ভালোবাসার_সুপ্তচিহ্ন

 ভালোবাসার_সুপ্তচিহ্ন


বেলকনির পর্দা সরাতেই সামনে আরিয়ানকে দেখে তাসমিন ভয় পেয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। হাতের জায়নামাজ প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
— “আপনি!”
তার চোখ-মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। তারপর ভয়টা মুহূর্তেই রাগে বদলে গেল।ভুরু কুঁচকে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
— “আপনি আমার বেলকনিতে কি করছেন?”
আরিয়ান তখনো হাঁপাচ্ছে। এত কষ্ট করে মই বেয়ে উঠেছে। সে বিরক্ত গলায় বলল,
— “কখন থেকে ডাকছি। দরজা খুলছিলি না কেন?”
তাসমিন ঠোঁট বাঁকায়।
— “আমার রুম, আমার দরজা। তাই খুলিনি। আপনার সমস্যা?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। মেয়েটার চোখ এখনো লাল। কিন্তু মুখে সেই আগুনে রাগ।তাসমিন হাত গুটিয়ে বলল,
— “যান এখান থেকে।”
আরিয়ান ফুস করে শ্বাস ফেলল। তারপর একটু শান্ত গলায় বলল,
— “তোর সাথে কথা আছে আমার।”
তাসমিন এক সেকেন্ডও দেরি না করে বলে দিল,
— “আপনার সাথে আমার কোনো কথা থাকতে পারে বলে মনে হয় না।”
বলেই ঘুরে চলে যেতে নিল। ঠিক তখনই আরিয়ান খপ করে তাসমিনের হাতে থাকা জায়নামাজটা ধরে ফেলল। তাসমিন থমকে গেল। পিছনে না তাকিয়েই বিরক্ত গলায় বলল,
— “এটা ধরেছেন কেন? ছাড়ুন।”
আরিয়ান দাঁত চেপে বলল,
— “বললাম না কথা আছে আমার?”
তাসমিন এবার ঘুরে দাঁড়াল। চোখ-মুখ শক্ত।
— “আমার কোনো কথা নেই বললাম তো। যান আপনি আমার রুম থেকে।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর আরিয়ান ধীরে, খুব ধীরে বলল,
— “সরি…”
তাসমিন থমকে গেলেও পরক্ষণেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কষ্ট ছিল, অভিমান ছিল।
— “আমার মতো বেয়াদব মেয়ের সাথে আপনার কথা থাকতে পারে না।”
কথাগুলো শুনে আরিয়ানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছে মেয়েটা সকাল থেকেই কষ্ট পেয়ে আছে। কিন্তু তাসমিন থামল না।
— “আর এই রাত বিরেতে একজন অবিবাহিত মেয়ের ঘরে এসেছেন। এটা খারাপ দেখায়।”
এই কথাটাতেই আরিয়ানের মেজাজ হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। সে এক ধাপ সামনে এগিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
— “বেশি বুঝলে কানের নিচে একটা মারবো, মাথামোটা কোথাকার!”
তাসমিন চমকে উঠল। আরিয়ান এবার রাগে গর্জে উঠল,
— “আমি তোর সাথে এখানে খারাপ কিছু করতে এসেছি? এমন মনে হয় তোর?”
তাসমিন একটু কেঁপে উঠলেও নিজেকে সামলে নিল।
— “আমি সেটা বলিনি।কিন্তু মানুষ দেখলে কি ভাববে?”
আরিয়ান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,
— “মানুষ জাহান্নামে যাক। আমি এসেছি তোর সাথে কথা বলতে।”
তাসমিন হেসে ফেলল। তবে সেই হাসি বিদ্রূপের।
— “আমার সাথে? সকালবেলা পুরো ক্লাসের সামনে অপমান করার পর?এখন আবার কথা বলতে এসেছেন?”
আরিয়ান চুপ। তাসমিনের গলা এবার কেঁপে উঠল।
— “জানেন আমার কতো অপমান লেগেছে? সবাই আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল মাটির নিচে ঢুকে যাই।”
আরিয়ান নিচু গলায় বলল,
— “তুইও তো সীমা ছাড়িয়ে গেছিলি। ক্লাসে এভাবে তর্ক করছিলি কেন?”
তাসমিন রেগে উঠল।
— “করবো না? আপনি কি কম বলেছেন? সবসময় ধমক, রাগ, অপমান! আমি কি আপনার খেলনা?”
আরিয়ান এবার ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে এলো।
তাসমিন পিছিয়ে গেল।
— “দূরে থাকুন।”
আরিয়ান থেমে গেল। চোখ দুটো গভীর হয়ে উঠেছে।
আরিয়ান এবার বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলল, “এই মেয়ের এত রাগ কেন?”
— “আচ্ছা সরি বলছি তো!”
তাসমিন ঝট করে বলে উঠল,
— “আপনার সরি আমার লাগবে না। যান। আপনার ওই স্পেশাল মানুষের কাছে যান।”
আরিয়ান এবার ভুরু কুঁচকে তাকাল।
— “আবার সেই কথা?”
তাসমিন চোখের পানি আটকাতে আটকাতে বলল,
— “হ্যাঁ বলবো! আপনি নিজেই তো বলেছিলেন।আপনার স্পেশাল মানুষ আছে। তাহলে আমার কাছে কেন এসেছেন?”
