প্রতারক_স্বামীর_স্বপ্নভঙ্গ

 প্রতারক_স্বামীর_স্বপ্নভঙ্গ

প্রতারক_স্বামীর_স্বপ্নভঙ্গ


বার্সেলোনার সেই রাতটা সোহাগির জীবনের সবচেয়ে অস্থির রাতগুলোর একটা হয়ে রইল।
ঘড়ির কাঁটা রাত তিনটা পার করলেও তার চোখে ঘুম আসেনি। বারবার মাথার ভেতর ঘুরছিল মিস্টার ইয়াসিনের শেষ কথাটা।
“এই পুরো ষড়যন্ত্র আরও বড়।”
সোহাগি বিছানার পাশে বসে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। অনেকবার নিজেকে বলেছে, আর কিছু জানার দরকার নেই। অতীতকে যত কম ছোঁয়া যায়, তত ভালো। কিন্তু মানুষের মন সবসময় যুক্তির কথা শোনে না।
বিশেষ করে যখন একটা ভয় বুকের ভেতর ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
হঠাৎ সে খেয়াল করল, পাশের রুমে আয়ান ঘুমের মধ্যে কিছু বলছে।
সে দ্রুত উঠে ছেলের রুমে গেল।
আয়ান অস্থিরভাবে এপাশ ওপাশ করছে।
“না বাবা… যেও না…”
সোহাগির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে ধীরে ছেলের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
কয়েক মিনিট পর আয়ান শান্ত হয়ে গেল।
কিন্তু সোহাগির ভেতরের অস্থিরতা আর থামল না।
ভোরের দিকে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
দূরে সমুদ্রের ওপরে সূর্য উঠছে।
নতুন শহর।
নতুন জীবন।
তবুও কেন মনে হচ্ছে অতীত ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে?
ঠিক তখন ফোনে একটা মেসেজ এল।
অ্যাডভোকেট সাদিকুল ইসলাম।
“জরুরি কথা আছে। কল করুন।”
সোহাগির বুক ধক করে উঠল।
সে দ্রুত কল দিল।
ওপাশে সাদিকুলের গলা অস্বাভাবিক গম্ভীর।
“আপনি শান্ত থাকবেন।”
“কি হয়েছে?”
“গতরাতে মিস্টার ইয়াসিনের ওপর হামলার চেষ্টা হয়েছে।”
সোহাগির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কি!”
“অফিস থেকে বের হওয়ার সময় একটা মোটরবাইক তাকে অনুসরণ করে। গুলি চালানো হয়েছে।”
সোহাগির হাত কেঁপে উঠল।
“তিনি ঠিক আছেন?”
“হ্যাঁ। অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন।”
কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলতে পারল না।
কারণ যতই ঘৃণা থাকুক, এই খবর শুনে তার বুকের ভেতর ভয় কাজ করেছে।
সাদিকুল ধীরে বললেন, “আরও খারাপ খবর আছে।”
“কি?”
“রাকিব নিখোঁজ।”
সোহাগি চোখ বন্ধ করল।
সবকিছু আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে।
“পুলিশ কি বলছে?”
“তারা সন্দেহ করছে কোম্পানির টাকার পেছনে বড় একটা চক্র আছে।”
ফোন রাখার পর সোহাগি দীর্ঘক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তার মাথার ভেতর এখন শুধু একটা প্রশ্ন।
ইয়াসিন আসলে কোন জালে জড়িয়ে পড়েছে?
অন্যদিকে ঢাকায় সকালটা ছিল বিশৃঙ্খল।
মিস্টার ইয়াসিন হাসপাতালের কেবিনে বসে ছিল।
বাম হাতে ব্যান্ডেজ।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
গত রাতের ঘটনা এখনও মাথার ভেতর ঘুরছে।
গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার কয়েক মিনিট পরই কালো মোটরবাইক তার গাড়ির পাশে আসে।
তারপর হঠাৎ গুলির শব্দ।
ড্রাইভার দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে না নিলে হয়তো আজ সে বেঁচে থাকত না।
ঠিক তখন দরজা খুলে পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব রহমান ভেতরে ঢুকলেন।
গম্ভীর মুখ।
“আপনার কিছু শত্রুর নাম জানতে চাই।”
ইয়াসিন তিক্ত হাসল।
“এই মুহূর্তে তালিকা অনেক বড়।”
মাহবুব চেয়ার টেনে বসলেন।
“আপনার কোম্পানির টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।”
“আমি জানি না।”
“কিন্তু সব অনুমোদন আপনার।”
ইয়াসিন চোখ তুলে তাকাল।
“আপনি কি মনে করেন আমি নিজেই নিজের জীবন ধ্বংস করেছি?”
