আরাভ প্যারিস গেছে আজ তিন দিন হলো। এই তিন দিনে সায়রা নিজেকে একদম স্বাভাবিক করে ফেলেছে। আগের মতোই সকালে উঠছে, নাওয়া-খাওয়া করছে, নিয়মিত ভার্সিটিতে যাচ্ছে—বাইরে থেকে দেখে মনে হবে সব কিছু একদম ঠিকঠাক আছে। কিন্তু সায়রা আসলে সবার থেকে নিজেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিচ্ছে। আগে থেকেই সায়রা কথা একটু কম বলত, আর এখন প্রয়োজন ছাড়া কেউ কিছু জিজ্ঞেস না করলে মুখই খোলে না। শারমিন শাহরিয়ার ভাবছেন আরাভ আর সাফওয়ান দুজনেই বাড়িতে নেই বলে হয়তো মেয়েটার মন খারাপ, ওরা ফিরে আসলেই সব আবার আগের মতো হয়ে যাবে।
তবে আরিশা কিছুটা আঁচ করতে পারছে যে সায়রা নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে নিচ্ছে। তাই সে নিজের মনের কষ্ট ভুলে সায়রার সাথেই বেশি সময় কাটায়। এদিকে সায়রাও কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না তার ভেতরে কী মারাত্মক ভাঙচুর চলছে। আরিশা কিছু জিজ্ঞেস করলে সেটুকু জবাব দেয়, দিনে একবার-দুবার মাইশার কাছ থেকে সবার খোঁজখবরও নেয়; কিন্তু আরাভের সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি। আরাভ অনবরত কল করে গেলেও সায়রা একবারের জন্যও ফোন রিসিভ করেনি। বেশি কল করলে সে ফোনটাই বন্ধ করে রেখে দেয়।
ওদিকে প্যারিসে আরাভ সারাদিন রিসার্চের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর রাতে রুমে ফিরে ল্যাপটপের সামনে বসে একদৃষ্টিতে সায়রাকে দেখে। সায়রা সারারাত একদম চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে, নয়তো স্নো-এর সাথে আনমনে কথা বলে, কিংবা বারান্দার দোলনায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আরাভের রাতের ঘুম চিরতরে উধাও হয়ে গেছে। তার ভেতরের ছটফটানি কিছুতেই কমছে না, এক তীব্র অপরাধবোধ তাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। বুকে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে সারাদিন গবেষণার কাজ করে আর রাত কাটে নির্ঘুম চোখে। খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। সায়রার এই নিষ্প্রাণ অবস্থা দেখে আরাভের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যায়, অথচ দূর পরবাসে থাকায় তার হাত-পা বাঁধা, কিচ্ছু করার নেই। সে প্রতিদিন হাজার বার চেষ্টা করেও সায়রার কোনো সাড়া পায় না।
আরাভ যেন জলছাড়া মাছের মতো সারারাত ছটফট করে তার আইরিকে একটু বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য। কিন্তু সে যে আজ অনেক দূরে! সায়রার গায়ের সেই চেনা মেয়েলি ঘ্রাণ, তার রিনিঝিনি মিষ্টি হাসির শব্দ—কোনো কিছুই এখানে নেই। এই বিলাসবহুল রুমের দামী দামী জিনিসপত্রের মাঝেও আরাভের বিন্দুমাত্র শান্তি নেই। তার দেহটা প্যারিসে পড়ে থাকলেও রুহটা পড়ে আছে তার আইরির কাছে। দুই দেশের দুই প্রান্তে বসে দুজন মানুষ দুরকমভাবে তড়পাচ্ছে পরস্পরের অভাবে। একজন স্ক্রিনে প্রিয়তমার ঘুমন্ত মুখ দেখে নির্ঘুম রাত পার করছে, আর অন্যজন সব কষ্ট নিজের ভেতরে চেপে রেখে বাইরে ‘স্বাভাবিক’ সাজার অভিনয় করে যাচ্ছে।
~~~~~~~~~~~
