প্রফেসরের_জেদিলতা

 প্রফেসরের_জেদিলতা 

প্রফেসরের_জেদিলতা


রাতের ওই অদ্ভুত, মিষ্টি আর কিছুটা হুমকিসূচক মুহূর্তের পর ঈনশুর চোখে আর ঘুম আসেনি। বিছানার একপাশে গম্ভীর প্রফেসর আরশাদ খান আয়াত ধীর শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলেন, আর অন্যপাশে ঈনশু বালিশ কামড়ে নিজের ভাগ্যকে দোষ দিচ্ছিল। ও ভেবেছিল গম্ভীর প্রকৃতির চাচাতো ভাইটাকে ও নিজের জেদের পুতুল বানাবে, কিন্তু লোকটা তো তলে তলে আস্ত একটা রোমান্টিক বাজিকর!
সকাল গড়াতেই খান বাড়ির নিচতলায় এলাহী কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। হুট করে কাজী ডেকে মাঝরাতে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিবার এখনো এই এক ছাদের নিচেই অবস্থান করছে। ড্রয়িংরুমের বড় সোফাটায় পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছেন দুই ভাই ইব্রাহিম খান আর ইসমাইল খান। ইব্রাহিম খান হলেন ইনশুর বাবা, আর ইসমাইল খান হলেন আয়াজের বাবা। দুজনের স্বভাবই বেশ রাশভারী, তবে ইব্রাহিম খান মেয়ের জেদের কাছে সবসময়ই একটু নরম।
রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ ট্রে-তে সাজিয়ে নিয়ে আসলেন ইনশুর মা শাপলা বেগম এবং আয়াজের মা সুমি বেগম। দুই জা-এর মধ্যে দীর্ঘদিনের চমৎকার মিল, তবে আজকের সকালের চায়ের আড্ডার মূল আলোচ্য বিষয় অত্যন্ত গরম কাল রাতের আকস্মিক বিয়ে।
শাপলা বেগম সোফার একপাশে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমি বেগমকে বললেন, "আপা, আমার তো এখনো মনে হচ্ছে আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি। এই ইনশু মেয়েটা যে কী একগুঁয়ে আর জেদি, তা তো তুমি ছোটবেলা থেকেই দেখছ। রনির সাথে ঝগড়া করে এসে এক রাতে নিজের আপন চাচাতো ভাই আয়াজকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল! মেয়েটার মনে যে কী চলে, আল্লাহই জানে। কপালে কী আছে কে জানে!"
সুমি বেগম হেসে শাপলা বেগমের হাতে আলতো চাপ দিয়ে বললেন, "আরে ধুর ছোটো! এত চিন্তা করো না তো। ইনশু একটু জেদি হতে পারে, কিন্তু ও তো আমাদের চোখের সামনে বড় হওয়া মেয়ে। বাইরে যতই দেমাগ দেখাক, ভেতরটা ওর পরিষ্কার। আর আয়াজ তো ওকে ছোটবেলা থেকেই চেনে, আগলে রাখে। দেখবে, প্রফেসর ছেলে আমার ঠিক লাইনে নিয়ে আসবে জেদিলতাকে।"
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করল সায়েব, ইনশুর বড় ভাই। সায়েব হলো এই বাড়ির এক নাম্বারের ফাঁকিবাজ, ফাঁকিবাজিতে যার ডক্টরেট ডিগ্রি আছে। পড়ালেখার নামগন্ধ নেই, সারাদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া আর সুযোগ পেলেই নিজের কঠোর, গম্ভীর প্রফেসর দুলাভাই ওরফে চাচাতো ভাই আয়াজকে জ্বালানোই তার জীবনের একমাত্র পরম লক্ষ্য।
সায়েব সোফায় ধপ করে বসে টেবিল থেকে একটা বিস্কুট মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে বলল, " আম্মু, তোমরা শুধু আমার বোন ইনশুর জেদটাই দেখলে? ওই খড়খড়ে শুকনো গম্ভীর প্রফেসরের চালটা দেখলে না? ক্লাসে যিনি আমাদের অ্যাসাইনমেন্টের ডেট এক মিনিট পিছাতে চান না, কড়া হিটলার সেজে থাকেন, তিনি কাল রাতে কাজীর মুখ থেকে ইনশুর বিয়ের প্রস্তাব শুনে কেমন বিড়ালের মতো মিউ মিউ করে এক বাক্যে 'কবুল' বলে দিলেন! আমি তো ভাবছি আজ থেকে আয়াজ ভাইকে আর 'ভাই' বলে ডাকব না, সোজা 'দুলাভাই' বলে খ্যাপাব। দেখি ডিপার্টমেন্টে আমার ইন্টারনাল মার্কস ক্যামনে কাটে!"
