অঘোষিত_হৃদয়সন্ধি

 অঘোষিত_হৃদয়সন্ধি

অঘোষিত_হৃদয়সন্ধি


চোরকে সামলানোর পর নিজের ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজল মি. দিদার। কিন্তু না, সাধের ক্রেডিট কার্ডটা কোথাও নেই! মাথায় হাত দিয়ে মি. দিদার যখন হুঙ্কার দিয়ে মি. চোরকে ধরতে যাবে, ঠিক তখনই আরিশা বুঝতে পারল—চোর মুখ খুললে আজ তার দফা রফা! সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চোরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং ধুমধাম কয়েকটা লাগিয়ে বেচারাকে অজ্ঞান করে ফেলল।​এদিকে ক্রেডিট কার্ডের শোকে মি. দিদার এখন ড্রয়িংরুমের চেয়ারে বসে রীতিমতো বিলাপ জুড়ে দিয়েছেন। ওনার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কার্ড নয়, কলিজার একটা টুকরো হারানো গিয়েছে। ফারিশ আর মিসেস নাহার স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ওনার কাণ্ড দেখছেন। ওদিকে আরিশা ঠিক বাবার সামনে সোফায় বসে বিরক্ত মুখে পা নাচাচ্ছে। মনে মনে বিড়বিড় করছে—
​"অ্যাহহ, নাটক যে কত দেখব! কাঁদো কাঁদো, কাঁদতে কাঁদতে শহীদ হয়ে যাও তবুও বোম ফাটলেও তোমায় আমি ক্রেডিট কার্ড ফেরত দিচ্ছি না!এখন ওটা আমার!"
​ফারিশ এতক্ষণ চুপ করে সবটা পর্যবেক্ষণ করছিল। তার উকিল মস্তিষ্ক আরিশার ওই চোরা চাউনি আর অতি-উৎসাহী হয়ে চোরকে অজ্ঞান করা দেখে পুরো বিষয়টা ধরে ফেলেছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল—
​"আরিশা!! আঙ্কেলকে ক্রেডিট কার্ডটা দিয়ে দাও!!"
​ফারিশের এমন ডিরেক্ট অ্যাটাকে আরিশা একদম বিষম খাওয়ার মতো চমকে উঠল। তুতলিয়ে নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
"আ.. আমি কোথায় থেকে দেব? আমি কি চোর নাকি?"
​"আরিশা!!"
ফারিশ এবার গলায় কিছুটা চাপ দিয়ে পুনরায় ডাকল।​মি. দিদার ‘ক্রেডিট কার্ড’ নামটা শুনতেই তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। যেন মৃতদেহে প্রাণ ফিরে এসেছে!
"কে... কে নিয়েছে আমার কার্ড? তুই আরিশা? দিয়ে দে মা!!"
​আরিশা এবারও আমতা আমতা করে বলল,
"আ... আমি কেন নেব? চোরই তো নিল হয়তো!"
​ফারিশ এবার এক পা এগিয়ে আসতেই আরিশার সব প্রতিরোধ ভেঙে গেল। সে রেগে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল,
"হ্যাঁ, নিয়েছি তো বেশ করেছি! ওই চোর নিলে তো তোমার সব টাকা যেত, এখন আমি নিলে বড়জোর অল্প কিছুই খরচ করব! এতে কান্নার কী আছে?"
​মি. দিদার এবার রীতিমতো কাঁপতে শুরু করলেন।
"খবরদার! এক টাকাও যদি তুই ওই কার্ড থেকে খরচ করেছিস, তবে তোর খবর আছে!"
​বাবার এমন বাড়াবাড়ি কিপ্টেমি দেখে আরিশা হতাশ হয়ে তার মায়ের দিকে তাকাল।
"এই কিপ্টেটাকে তুমি কী দেখে বিয়ে করেছিলে মা? সিরিয়াসলি!"
​মিসেস নাহার এবার একটা গভীর আফসোসমাখা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"আরে তখন আমার আবেগে কাজ করেছে, বিবেকে না রে মা। এ পাবলিক যে এত কিপ্টে তা বলার বাইরে। বিশ্বাস করবি না ফারিশ, গতকাল সে ব্রাশ করতে গিয়ে দেখে টুথপেস্ট শেষ। বললাম নতুন একটা বের করো! আমার কথা না শুনে ওই শেষ হয়ে যাওয়া টুথপেস্টের টিউবটাকে পোস্টমর্টেম করে ইউজ করছে! এর কিপ্টামো কল্পনারও বাহিরে। তবে আমার ক্ষেত্রে আবার সে হাত খুলে খরচ করে!"
​লাস্টের কথাটা বেশ গদগদ হয়ে লাজুক হাসিতে বললেন মিসেস নাহার। ফারিশ আর আরিশা দুজনেই হা হয়ে মিসেস নাহারের দিকে তাকিয়ে রইল। ফারিশ এবার আরিশার দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল—
​"আঙ্কেলকে কার্ডটা দিয়ে দাও আরিশা। তোমার যা টাকা লাগবে আমাকে বলো, আমি দিচ্ছি!"
