সংসারের_অন্ধকার
মা চলে যাওয়ার পর পুরো বাসাটা অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই নীরবতার মাঝেও আমি যেন প্রতিটা দেয়ালে জমে থাকা চাপা উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। ড্রয়িংরুমের কোণায় পড়ে থাকা মায়ের ব্যাগ, টেবিলের ওপর তার চশমা, রান্নাঘরের তাকের ওপর রাখা তার ওষুধের বক্স—সবকিছুই যেন একটা যুদ্ধের পরে ফেলে যাওয়া স্মৃতি।
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নিচে গাড়ির শব্দ ভেসে আসছিল। ড্রাইভার মায়ের লাগেজ গাড়িতে তুলছে। মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চোখে সেই পরিচিত কঠোরতা। কিন্তু আজ সেখানে আরেকটা জিনিসও ছিল—অপমান।
তিনি শেষবারের মতো আমার দিকে তাকালেন।
“তুই আজ যা করলি, তার জন্য একদিন আফসোস করবি, ইয়াসিন।”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কারণ আমার মাথার ভেতর তখনও হাসপাতালের সেই দৃশ্য ঘুরছিল। নুসরাতের নিস্তেজ মুখ, শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট আর ছোট্ট আয়ানের আতঙ্কিত কান্না।
মা ধীরে ধীরে বের হয়ে গেলেন।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো পুরো বাসা যেন গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আমি কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। বুকের ভেতর কেমন শূন্য লাগছিল। মানুষটা আমার মা। ছোটবেলায় যিনি আমার মাথায় তেল মেখে স্কুলে পাঠাতেন, জ্বর হলে সারারাত মাথার পাশে বসে থাকতেন—আজ তাকেই আমি নিজের বাসা থেকে বের করে দিলাম।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা চিন্তা মাথা তুলে দাঁড়াল।
যদি আমি আজও চুপ থাকতাম?
তাহলে হয়তো একদিন হাসপাতালের সেই বিছানায় নুসরাতকে আর জীবিত পেতাম না।
আমি ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লাম।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল “খালা”
আমি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ভেসে এল।
“ইয়াসিন, তুই নাকি নিজের মাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিস?”
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
খবর এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, সেটা বুঝতেই পারছিলাম।
“খালা, পরিস্থিতি—”
তিনি আমাকে শেষ করতে দিলেন না।
“কী পরিস্থিতি? একটা নতুন মেয়ের জন্য তুই নিজের জন্মদাত্রী মাকে অপমান করলি?”
আমার ভেতরে জমে থাকা ক্লান্তি ধীরে ধীরে বিরক্তিতে বদলে যাচ্ছিল।
“খালা, নুসরাত অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি।”
“মেয়েরা বাচ্চা জন্ম দেয়, এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে এত নাটক করতে হবে?”
আমি চুপ করে গেলাম।
এই কথাগুলোই তো মা বলতেন।
একই সুর। একই মানসিকতা।
খালা আবার বললেন, “তোর মা সারাজীবন তোকে মানুষ করেছে। আর তুই একটা মেয়ের কথা শুনে তাকে বের করে দিলি?”
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আমি কাউকে বিশ্বাস করে কিছু করিনি। আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ঠান্ডা গলায় খালা বললেন, “তোর এই সংসার টিকবে না, ইয়াসিন। যেই মেয়ে ছেলেকে মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, সে কখনো সংসার ধরে রাখতে পারে না।”
ফোন কেটে গেল।
আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী যেন আমাকে অপরাধী বানিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু আমি জানতাম, সত্যিটা অন্য।
আমি ধীরে ধীরে উঠে নুসরাতের জন্য কিছু কাপড় গুছাতে লাগলাম। ওর প্রিয় নীল শালটা হাতে নিতেই বুকের ভেতর মোচড় দিল।
এই মেয়েটা কখনো আমার কাছে কিছু চায়নি।
বিয়ের পর থেকে সে সবসময় আমার সংসারটাকে নিজের সবকিছু দিয়ে আগলে রেখেছে।
আর আমি?