ইসমাইল খান চশমার ওপর দিয়ে কড়া চোখে নিজের ভাতিজার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, "সায়েব! বড়দের সাথে ইয়ার্কি একদম করবে না। আয়াজ তোমার বড় ভাই, আবার তোমার কলেজের প্রফেসরও। বাড়িতে যাই হোক, কলেজে গিয়ে যদি কোনো রকম বেয়াদবি করো, ও কিন্তু তোমার খাতা আটকে জিরো দিয়ে দেবে। তখন আবার আমাদের কাছে কাঁদতে আসতে পারবে না।"
সায়েব ওমনি মুখটা একদম কাঁচুমাচু করে বলল, "উফ বড় আব্বু! তোমরা সবসময় ওই কড়া শিক্ষকের পক্ষ নাও। দাঁড়াও, আজ ইনশু ঘুম থেকে উঠুক, দুই ভাইবোন মিলে ওর জীবন একদম তেজপাতা বানিয়ে ছাড়ব!"
এমন সময় ড্রয়িংরুমের কোণায় এসে দাঁড়াল আয়াজের ছোট বোন জেবা এবং তার স্বামী শওকত। শওকতের পরনে চকচকে একটা পাঞ্জাবি, মুখে চওড়া ভদ্রতার এক কৃত্রিম মুখোশ। কিন্তু পুরো খান পরিবারের মধ্যে একমাত্র ইনশু আর সায়েবই এই শওকতের আসল চরিত্রটা জানে। শওকত লোকটা বাইরে অত্যন্ত বিনয়ী সাজলেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ লোভী, লম্পট এবং একটা আস্ত চরিত্রহীন। নিজের স্ত্রী জেবাকে সে সবসময় মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপে রাখে, কিন্তু শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি আর খাতিরের লোভে সবার সামনে একদম ধোয়া তুলসী পাতা সেজে থাকে। মেয়েদের দিকে আড়চোখে তাকানোটা তার পুরোনো স্বভাব।
শওকত এসে খুব মোলায়েম গলায় ইসমাইল খানের পাশে বসে বলল, "আব্বা, সায়েব তো ছোট, ও বুঝবে না। তবে আয়াজ ভাইয়ের বিয়েটা এভাবে হুট করে না হয়ে যদি একটু ধুমধাম করে হতো, তবে আমরা আমাদের বন্ধুদেরও দাওয়াত দিতে পারতাম। ইনশু অবশ্য একটু অন্যরকম মেয়ে, নিজের জেদের বাইরে তো কিছু করতে দেয় না কাউকে। একটু কেমন যেন দেখায় না এভাবে হুট করে বিয়ে?"
শওকতের মুখে ইনশুকে নিয়ে এই বাঁকা মন্তব্যটা সায়েবের কান এড়াল না। সায়েব চতুর আর তীক্ষ্ণ চোখে শওকতের দিকে তাকিয়ে বলল, "আরে শওকত ভাই! ধুমধাম তো পরে হবেই। আপনার বন্ধুদের দাওয়াত দেওয়ার এত শখ কেন বলুন তো? নাকি অন্য কোনো ধান্দা আছে? আর ইনশুকে নিয়ে আপনার এত মাথা না ঘামালেও চলবে, ও এখন আমাদের প্রফেসরের অফিশিয়াল পার্টনার!"