__“ আমার স্পেশাল মানুষ আছে শুনে তুই জেলাস হচ্ছিস আরিয়া.?? "
আরিয়ানের কথায় তাসমিন যেন হঠাৎ থমকে গেল।
চোখদুটো বড় বড় করে তাকাল ওর দিকে।গলাটা একটু কেঁপে গেল তবুও নিজেকে সামলে নিল সে,
— “আমি জেলাস হতে যাবো কেন? আপনার জীবন, আপনার স্পেশাল মানুষ… থাকতেই পারে। তাতে আমার কি?”
আরিয়ান ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।
তারপর ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে এলো।
— “সত্যি?”
তাসমিন বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
— “হ্যাঁ সত্যি।”
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
— “কিন্তু আমি তো অন্য কিছুর গন্ধ পাচ্ছি।”
তাসমিন কপাল কুঁচকে তাকাল।
— “মানে?”
আরিয়ান নিচু হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “হিংসার গন্ধ। একদম টাটকা।”
তাসমিন রাগে লাল হয়ে গেল। আরিয়ান হেসে ফেলল। ওকে আর একটু রাগানোর জন্য বলে,
— “ তুই জানিস আমার স্পেশাল মানুষ খুব সুন্দর…একেবারে পরীর মতো সুন্দর! রাগ করলে মিষ্টি লাগে, হাসে মিষ্টি লাগে। তাকে সব ভাবেই মিষ্টি লাগে। ”
তাসমিন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— “তা আমাকে শুনাচ্ছেন কেন? যান গিয়ে তাকেই বলুন।”
আরিয়ান এবার মজা পেয়ে গেল। সে নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “তাকে তো বলি আমি কিন্তু তুই রাগ করছিস কেনো।”
তাসমিনের বুক ধক করে উঠল।
তবুও জোর করে কঠিন গলায় বলল,
— “আমি কেন রাগ করবো? আপনার প্রেমিকা আছে, বউ আছে, দশটা মানুষ থাকুক। আমার কিছু যায় আসে না।”
আরিয়ান এবার একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
— “কিন্তু তোর চোখ তো অন্য কথা বলছে।”
তাসমিন দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। কারণ সত্যিই চোখদুটো ভিজে উঠেছে। আরিয়ান সেটা দেখেই নরম হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বলল,
— “এত কষ্ট পেয়েছিস?”
তাসমিন ঠোঁট কামড়ে ধরে রইল। কিছু বলল না।
আরিয়ান এবার দুই কান ধরে দাঁড়িয়ে গেল।
— “আচ্ছা সরি। ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো তোকে কাঁদাবো না। বকাও দিবো না।”
তাসমিন কিছুতেই আরিয়ানের কথা শুনতে রাজি না।
মেয়েটা যেন ঠিক করে ফেলেছে আজ তাকে একটাও সুযোগ দেবে না। আরিয়ান যতবার কিছু বলতে যায়, ততবারই তাসমিন রাগী গলায় থামিয়ে দেয়।
— “আপনি এখনই বের হয়ে যান আমার রুম থেকে।আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না।”
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে চুলে হাত চালাল।
— “আরে আগে শুন তো…”
— “শুনতে চাই না!”
— “আরিয়া—”
— “প্লিজ বের হন!”
ওর গলা কেঁপে যাচ্ছে। চোখ দুটো লাল। কান্না আটকাতে গিয়ে আরও বেশি রাগী লাগছে তাকে।
আরিয়ান এবার একটু নরম হয়ে বলল,
— “আমার উপর এত রাগ কেন তোর? বকেছি বলে?আচ্ছা সরি। আর বকবো না, কথা দিলাম।কানেও ধরছি ।”
তাসমিন মুখ ফিরিয়ে নেয়। একটাও উত্তর দেয় না। আরিয়ান এবার সত্যি সত্যি ধৈর্য হারাতে শুরু করল।
এই মেয়েটা তাকে একটা কথাও শেষ করতে দিচ্ছে না। সে সামনে এগিয়ে এসে বলল,
— “তুই কি চাস আমি সারারাত দাঁড়িয়ে থাকি
এখানে?”
তাসমিন এবার দরজার দিকে আঙুল তুলে বলল,
— “বের হন। নাহলে আমি চিৎকার করবো।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
তারপর হঠাৎ করেই এগিয়ে এলো। তাসমিন বুঝে উঠার আগেই,এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নিল!
তাসমিন চমকে উঠে দুহাতে আরিয়ানের শার্ট খামচে ধরল।
— “এই কি করছেন আপনি! শয়তান লোক! ছাড়ুন আমায়!”
সে ছটফট করতে লাগল। পা ছুঁড়ছে, হাত দিয়ে মারছে।
— “আমি চিৎকার করবো কিন্তু!”
আরিয়ান দাঁত চেপে বলল,
— “কর। আমার কোনো সমস্যা নেই। ”
তাসমিনের চোখ কোটর থেকে বের হওয়ার উপক্রম।
— “ইয়া আল্লাহ আপনার লজ্জা নেই?”
আরিয়ান গম্ভীর মুখে বলল,
— “এই মুহূর্তে না।”
তাসমিন প্রায় কেঁদে ফেলল।
— “নামান আমাকে…প্লিজ…”
আরিয়ান এবার একটু ধমক দিয়ে বলল,
— “একদম চুপ। অনেক বলেছিস। এখন আমি যা বলবো তাই হবে।”
তাসমিন সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। তার বুক ধড়ফড় করছে। মেয়েটা কাঁপা গলায় বলল,
— “কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সোজা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এলো তাসমিনকে কোলে নিয়েই। করিডোরে বের হতেই ঠান্ডা বাতাস লাগল। তাসমিন লজ্জা আর ভয়েতে মরে যাচ্ছে। সে ফিসফিস করে বলল,
— “নামান…কেউ দেখে ফেলবে…”
আরিয়ান এবার নিচু গলায় বলল,
— “দেখুক। তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”
তাসমিন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
লোকটার চোখমুখে আজ অন্যরকম জেদ। মনে হচ্ছে আজ যা বলতে এসেছে, না বলে যাবে না।
তাসমিন আবার ছটফট শুরু করল।
— “ অস্ট্রেলিয়ার ষাড় ! আমি পড়ে যাবো!”
