আমি_এক_গরীব_স্বামীর_স্ত্রী

 আমি_এক_গরীব_স্বামীর_স্ত্রী

আমি_এক_গরীব_স্বামীর_স্ত্রী


আমার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে পুরো উঠোনে হঠাৎ হইচই শুরু হয়ে গেল।
অন্ধকারের ভেতর মানুষজন দৌড়াদৌড়ি করছে। কেউ মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালাচ্ছে, কেউ আবার ভয়ে চিৎকার করছে।
আমি আতঙ্কে পিছিয়ে যেতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ঠিক তখনই একটা শক্ত হাত আমার কবজি ধরে ফেলল।
আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম।
পরের মুহূর্তেই পরিচিত গলা শুনলাম।
“সিমরান, আমি।”
মিস্টার ইয়াসিন।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে তার শার্ট শক্ত করে চেপে ধরলাম। অন্ধকারের মধ্যেও অনুভব করতে পারছিলাম, তিনি একদম স্থির হয়ে আছেন।
যেন এই ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে তিনি আগেও বহুবার লড়েছেন।
কয়েক সেকেন্ড পর চারপাশে কয়েকটা শক্তিশালী টর্চ জ্বলে উঠল।
ইয়াসিনের লোকজন দ্রুত পুরো উঠোন ঘিরে ফেলেছে।
রফিক চিৎকার করে বলল, “সবাই সাবধান! কেউ বাইরে যাবে না!”
আমি এখনও কাঁপছিলাম।
ইয়াসিন খুব নিচু গলায় বললেন, “ভয় পেও না। আমি আছি।”
তার কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরের আতঙ্কটা একটু কমল।
ঠিক তখনই বিদ্যুৎ আবার ফিরে এলো।
চারপাশ আলোয় ভরে উঠতেই সবাই দ্রুত এদিক-ওদিক তাকাতে শুরু করল।
কিন্তু আশেপাশে সন্দেহজনক কাউকে দেখা গেল না।
যেন অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষটাও মিলিয়ে গেছে।
রফিক এসে বলল, “স্যার, পুরো এলাকা চেক করেছি। কাউকে পাওয়া যায়নি।”
ইয়াসিনের চোখ ঠান্ডা হয়ে উঠল।
“ওরা কাছেই আছে।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। “আপনি এত নিশ্চিত কীভাবে?”
তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর নিচু গলায় বললেন, “কারণ এই কণ্ঠ আমি আগে শুনেছি।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কে সে?”
ইয়াসিন উত্তর দিলেন না।
বরং তিনি স্থির চোখে অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মনে হচ্ছিল, তার মাথার ভেতর অনেক পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসছে।
ঠিক তখনই আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল, “স্যার… তাহলে কি রিয়াজ সত্যিই বেঁচে আছে?”
নামটা শুনেই আমি খেয়াল করলাম, ইয়াসিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
আমি ধীরে বললাম, “রিয়াজ কে?”
ইয়াসিন এবার খুব ধীরে আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে এমন এক ক্লান্তি ছিল, যা আমি আগে দেখিনি।
তিনি শান্ত গলায় বললেন, “যে মানুষটা একসময় আমার সবচেয়ে কাছের ছিল।”
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
চারপাশের সব শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, “আজ থেকে ছয় বছর আগে আমি শুধু ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তখন আমার সবচেয়ে বিশ্বাসের মানুষ ছিল রিয়াজ।”
তিনি থামলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “আমি তাকে ভাইয়ের থেকেও বেশি বিশ্বাস করতাম।”
তার কণ্ঠের ভেতরের কষ্টটা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম।
“কিন্তু একদিন আমি জানতে পারি, সে আমার কোম্পানির টাকা পাচার করছে। শুধু তাই না… আমার ব্যবসা ধ্বংস করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলাম।
“আমি তাকে থামাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে পালিয়ে যায়। তারপর এক রাতে তার গাড়ি পাহাড়ি রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়।”
আরিয়ান নিচু গলায় বলল, “সবাই ভেবেছিল সে মারা গেছে।”
ইয়াসিন ধীরে মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। আমিও তাই ভেবেছিলাম।”
আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত শীতলতা নেমে এলো।
“তাহলে… সে এখন ফিরে এসেছে?”
