একজন_মায়ের_বিচার

 একজন_মায়ের_বিচার

একজন_মায়ের_বিচার


ফোনটা বাজতেই পুরো রুমের পরিবেশ বদলে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগেও যে মানুষটা অহংকারে গলা উঁচু করে কথা বলছিল, সেই প্রিন্সিপাল মাহবুব কবিরের চোখের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত এক আতঙ্ক নেমে এলো। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন।
“জাস্টিস আরিফুল হক।”
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি।
আমি ধীরে ফোনটা রিসিভ করলাম। আমার গলার স্বর শান্ত ছিল, কিন্তু রুমের সবাই বুঝতে পারছিল পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় নেই।
“জি স্যার।” ওপাশ থেকে ভারী গলা ভেসে এলো।
“নীলাঞ্জনা, তুমি এখনও স্কুলেই আছো?”
“জি স্যার।”
“আমি রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সব শুনেছি। তুমি ঠিক আছো?”
আমি তিথির মাথায় হাত রাখলাম। মেয়েটা এখনও কাঁপছিল।
“আমি ঠিক আছি স্যার। কিন্তু আমার মেয়ে না।”
রুমের ভেতর নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে উঠল।
বিচারপতি আরিফুল হক আবার বললেন, “আমি ইতোমধ্যে শিশু অধিকার সেলের সাথে কথা বলেছি। প্রয়োজন হলে এখনই ম্যাজিস্ট্রেট পাঠানো হবে।”
আমি শান্তভাবে বললাম, “ধন্যবাদ স্যার। আপাতত দরকার হবে না। আমি পরিস্থিতি সামলে নিচ্ছি।”
“তুমি নিশ্চিত?”
“জি।” “ঠিক আছে। আর একটা কথা।”
“জি স্যার।”
“কেউ যেন তোমার পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলতে না পারে। সবকিছু নিয়ম মেনে করো।”
আমার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
“আইনের বাইরে আমি কখনও যাই না স্যার।”
কল কেটে যেতেই রুমের বাতাস যেন জমে গেল।
শারমিন ম্যাডামের মুখের রঙ পুরো সাদা হয়ে গেছে। আর মাহবুব কবিরের কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “আপনি… আপনি একজন জাজ?”
আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর ধীরে বললাম, “আজ পর্যন্ত আমি সেটা কাউকে বলিনি। কারণ আমার মেয়ে যেন অন্যদের মতোই স্বাভাবিক জীবন পায়, সেটাই চেয়েছিলাম।”
তিথি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। হয়তো সে প্রথমবার বুঝতে পারছিল তার মা ঠিক কতটা শক্তিশালী।
প্রিন্সিপাল হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম হাসি দিলেন।
“ম্যাডাম, আসলে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আপনি চাইলে আমরা বসে বিষয়টা আলোচনা করতে পারি।”
আমি ঠান্ডা চোখে তাকালাম।
“আলোচনা?”
“জি ম্যাডাম। শিশুরা তো একটু দুষ্টুমি করেই…”
“একটা আট বছরের শিশুকে অন্ধকার ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা কি এই স্কুলের নিয়মের মধ্যে পড়ে?”
তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, “না না, অবশ্যই না। শারমিন ম্যাডাম হয়তো একটু বেশি কঠোর হয়ে ফেলেছেন।”
কথাটা শুনেই শারমিন ম্যাডাম অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকালেন।
“স্যার! আপনি তো নিজেই বলেছিলেন—”
“চুপ করুন!” মাহবুব কবির হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন।
আমি সবকিছু নীরবে দেখছিলাম।
ক্ষমতাবান মানুষদের একটা স্বভাব আছে। বিপদ আসলে তারা সবার আগে নিজেদের বাঁচাতে চায়।
শারমিন ম্যাডামের চোখে এবার ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, “ম্যাডাম, আমি আসলে ওর ভালোর জন্যই…”
আমি তাকে থামালাম।
“একটা শিশুর খাতায় ‘অকেজো’ লিখে দেওয়া কি তার ভালোর জন্য?”
তিনি চুপ করে গেলেন।
আমি ব্যাগ থেকে তিথির খাতার ছেঁড়া পাতাটা বের করলাম। লাল কালিতে বড় বড় করে লেখা সেই শব্দটা পুরো রুমকে আরও ভারী করে তুলল।
অকেজো।
আমি ধীরে বললাম, “আপনারা জানেন, একটা শিশু প্রথম নিজের পরিচয় কোথা থেকে শেখে?”
কেউ উত্তর দিল না।
“তার পরিবার আর তার শিক্ষক থেকে। আপনারা আজ আমার মেয়েকে শিখিয়েছেন যে সে অকেজো।”
তিথি আবার মাথা নিচু করে ফেলল।
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আদালতে আমি প্রতিদিন অপরাধীদের দেখি। খুনি, দুর্নীতিবাজ, প্রতারক। কিন্তু একটা শিশুর আত্মসম্মান ভেঙে ফেলার মতো নিষ্ঠুরতা খুব কম মানুষই করে।
আমি তিথির পাশে হাঁটু গেড়ে বসলাম।
“মা, আমার দিকে তাকাও।”
সে ধীরে ধীরে তাকাল। চোখদুটো ফুলে গেছে কান্নায়।
আমি তার গাল ছুঁয়ে বললাম, “তুমি অকেজো না। তুমি অন্যদের চেয়ে আলাদা ভাবে শেখো। আর আলাদা হওয়া কোনো অপরাধ না।”
তিথি কাঁপা গলায় বলল, “কিন্তু ম্যাডাম বলেছে আমি সবার জন্য সমস্যা।”
আমার ভেতরের মা তখন চিৎকার করতে চাইছিল। কিন্তু আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম।
“সমস্যা তুমি না মা। সমস্যা হলো যারা বুঝতে শেখেনি।”
রুমের কেউ একটা শব্দও করছিল না।
