়ে গেল। সে ভাবল উদ্যান হয়তো বন্দুক দিয়ে এমন করছে। সে নিরুপায় হয়ে আবারও পা তুলে উদ্যানের বুক বরাবর লাথি মেরে দিল। তার এমন উগ্রতায় উদ্যান উঠে দাঁড়িয়ে খসখসে হাতের বলয়ে ফুলের নরম গালদুটো চেপে ধরল।
রুক্ষ গলায় গর্জে উঠল সে, “এই হারামজাদি! তুই এই ক'মাসে কী খেয়ে এমন মোটা হয়েছিস, হ্যাঁ?”
মুখ বাঁধা থাকায় ফুল কিছুই বলতে পারল না। তার এই নীরবতা উদ্যানকে আরও বেশি ক্ষেপিয়ে তুলল। সে ফুলের মুখটা আরও জোরে পিষে ধরে বলল, “এই! তুই জবাব দিচ্ছিস না কেন? আমার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সাহস হলো কী করে তোর?”
ফুলের সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠল। উদ্যান এই মুহূর্তে কোনো সুস্থ মানুষের মতো আচরণ করছে না; সে নিজেই ফুলের মুখ বেঁধে রেখেছে, আবার নিজেই জিজ্ঞেস করছে সে কথা বলছে না কেন!
হঠাৎই উদ্যানের ভেতরের রাগটা দপ করে নিভে গেল। সে নিজের কপালটা ফুলের কপালে ঠেকাল। উন্মত্ত গলায় বলতে লাগল, “তুই আমার সব সুখশান্তি খেয়ে এমন স্বাস্থ্যবতী হয়েছিস তাই না? বল, খাসনি তুই? খেয়েছিস তো! তুই আমাকে শেষ করে ফেলেছিস। আমাকে ধ্বংস করে দিয়েছিস। তুই ধ্বংসবতী, তুই সর্বনাশী, সর্বগ্রাসী জেনেও কেন যে আমি তোর অতোটা কাছে গেলাম। কেন গেলাম বল! তুই কেন আমার এতোবড় সর্বনাশ করলি। আমার ভেতরটা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে রে, ছারখার হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। এ কেমন যন্ত্রণায় জর্জরিত করলি আমায়? এ কেমন মরণব্যাধি হলো আমার? তুই কেন বিষের মতো আমার রক্তকণিকায় ধাবিত হচ্ছিস? কেন আমার মস্তিষ্ক তোর এই মুখটা ছাড়া অন্য কিছু কল্পনা করতেও ভুলে গেছে? এ কেমন ভাবে গ্রাস করে নিলি আমায়? কিসের প্রতিশোধ নিলি? বল!”
ফুলের কান্নার মাত্রা বেড়ে গেল। সে ছোটার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে মোচড়াতে লাগল রীতিমতো। উদ্যান তখনও উত্তরের আশায় তার গাল ছেড়ে দিয়ে, এক ঝটকায় চুলের মুঠি খাবলে ধরল, “বলছিস না কেন? বল… বল না! এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় বলে দে না! আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার… আমার তোকে টুকরো টুকরো করে কেটে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে!”