ইয়াসিন এবার সরাসরি উত্তর দিলেন।
“হয়তো প্রতিশোধ নিতে।”
চারপাশের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল।
আমি হঠাৎ অনুভব করলাম, আমি অজান্তেই খুব বড় একটা যুদ্ধের মাঝে এসে পড়েছি।
ঠিক তখনই ইয়াসিনের ফোন আবার বেজে উঠল।
তিনি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে দ্রুত কিছু বলা হলো।
তার মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল।
“কি বলছ?”
ওপাশের কথা শুনে তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “আমি এখনই আসছি।”
ফোন কেটে তিনি রফিকের দিকে তাকালেন।
“গাড়ি বের করো।”
আমি দ্রুত বললাম, “কি হয়েছে?”
তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর নিচু গলায় বললেন, “আমার পুরোনো ফ্যাক্টরিতে বিস্ফোরণ হয়েছে।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“কেউ আহত হয়েছে?”
“দুইজন।”
তার গলায় চাপা রাগ স্পষ্ট।
আমি বুঝতে পারছিলাম, পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হচ্ছে।
ঠিক তখনই তিনি হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন।
“তুমি আমার সঙ্গে যাবে।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। “আমি?”
“হ্যাঁ।”
আরিয়ান দ্রুত বলল, “স্যার, এটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন, “ওকে একা রেখে যাওয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ।”
আমি আর কিছু বললাম না।
কয়েক মিনিট পর আমরা গাড়িতে উঠলাম।
রাতের শহর দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছিল।
গাড়ির ভেতর চাপা নীরবতা।
আমি বারবার ইয়াসিনের দিকে তাকাচ্ছিলাম।
তার মুখ সম্পূর্ণ কঠিন।
চোখদুটো স্থির।
মনে হচ্ছিল, তিনি এখন আর শুধু ব্যবসায়ী নন… যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একজন মানুষ।
হঠাৎ আমি ধীরে বললাম, “আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “নিজের জন্য না।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
তিনি আবার জানালার বাইরে তাকালেন।
“যাদের আমি নিজের মানুষ ভাবি… তাদের হারানোর ভয় পাই।”
কথাটা শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেল।
এই মানুষটা কখন যেন আমার হৃদয়ের ভেতরে জায়গা করে ফেলেছে, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।
একসময় গাড়ি বিশাল একটা ফ্যাক্টরির সামনে এসে থামল।
চারপাশে আগুনের পোড়া গন্ধ।
দমকলের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
কর্মচারীরা আতঙ্কিত মুখে দৌড়াদৌড়ি করছে।
আমরা নামতেই সবাই সম্মান নিয়ে সরে দাঁড়াল।
“স্যার!”
ইয়াসিন দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেলেন।
আমি তার পেছন পেছন হাঁটছিলাম।
ঠিক তখনই হঠাৎ ওপরের ভাঙা কাঁচের দিক থেকে একটা শব্দ এলো।
আমি মুখ তুলে তাকাতেই দেখলাম, একটা ভারী লোহার পাইপ ওপর থেকে পড়ে আসছে।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে আমি নড়তেও পারলাম না।
ঠিক সেই মুহূর্তে ইয়াসিন ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
ধাম!
পাইপটা আমাদের পাশেই পড়ল।
চারপাশে চিৎকার শুরু হয়ে গেল।
আমি আতঙ্কে কাঁপছিলাম।
ইয়াসিন আমাকে শক্ত করে ধরে আছেন।
তার কপাল কেটে রক্ত বের হচ্ছে।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আপনার রক্ত…”
তিনি যেন সেটা গুরুত্বই দিলেন না।
বরং চারপাশে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, “সব দরজা বন্ধ করো!”
তার কণ্ঠে এমন রাগ ছিল যে সবাই থমকে গেল।
ঠিক তখনই ওপরের ভাঙা অংশে একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেল।
লোকটা কালো পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে।
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
“অনেকদিন পর দেখা হলো, ইয়াসিন।”
আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
ইয়াসিন স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন।
“রিয়াজ।”
লোকটা হেসে উঠল।
“তুমি এখনও আগের মতোই বুদ্ধিমান।”
আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
রিয়াজের চোখ হঠাৎ আমার দিকে গেল।
“এই মেয়েটার জন্যই তুমি দুর্বল হয়ে গেছো, তাই না?”