আরিয়ান শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
— “চুপচাপ থাক। তোকে ফেলবো না।”
তাসমিন এবার সত্যি কেঁদে ফেলল।
— “আপনি খুব খারাপ… অনেক খারাপ…”
আরিয়ান থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিচু গলায় বলল,
— “তোর কাছে খারাপ হলেও সমস্যা নেই।”
তাসমিন এখনো রাগে ফুঁসছে। চোখ লাল হয়ে আছে কান্না করতে করতে। আরিয়ান একটাও কথা না বলে ওর হাত ধরে টানতে টানতে বাড়ির গ্যারেজে নিয়ে এলো। তাসমিন বারবার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।
— “ছাড়ুন আমায়! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না!”
কিন্তু আরিয়ান যেন আজ কিছু শুনতেই পাচ্ছে না।
সে সোজা নিজের বাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হেলমেটটা তাসমিনের হাতে ধরিয়ে দিল।
— “পরে ওঠ।”
তাসমিন অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল।
— “আমি আপনার সাথে কোথাও যাচ্ছি না।”
আরিয়ান এবার কড়া গলায় বলল,
— “আরিয়া, বেশি রাগ দেখাস না। চুপচাপ উঠ।”
তাসমিনের অভিমান আরও বেড়ে গেল। চোখ ভিজে উঠল আবার।
— “আপনি আমাকে জোর করছেন কেন? আমি বাড়ি যাবো…”
আরিয়ান এবার কোনো কথা না বলে ওকে বাইকে বসিয়ে দিল। তারপর নিজেও উঠে বাইক স্টার্ট করল।
তাসমিন পুরো রাস্তা কাঁদতেই থাকল। বারবার বলছে,
— “বাইক থামান…আমি নামবো…আমার ভয় লাগছে…”
কিন্তু আরিয়ান একবারও থামল না। শুধু মাঝে মাঝে আয়নায় তাকিয়ে ওর কান্নাভেজা মুখটা দেখছিল।
অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল বুকের ভিতর।কিছুক্ষণ পর বাইক এসে থামল বিশাল এক শপিং মলের সামনে। বড় বড় অঙ্করে লেখা তাজ ফ্যাশন হাউস। তাসমিন অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল।
— “এখানে কেন এনেছেন আমায়? আমি বাড়ি যাবো।”
আরিয়ান হেলমেট খুলে শান্ত গলায় বলল,
— “চুপচাপ আমার সাথে আয়।”
তাসমিন এবার সত্যিই ভয় আর রাগে গুলিয়ে ফেলল।
— “না! আমি যাবো না!”
বলে উল্টো ঘুরে দৌড় দিল। কিন্তু দুই কদম যেতেই আরিয়ান পিছন থেকে ধরে ফেলল। তাসমিন ছটফট করতে লাগল।
— “ছাড়ুন! আমি বাবাইয়ের কাছে বিচার দিবো! আপনি আমাকে কিডন্যাপ করেছেন!”
আরিয়ান এবার বিরক্ত হয়ে সরাসরি ওকে কোলে তুলে নিল।তাসমিন হতভম্ব। তারপর আরও জোরে কাঁদতে লাগল।
— “নামান আমায়! মানুষ দেখছে!”
আরিয়ান নির্বিকার গলায় বলল,
— “দেখুক। তোর যা ইচ্ছে তাই বল।”
ঠিক তখনই দারোয়ান দ্রুত গেট খুলে দিল। আরিয়ান সোজা ভিতরে ঢুকে গেল তাসমিনকে কোলে নিয়েই।
দারোয়ানরা সম্মান নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাসমিন অবাক হয়ে সব দেখছে। এত রাতে পুরো মল প্রায় ফাঁকা। শুধু হালকা নীল আলো জ্বলছে চারপাশে। নিস্তব্ধ জায়গাটায় ওদের পায়ের শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। আরিয়ান লিফটে উঠে সরাসরি থার্ড ফ্লোরে চলে গেল। তাসমিনের বুক ধুকপুক করছে। সে নিচু গলায় বলল,
— “আমায় এখানে কেন এনেছেন?”
আরিয়ান এবারও উত্তর দিল না। লিফট খুলতেই সে সোজা একটা বড় দোকানের সামনে এসে তাসমিনকে নামিয়ে দিল। তাসমিন বিরক্ত মুখে সামনে তাকিয়েই থমকে গেল। চোখদুটো ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেল।পুরো দোকানটা ভর্তি নরম নরম টেডি বিয়ার। ছোট বড় হাজার রঙের টেডি সাজানো চারপাশে। গোলাপি, সাদা, বাদামি… আর মাঝখানে বিশাল একটা সাদা টেডি।
যেটার গলায় ঝুলছে একটা ছোট্ট কার্ড। তাসমিন অবাক হয়ে কার্ডটার দিকে তাকাল। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা,“আমার রাগী বাচ্চাটার জন্য।” তাসমিন ধীরে ধীরে দোকানের ভিতরে ঢুকল। চারপাশে শুধু টেডি আর টেডি। ছোট ছোট, বড় বড়, গোলাপি, সাদা, বাদামি— কত রঙের যে টেডি আছে গুনেই শেষ করা যাবে না। নরম আলোয় পুরো দোকানটা যেন স্বপ্নের মতো লাগছে। তাসমিন অবিশ্বাস্য চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে। তার মাথায় এখনো ঢুকছে না, এসব সত্যি?