শেষোক্ত কথাটা শুনে ফুলের হৃৎপিণ্ডটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্পন্দিত হতে ভুলে গেল। ভয়ে তার শরীর পুরো জমে বরফ হয়ে গেল। ঠিক তখনই উদ্যান তার কানের কাছে নিজের তপ্ত মুখটা নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমার মনে হচ্ছে… তোকে একেবারে খেয়ে ফেলতে পারলেই আমার সব প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে।”
কথাটা বলেই উদ্যান সোজা হয়ে দাঁড়াল। একবার ফুলকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে আবারও তার সামনে বসল। উদ্যানের এই নিস্তব্ধতা ফুলের ভেতরটা কাঁপিয়ে তুলল। উদ্যান ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডস আর রোবটদের উদ্দেশ্যে আদেশের সুরে বলল, “সবাই যা এখান থেকে। গেট ডিরেক্ট লক কর।”
তারা বেরিয়ে যেতেই উদ্যান ক্ষিপ্ত হাতে কয়েকটা হ্যাঁচকা টানে ফুলের পরনের বোরকাটা চিরে দুই টুকরো করে মেঝেতে ফেলে দিল। বোরকার আব্রু সরতেই উদ্যান উন্মত্তের মতো ফুলের সালোয়ারটা টেনে নিচে নামিয়ে দিল। তার এই বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডে ফুল আতঙ্কে শুধু ছটফট করে যাচ্ছিল।
কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই উদ্যান এমন কিছু করল যাতে তার ছটফটানি থেমে গেল। এক প্রবল ও তীব্র শারীরিক শিহরণে সে নিজের মাথাটা চেয়ারের পেছনের কাঠের ওপর এলিয়ে দিয়ে ঘনঘন শ্বাস টানতে লাগল। ব্যাপারটা ফুলের ভালো লাগল না। একটুও ভালো লাগল না। কিন্তু কী ই বা করবে সে?
প্রায় পনেরো মিনিট পর। উদ্যান ফুলের সালোয়ার ঠিক করে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত উল্টে নিজের ঠোঁট মুছতে লাগল। নিজের ওপর নিজেই রেগে গেল সে৷ পকেট হাতড়ে একপ্যাকেট পাউডার বের করল উদ্যান। টেবিলের ওপর দ্রুত সেই পাউডার ছড়িয়ে এক তীব্র টানে নিশ্বাসের সাথে তা ভেতরে টেনে নিল। নেশার নতুন এক জোয়ার মস্তিষ্কে আঘাত করতেই চোখ দুটো বুজে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল দানবটা।
পরক্ষণেই তার লাল চোখ দুটো আবার চাইল চেয়ারে বন্দি ফুলের দিকে। নেশার ঘোরে তার ভেতরের মনস্টারটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে কোমরে গুঁজে রাখা বন্দুকটা টেনে বের করল।
খটখট শব্দে বুলেট লোড করে সে সটান এগিয়ে গেল ফুলের সামনে। বন্দুকের শীতল নলটা ফুলের থুতনির নিচে শক্ত করে চেপে ধরে ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “তুই… তুই… আমি তোকে শেষ করে ফেলবো।”
ফুল পাগলের মতো জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না’ ‘না’ করতে লাগল। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে গোঙানির সুরে বলতে চাইল, ‘মারবেন না… প্লিজ আমাকে মারবেন না। আমাকে বাঁচতে দিন, আমাকে বাঁচতে দিন!’
ফুলের এটুকু কথা বুঝে নিল উদ্যান। সে বন্দুকের নলটা ফুলের থুতনি থেকে স্লাইড করতে করতে গলার ওপর দিয়ে নিচে নামিয়ে এনে ঠিক বুকের বাম পাশে চেপে ধরে বলল, “আমি না খুব অবাক হলাম জানিস তো, আমার বাবাকে মে`রে ফেলেও তুই বেঁচে থাকতে চাইছিস এটা জেনে। আমার ধারণা ছিল তুই নিজে থেকেই ম`রে যেতে চাইবি। এই! কয়েকমাস আগেও না তুই ম`রে যেতে চেয়েছিলি? বলেছিলি না, ‘আমাকে মে`রে ফেলুন, আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না।’ তবে এই কয় মাসে কী এমন হলো যে এখন তুই বাঁচার জন্য এত তড়পাচ্ছিস? নাকি আগে ওইসব ভালোমানুষির নাটক করে আমার সহানুভূতি পেতে চেয়েছিলি, কোনটা?”