​আরিশা এবার ফারিশের দিকে ফিরে চোখ ছোট করে তাকাল।
"নাহ, অসম্ভব! নিজের বউয়ের বেলায় ঠিক আর বাকিদের বেলায় বেঠিক? এই কার্ড থেকে আজ ২০ হাজার টাকা খরচ করে তবেই আমি শান্তি পাব। বাই!!"
​কথাটা বলেই আরিশা ক্রেডিট কার্ডটা বাতাসে নাচাতে নাচাতে গটগট করে বাইরে বেরিয়ে গেল। ফারিশ একবার মি. দিদারের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে আরিশার পিছু নিল।​ওদিকে মি. দিদার আবার চেয়ারে ধপ করে বসে বিলাপ শুরু করলেন,
"গেল গেল... আমার সব গেল রে!শয়তান মেয়েটা একদম নানার মতো হয়েছে!!"
​মি. দিদারের কথায় মিসেস নাহার এবার রাগে জ্বলে উঠলেন।
"একদম কথায় কথায় আমার বাপকে টানবে না দিদার!"
​"হাজার বার টানব! তোমাকে বিয়ে করার জন্য ওই শ্বশুরকে পটাতে কম খরচ তো আর করিনি! ... সব গেল..."
________
মিসেস ফাতেমা আর আরিশা বেশ গল্প করতে করতে বাগানে হাঁটছিলেন।পরিবেশটা বেশ মনোরম। ঠিক এমন সময় ফারিশের এক ক্লায়েন্ট এলো। সচরাচর ফারিশ কোনো ক্লায়েন্টকে বাসায় নিয়ে আসে না, সে তার প্রফেশনাল লাইফটা খুব আলাদা রাখতেই পছন্দ করে। তবে আজকের ব্যাপারটা এতটাই জরুরি আর গোপনীয় যে, সে বাধ্য হয়েই লোকটিকে নিজের স্টাডি রুমে নিয়ে গেল।​গল্পের মাঝখানে হঠাৎ মিসেস ফাতেমা আরিশার কাঁধে হাত রেখে বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠলেন,
"ওহ, ভালো কথা আরিশা! বলতে একদম ভুলে গেছি। তোর আঙ্কেলরা মিলে আজ বসেছিল, আয়ান আর ইনায়ার এনগেজমেন্টের দিন একদম পাকা করে ফেলেছে!"
​"কী বলো আন্টি!!"
আরিশার চোখে তীব্র বিষ্ময়।
"আয়ান ভাই আর ইনায়া কি জানে এই খবর?"
​মিসেস ফাতেমা একটু হেসে বললেন,
"এতক্ষণে হয়তো জেনে গেছে।"
​খবরটা শুনে আরিশা এবার সত্যিই চরম দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেল। ইনায়া আর আয়ান ভাইয়ের সমীকরণ যা—তাতে সত্যি সত্যি যদি এদের বিয়ে দেওয়া হয়, তবে বাসর রাতেই তো একে অপরকে নির্ঘাত মার্ডার করবে! আর পরের দিন সকালে মি ফারিশ নওয়ানকে খুনের মামলা লড়তে হবে। ​আরিশা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে আয়ানের রুমের দিকে রওনা দিল। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে মাঝপথেই তার দেখা হয়ে গেল আয়ানের সাথে। আয়ানকে দেখে মনে হচ্ছে সে অলরেডি কোনোভাবে আগাম সংকেত পেয়ে গেছে। তার মুখভঙ্গি পুরো ফ্যাকাসে হয়ে আছে।​আরিশাকে দেখেই আয়ান প্রায় কেঁদে দেওয়ার মতো মুখ করে বলল,
"আরে আরিশা, তোর কাছেই যাচ্ছিলাম রে! এখন কী করব বল তো বোইন? বাড়িতে তো দেখছি সবাই হুটহাট সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। সত্যি সত্যি ওই ডাইনিটার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দেবে রে!"
​আরিশা দুই হাত কোমরে দিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,
"আরে ধুর! তুমি তো মস্ত বড় লয়ারের ভাই। তোমার ওই লয়ার ভাইকে কোনো বুদ্ধি দিতে বলতে পারছ না? ও তো কত জটিল কেস সমাধান করে!"
​আয়ান এবার কপাল চাপড়ে বলল,
"আরে ওকে কী বলব! আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার খবরে তো ওই ব্যাটাই সবচেয়ে বেশি এক্সাইটেড! তুই কিছু একটা কর বোইন! তোর মাথায় তো সবসময় শয়তানি বুদ্ধি ঘুরে বেড়ায়, এই ভাইটাকে বাঁচা!"
