সাবেক_স্বামীর_দ্বিতীয়_বিয়ে

 সাবেক_স্বামীর_দ্বিতীয়_বিয়ে



ইয়াসিনের মৃত্যুর খবরটা শোনার পর প্রথম কয়েক মিনিট আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দিতে পারিনি, শুধু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর বাইরে ধীরে ধীরে উঠতে থাকা সূর্যের আলোকে দেখছিলাম, যেন এই আলোটা কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, শুধু পৃথিবীকে আলোকিত করার দায়িত্ব পালন করছে।
কিন্তু মানুষের ভেতরের পৃথিবী কখনো সূর্যের মতো সোজা হয় না, সেখানে আলো আর অন্ধকার একসাথে থাকে, আর কিছু কিছু খবর সেই অন্ধকারকে আরও গভীর করে দেয়।
মেয়েটা তখন ঘুমাচ্ছিল, তার ছোট্ট হাত আমার শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে ছিল, যেন সে জানে না পৃথিবীর কোথায় একটা অধ্যায় চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে বসে পড়লাম।
কোনো কান্না আসেনি প্রথমে।
শুধু একটা শূন্যতা।
কিছুক্ষণ পর ফোন আবার বেজে উঠল।
এইবার মেহরীন।
আমি ধরলাম না।
কিন্তু সে বারবার কল করছিল।
শেষে আমি ধরলাম।
ওপাশে তার কণ্ঠ ছিল ভাঙা, প্রায় অচেনা।
“সে চলে গেছে…” সে বলল।
আমি কিছু বললাম না।
সে আবার বলল,
“শেষ মুহূর্তে সে শুধু আপনার নাম বলছিল।”
এই কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর একটা চাপ অনুভব হলো, কিন্তু সেটা দুঃখ না, বরং একটা অদ্ভুত ক্লান্তি।
আমি ধীরে বললাম,
“এখন আর কিছু বলার নেই।”
মেহরীন চুপ হয়ে গেল।
তারপর শুধু বলল,
“আমি সব নষ্ট করেছি।”
আমি বললাম,
“না মেহরীন… আমরা সবাই কিছু না কিছু নষ্ট করেছি।”
তারপর ফোন কেটে দিলাম।
পরদিন আমি কোর্টে যাইনি।
মৃত্যুর পর আইন আর সম্পর্কের লড়াই আর অর্থ রাখে না।
কিন্তু ইয়াসিনের অফিস থেকে একজন উকিল এল।
তার হাতে কিছু কাগজ।
তিনি বললেন,
“মিস্টার ইয়াসিন আপনাকে শেষবারের মতো কিছু দিয়ে গেছেন।”
আমি কাগজটা নিলাম।
ভেতরে ছিল একটি চিঠি।
চিঠি শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে।
“সানজিদা,
আমি জানি আমি তোমার জীবনে থাকার যোগ্য ছিলাম না। কিন্তু আমি চলে যাওয়ার আগে কিছু কথা না বললে আমি শান্তি পাব না।”
আমি চুপ করে পড়তে লাগলাম।
“আমি তোমাকে হারিয়েছি আমার অহংকারের কারণে, আমার অন্ধত্বের কারণে, আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি তোমাকে মানুষ হিসেবে দেখতে ভুলে গিয়েছিলাম।”
চিঠির প্রতিটা লাইন যেন অতীতকে আবার জীবিত করছিল।
“যদি কখনো আমাদের মেয়ে বড় হয়, তাকে বলো—তার বাবা নিখুঁত ছিল না, কিন্তু সে তাকে ভালোবাসতে শিখেছিল খুব দেরিতে।”
আমি চিঠিটা থামিয়ে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করলাম।
কিছুদিন কেটে গেল।
জীবন ধীরে ধীরে আবার আগের মতো চলতে শুরু করল।
কিন্তু আগের মতো না।
কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের প্রভাব থেকে যায়।
আমি এখন আগের মতো একা না, আবার পুরোপুরি পূর্ণও না।
আমি মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছি—যেখানে অতীত আছে, কিন্তু আর শাসন করতে পারে না।
একদিন সকালে আমি মেয়েকে নিয়ে বাইরে বের হলাম।
তার ছোট্ট পা মাটিতে পড়ছে, সে হাসছে, আর তার চোখে কোনো ভয় নেই।
আমি তাকিয়ে থাকলাম।
হঠাৎ মনে হলো, এই শিশুই এখন আমার পুরো পৃথিবী।
যার জন্য অতীতকে পেছনে ফেলা দরকার ছিল।
ঠিক তখনই দূর থেকে মেহরীনকে দেখলাম।
সে একা দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখে আর কোনো সাজ নেই, কোনো অহংকার নেই।
শুধু একজন ভেঙে যাওয়া মানুষের শান্ত স্বীকারোক্তি।
সে আমার কাছে এল না।
শুধু দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
আমি জানি, কিছু মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগও থাকে না।
আর কিছু মানুষের কাছে ক্ষমা দেওয়ার ইচ্ছাও থাকে না।
আমি মেয়ের হাত ধরলাম।
সে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল সামনে।
আমি আর পেছনে তাকালাম না।
কারণ আমি শিখে গেছি—
সব গল্পের শেষ উত্তর থাকে না।
কিছু গল্প শুধু শেখায় কীভাবে এগিয়ে যেতে হয়।
হঠাৎ মনে হলো, ইয়াসিন যদি আজ থাকত…
সে হয়তো দূর থেকে এই দৃশ্যটাই দেখত।
কিন্তু এবার কোনো অধিকার নিয়ে না।
শুধু একজন দর্শক হিসেবে।
আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম।
রাস্তায় মানুষ, শব্দ, জীবন—সব চলছে।
কিন্তু আমার ভেতরের যুদ্ধটা শেষ।
কারণ আমি এখন জানি—
ভালোবাসা কখনো কাউকে জোর করে ধরে রাখে না।
ভালোবাসা কখনো কাউকে ভেঙে ফেলে না।
ভালোবাসা শুধু শেখায়—
কখন ছাড়তে হয়।
শেষবার আমি আকাশের দিকে তাকালাম।
সূর্যটা পুরোপুরি উঠেছে।
আলো চারদিকে ছড়িয়ে গেছে।
আর আমি প্রথমবার অনুভব করলাম—
অতীত আর আমাকে ডাকছে না।
এইভাবেই গল্পটা শেষ হলো।
কোনো বিজয়ী নেই।
কোনো সম্পূর্ণ পরাজিত নেই।
শুধু একজন নারী আছে—
যে এখন নিজের মেয়ের হাত ধরে সামনে হাঁটছে…
আর পেছনের সব শব্দ ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে।
সমাপ্ত।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post