ফুলের চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় নোনাজল ঝরছে। সেই অশ্রুজলে চোখ বেঁধে রাখা কাপড়টা সম্পূর্ণ ভিজে সিক্ত হয়ে গেছে। উদ্যান চোয়াল শক্ত করে, দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বলল, “তুই বেঁচে থাকতে চাইছিস যার মানে তোর ম`রে যাওয়াই উচিত। আমি মে`রে ফেলবো তোকে।”
ফুল পাগলের মতো তড়পাতে শুরু করল। তার এই ছটফটানি দেখে উদ্যান অনবরত নিজের নাক ঘষে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ যেতেই ফুল বুঝে গেল মৃ`ত্যু তার খুবই সন্নিকটে। এই উন্মাদ, নেশাগ্রস্ত রাক্ষসের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তার এই ভাবনার মাঝেই হুট করে পুরো রুম কাঁপিয়ে এক বিকট গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো, ‘ঠাস!’
কেঁপে উঠল ফুলের সর্বাঙ্গ। ঠিক তখনই কানের কাছে উদ্যানের ক্রূর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “জাস্ট টেস্ট ফায়ার করলাম। পরের গুলিটা একদম সঠিক জায়গাতেই ঢুকবে।”
কথাটা শুনে ফুলের বেঁচে থাকার শেষ আশার আলোটুকুও নিভে গেল। পরপরই ঘর জুড়ে আরও কয়েকটা গুলির বিকট শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো, ‘ঠাস! ঠাস! ঠাস!’
যদিও একটাও ফুলের গায়ে লাগেনি। সবগুলো তার দু-পাশ দিয়ে কংক্রিটের দেয়ালে গিয়ে বিঁধেছে। তবুও কানের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া তীব্র বাতাস আর প্রচণ্ড ভয়ে ফুলের জ্ঞান হারিয়ে ফেলার উপক্রম হলো। শেষ বারের মতো তার কানে ভেসে উঠল উদ্যানের মাতাল কণ্ঠস্বর, “ধ্যাৎ বারবার মিস হয়ে যাচ্ছে কেন? না, না এবার আর টার্গেট মিস হবে না।”
ফুল অবচেতন মনেই আরও কয়েকটা গুলির বিকট শব্দ শুনলো। তারপর তার চোখদুটো বুজে গেল।
খানজাদা নিবাসের দেয়ালের গায়ে সবেমাত্র ভোরের নরম আলো রঙ ছড়াতে শুরু করেছে। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে নতুন একটা দিনের সূচনা হচ্ছিল।
প্রকৃতির এই শান্ত রূপের বিপরীতে আবেশের ভেতরটা চরম অশান্তির দাবদাহে পুড়ছিল। সারাটা রাত সে বাড়ির বাইরে, উদ্দেশ্যহীনভাবে কাটিয়ে দিয়েছে; চেনা-অচেনা একরাশ বিষণ্ণতা আর উৎকণ্ঠা তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। সে আনমনে, ক্লান্ত শরীরে মাথা নিচু করে বাড়ির চেনা পথ ধরে হেঁটে আসছিল।
হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির মূল ফটকের সামনে এসে পৌঁছানো মাত্রই আবেশের পা জোড়া অকস্মাৎ থমকে গেল। এক ইঞ্চিও সামনে এগোনোর ক্ষমতা রইল না তার। অবচেতনভাবেই ফটকের এক কোণে চোখ পড়তেই তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। চোখের মণি দুটো ভয়ের চোটে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবেশ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। চোখের সামনে ভেসে ওঠা দৃশ্যটা কোনো দুঃস্বপ্ন নাকি বাস্তব তা ঠাহর করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল সে। পরমুহূর্তেই ঘোর ভাঙতেই সে নিজের সমস্ত শক্তি উজাড় করে, পাগলের মতো চিৎকার করে ছুট লাগাল সেই অভিমুখে।
“ফুউউল!”
তার কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে আসা আর্তনাদ চারপাশের নিস্তব্ধতাকে নিমেষেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। আবেশ ফুলের অচেতন দেহটার ঠিক সামনেই হাঁটু গেড়ে ধপ করে বসে পড়ল।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post