আরিয়ান দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাসমিন একটা ছোট্ট টেডি হাতে তুলে নিয়ে।আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
— “সব তোর।”
তাসমিন চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— “মানে?”
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
— “মানে এগুলো আমার রাগী মেয়ের জন্য।”
তাসমিনের বুকটা কেমন ধক করে উঠল। তাসমিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দোকানের ভিতর হাঁটতে লাগল। একটা বড় সাদা টেডির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এত বড় টেডি সে জীবনে দেখেনি। হাত দিয়ে আলতো ছুঁয়ে দিতেই টেডিটা আরও নরম লাগল।
অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল তার।আরিয়ান দূর থেকে সেটা দেখছিল। মেয়েটা হাসলে কেন যেন তার বুকের ভিতরটা হালকা হয়ে যায়। হঠাৎ সে এগিয়ে এসে তাসমিনের হাত ধরে ফেলল। তাসমিন চমকে উঠল।
— “হাত ধরছেন কেনো ?”
আরিয়ান রহস্যময় গলায় বলল,
— “চল। আরেকটা জিনিস দেখাবো।”
তাসমিন ভ্রু কুঁচকাল।
— “কি দেখাবেন?”
— “আয় আগে।”
আরিয়ান ওকে নিয়ে পাশের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দোকানের কাঁচের ভিতর তাকিয়েই তাসমিন থমকে গেল। মুখের উপর হাত চলে গেল নিজের অজান্তেই। পুরো দোকান জুড়ে শুধু চুড়ি। ঝিকমিক করা হাজার রঙের চুড়ি। লাল, নীল, সোনালি, রুপালি, কালো, সবুজ আর সবচেয়ে বেশি ছিল কাশ্মীরি চুড়ি। সূক্ষ্ম কাজ করা, পাথর বসানো, নরম আলোয় চকচক করছে। দেখতে যেন রাজকুমারীর গহনা। আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল,
— “এই দোকানটাও তোর।”
তাসমিন এবার সত্যি কথা হারিয়ে ফেলল। চোখের পলক পর্যন্ত পড়ছে না। সে শুধু দোকানের দিকে তাকিয়ে আছে।তার মাথায় একটা কথাই ঘুরছে,এই মানুষটা কি সত্যি? নাকি স্বপ্ন দেখছে সে? আরিয়ান ওর মুখের অবস্থা দেখে মুচকি হাসল।
— “কি হলো? এবারও রাগ কমলো না?”
তাসমিন উত্তর দিল না। সে ধীরে ধীরে দোকানের ভিতরে ঢুকে গেল। তার চোখে এখন শিশুর মতো উচ্ছ্বাস। একটার পর একটা চুড়ি হাতে নিয়ে দেখছে।
কখনো আলোয় ধরছে, কখনো নিজের হাতে মিলিয়ে দেখছে। একটা গোলাপি কাশ্মীরি চুড়ি হাতে নিয়ে হঠাৎ থেমে গেল সে। মনে মনে ভাবল, “এগুলো কি সত্যিই আমার?” তার জীবনে কেউ কখনো এভাবে কিছু করেনি। রাগ ভাঙাতে কেউ পুরো দোকান এনে সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় ? অসম্ভব। একদম অসম্ভব।
আরিয়ান ধীরে ধীরে এসে ওর পাশে দাঁড়াল।
— “পছন্দ হয়েছে?”
তাসমিন এবারও কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে হালকা হ্যাঁ করল। আরিয়ান নিচু হয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল।
— “তাহলে? রাগ গেছে?”
তাসমিন সঙ্গে সঙ্গে মুখ শক্ত করে ফেলল।
— “না।”
আরিয়ান হতাশ মুখ করল।
— “এত কিছুর পরও?”
তাসমিন এবার ঠোঁট কামড়ে বলল,
— “আপনি আমাকে অপমান করেছেন। আমি ভুলিনি।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আরিয়ান ধীরে ধীরে কাশ্মীরি চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা হালকা গোলাপি রঙের চুড়ির সেট হাতে তুলে নিল।
আলোয় চুড়িগুলো চিকচিক করে উঠল। তাসমিন তখনও দোকানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সবকিছু হতভম্ব হয়ে দেখছে। এত সুন্দর চুড়ি সে জীবনে একসাথে কখনো দেখেনি। কিন্তু তার থেকেও বেশি অদ্ভুত লাগছে আরিয়ানকে। লোকটা আজ কেমন যেন অন্যরকম। চোখে সেই আগের রাগ নেই। বরং কেমন নরম একটা দৃষ্টি। আরিয়ান চুড়িগুলো হাতে নিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়াল।
— “হাত দে।”
তাসমিন চমকে উঠে বলল,
— “ক.কেন?”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “চুড়ি কি তোর মাথায় পরাবো।”
তাসমিন ঠোঁট কামড়ে চুপ করে গেল। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু হাতটা কাঁপছে। আরিয়ান সেটা খেয়াল করল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল তার।
— “এত ভয় পাচ্ছিস কেন?”
তাসমিন দ্রুত বলল,
— “আমি ভয় পাই নি।”
— “তাহলে হাত কাঁপছে কেন?”
তাসমিন উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে নিজেও জানে না কেন বুকের ভিতরটা এভাবে ধুকপুক করছে।
আরিয়ান ওর হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিল। সাথে সাথে তাসমিনের নিঃশ্বাস আটকে গেল।
লোকটার হাত এত গরম কেন? আর এত শক্ত অথচ ছোঁয়াটা এত সাবধানী কেন?