ইয়াসিনের চোখ মুহূর্তে ভয়ংকর হয়ে উঠল।
“তার নাম মুখে আনবে না।”
রিয়াজ হেসে বলল, “দেখলে? এটাই তোমার সমস্যা। তুমি মানুষকে ভালোবাসতে শুরু করেছ।”
আমি অনুভব করলাম, ইয়াসিনের হাত আরও শক্ত হয়ে গেছে।
রিয়াজ ধীরে ধীরে বলল, “তোমার সবকিছু ধ্বংস করতে আমি ফিরে এসেছি।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন, “তুমি আগেও হেরেছিলে।”
“না,” রিয়াজ হাসল, “আগে আমি লোভী ছিলাম। এবার আমি শুধু প্রতিশোধ চাই।”
হঠাৎ সে পকেট থেকে একটা রিমোট বের করল।
আমার বুক ধক করে উঠল।
ইয়াসিন গর্জে উঠলেন, “রিয়াজ!”
কিন্তু ততক্ষণে সে বোতামে চাপ দিয়েছে।
পুরো ভবন কেঁপে উঠল।
চারদিকে বিস্ফোরণের শব্দ।
মানুষ চিৎকার করতে লাগল।
আমি আতঙ্কে ইয়াসিনকে জড়িয়ে ধরলাম।
তিনি দ্রুত আমাকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন।
চারপাশে ধোঁয়া আর আগুন।
হঠাৎ একটা ভাঙা অংশ আমাদের সামনে পড়ে রাস্তা আটকে দিল।
আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, “আমরা কি বের হতে পারব?”
ইয়াসিন আমার মুখ দুহাতে ধরে বললেন, “আমার দিকে তাকাও।”
আমি কাঁপা চোখে তার দিকে তাকালাম।
তিনি খুব শান্ত গলায় বললেন, “তুমি কিছু হবে না। আমি থাকতে তোমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না।”
জানি না কেন… সেই মুহূর্তে আমি তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলাম।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরিয়ানের গলা ভেসে এলো।
“স্যার!”
ইয়াসিন দ্রুত শব্দের দিকে এগোলেন।
কয়েক মিনিটের ভয়ংকর লড়াইয়ের পর আমরা অবশেষে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
আমি হাঁপাচ্ছিলাম।
পেছনে পুরো ফ্যাক্টরি আগুনে জ্বলছে।
পুলিশ এসে গেছে।
চারপাশে বিশৃঙ্খলা।
ঠিক তখনই পুলিশ একজন আহত লোককে ধরে নিয়ে এলো।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম… সে রিয়াজ।
তার পায়ে গুলি লেগেছে।
রিয়াজ রক্তাক্ত মুখে হাসছিল।
সে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি জিতেছো।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন, “আমি কখনও তোমার শত্রু হতে চাইনি।”
রিয়াজ তিক্ত হাসল। “কিন্তু আমি সবসময় তোমার মতো হতে চেয়েছিলাম।”
পুলিশ তাকে নিয়ে চলে গেল।
চারপাশ ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল।
আমি ক্লান্ত শরীরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
ঠিক তখনই ইয়াসিন ধীরে ধীরে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তার কপালের রক্ত এখনও শুকায়নি।
তিনি খুব আস্তে বললেন, “ভয় পেয়েছিলে?”
আমার চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল।
আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না।
হঠাৎ তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম।
“আমি ভেবেছিলাম… আপনাকে হারিয়ে ফেলব।”
কয়েক সেকেন্ড তিনি স্থির হয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
আমি তার বুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
তিনি নিচু গলায় বললেন, “আমি এতদিন শুধু বেঁচে ছিলাম, সিমরান।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
তিনি খুব ধীরে বললেন, “কিন্তু তোমাকে পাওয়ার পর প্রথমবার মনে হচ্ছে… আমি সত্যিই একটা জীবন পেয়েছি।”
আমার চোখ আবার ভিজে উঠল।
দূরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
নতুন সকাল।
নতুন জীবন।
কয়েক মাস পর…
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
বাতাসে হালকা রোদ।
পেছন থেকে ইয়াসিন এসে শান্তভাবে আমার পাশে দাঁড়ালেন।
তার মুখে আগের সেই কঠিনভাব নেই।
বরং অদ্ভুত প্রশান্তি।
আমি হেসে বললাম, “জানেন, এখনও বিশ্বাস হয় না… আমি সেই গরিব শ্রমিকের স্ত্রী।”
তিনি হেসে ফেললেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “আর আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না… এত কষ্টের পরও কেউ আমাকে ভালোবাসতে পেরেছে।”
আমি তার হাত শক্ত করে ধরলাম।
দূরে আকাশে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল।
আর আমি মনে মনে বুঝলাম…
কিছু মানুষকে প্রথম দেখায় চেনা যায় না।
কারণ তাদের আসল পরিচয় লুকিয়ে থাকে হৃদয়ের গভীরে।
সমাপ্ত।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post