মাহবুব চুপ।
কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে বললেন, “আমি মনে করি আপনি কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেছিলেন।”
এই কথাটা শুনে ইয়াসিনের মাথায় হঠাৎ সোহাগির মুখ ভেসে উঠল।
সে একসময় বলেছিল, “সবাইকে বিশ্বাস করা বুদ্ধিমানের কাজ না, ইয়াসিন।”
আর সে হাসতে হাসতে বলেছিল, “যারা আমার সঙ্গে খায়, তারা কখনো আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।”
আজ সেই কথাগুলো কানের ভেতর বিষের মতো বাজছে।
ঠিক তখন কেবিনের বাইরে হৈচৈ শুরু হলো।
রওশন আরা দ্রুত ভেতরে ঢুকলেন।
তার মুখ ফ্যাকাশে।
“ইয়াসিন…”
“কি হয়েছে?”
তিনি কাঁপা হাতে একটা ফোন এগিয়ে দিলেন।
“টিভি দেখ।”
ইয়াসিন ফোনে নিউজ চালু করতেই তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
স্ক্রিনে তানিয়া রহমান।
সে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
“আমি নির্দোষ… ইয়াসিন সব জানত…”
ইয়াসিনের চোখ লাল হয়ে উঠল।
তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “সব টাকা তার অনুমতিতেই সরানো হয়েছে… আমি শুধু যা বলেছে তাই করেছি…”
ইয়াসিন দাঁত চেপে ফোন বন্ধ করল।
রওশন আরা আতঙ্কিত গলায় বললেন, “ও মিথ্যা বলছে, তাই না?”
ইয়াসিন কিছু বলল না।
কারণ এই মুহূর্তে সে বুঝে গেছে—
যারা ডুবছে, তারা বাঁচার জন্য অন্যকেও টেনে ডুবায়।
এদিকে বার্সেলোনায় সোহাগি আয়ান আর আয়েশাকে নিয়ে সমুদ্রের পাশে গিয়েছিল।
অনেকদিন পর বাচ্চাদের মুখে একটু হাসি দেখা যাচ্ছে।
আয়েশা বালুর ওপর দৌড়াচ্ছে।
আয়ান দূরে ফুটবল খেলছে কিছু বাচ্চার সঙ্গে।
সোহাগি বেঞ্চে বসে তাদের দেখছিল।
ঠিক তখন তার পাশে এসে বসলেন আরমান চৌধুরী।
“আজ আপনাকে একটু শান্ত লাগছে।”
সোহাগি হালকা হাসল।
“হয়তো।”
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আপনি চাইলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?”
“জি?”
“আপনি এখনও তাকে ভালোবাসেন?”
প্রশ্নটা শুনে সোহাগি থেমে গেল।
দূরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ভালোবাসা হঠাৎ শেষ হয় না।”
“তাহলে?”
“কিন্তু কিছু আঘাত আছে, যেগুলো ভালোবাসার থেকেও গভীর।”
আরমান মাথা নেড়ে চুপ হয়ে গেলেন।
ঠিক তখন আয়ান দৌড়ে এসে বলল, “মা! দেখো আমি গোল করেছি!”
সোহাগির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাকে বাঁচিয়ে রাখছে।
কিন্তু সেই শান্ত মুহূর্ত বেশি সময় টিকল না।
রাতে বাসায় ফেরার পর দরজার সামনে একটা খাম পড়ে থাকতে দেখা গেল।
কেউ নাম লিখেনি।
আরমান দ্রুত খাম খুলে ভেতরের কাগজ বের করলেন।
তার মুখ মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে গেল।
“কি হয়েছে?” সোহাগি জিজ্ঞেস করল।
আরমান ধীরে ছবিগুলো তার হাতে দিলেন।
সোহাগির হাত কেঁপে উঠল।
ছবিগুলোতে সে নিজে।
আয়ান।
আয়েশা।
আজ বিকেলের সমুদ্র সৈকতের ছবি।
মানে কেউ তাদের অনুসরণ করছে।
খামের ভেতরে একটা ছোট্ট নোট।
“বাংলাদেশ থেকে এত দূরে গিয়েও সব সত্য লুকানো যায় না।”
সোহাগির বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
আরমান দ্রুত বললেন, “আমি এখনই নিরাপত্তা বাড়াচ্ছি।”
“কে এটা করতে পারে?”