আমি তাকে নিরাপত্তা দিতে পারিনি।
হাসপাতালে ফিরে গিয়ে দেখি নুসরাত ঘুমাচ্ছে। আয়ান নার্সারিতে আছে। কেবিনের আলো ম্লান। স্যালাইনের ফোঁটা ধীরে ধীরে পড়ছে।
আমি চুপচাপ গিয়ে তার পাশে বসলাম।
কিছুক্ষণ পর নুসরাত চোখ খুলল।
আমাকে দেখেই মৃদু হেসে বলল, “তুমি বাসায় গিয়েছিলে?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ।”
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করল, “আন্টি… রাগ করেছেন?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
“মা গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন।”
নুসরাতের চোখ বড় হয়ে গেল।
“কী?”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “আমি তাকে যেতে বলেছি।”
সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসতে গেল। কিন্তু দুর্বল শরীর কেঁপে উঠল।
আমি দ্রুত তাকে ধরে ফেললাম।
“আস্তে।”
নুসরাতের চোখে আতঙ্ক।
“তুমি এটা কেন করলে? উনি তোমার মা!”
আমি একটু তিক্ত হেসে বললাম, “আর তুমি আমার স্ত্রী। আয়ান আমার ছেলে। তোমাদের নিরাপদ রাখা আমার দায়িত্ব।”
নুসরাতের চোখ ভিজে উঠল।
“আমি চাইনি তোমাদের সম্পর্ক নষ্ট হোক।”
আমি তার হাত ধরলাম।
“সম্পর্ক তখনই নষ্ট হয়, যখন মানুষ অন্যায়ের পরও চুপ থাকে।”
নুসরাত কিছু বলল না।
সে মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, তার ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করছে। অথচ দোষটা তার নয়।
সেদিন রাতে হাসপাতালের কেবিনে বসে আমি অনেক পুরোনো কথা ভাবছিলাম।
আমার বাবা মারা যান যখন আমি ক্লাস নাইন এ পড়ি। তারপর মা একাই আমাকে বড় করেছেন। আত্মীয়দের বাসায় সেলাইয়ের কাজ করেছেন, মানুষের বাসায় রান্না করেছেন, শুধু যেন আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি।
আমি কখনো তাকে প্রশ্ন করিনি।
তিনি যা বলেছেন, আমি সেটাই বিশ্বাস করেছি।
কারণ আমার কাছে মা মানেই ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
কিন্তু আজ প্রথমবার বুঝলাম, একজন মানুষ একই সঙ্গে ত্যাগীও হতে পারে, আবার অন্য কারও প্রতি নিষ্ঠুরও হতে পারে।
মানুষ কখনো পুরোপুরি সাদা বা কালো হয় না।
পরদিন সকালে হাসপাতালের ক্যান্টিনে গিয়ে নাস্তা আনছিলাম। তখন হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ শুনলাম।
“ইয়াসিন?”
আমি ঘুরে তাকালাম।
নুসরাতের বড় ভাই রাকিব দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে উদ্বেগ।
“তুই আমাকে কিছু বলিসনি কেন?”
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
রাকিব এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল।
“নুসরাত আমাকে রাতে ফোন করেছিল। কাঁদছিল।”
আমার বুকটা কেঁপে উঠল।
“সে তো কিছুই বলেনি কখনো…”
রাকিব তিক্ত হেসে বলল, “কারণ ও সবসময় সবাইকে বাঁচাতে চায়।”
আমরা দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর সে ধীরে বলল, “আমি তোর ওপর রাগ করেছিলাম, জানিস? ভাবছিলাম তুই বুঝি নুসরাতের কষ্ট দেখেও কিছু করিস না।”
আমি মাথা নিচু করলাম।
“আমি সত্যিই বুঝিনি।”
রাকিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“সমস্যা হলো, অনেক পুরুষ বুঝতেই চায় না। তুই অন্তত শেষ পর্যন্ত বুঝেছিস।”
তার কথাগুলো শুনে বুকটা আরও ভারী হয়ে গেল।
কেবিনে ঢুকতেই নুসরাত অবাক হয়ে বলল, “ভাইয়া!”