আরিয়ান খুব ধীরে ধীরে একটা একটা করে চুড়ি পড়াতে লাগল। চুড়ির টুংটাং শব্দে পুরো দোকানটা কেমন নরম হয়ে উঠেছে। তাসমিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার হার্টবিট এত জোরে হচ্ছে যে মনে হচ্ছে আরিয়ানও শুনতে পাচ্ছে। সে চাইলেও চোখ ফিরাতে পারছে না। লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু। আরিয়ান মাথা নিচু করে চুড়ি পড়াচ্ছে।
এলো-মেলো চুলগুলো বারবার কপালে পড়ছে।
তীক্ষ্ণ চোখ দুটো মনোযোগী। চোয়াল শক্ত। আর ঠোঁটের কোণে হালকা গম্ভীরতা। তাসমিনের বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল। হঠাৎ আরিয়ান নিচু গলায় বলল,
— “এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?”
তাসমিন চমকে উঠল।
— “ক.কোথায়?”
আরিয়ান এবার মুখ তুলে তাকাল ওর দিকে। দুজনের চোখ একসাথে আটকে গেল। তাসমিনের গলা শুকিয়ে গেল। আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
— “আমার দিকে।”
তাসমিন তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেলল।
— “আমি তাকাই নি।”
— “মিথ্যা বলিস?”
তাসমিন কিছু বলল না। আরিয়ান এবার শেষ চুড়িটা পড়িয়ে ওর হাতটা একটু তুলে ধরল। চুড়িগুলো আলোয় ঝিকমিক করছে। আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল,
— “ খুব সুন্দর লাগছে তোকে…”
তাসমিনের নিঃশ্বাস আটকে গেল। সে বুঝতে পারছে না আরিয়ান চুড়িকে সুন্দর বলছে নাকি তাকে। তার গাল দুটো ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল। আরিয়ান সেটা দেখেই হেসে ফেলল।
— “ তুই দেখি আবার লজ্জাও পাস?”
তাসমিন সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল। তাসমিন কেঁপে ওঠে। মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা আজ হঠাৎ উল্টে গেছে। একটা মানুষ কি সত্যিই এত কিছু করতে পারে কারও জন্য? আরিয়ান যেন ওর মুখের প্রতিটা অভিব্যক্তি দেখেই মজা পাচ্ছিল। তাসমিন বারবার নিজের হাতের চুড়িটা ছুঁয়ে দেখছে। মনে হচ্ছে বিশ্বাসই করতে পারছে না। ঠিক তখনই আরিয়ান কোথা থেকে একটা কালো ফাইল এনে ওর সামনে ধরল।
— “এই নে।”
তাসমিন কপাল কুঁচকে তাকাল।
— “এটা কি?”
আরিয়ান খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
— “এখানে মলের সব ডকুমেন্টস আছে। দেখে নে।”
তাসমিন ভেবেছিল লোকটা মজা করছে। তাই হেসে ফেলল।
— “আমি কেন দেখবো?”
আরিয়ান ভ্রু তুলে বলল,
— “কারণ মালিক তুই।”
তাসমিন একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— “কি?”
আরিয়ান এবার আরও নির্লিপ্তভাবে বলল,
— “এই পুরো মল এখন তোর নামে। আজ বিকেলেই সব ট্রান্সফার করেছি।”
তাসমিনের হাত থেকে প্রায় চুড়ির বক্স পড়ে যাচ্ছিল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
— “আপনি…মজা করছেন আমার সাথে ?”
আরিয়ান হেসে ফেলল। তাসমিনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। শ্বাস যেন আটকে যাচ্ছে। সে একবার ফাইলের দিকে তাকাচ্ছে, একবার আরিয়ানের দিকে।
মনে হচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে সে চিনতেই পারছে না। এই সেই আরিয়ান? যে দুপুরে ওকে পুরো ক্লাসের সামনে ধমক দিয়েছে? যে রাগলে আগুন হয়ে যায়?
সেই মানুষটাই এখন ওর সামনে দাঁড়িয়ে রাভাঙ্গানোর জন্য পুরো একটা শপিং মল দিয়ে দিচ্ছে? তাসমিন কাঁপা হাতে ফাইলটা নিল। ধীরে ধীরে খুলল। প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা নামটা চোখে পড়তেই তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।“Owner: Ariya Tasmin Chowdhury.” তাসমিনের চোখ বড় হয়ে গেল। শ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে। সে পাতা উল্টাতে গেল। কিন্তু হাত কাঁপছে এত বেশি যে ঠিকমতো ধরতেই পারছে না। আরিয়ান এবার একটু ভয় পেল।
— “এই…আরিয়া কি হইছে তোর ?”
তাসমিন কিছু বলল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তারপর হঠাৎ,মাথা ঘুরে পুরো শরীরটা দুলে উঠল। আরিয়ান চমকে গেল।
— “আরিয়া!”
সে দ্রুত এগিয়ে এসে ওকে ধরে ফেলল। আর এক সেকেন্ড দেরি হলেই মেয়েটা সোজা মেঝেতে পড়ে যেত। তাসমিন নিস্তেজ হয়ে আরিয়ানের বুকে হেলে আছে। চোখ বন্ধ। আরিয়ান পুরো ভয় পেয়ে গেল।
— “এই! আরিয়া চোখ খোল! এই পাগলি!”
