প্রতারক_স্বামীর_স্বপ্নভঙ্গ
স্পেনগামী ফ্লাইটের বোর্ডিং গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সোহাগি শেষবারের মতো পিছনে তাকাল। বিশাল কাঁচের দেয়ালের ওপাশে রাতের ঢাকা শহর ঝলমল করছিল। সেই শহরেই পড়ে রইল তার দশ বছরের সংসার, অপমান, প্রতারণা, আর এমন এক ভালোবাসা যার শেষটা এত নির্মম হবে সে কখনো কল্পনাও করেনি।
আয়ান ধীরে তার হাত ধরল।
“মা… আমরা সত্যিই চলে যাচ্ছি?”
সোহাগি নিচু হয়ে ছেলের কপালে চুমু খেল।
“হ্যাঁ, সোনা। এবার আমরা নতুন জীবন শুরু করব।”
আয়েশা ছোট্ট কণ্ঠে বলল, “বাবা কি আমাদের খুঁজবে?”
প্রশ্নটা শুনে সোহাগির বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করল না। সে শুধু মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “এখন এসব ভাবতে হবে না।”
ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল একটা পরিচিত কণ্ঠ।
“সোহাগি!”
সে ঘুরে তাকাতেই দেখল মিস্টার ইয়াসিন দৌড়ে আসছে। তার চুল এলোমেলো, শার্টের বোতাম খোলা, নিঃশ্বাস দ্রুত। জীবনে প্রথমবার তাকে এত ভাঙা লাগছিল।
নিরাপত্তাকর্মীরা প্রথমে তাকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে প্রায় জোর করেই ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
সোহাগির চোখ শান্ত হয়ে গেল।
যে মানুষটা কয়েক ঘণ্টা আগেও তাকে “বোঝা” বলেছিল, এখন সেই মানুষটাই মরিয়া হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে।
ইয়াসিন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “প্লিজ… যেও না।”
সোহাগি স্থির গলায় বলল, “কেন?”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “আমি ভুল করেছি।”
সোহাগির ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটল।
“শুধু ভুল?”
ইয়াসিন মাথা নিচু করল। “আমি জানতাম না…”
“তুমি কিছুই জানতে চাওনি,” সোহাগি তাকে থামিয়ে দিল। “তুমি শুধু বিশ্বাস করতে চেয়েছিলে যা তোমার অহংকারকে সুখ দেয়।”
আয়ান ভয়ে মায়ের পেছনে লুকিয়ে গেল।
ইয়াসিন ছেলের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “আয়ান… বাবা…”
কিন্তু আয়ান মুখ ফিরিয়ে নিল।
সেই ছোট্ট প্রতিক্রিয়াটাই ইয়াসিনের বুকের ভেতর ছুরি হয়ে ঢুকল।
সে কখনো ভাবেনি তার ছেলে একদিন তাকে এভাবে এড়িয়ে যাবে।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “আমি জানতাম না ওরা… আমার সন্তান…”
সোহাগির চোখে এবার রাগের ঝলক দেখা দিল।
“তুমি জানার চেষ্টাও করোনি।”
চারপাশের মানুষ থেমে থেমে তাকাচ্ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের কারও অস্তিত্ব যেন গুরুত্বপূর্ণ না।
ইয়াসিন কাঁপা হাতে একটা ফাইল এগিয়ে দিল।
“ডা. ফারহান সব বলেছে। আইভিএফ… রিপোর্ট… সব…”
সোহাগি শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ। কারণ তুমি সন্তান নিতে পারবে না এটা জানার পর তুমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলে। তখন তুমি নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলে।”
ইয়াসিনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল, “তুমি… তুমি জানতেও?”
“সব জানতাম।”
“তাহলে তুমি আমাকে বলোনি কেন?”
সোহাগির গলা এবার ভারী হয়ে এল।
“কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসতাম।”
এই কথাটা শুনে ইয়াসিন যেন ভিতর থেকে ভেঙে পড়ল।
তার চোখ ভিজে উঠল।
“আমি এত খারাপ ছিলাম?”