আরমান ধীরে বললেন, “যদি সত্যিই বড় কোনো চক্র জড়িত থাকে, তাহলে হয়তো আপনি ভাবার থেকেও বেশি কিছু জানেন।”
সোহাগি হতভম্ব হয়ে গেল।
“আমি তো কিছুই জানি না!”
“হয়তো আপনি জানেন না যে আপনি কি জানেন।”
কথাটা শুনে তার মাথা ঘুরে উঠল।
ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।
ভিডিও কল।
মিস্টার ইয়াসিন।
সোহাগি কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় থেকে কল ধরল।
ওপাশে ইয়াসিনকে আরও ক্লান্ত লাগছে।
সে ধীরে বলল, “তুমি ঠিক আছ?”
সোহাগি অবাক হয়ে গেল।
“তুমি গুলিবিদ্ধ হয়েছ, তবুও প্রথম প্রশ্ন এটা?”
ইয়াসিন তিক্ত হাসল।
“কারণ আমি জানি ওরা শুধু আমার পেছনে না।”
সোহাগির বুক ধক করে উঠল।
“মানে?”
“তুমি যে খাম পেয়েছ, আমি জানি।”
সোহাগি জমে গেল।
“তুমি কিভাবে জানো?”
“কারণ একই খাম আমার কাছেও এসেছে।”
ইয়াসিন ক্যামেরার সামনে একটা ছবি ধরল।
একই ধরনের ছবি।
তারপর ধীরে বলল, “সোহাগি… তুমি আর বাচ্চারা বিপদে আছ।”
সোহাগির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“সব পরিষ্কার করে বলো।”
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “রাকিব শুধু আমার ব্যবসায়িক পার্টনার না। সে একটা মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত।”
“কি!”
“আমি জানতাম না। কিন্তু এখন বুঝছি কোম্পানিকে ব্যবহার করা হয়েছে।”
সোহাগির মাথা ঘুরতে লাগল।
“আর আমাদের সঙ্গে এর সম্পর্ক?”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “কারণ কিছু ডকুমেন্ট তোমার নামে ট্রান্সফার হয়েছে।”
সোহাগির নিঃশ্বাস আটকে গেল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই খাম।
ব্যাংক পেপার।
সম্পত্তির কাগজ।
সবকিছু।
ইয়াসিন নিচু গলায় বলল, “যদি ওরা ভাবে সেই কাগজ তোমার কাছে আছে… তাহলে ওরা তোমাকে চুপ করাতে চাইবে।”
সোহাগি কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না।
তার চারপাশের দেয়াল যেন হঠাৎ সংকুচিত হয়ে আসছে।
সে শুধু একটাই কথা ভাবছিল।
আয়ান।
আয়েশা।
তার সন্তানরা।
হঠাৎ আয়েশা ঘুমজড়ানো চোখে রুমে এসে দাঁড়াল।
“মা… তুমি কাঁদছ?”
সোহাগি দ্রুত চোখ মুছে মেয়েকে বুকে টেনে নিল।
ইয়াসিন স্ক্রিনের ওপাশ থেকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে এমন ভয়, যা সোহাগি আগে কখনো দেখেনি।
সে ধীরে বলল, “আমি কাল স্পেনে আসছি।”
সোহাগির বুক কেঁপে উঠল।
“না।”
“এবার এটা শুধু আমাদের ব্যাপার না।”
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না।”
ইয়াসিন মাথা নিচু করল।
“জানি। কিন্তু তুমি যদি আমাকে ঘৃণাও করো, তবুও আমি আমার সন্তানদের বিপদে রেখে দূরে বসে থাকতে পারব না।”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর সোহাগি ধীরে কল কেটে দিল।
সে মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
আর তার মনে হচ্ছিল
তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়টা হয়তো এখনই শুরু হতে যাচ্ছে।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post