শওকত একটু অপ্রস্তুত হয়ে জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল, "আরে না সায়েব, তুমি ভুল বুঝছ... আমি তো জাস্ট বলছিলাম..."
জেবা তার বরের অপমান সহ্য করতে না পেরে একটু চড়া গলায় বলল, "সায়েব, ও তো ভালো কথাই বলেছে। তুই সবসময় ওর কথার পেছনে লাগিস কেন বল তো? নিজের তো পড়ার ঠিক নেই, সারাদিন শুধু মানুষের খুঁত ধরা!"
শাপলা বেগম পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য তাড়া দিয়ে বললেন, "তোরা সকাল সকাল ঝগড়া থামাবি? আয়াজ আর ইনশু এখনো উঠছে না কেন? এত বেলা হয়ে গেল, নতুন বউ-জামাইকে নাস্তা দিতে হবে না?"
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে এল ঈনশু। পরনে একটা হালকা জামদানি শাড়ি, চুলে আলগা একখানা খোঁপা। সকালের নরম আলোয় তাকে দেখতে অসাধারণ মিষ্টি আর নিখাদ এক লক্ষ্মী মেয়ে মনে হচ্ছে। তার ঠিক দুই কদম পেছনেই নেমে আসছেন প্রফেসর আরশাদ খান আয়াজ। পরনে ক্যাজুয়াল শার্ট, চোখে সেই চিরচেনা চশমা, মুখে বরাবরের মতোই গম্ভীর ভাবমূর্তি।
ঈনশু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই নিজের ভেতরের জেদি আর ভন্ড ভাবটা চাপা দিয়ে মুখে এক পৃথিবীর সরলতা ফুটিয়ে তুলল।
"আম্মু, বড় আম্মু, শুভ সকাল। আমার উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল, আসলে কাল রাতের ধকল তো... মানে, নতুন পরিবেশ..." ইনশু খুব লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে মায়াবী গলায় বলল।
সায়েব চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে প্রায় কেসেই ফেলল। সে মনে মনে বলল, "বাহ রে ঈনশু! অস্কার বিজয়ী অভিনয়! কাল রাত পর্যন্ত যে মেয়ে রনির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ঘর মাথায় তুলছিল, সে এখন কত বড় সতী-সাধ্বী, বাধ্য বউ সেজেছে! একেই বলে আসল ভন্ডামি!"
সুমি বেগম গলে পানি হয়ে ইনশুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "কোনো সমস্যা নেই মা। বসো, সবাই মিলে একসাথে নাস্তা করব। আয়াজ, তুমিও বসো।"
সবাই ডাইনিং টেবিলে গিয়ে আসন গ্রহণ করল। আয়াজ গম্ভীর মুখে চেয়ার টেনে বসার সময় ঈনশু খুব কায়দা করে তার ঠিক পাশের চেয়ারটায় বসল। টেবিলে বসার পর পরিবারের বড়রা যখন নিজেদের মধ্যে গল্প আর ঘরোয়া আলোচনায় ব্যস্ত, তখন টেবিলের নিচে শুরু হলো এক অন্যরকম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
ঈনশু তার শাড়ির কুঁচি ঠিক করার বাহানায় টেবিলের নিচে আয়াজের পায়ে নিজের জুতো পরা পা দিয়ে জোরে একটা চাপ দিল। ও ভাবল, এবার অন্তত প্রফেসর সাহেব ব্যথা পেয়ে চেঁচিয়ে উঠবেন কিংবা ভড়কে যাবেন।