হঠাৎ দরজায় নক পড়ল।
একজন অফিস সহকারী ভেতরে ঢুকে কাঁপা গলায় বলল, “স্যার… বাইরে কয়েকজন পুলিশ এসেছে।”
মাহবুব কবির যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
তার মুখে আবার আত্মবিশ্বাস ফিরতে শুরু করল।
“দেখলেন?” তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন। “আমি বলেছিলাম না? মিস্টার ইয়াসিন আমার খুব ঘনিষ্ঠ।”
তার কথার কয়েক সেকেন্ড পরই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন একজন লম্বা, গম্ভীর চেহারার মানুষ। পরিপাটি পুলিশ ইউনিফর্ম। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
ডিআইজি ইয়াসিন নীল।
রুমে ঢুকেই তিনি প্রথমে আমাকে দেখলেন। তারপর তিথির দিকে তাকালেন।
আর তার মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
“তিথি মা…”
তিথি দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“ইয়াসিন আঙ্কেল…”
মাহবুব কবিরের মুখের রঙ আবার উধাও হয়ে গেল।
তিনি হতভম্ব হয়ে বললেন, “স্যার… আপনি… আপনি এদের চেনেন?”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে তিথির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর আমার দিকে তাকালেন।
“কি হয়েছে?”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “আমার মেয়েকে স্টোররুমে আটকে রাখা হয়েছিল।”
ইয়াসিনের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেল।
“কে করেছে?”
প্রিন্সিপাল তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন।
“স্যার, আসলে ব্যাপারটা ভুল বোঝাবুঝি—”
“আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি।”
একটা মাত্র বাক্যে পুরো রুম থমকে গেল।
শারমিন ম্যাডাম এবার প্রায় কাঁদার মতো গলায় বললেন, “স্যার, বাচ্চাটা খুব অবাধ্য…”
ইয়াসিন তার দিকে তাকালেন।
“আপনি শিক্ষক?”
“জি…”
“তাহলে অন্তত শিশুদের সাথে মানুষ হিসেবে আচরণ করতে শেখা উচিত ছিল।”
মাহবুব কবির এবার মরিয়া হয়ে উঠলেন।
“স্যার, আপনি জানেন না। এই মহিলা আমাদের হুমকি দিচ্ছেন।”
ইয়াসিন ধীরে আমার দিকে তাকালেন। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন,
“আপনি জানেন এই মহিলা কে?”
প্রিন্সিপাল চুপ।
“বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠোর এবং সৎ বিচারকদের একজন। কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিচয় হলো, তিনি একজন মা।”
রুমে পিনপতন নীরবতা।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে ডেস্কের ওপর রাখা তিথির খাতার পাতাটা হাতে তুলে নিলেন।
অকেজো।
শব্দটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন,
“এই লেখাটা কে লিখেছে?”
শারমিন ম্যাডামের ঠোঁট কাঁপছিল।
“আমি…”
ইয়াসিন মাথা নেড়ে বললেন, “অভিনন্দন। আজ আপনি শুধু একটা শিশুকে অপমান করেননি। নিজের পেশাকেও অপমান করেছেন।”
মাহবুব কবির এবার প্রায় অনুনয়ের সুরে বললেন, “স্যার প্লিজ… ব্যাপারটা মিডিয়ায় গেলে স্কুলের সম্মান শেষ হয়ে যাবে।”
আমি প্রথমবার হালকা হেসে উঠলাম।
“সম্মান?”
আমি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
“সম্মান সেই দিন শেষ হয়েছে, যেদিন আপনারা একটা বাচ্চাকে অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে তার কান্না শুনেও দরজা খোলেননি।”
লোকটা চুপ করে গেল।
আমি ফোনটা তুলে নিলাম।
“ভিডিওটা ইতোমধ্যে তিন জায়গায় ব্যাকআপ হয়ে গেছে। আর আগামীকাল সকালে শিশু অধিকার কমিশন, শিক্ষা বোর্ড আর হাইকোর্টে অফিসিয়ালি জমা পড়বে।”
শারমিন ম্যাডাম কাঁদতে শুরু করলেন।
“ম্যাডাম প্লিজ… আমার চাকরিটা চলে যাবে…”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“আমার মেয়ের শৈশবের ভয়গুলো কি ফিরিয়ে দিতে পারবেন?”
তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
তিথি তখনও আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। আমি বুঝতে পারছিলাম, এতক্ষণে সে একটু নিরাপদ বোধ করছে।
ইয়াসিন ধীরে বললেন, “নীলা, তুমি বাসায় যাও। আমি এখানটা সামলাচ্ছি।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না। আজ সবকিছু আমি নিজের চোখে শেষ হতে দেখব।”
মাহবুব কবির হঠাৎ বললেন, “আপনারা আমাদের ধ্বংস করে দিচ্ছেন।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“না। আপনারা নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই করেছেন।”
বাইরে তখন স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজছে। বাচ্চাদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। অথচ এই রুমের ভেতর কয়েকজন মানুষের মুখে মৃত্যুভয়।
কারণ তারা প্রথমবার বুঝতে পেরেছে, যাকে দুর্বল ভেবেছিল… সে আসলে নীরব ছিল মাত্র।
আর নীরব মানুষের বিচার সবচেয়ে ভয়ংকর হয়।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post