​আরিশা এবার এক ভুরু উঁচিয়ে আয়ানের দিকে তাকাল।সে বুঝতে পারল না কথাটা প্রশংসা ছিল নাকি দুর্নাম। তবে আরিশার মাথায় তখন অন্য ছক। যেহেতু মি. লয়ার ফারিশ নওয়ানই বিপদে ফেলেছে—তবে উদ্ধার করার দায়িত্বও তাকেই নিতে হবে।​আরিশা এবার দৃঢ় পায়ে হাঁটা শুরু করল। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"চলো মি. লয়ারের কাছেই যাওয়া যাক! তাকেই বলব এই কেসের সমাধান করতে।"
​আয়ানও আর দ্বিমত না করে আরিশার পেছন পেছন গুটিগুটি পায়ে ফারিশের স্টাডি রুমের দিকে পা বাড়াল।
স্টাডি রুমের গাম্ভীর্য তখন তুঙ্গে। ফারিশ তার ক্লায়েন্টের দেওয়া অত্যন্ত সেনসিটিভ একটা ফাইল চেক করছিল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে জানালার ওপার থেকে ভেসে এল সেই অতি পরিচিত বেসুরো সুর,
​"Oh whoaa~
Aha!
Oh whoaa hoo~
Aha!
Oh whoa oh hoo~
Hoo"
​ফারিশের কলমটা কাগজের ওপর থমকে গেল। সে আড়চোখে দেখল, জানালার ওপারে আয়ান আর আরিশা রীতিমতো স্টেজ পারফরম্যান্সের ভঙ্গিতে হাত-পা ছুড়ছে। আয়ান যেন কোনো অপেরা সিঙ্গার, আর আরিশা তার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিশিয়ান!​ফারিশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ক্লায়েন্ট লোকটা একবার জানালার দিকে তাকায়, একবার ফারিশের দিকে। তার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মি. নাসিরের রাগী কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
​"কোন শয়তানের গলায় যক্ষ্মা হয়েছে রে?? এভাবে ছাগলের মতো ভ্যা ভ্যা করছিস কেন??"
​মি নাসিরের চিৎকারে আরিশা আর আয়ান দমে যাওয়া তো দূরের কথা, তারা যেন দ্বিগুণ উৎসাহ পেল। আরিশা আয়ানকে চোখ টিপে ইশারা করল—‘কাজ হচ্ছে আয়ান ভাই, ক্যারি অন!’ তারা এবার রুমের আরও কাছে এসে গান শুরু করল,
​"You know you love me,
Love me
I know you care...
You care
Just shout whenever, and I will be there!
I'll be there"
​ফারিশের মাথা তখন রাগে দপদপ করছে।বিশেষ করে আয়ান আর আরিশার এই ক্লোজনেস তার সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,
"ডিসটেন্স!! ডিসটেন্স!!"
​ফারিশের সামনে বসে থাকা ক্লায়েন্ট ঘাবড়ে গিয়ে চেয়ারটা একটু পিছিয়ে নিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
"দূরেই তো আছি স্যার! একদম সোশ্যাল ডিসটেন্স মেইনটেইন করছি!"
​ফারিশ ক্লায়েন্টের দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকাল। তার চোখে তখন খুনের নেশা। সে আবার জানালার ওপারে আরিশাদের দিকে তাকিয়ে সজোরে টেবিল চাপড়ে হুঙ্কার দিল,
"আই সেইড ডিসটেন্স!!!"
​ফারিশের সেই গর্জনে আরিশা আর আয়ান ‘বাপ রে’ বলে এক দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। ওদিকে স্টাডি রুমের ভেতর ক্লায়েন্টের অবস্থা শোচনীয়! সে ভয়ে এক লাফে চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
​"আরে স্যার! আমি তো দূরেই আছি! একদম তিন হাত দূরে!"
​ফারিশ তখনও রাগে ফুঁসছে দেখে ক্লায়েন্ট আর রিস্ক নিল না। সে চেয়ার থেকে নেমে এক দৌড়ে রুমের কর্নারে থাকা শোকেজের ওপর উঠে হাঁটু গেড়ে বসল। কাঁপা গলায় বলল,
"এর থেকে আর ডিসটেন্স সম্ভব না স্যার! তবুও রাইগেন না, হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে আমার!"
​ফারিশের মাথার রাগ তখন সপ্তম আকাশে। সে আর সহ্য করতে না পেরে ড্রয়ার টেনে তার লাইসেন্স করা বন্দুকটা হাতে নিল। সেটা হাতে নেওয়া মাত্রই ক্লায়েন্ট লোকটা দৌড় দিল।
​"২৪ আওয়ারের মধ্যে যদি সঠিক তথ্য না পেয়েছি..."
ফারিশের বাক্য শেষ হওয়ার আগেই ক্লায়েন্টের চিৎকার ভেসে এল ওপার থেকে—
​"পাবেন পাবেন স্যার! ২৪ কেন, ১৪ আওয়ারের মধ্যে সব খবর আপনার টেবিলে থাকবে! দয়া করে ট্রিগার টিপবেন না!"
​চরম উত্তেজনার মাঝেও আরিশা আর আয়ান তখন পাশের ঘরের কোণ থেকে উঁকি দিয়ে এই দৃশ্য দেখে হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে। ফারিশ বন্দুকটা টেবিলের ওপর রেখে লম্বা একটা শ্বাস নিল।সম্ভবত নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post