আয়াজ তখন চায়ের কাপ মুখে তুলতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পায়ের ওপর এমন অতর্কিত আক্রমণে তাঁর চোখ দুটো চশমার আড়াল থেকে ক্ষণিকের জন্য একটু বড় বড় হয়ে গেল। কিন্তু তিনি ড. আরশাদ খান আয়াজ, ক্লাসরুমের বাঘ। নিজের কড়া ভাবমূর্তি ঘরের লোকের সামনে সহজে নষ্ট হতে দেবেন না। তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গম্ভীর মুখে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিলেন, যেন কিছুই হয়নি।
তবে খেলা এখানেই শেষ হলো না। টেবিলের নিচে আয়াজ নিজের পা সরিয়ে নিলেন না, বরং উল্টো ঈনশুর পা-টাকে নিজের দুই পায়ের শক্ত বন্ধনে এমনভাবে লক করে ফেললেন যে ঈনশু আর পা নাড়াতে পারল না।
ঈনশু মনে মনে রেগে আগুন হয়ে গেল। সে আড়চোখে আয়াজের দিকে তাকাল। আয়াজ তখন খুব শান্ত মুখে ইব্রাহিম খানের সাথে দেশের কর ব্যবস্থা ও অর্থনীতি নিয়ে মারাত্মক গম্ভীর আলোচনা করছেন। কার বাপের সাধ্য আছে যে বুঝবে টেবিলের নিচে এই গম্ভীর লোকটা তার নতুন বউয়ের পা বন্দি করে রেখেছে!
ঈনশুও তো দমবার পাত্রী নয়। সে তার ডান হাতটা টেবিলের নিচে নিয়ে আয়াজের উরুতে জোরে করে চিমটি কাটার চেষ্টা করল। কিন্তু আয়াজ যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। সে চট করে ঈনশুর সেই চতুর হাতটা নিজের বড়, শক্ত মুঠোয় বন্দি করে ফেলল। শুধু বন্দিই করল না, নিজের আঙুলগুলো ঈনশুর নরম আঙুলের ফাঁকে গলিয়ে দিয়ে একদম ইন্টারলক করে শক্ত করে ধরে রইল।
ঈনশুর গাল এবার সত্যি সত্যি লাল হয়ে উঠল। সে হাতটা ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগল, কিন্তু আয়াজের গ্রিপ অত্যন্ত মজবুত। আয়াজ ইব্রাহিম খানের দিকে তাকিয়ে বললেন, "হ্যাঁ কাকা, আপনি ঠিকই বলেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্রদের প্র্যাক্টিকাল নলেজ বাড়ানোটা খুব দরকার।" আর কথাটি বলার মাঝেই তিনি টেবিলের নিচে ঈনশুর হাতের তালুতে নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে, অত্যন্ত রোমান্টিক উপায়ে বৃত্তাকার লাইনে ঘষতে লাগলেন।
ঈনশুর পুরো শরীরে যেন এক তীব্র বিদ্যুৎ খেলে গেল। দুনিয়ার কাছে যে মেয়ে এক নাম্বারের জেদি আর অহংকারী, সে এখন নিজের গম্ভীর বরের হাতের মুঠোয় বন্দি হয়ে মনে মনে ছটফট করছে, অথচ মুখে কিছু বলতে পারছে না।
সায়েব ইনশুর মুখের এই হঠাৎ লাল হয়ে যাওয়া আর ছটফটানি লক্ষ্য করল। সে খুব ভালো করেই চেনে তার বোনকে। সে বাঁকা হেসে বলল, "কী রে ঈনশু? তোর মুখ এত টমেটোর মতো লাল দেখাচ্ছে কেন রে? সকাল সকাল কি জন্ডিস হলো নাকি প্রফেসরের কোনো কঠিন থিওরি সকাল সকাল খালি পেটে হজম করতে পারছিস না?"