সে বারবার ওর গালে হাত চাপড়াতে লাগল।
— “আরিয়া জান আমার চোখ খোল !”
কোনো সাড়া নেই। আরিয়ানের বুক ধকধক করছে।
মাথায় হাজার চিন্তা।সে তাড়াতাড়ি ওকে কোলে তুলে পাশের সোফায় বসাল। পানির বোতল খুলে মুখে ছিটাল।
— “এই! শুনতে পাচ্ছিস জান। আমাকে ভয় দেখাস না প্লিজ ?”
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে খেয়াল করল,তাসমিনের ঠোঁট কাঁপছে। মনে হচ্ছে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।
আরিয়ান কপাল কুঁচকাল। তারপর নিচু হয়ে আরও ভালো করে তাকাল। ঠিক তখনই তাসমিন খুব আস্তে একচোখ খুলে দেখল আরিয়ান কেমন ভয় পেয়েছে।
আর সঙ্গে সঙ্গে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল।
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তাসমিনের ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসিটা দেখেই আরিয়ানের মাথা গরম হয়ে গেল। এক মুহূর্ত আগেও বুকের ভিতরটা যেন থেমে যাচ্ছিল তার। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। আর এই মেয়ে কিনা অভিনয় করছে!
আরিয়ান দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলল,
— “চোখ খোল।”
তাসমিন কেঁপে উঠল। আরিয়ান আরও নিচু গলায় বলল,
— “আমি জানি তুই অভিনয় করছিস, আরিয়া। চোখ খোল ”
তাসমিন ধীরে ধীরে চোখ খুলল। কিন্তু এবার আর তার হাসি পাচ্ছে না। কারণ এই প্রথম সে আরিয়ানকে এত ভয় পাওয়া অবস্থায় দেখেছে। লোকটার চোখ লাল হয়ে গেছে। শ্বাস ভারী। মুখটা শক্ত। মনে হচ্ছে সত্যিই ভয় পেয়েছিল সে। তাসমিন কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তার বুকের ভিতরটাও কেমন কাঁপছে। কারণ জ্ঞান হারানোর অভিনয় করার সময় একটা জিনিস বারবার কানে এসেছে—“জান…আরিয়া…চোখ খোল জান…” এই ডাকগুলো অদ্ভুতভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে তাকে। তাসমিন আস্তে করে উঠে বসল। তারপর নিচু গলায় বলল,
— “আপনি… আমায় বারবার জান বলছিলেন কেন?”
আরিয়ান মুখ ফিরিয়ে নিল। কোনো উত্তর দিল না।
তাসমিন এবার আরও কাছে এগিয়ে এলো।
— “কি হলো?জবাব দিচ্ছেন না কেন? আমাকে জান বলছিলেন কেন?”
আরিয়ান এবার চোখ বন্ধ করল। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কারণ সত্যি বলতে এই মুহূর্তে সে রাগ আর স্বস্তির মাঝখানে আটকে গেছে। মেয়েটা ঠিক আছে দেখে শান্তি লাগছে। আবার ওর এই বোকামিতে রাগও হচ্ছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
— “তুই বুঝবি না।”
তাসমিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “বুঝিয়ে বলুন। আমি শুনতে চাই।”
আরিয়ান এবার ওর দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি দেখে তাসমিনের বুক কেঁপে উঠল। লোকটার চোখে অদ্ভুত কিছু আছে আজ। রাগ, ভয়, অভিমান… সব মিলেমিশে। আরিয়ান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
— “চল।”
তাসমিন হতভম্ব।
— “কোথায়?”
কোনো উত্তর না দিয়ে আরিয়ান দোকান থেকে বের হয়ে গেল। তাসমিন দ্রুত ওর পিছনে বের হলো। পুরো থার্ড ফ্লোর ফাঁকা। কম আলোয় শুধু ওদের ছায়া দেখা যাচ্ছে মেঝেতে। আরিয়ান দ্রুত হাঁটছে। তাসমিন প্রায় দৌড়ে ওর পাশে এসে দাঁড়াল।
— “এই শুনুন! কথা বলছেন না কেন?”
আরিয়ান চুপ। তাসমিন এবার বিরক্ত হয়ে ওর হাত টেনে ধরল।
— “আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি।”
আরিয়ান থেমে গেল। ধীরে ধীরে নিচে তাকাল ওর হাতের দিকে। তাসমিন এখনো ওর হাত ধরে আছে।
মেয়েটা সেটা খেয়াল করতেই তাড়াতাড়ি হাত ছেড়ে দিল। কিন্তু আরিয়ান এবার নিজেই ওর হাত ধরে ফেলল। শক্ত করে। তাসমিন চমকে উঠল।
— “কি করছেন?”
আরিয়ান নিচু গলায় বলল,
— “ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি।”
তাসমিন থমকে গেল। আরিয়ান দাঁত চেপে বলল,
— “এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল সত্যি তোর কিছু হয়ে গেছে। আমি…”
সে থেমে গেল। গলা ভারী হয়ে আসছে। তাসমিন নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। আরিয়ান এবার ধীরে ধীরে বলল,
— “আমার অবস্থা কি হয়েছিল জানিস? বুকের ভিতরটা একদম ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।”
তাসমিনের চোখ নরম হয়ে এলো। সে আস্তে করে বলল,
— “তাহলে জান বলছিলেন কেন?”
আরিয়ান হালকা হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসিতে ক্লান্তি।
— “কারণ তখন মাথা কাজ করছিল না। মুখে যেটা আসছিল সেটাই বলছিলাম। সিরিয়াসলি নিস না ”
তাসমিন এবার খুব আস্তে বলল,
— “তাহলে…আপনার জান কে?”