আজ দীর্ঘ ৪৮ দিন পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখল আরাভ। দুই মাসের রিসার্চের কাজ ছিল, কিন্তু আরাভ দিনরাত এক করে পরিশ্রম করেছে, ওখানকার প্রফেসরদের সাথে কথা বলে অনেক কষ্টে নির্ধারিত সময়ের ১২ দিন আগেই বাংলাদেশে ফিরে এসেছে। এই ৪৮টা দিন সে কীভাবে পার করেছে, তা শুধু সে আর তার আল্লাহই জানেন। প্রতিটা রাতে বুকের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সিসিটিভি ফুটেজে সায়রাকে দেখতে দেখতে কেটেছে তার। সায়রা একবারও আরাভের কল রিসিভ করেনি, নিজের মতো ভার্সিটিতে গেছে-এসেছে, আরিশার সাথে বসে কথা বলেছে—সবকিছুই করেছে একদম নিয়মমাফিক। কিন্তু আরাভ খুব ভালো করেই জানে, তার আইরি নিজের ভেতরের প্রলয়ংকারী ঝড়টা কাউকে বিন্দুমাত্র বুঝতে দেয়নি।
আরাভ প্যারিস থেকে ভোর চারটার ফ্লাইট ধরেছিল। আগের দিন সারারাত ছটফট করতে করতে ওখানকার সময় অনুযায়ী রাত দুইটা বাজতেই সে গেস্ট হাউস ছেড়ে প্যারিস এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সেখান থেকে ভোর চারটায় ফ্লাইট নিয়ে দুবাই আর কাতার ট্রানজিট পার করে অবশেষে যখন বাংলাদেশের মাটিতে ফ্লাইট ল্যান্ড করল, তখন ঘড়িতে রাত দশটা। এয়ারপোর্টে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল আরাভের অ্যাসিস্ট্যান্ট রাজিব। তবে এয়ারপোর্ট থেকে জ্যাম ঠেলে ধানমন্ডির বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরও দুটো ঘণ্টা কেটে গেল।
রাত যখন বারোটা, তখন আরাভ নিজের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। কে জানে, তার আইরি এখন কী করছে! আরাভ কলিং বেল বাজাল, কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। আরও কয়েকবার বেল বাজানোর পর অবশেষে শারমিন শাহরিয়ার দরজা খুলে দিলেন। এত রাতে ছেলেকে হুট করে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি ভীষণ অবাক হলেন। তবে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে আরাভকে ভেতরে আসতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
– “তোর তো আরও কয়েকদিন পরে আসার কথা ছিল! তাহলে এত তাড়াতাড়ি কীভাবে চলে আসলি?”
আরাভ মায়ের কথার জবাবে ম্লান হেসে বলল—
– “আম্মু, কাজ শেষ হয়ে গেছে, তাই চলে আসলাম। ওখানে একা একা আর কী করব?”
ছেলের দিকে তাকিয়ে শারমিন শাহরিয়ার আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলেন না। আরাভের চোখ দুটো শুকিয়ে ভেতরে দেবে গেছে, চোখের নিচে স্পষ্ট কালচে দাগ। মাত্র কয়েকটা দিনেই চেহারাটা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে। ছেলের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে মায়ের মন হু হু করে উঠল। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন—
– “তুই ওখানে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া সব ছেড়ে শুধু কাজ নিয়েই পড়েছিলি, তাই না? নিজের মুখের কী অবস্থা করেছিস দেখ! চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে, মুখটা শুকিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় তো এমন ছিলি না তুই!”
আরাভ মায়ের কথার পিঠে কিছু না বলে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মাকে সে কিভাবে বোঝাবে—তার ভালো থাকার মূল চাবিকাঠিই যার কাছে, সে-ই যখন দীর্ঘ ৪৮টা দিন যোগাযোগ বন্ধ করে রাখে, তখন মানুষ কীভাবে ভালো থাকে? যার নীরবতা মরণযন্ত্রণা দেয়, সেই যন্ত্রণা বুকে চেপে খাওয়া-দাওয়া করে ভালো থাকা কি আদৌ সম্ভব?