ঈনশু চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে সায়েবকে চোখ রাঙিয়ে বলল, "তুই নিজের চরকায় তেল দে তো সায়েব! কাল যে তুই কলেজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে ব্যাকবেঞ্চে বসে আড্ডা দিচ্ছিস আর প্রক্সি দেওয়াচ্ছিস, সেটা কিন্তু আয়াজ ভাই... মানে উনি সব জানেন। আজ কলেজে গেলে বুঝবি মজা!"
আয়াজ এবার টেবিলের নিচে ঈনশুর হাতটা আলতো করে ছেড়ে দিলেন এবং নিজের চশমাটা ঠিক করে সায়েবের দিকে তাকালেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর চোখ-মুখের সেই গোপন রোমান্টিক ভাব উধাও হয়ে সেখানে প্রফেসরের গম্ভীর ও কড়া রূপ ফিরে এল। তিনি কড়া গলায় বললেন, "সায়েব, ঈনশু ঠিকই বলেছে। তোমার গত সপ্তাহের থিসিস পেপারের সাবমিশন এখনো বাকি। আজ দুপুর ১২টার মধ্যে যদি আমার ডেস্কে ওটা না পৌঁছায়, তবে এই সেমিস্টারে তোমার অ্যাটেনডেন্স জিরো কাউন্ট হবে। আর হ্যাঁ, ঘরে আমি তোমার দুলাভাই হতে পারি, কিন্তু ডিপার্টমেন্টে আমি শুধুই ড. আরশাদ খান আয়াজ তোমার প্রফেসর।"
সায়েব কাল্পনিক কান্নার অভিনয় করে কপালে হাত দিয়ে বলল, "আরে ভাই! ঘরে এসেও তুমি প্রফেসরগিরি ছাড়বে না? বড় আম্মু দেখেছ, কাল রাতে আমার বোনটাকে কেড়ে নিল, আর আজ সকাল থেকে আমার মার্কস কাটার হুমকি দিচ্ছে! এরা দুই ভাইবোন মিলে আমার জীবনটা শেষ করে দেবে!"
সবাই সায়েবের কাণ্ড দেখে হেসে উঠল। কিন্তু এই হাসাহাসির মাঝেই শওকত খুব সূক্ষ্ম, কুৎসিত চাউনিতে ঈনশুর শরীরের দিকে তাকাচ্ছিল। তার সেই বাঁকা নজরটা আয়াজের তীক্ষ্ণ চোখ এড়াল না। আয়াজের চোয়াল মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে উঠল। তিনি শওকতের দিকে এক শীতল, অন্ধকার ও ভয়ানক রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। প্রফেসরের সেই চোখের ভয়ঙ্কর ভাষা বুঝতে শওকতের বেশি সময় লাগল না, সে চট করে মেরুদণ্ড সোজা করে নিজের নজর নামিয়ে চায়ের কাপে মনোযোগ দিল।
নাস্তা শেষ হতেই ঈনশু নিজেকে ওই টেবিল থেকে উদ্ধার করার জন্য তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "বড় আম্মু, তোমরা বসো, আমি টেবিলটা পরিষ্কার করে প্লেটগুলো রান্নাঘরে নিয়ে যাচ্ছি।"
সে যখন প্লেটগুলো হাতে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল, আয়াজও নিজের পানির গ্লাসটা রাখার বাহানায় তার পেছন পেছন রান্নাঘরে ঢুকলেন।
রান্নাঘরে তখন বাড়ির আর কোনো কাজের মানুষ বা বড়রা নেই। ঈনশু প্লেটগুলো সিঙ্কে রেখে যেমনই ঘুরে দাঁড়াল, ওমনি দেখল আয়াজ একদম তার সামনে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দুই হাত ঈনশুর দুই পাশে দেয়ালের ওপর রাখা, যার ফলে ঈনশু পুরোপুরি তাঁর বাহুডোরে অবরুদ্ধ।
"কী ব্যাপার প্রফেসর সাহেব? রান্নাঘরেও কি কোনো স্পেশাল প্র্যাক্টিকাল ক্লাস আছে নাকি?" ইনশু তার সেই চিরচেনা জেদি আর ঠোঁটকাটা গলায় বুক ফুলিয়ে বলল, যদিও তার ভেতরের হৃৎপিণ্ড তখন ড্রাম বাজাচ্ছিল।
