দুই পৃথিবী

দুই পৃথিবী

দুই পৃথিবী


 আমার স্বামীর গোপন দ্বিতীয় স্ত্রী এসেছে আমার কাছে আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করাতে। আমিও জানতাম না ওনি আমার স্বামীর স্ত্রী। আমি যখন বললাম এই খুশির দিনে আপনার হাসবেন্ড আসে নাই আপনার সাথে? ওনি তখন বললো আসলে ম্যাডাম আমার স্বামী তো তার ব্যবসা নিয়ে প্রচুর জামেলায় থাকে তাই আসতে পারে নাই। এটা বলে ওনি খুশি মনে ওনার মোবাইল থেকে তাদের দুইজনের একসাথে একটা ফটো দেখাইলো। ফটোতে তার স্বামীকে দেখে আমার পায়ের তলা থেকে মনে হলো মাটি সরে গেল। আরে এটা তো সায়ন আমার হাসবেন্ড। কিন্তু আমি তাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে তাকে বিদায় করে দিলাম। আমার একটা ৬ বছরের বাচ্চা আছে।

আফরিন নামের ওই মেয়েটা যখন চেম্বার থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে গেল, আমি ঝটপট আমার এসিস্ট্যান্টকে বলে দিলাম, "আজকের মতো রোগী দেখা শেষ, বাকিদের অন্য ডেট দিয়ে দাও।"
ভেতর থেকে দরজাটা লক করে দিয়ে আমি ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লাম। আমার পুরো শরীর কাঁপছিল, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসটা নিতে গিয়েও পারলাম না, হাত থেকে ফস্কে পানিগুলো মেঝেতে পড়ে গেল। ঠিক আমার জীবনের মতোই, যা এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গেছে।
মোবাইলের স্ক্রিনে দেখা সায়নের ওই চিলতে হাসিটা আমার চোখের সামনে বারবার ভাসছিল। যে মানুষটা প্রতিদিন সকালে আমার আর আমাদের ৬ বছরের ছেলে আদিবের কপালে চুমু খেয়ে বাসা থেকে বের হয়, যে মানুষটা রাতে বাড়ি ফিরে আদিবকে কোলে নিয়ে গল্প করায়—সে অন্য একটা মেয়ের স্বামী! আর সেই মেয়েটা এখন সায়নের সন্তানের মা হতে চলেছে!
"ব্যবসায় প্রচুর ঝামেলা থাকে"—আফরিনের এই কথাটা আমার কানে তীরের মতো বিঁধছিল। এবার আমার মাথায় সব হিসাব মিলতে লাগল। গত এক বছর ধরে সায়ন প্রায়ই বলত, "ব্যবসায় একটু মন্দা যাচ্ছে, ঢাকার বাইরে ক্লায়েন্ট মিটিং আছে।" কখনো চিটাগং, কখনো সিলেট যাওয়ার নাম করে ও তিন-চার দিন উধাও থাকত। আমি সরল বিশ্বাসে ভাবতাম, লোকটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কত কষ্ট করছে! অথচ ও সেই দিনগুলো কাটাত আফরিনের সাথে, আরেকটা সংসারে!
কান্নায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি নিজের গালে থাপ্পড় মেরে থামালাম। না, এখন কান্নার সময় না। আমার একটা ৬ বছরের বাচ্চা আছে, ওর ভবিষ্যতের দায়িত্ব আমার। আমি যদি এখন ভেঙে পড়ি, তবে সায়ন খুব সহজে পার পেয়ে যাবে। ও একটা ধূর্ত লোক, আমি চেম্বারে সিনক্রিয়েট করলে ও উল্টো আফরিনকে সরিয়ে ফেলত আর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার নাটক করত।
আমি ব্যাগটা গুছিয়ে চেম্বার থেকে বের হলাম। গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললাম বাসার দিকে যেতে। পুরোটা পথ আমার শুধু আদিবের মুখটা মনে পড়ছিল। ও এখনো কত ছোট, কিচ্ছু বোঝে না। ও জানে ওর বাবা পৃথিবীর সেরা বাবা। এই নিষ্পাপ বাচ্চাটার সামনে আমি কীভাবে এই সত্যিটা আনব?
বাসায় যখন পৌঁছালাম, তখন সন্ধ্যা সাতটা। কলিংবেল চাপতেই আদিব এসে দরজা খুলে দিল।
"আম্মু! তুমি আজকে এত তাড়াতাড়ি চলে আসলে?" ও আমার গলা জড়িয়ে ধরল।
আমি অনেক কষ্টে নিজের চোখের পানি লুকিয়ে ওকে কোলে নিলাম। ওর কপালে চু*মু খেয়ে বললাম, "হ্যাঁ বাবা, আম্মুর আজকে একটু তাড়া ছিল।"
আদিবকে ওর রুমে পাঠিয়ে আমি ড্রয়িংরুমে এসে বসলাম। ঘড়ির কা*টার দিকে তাকিয়ে রইলাম। রাত নয়টা বাজে সায়ন বাসায় ফেরে। আজকেও ফিরবে। কিন্তু আজকে আর পাঁচটা দিনের মতো সাধারণ কোনো রাত হবে না। আজ আমি কোনো ঝগড়া করব না, আমি সায়নের মুখ থেকেই সত্যিটা বের করব, কিন্তু এমনভাবে যা ও কল্পনাও করতে পারবে না।
ঠিক রাত নয়টা বেজে দশ মিনিটে দরজার লক খোলার শব্দ হলো। সায়ন ভেতরে ঢুকল। হাতে মিষ্টির প্যাকেট, মুখে সেই চিরচেনা ক্লান্ত অথচ মায়াবী হাসি।
ওর দিকে তাকিয়ে আমার ভেতরের ঘৃণাটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। কিন্তু আমি মুখে একটা স্বাভাবিক হাসি টেনে বললাম, "আজকে এত খুশি কেন? মিষ্টি এনেছ যে?"
সায়ন জ্যাকেটটা খুলতে খুলতে বলল, "আরে বলো না, ব্যবসায় একটা বড় ডিল ফাইনাল হলো আজ। অনেকদিনের একটা ঝামেলা মিটলো।"
আমি মনে মনে হাসলাম। ঝামেলা তো কেবল শুরু হলো, সায়ন।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post