প্রশ্নটা শুনে আরিয়ান চুপ হয়ে গেল। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। দূরে শুধু এসির শব্দ। আরিয়ান ধীরে ধীরে তাসমিনের দিকে এগিয়ে এলো। এতটাই কাছে যে তাসমিন নিজের নিশ্বাস পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছে। তাসমিন ধীরে ধীরে মাথা তুলল।তারপর খুব আস্তে বলল,
— “সরি…”
আরিয়ান ভ্রু তুলল।
— “এই প্রথম তুই আমাকে সরি বললি।”
তাসমিন ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— “বেশি ভাব নিবেন না। আমি শুধু একটু…”
সে থেমে গেল। আরিয়ান মজা পেয়ে বলল,
— “একটু কি?”
তাসমিন চোখ সরিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— “ আমার রাগ ভাঙ্গাতে আপনি এতো কিছু দিলেন। আমার তো কিছুি নেই তাই সরি দিলাম ”
__“ তার মানে রাগ ভেঙেছে তোর.? "
__“ হুম. ”
আরিয়ান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে হাসল।এমন হাসি, যেটা শুধু তাসমিনের জন্যই জমা ছিল।
~~~~~~~
মাহিদ দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে কাউকে খুন করলেও তার অপরাধবোধ হবে না। আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে রাদিফ একের পর এক ধাক্কা দিয়েই যাচ্ছে।
— “ভাইয়া দরজা খোলো! আমার ভাবির সাথে কথা আছে!”
মাহিদ দাঁত চেপে বলল,
— “তোর ভাবি এখন ব্যস্ত!”
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “এতো রাতে কিসে ব্যস্ত?”
মাহিদ চোখ বন্ধ করে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করল।
— “তুই ছোট মানুষ, এসব বুঝবি না।”
— “ছোট মানুষ মানে? আমার বয়স চব্বিশ!”
— “তোর ব্রেইনের বয়স আট!”
রাদিফ এবার আরও জোরে দরজা ঠেলতে লাগল।
মাহিদও ভেতর থেকে ধাক্কা দিয়ে আটকে রেখেছে।
দুই ভাইয়ের এই ঠেলাঠেলিতে পুরো দরজা কাঁপছে।
ভিতরে মাইশা বিছানায় বসে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। এমন সময় মাহিদের ধৈর্য একদম শেষ হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলল,
— “তুই প্রতি বার এসে আমার রোমাঞ্চে বাধা দিস! এবার সেটা হতে দিবো না। ”
রাদিফ হঠাৎ থেমে গেল। দরজার ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সন্দেহভরা গলায় বলল,
— “তোমরা রোমাঞ্চ করছিলে ভাইয়া?”
মাহিদ কপালে হাত ঠেকাল।
— “করতে পারলাম কই? তার আগেই তুই হাজির!”
ওয়াশরুমের ভিতর থেকে মাইশার চাপা হাসির শব্দ এলো। রাদিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
— “ওহ…”
মাহিদ ভাবল এবার বুঝি শান্তি মিলবে। সে বিরক্ত হয়ে দরজার হাতল ছেড়ে দিল।
— “যা এখন। ঘুমা গিয়ে।”
ওপাশ থেকে আর কোনো শব্দ এলো না। মাহিদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। “আলহামদুলিল্লাহ…”ঠিক তখনই দরজা হঠাৎ খুলে গেল। মাহিদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাদিফ দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল।এক লাফে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল সে।রাদিফ বালিশ টেনে নিয়ে আরাম করে শুয়ে বলল,
— “আজকে আমি এখানেই ঘুমাবো।”
মাহিদের মুখ এক সেকেন্ডে কালো হয়ে গেল।
— “কি?”
রাদিফ মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “তোমরা তো রোমাঞ্চ করতেছিলা। আমি না থাকলে আবার শুরু করে দিবা।”
মাইশা এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।
ফুস করে হেসে ফেলল। মাহিদ অবিশ্বাস নিয়ে ওর দিকে তাকাল।
— “তুমি হাসতেছো?”
মাহিদ এবার কম্বল ধরে টান দিল। রাদিফও শক্ত করে ধরে আছে। দুইজন আবার টানাটানি শুরু করে লাগলো। মাহিদ ওর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন বহু বছরের শত্রু সামনে পেয়েছে। হঠাৎ মাহিদ গভীর শ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।
— “তোরে ছোটবেলায় নদীতে ভাসাইয়া দিলে ভালো হইতো। তোর জন্য আজকে আমার সংসার শেষ হতে বসেছে!”
রাদিফ মিনমিন করে বলল,
— “আমি তো ভাবির জন্য চিন্তা করছি…”
মাহিদ দুই হাত কোমড়ে দিয়ে হা করে তাকাল।
— “চিন্তা? তুই চিন্তা করতে গিয়া আমার সর্বনাশ করে ফেলছিস!”
রাদিফ এবার একটু সাহস করে বলল,
— “আচ্ছা ভাইয়া, একটা কথা বলেন তো…ভাবি ওইভাবে ওয়াশরুমে লুকিয়ে আছে কেন?”
মাহিদ একদম থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। মনে হচ্ছে নিজেকে কন্ট্রোল করছে।
এরপর দাঁত চেপে বলল,
— “তোকে কি সব কথা বুঝাইতে হবে?”
রাদিফ নির্দোষ মুখে মাথা নাড়ল।
— “হুম।”
মাহিদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
— “হে আল্লাহ, এই ছেলেটারে একটু বুদ্ধি দাও…”
তারপর রাদিফের কাঁধ ধরে কাছে টেনে বলল,
— “শুন। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর একটু প্রাইভেসি লাগে।”
রাদিফ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “ওহ। বুঝেছি..”