আয়াজ আরও একটু কাছে ঝুঁকে এলেন। তাঁর চশমা জোড়া এখন ইনশুর চোখের খুব কাছে। তিনি নিছু, মায়াবী কিন্তু গম্ভীর স্বরে বললেন, "টেবিলের নিচে জুতো দিয়ে লাথি মা-রা আর চিমটি কাটার চেষ্টা করার শাস্তিটা কিন্তু এখনো বাকি আছে,জেদিলতা।"
ইনশু নিজের ভন্ডামি বজায় রেখে বলল, "কীসের শাস্তি? আমি তো আপনাকে পরীক্ষা করছিলাম। আপনি কত বড় গম্ভীর প্রফেসর, তা তো দেখাই গেল। টেবিলের নিচে নতুন বউয়ের হাত ধরে বসে থাকতে লজ্জা করে না? ক্লাসের ছাত্ররা দেখলে কী বলবে?"
আয়াজ একটু হাসলেন। তাঁর সেই হাসিতে ছিল এক অদ্ভুত পুরুষালি টান। তিনি আচমকাই ঈনশুর খুব কাছে ঝুঁকে এসে তার কপালে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছোঁয়ালে। সেই স্পর্শটা ছিল অত্যন্ত শালীন, গভীর, কিন্তু ভালোবাসায় জড়ানো এক তীব্র ঘোষণা।
ঈনশু স্তব্ধ হয়ে গেল। তার সমস্ত জেদ, অহংকার আর ভন্ডামি যেন এই একটা গভীর ছোঁয়ায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে শুধু দেখল আয়াজের চোখ দুটো চশমার আড়ালে কতটা তীব্র আলো ছড়াচ্ছে।
আয়াজ তার কপাল থেকে ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে গভীর গলায় বললেন, "পরীক্ষায় আমি সবসময় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হই, ঈনশু। তাই আমাকে পরীক্ষা করার চেষ্টা আর কখনো করবে না। আর একটা জরুরি কথা..." আয়াজের গলাটা এবার বেশ গম্ভীর ও সতর্ক শোনাল, "ওই শওকত লোকটার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখবে। ওর নজরটা আমার মোটেও ভালো ঠেকছে না। যদি ও কোনো রকম আজেবাজে আচরণ বা সমস্যা করার চেষ্টা করে, সোজা আমাকে বলবে। মনে থাকবে?"
ঈনশু কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু বড় বড় চোখ করে আয়াজের দিকে তাকিয়ে রইল। সে মনে মনে ভাবল, "রনির ওপর জেদ দেখাতে গিয়ে আমি কি নিজের অজান্তেই এই বুদ্ধিমান প্রফেসরের ভালোবাসার জালে চিরতরে বন্দি হয়ে গেলাম?"
বাইরে থেকে তখন সায়েবের চিল্লানো গলা শোনা গেল, "আয়াজ ভাই! ১২টা বাজতে চলল, তোমার কলেজের গাড়ি কিন্তু গেটে হর্ন দিচ্ছে! আমার অ্যাসাইনমেন্টটা মাফ করে দাও না প্লিজ!"
আয়াজ ইনশুর লাল হয়ে যাওয়া গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে চোখ মে-রে বললেন, "আজ কলেজে সাবধানে এসো, ঈনশু। ক্লাসে কিন্তু আমি তোমার শুধুই প্রফেসর, সেখানে ভুল করলে সবার সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে দেব!"
এই বলে তিনি এক গাল চমৎকার রোমান্টিক হাসি দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, আর ইনশু নিজের গালে হাত দিয়ে এক অদ্ভুত মিষ্টি আবেশে রান্নাঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post