রাকিব এগিয়ে গিয়ে বোনের মাথায় হাত রাখল।
“তুই এত কষ্ট পাচ্ছিলি, আর আমাকে বলিসনি?”
নুসরাত চোখ নামিয়ে ফেলল।
“আমি কাউকে চিন্তায় ফেলতে চাইনি।”
রাকিবের চোখ ভিজে উঠল।
“তুই সবসময় এমন কেন?”
কেবিনের ভেতর একটা ভারী নীরবতা নেমে এল।
হঠাৎ আয়ান কেঁদে উঠল।
নুসরাত সঙ্গে সঙ্গে ওর দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু আমি আগে গিয়ে আয়ানকে কোলে তুলে নিলাম।
ছোট্ট ছেলেটা কান্নার মাঝেও আমার আঙুল শক্ত করে ধরে ফেলল।
সেই মুহূর্তে মনে হলো, এই ছোট্ট মানুষটার জন্য আমাকে বদলাতেই হবে।
শুধু স্বামী হিসেবে নয়, বাবা হিসেবেও।
দুইদিন পর নুসরাতকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলো।
আমি বাসায় ফেরার আগে পুরো ফ্ল্যাট পরিষ্কার করালাম। রান্নার জন্য একজন কাজের মহিলা ঠিক করলাম। এমনকি একটা বেবি কেয়ার নার্সও রাখলাম, যেন নুসরাত বিশ্রাম নিতে পারে।
বাসায় ঢুকতেই নুসরাত থমকে গেল।
ঘরটা আগের মতো অগোছালো নেই। বাতাসেও সেই চাপা ভয় নেই।
সে ধীরে ধীরে সোফায় বসল।
তার চোখে অদ্ভুত এক শান্তি।
আমি রান্নাঘরে গিয়ে ওর জন্য স্যুপ গরম করছিলাম। হঠাৎ দেখি নুসরাত চুপচাপ আমাকে দেখছে।
আমি হেসে বললাম, “কী?”
সে মৃদু গলায় বলল, “তুমি আগে কখনো রান্নাঘরে ঢোকোনি।”
আমি লজ্জা পেয়ে হেসে ফেললাম।
“সবকিছু শেখা যায়।”
নুসরাতের চোখে পানি চিকচিক করল।
“আমি শুধু তোমাকে পাশে চেয়েছিলাম, ইয়াসিন।”
আমি থমকে গেলাম।
এত সহজ একটা চাওয়া।
কিন্তু আমি এতদিন সেটা বুঝতেই পারিনি।
রাতে আয়ানকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে নুসরাত হঠাৎ বলল, “তুমি কি আমাকে দোষ দাও?”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
“কিসের জন্য?”
সে নিচু গলায় বলল, “তোমার মা চলে যাওয়ার জন্য।”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম।
তারপর ধীরে বললাম, “না। আমি নিজেকে দোষ দিই।”
নুসরাত কিছু বলল না।
আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম।
“আমি যদি আগে বুঝতাম, তাহলে তোমাকে এত কষ্ট পেতে হতো না।”
নুসরাত মাথা নাড়ল।
“আমরা কেউই পুরো সত্যিটা বুঝতে পারিনি।”
আমি তার হাত ধরলাম।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমাদের সম্পর্কটা যেন নতুন করে শুরু হচ্ছে।
কিন্তু আমি জানতাম না
ঝড়টা আসলে তখনও পুরোপুরি শুরুই হয়নি।
কারণ পরদিন সকালেই এমন একজন আমাদের দরজায় এসে দাঁড়াবে, যার আগমন পুরো সংসারটাকে আবারও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