সোহাগি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল, “তুমি একসময় খুব ভালো মানুষ ছিলে। কিন্তু তোমার অহংকার তোমাকে অন্ধ করে দিয়েছে।”
ইয়াসিন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমাকে একটা সুযোগ দাও।”
সোহাগি মাথা নাড়ল।
“আমি দশ বছর সুযোগ দিয়েছি।”
বোর্ডিংয়ের শেষ ঘোষণা ভেসে এল।
সোহাগি বাচ্চাদের নিয়ে সামনে এগোতে লাগল।
হঠাৎ ইয়াসিন তার হাত ধরে ফেলল।
“প্লিজ… আমি ওদের ছাড়া বাঁচতে পারব না।”
সোহাগি ধীরে হাত ছাড়িয়ে নিল।
“কিন্তু আজ বিকেলেও তুমি ওদের বোঝা বলেছিলে।”
এই কথাটা ইয়াসিনকে স্তব্ধ করে দিল।
তার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না।
সোহাগি আর পিছনে তাকাল না।
সে আয়ান আর আয়েশাকে নিয়ে বোর্ডিং গেটের ভেতরে চলে গেল।
ইয়াসিন দাঁড়িয়ে রইল কাঁচের দেয়ালের পাশে।
তার সামনে ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
আর সেই দরজার ওপাশে চলে গেল তার পুরো পৃথিবী।
ফ্লাইট আকাশে উড়তে শুরু করলে আয়েশা মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
“মা… তুমি কাঁদছ?”
সোহাগি বুঝতেই পারেনি তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“না সোনা।”
কিন্তু সে জানত, এই কান্না ইয়াসিনের জন্য না।
এই কান্না সেই মেয়েটার জন্য, যে একদিন সত্যি সত্যি স্বপ্ন দেখেছিল।
যে ভেবেছিল ভালোবাসা সবকিছু ঠিক করে দিতে পারে।
অন্যদিকে এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে ইয়াসিন নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সোহাগির নাম্বার বন্ধ।
হঠাৎ তার ফোন আবার বেজে উঠল।
তানিয়া রহমান।
ইয়াসিনের চোখ মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেল।
সে কল রিসিভ করতেই ওপাশে কান্নার শব্দ।
“ইয়াসিন… প্লিজ শোনো…”
“কার সন্তান?” ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল সে।
তানিয়া চুপ।
ইয়াসিন গর্জে উঠল, “আমি জানতে চাই কার সন্তান!”
তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি ভয় পেয়েছিলাম তোমাকে হারাব…”
“নাম বলো!”
দীর্ঘ নীরবতার পর তানিয়া ফিসফিস করে বলল, “রাকিব…”
ইয়াসিনের মাথা যেন ঘুরে উঠল।
রাকিব।
তার নিজের ব্যবসায়িক পার্টনার।
তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন।
ইয়াসিনের চোখ রক্তিম হয়ে উঠল।
“তোমরা কতদিন ধরে?”
তানিয়া কাঁদছিল। “প্রায় এক বছর…”
ইয়াসিনের বুকের ভেতর সবকিছু ভেঙে পড়ল।
এক বছর।
মানে যখন সে নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করছিল, তখন তার নিজের পেছনেই প্রতারণা চলছিল।
সে হঠাৎ হাসতে শুরু করল।
ভয়ংকর, ফাঁকা একটা হাসি।
পাশ দিয়ে যাওয়া কয়েকজন মানুষ থেমে তাকাল।
কারণ সেই হাসির ভেতরে ছিল এক মানুষের সম্পূর্ণ ধ্বংসের শব্দ।
এদিকে রাত গভীর হওয়ার পর ক্লিনিকে রওশন আরা খাতুন একা বসে ছিলেন।
তার মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছিল।
সোহাগি সব জানত।
তবুও কখনো তাদের অপমান করেনি।
আর তিনি?