মাহিদ আঙুল তুলে গজগজ করতে করতে বলল,
— “না, তুই এখনো কিছু বুঝিস নাই। তোর জন্য আমি এখনো আরেক বাচ্চার বাপ হতে পারলাম না!ভাগ্যক্রমে পাঁচ বছরে একটা বাচ্চার বাপ হইছি।আজকে ভাবছিলাম হয়তো আল্লাহ মুখ তুলা তাকাইছে…আর ঠিক তখনই তুই হাজির হয়ে গেলি !”
রাদিফ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। দুই সেকেন্ড পর বলল,
— “মানে… আমি কি তাহলে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পথে বাধা?”
মাহিদ কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “তুই শুধু বাধা না। তুই একটা জাতীয় সমস্যা ”
রাদিফ এবার সত্যি লজ্জা পেয়ে গেল। ঘাড় চুলকে বলল,
— “সরি ভাইয়া…”
মাহিদ বিরক্ত মুখে বলল,
— “এই সরি দিয়ে কি হবে? তোর ভাবি এখন আমার দিকে তাকাইলেই হাসতেছে!”
রাদিফ ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।
মাহিদ সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙাল।
— “হাসবি না!”
রাদিফ তাড়াতাড়ি মুখ সোজা করল।
— “না হাসতেছি না…”
ঠিক তখনই দরজা একটু খুলে মাইশা উঁকি দিল।
মুখ লাল হয়ে আছে এখনো। সে মাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুমি এখনো ওকে বকছেন?”
মাহিদ সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগের সুরে বলল,
— “দেখছো? তোমার দেবর আমার পুরো রোমান্টিক লাইফ শেষ করে দিছে!”
মাইশা এবার আর ধরে রাখতে পারল না। হো হো করে হেসে ফেলল। রাদিফ অবাক হয়ে বলল,
— “ভাবি তুমি হাসতেছো?”
মাইশা হাসতে হাসতেই বলল,
— “তোর মতো দেবর থাকলে শত্রু লাগে না।”
মাহিদ গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল।
— “একদম ঠিক কথা।”
তারপর রাদিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আজ থেকে রাত দশটার পর আমার রুমের আশেপাশে দেখলে…সরাসরি নিখোঁজ করে দিব।”
রাদিফ ঢুক গিলল।
— “আচ্ছা ভাইয়া…আমি এখন যাই?”
মাহিদ দরজার দিকে ইশারা করল।
— “দৌড় দে বেডা ।”
রাদিফ আর এক সেকেন্ড বসলো না। এক দৌড়ে সেখান থেকে পালাল। আর পিছনে দাঁড়িয়ে মাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তখন আবার রাদিফ উঁকি মেরে বলে,
__“ ভাইয়া আমি সব বুঝি, শুধু তোমাকে রাগানোর একটু মজা করছিলাম। তুমি রোমাঞ্চ করো। আল্লাহ ভরসা দশমাস পর আবার চাচ্চু ডাক শুনবো। ”
মাহিদ পায়ের জুতা হাতে নিয়ে ওকে ডিল মারে। রাদিপ ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে এক দৌড় দেয়। রাদিফকে কোনোমতে রুম থেকে বের করে দিয়ে মাহিদ দরজা লক করল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মনে হচ্ছে যুদ্ধ জিতে এসেছে। বেডের ওপর ছড়িয়ে থাকা বালিশ ঠিক করতে করতে বিড়বিড় করল, “এই ছেলেটারে আমি হোস্টেলে পাঠামু…”
ওয়াশরুমের ভিতর থেকে পানির শব্দ আসছে।মাহিদের মুখে আবার ধীরে ধীরে হাসি ফুটল। সে দ্রুত আয়নার সামনে গিয়ে চুল ঠিক করতে লাগল। শার্টের কলার টেনে সোজা করল। এমনকি হালকা করে পারফিউমও স্প্রে করল। নিজেকে আয়নায় দেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— “মাহিদ চৌধুরী, ইউ আর রেডি।”
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল। মাইশা হাই তুলতে তুলতে বাইরে বের হলো। পরনে ঢিলেঢালা পাজামা আর বড়সড় টি-শার্ট। চুল ভেজা। মুখে ক্লান্ত ভাব। মাহিদের হাসি মুহূর্তেই থেমে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর হতাশ গলায় বলল,
— “বেগম…”
মাইশা চোখ ছোট করে তাকাল।
— “কি?”
মাহিদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
— “তুমি ওটা পরলে না কেন?”
মাইশা আবার হাই তুলল।
— “খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাবো।”
বলে সোজা গিয়ে বেডে বসে পড়ল। মাহিদ ওর সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। মুখে এমন এক্সপ্রেশন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট পেয়েছে।মাহিদ মিনমিন করে বলল,
— “বেগম…একটু দুষ্টু কাপড় পরে এসো না…একটু দুষ্টুমি করি…”
মাইশা কপাল কুঁচকে তাকাল।
—“ ইতর!”
মাইশার ধমকে মাহিদ প্রায় লাফিয়ে উঠল।
— “ফাজিল লোক একটা! সারাক্ষণ মাথায় শুধু এসব ঘুরে? একটু আগে কি হলো দেখলে না.? ”
মাহিদ কাঁধ ঝুলিয়ে বলল,
— “বউ আছে তো মাথায় ঘুরবেই…”
— “চুপ!”
মাইশা বালিশ ছুড়ে মারল।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post