তিনি প্রতিদিন মেয়েটাকে অপমান করেছেন।
“বুদ্ধিমান স্ত্রী প্রশ্ন করে না।”
এই কথাটা তিনি কতবার বলেছেন!
হঠাৎ তার নিজের কথাগুলোই আজ তাকে বিষের মতো পোড়াচ্ছে।
ঠিক তখন দরজা খুলে অ্যাডভোকেট করিমুল হক ভেতরে ঢুকলেন।
“ম্যাডাম।”
রওশন আরা ক্লান্ত গলায় বললেন, “কি হয়েছে?”
তিনি একটা ফাইল টেবিলে রাখলেন।
“এগুলো মিস্টার ইয়াসিনের সই করা কাগজ।”
“কিসের কাগজ?”
“সম্পত্তি হস্তান্তর।”
রওশন আরা চমকে উঠলেন।
“কি!”
“তিনি না পড়েই সই করেছিলেন। আইন অনুযায়ী ধানমন্ডির বাড়ি, গুলশানের দুইটা ফ্ল্যাট, আর কোম্পানির ৪০ শতাংশ শেয়ার এখন মিসেস সোহাগির নামে।”
রওশন আরার মুখ সাদা হয়ে গেল।
“অসম্ভব!”
“সব বৈধ কাগজ।”
তিনি কাঁপা হাতে ফাইল খুললেন।
প্রতিটা পাতায় ইয়াসিনের সই।
তার মাথা ঘুরতে লাগল।
মানে শুধু পরিবার না, সম্পদের বড় অংশও চলে গেছে।
হঠাৎ তিনি বুঝলেন—
সোহাগি চুপ ছিল, দুর্বল না।
সে সবকিছু বুঝেই নীরবে বেরিয়ে গেছে।
অন্যদিকে স্পেনের বার্সেলোনায় ফ্লাইট নামার সময় সকাল হয়ে গেছে।
জানালার বাইরে নতুন শহরের আলো দেখে আয়েশা অবাক হয়ে বলল, “মা… এটা কি এখন আমাদের নতুন বাড়ি?”
সোহাগি ধীরে হাসল।
অনেকদিন পর সত্যিকারের হাসি।
“হ্যাঁ সোনা।”
এয়ারপোর্টের বাইরে একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি এগিয়ে এসে ব্যাগ নিয়ে বললেন, “স্বাগতম, ম্যাডাম। আমি মি. আরমান চৌধুরী। অ্যাডভোকেট সাদিকুল ইসলাম আমাকে সব দায়িত্ব দিয়েছেন।”
সোহাগি ভদ্রভাবে মাথা নেড়ে গাড়িতে উঠল।
গাড়ি শহরের রাস্তা ধরে এগোতে লাগল।
চারপাশে অপরিচিত ভাষা, নতুন মানুষ, নতুন আকাশ।
কিন্তু বহু বছর পর প্রথমবার তার মনে হলো সে শ্বাস নিতে পারছে।
ঠিক তখনই ফোনে একটা মেইল এল।
সেন্ডার: মিস্টার ইয়াসিন।
সাবজেক্ট: “একটা সুযোগ চাই।”
সোহাগি অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে মেইলটা খুলল।
ভেতরে শুধু একটা লাইন লেখা ছিল।
“আমি সব হারিয়েছি, সোহাগি। শুধু একবার তোমাদের সামনে দাঁড়ানোর অধিকারটা কেড়ে নিও না।”
সোহাগি চোখ বন্ধ করল।
তারপর ধীরে ফোনটা অফ করে দিল।
কারণ কিছু সম্পর্ক ভাঙে না একদিনে।
ধীরে ধীরে মরতে মরতে একসময় শুধু স্মৃতি হয়ে যায়।
আর কিছু স্মৃতি যত দূরে রাখা যায়, ততই ভালো।