আরাভকে চুপ থাকতে দেখে শারমিন শাহরিয়ার তাকে উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিতে বললেন। তিনি খাবার গরম করার জন্য রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতে চাইলে আরাভ বলল সে এখন কিছু খাবে না, ফ্লাইটে খেয়ে এসেছে। যদিও আরাভ এক দানাও মুখে তোলেনি। সে এখন শুধু তার আইরিকে বুকে জড়িয়ে ধরতে চায়, তার সব অভিমান ভাঙাতে চায়। যতক্ষণ না তার আইরির সাথে কথা হচ্ছে, ততক্ষণ এক ঢোক জলও তার গলা দিয়ে নামবে না। আরাভ উপরে চলে যাওয়ার সময় মাকেও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলল।
আরাভ রুমের দরজা খুলে ঘরের আবছা নীল আলোয় দেখল সায়রা কমফোর্টার মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। আরাভ ঘরের বড় লাইটটা না জ্বালিয়ে নিজের ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করল। খুব সন্তর্পণে রুমে ঢুকে সে ওয়াশরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর গোসল সেরে মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। পরনে কালো টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। আরাভ আলতো করে সায়রার কমফোর্টারের ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু ঢুকতেই হঠাৎ ‘মিউ মিউ’ শব্দ করে উঠল কেউ। আরাভ কমফোর্টারটা একটু আলগা করে উঁচু করতেই ঘরের আবছা হালকা নীল আলোয় দেখতে পেল সাদা স্নো-কে! সে সায়রার বুকের ওপর একদম ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে, চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে।
আরাভ স্নো-কে কোল থেকে সরিয়ে খাট থেকে নামিয়ে দিল, তারপর ফিসফিস করে বলল—
– “এতদিন আমি ছিলাম না বলে তুই ছেলের দায়িত্ব পালন করেছিস, এতে আমি তোর ওপর বেশ সন্তুষ্ট। তোকে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেব, একটা সঙ্গী এনে দেব তোকে। কিন্তু এখন লক্ষ্মী ছেলের মতো যা তো দেখি, তোর মাম্মামের হাজবেন্ড চলে এসেছে।”
কিন্তু আরাভের কথা শুনেও স্নো একটুও নড়ল না। সে যেন আরও জোরে ‘মিউ মিউ’ করে ডেকে উঠল। বিড়ালটার ডাক শুনে মনে হলো সে বলতে চাইছে— ‘এতদিন আমার মাকে কাঁদিয়ে, এখন আবার মায়ের কাছে আসছো কেন? যাও এখান থেকে! আমি আমার মাকে ছাড়া কোথাও যাব না।’
স্নো-কে আবারও বিছানায় এক লাফে উঠে পড়তে দেখে আরাভ বেজায় বিরক্ত হলো। এমনিতেই এতগুলো দিন সে তার আইরির থেকে দূরে ছিল, এখন একটু বুকে জড়িয়ে ধরে এই অশান্ত বুকটাকে শান্ত করতে চাইছে—সেখানেও বাধা দিচ্ছে এই বিড়ালের বাচ্চা! সে স্নো-কে দুই হাতে শূন্যে উঁচু করে ধরে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল—
– “আমি ছিলাম না বলে আমার বউয়ের সাথে ছিলি, তাই এতক্ষণ তোর সাথে ভালো মানুষের মতো কথা বলছিলাম। কিন্তু এখন যদি আমার আর আমার বউয়ের মাঝে আসতে চাস, তোকে একেবারে ঘরছাড়া করব! তোকে না আমি শুরুতেই বলেছিলাম, আমি ফিরে আসলে তুই আমার বউয়ের আশেপাশেও আসবি না? যা এখন এখান থেকে!”
বলেই সে স্নো-কে আলতো করে ফ্লোরে নামিয়ে দিল। আরাভের ধমক খেয়ে স্নো ‘মিউ মিউ’ করতে করতে বারান্দার দিকে চলে গেল। যেতে যেতে সে যেন চোখ বাঁকিয়ে বলে গেল— ‘কাল সকালে দেখব মায়ের কাছে কে থাকে!’ স্নো বারান্দায় তার জন্য বানানো ছোট্ট সুন্দর ঘরটিতে গিয়ে আশ্রয় নিল।
আরাভ সায়রাকে বুকে টেনে নিতেই হঠাৎ থমকে গেল। এ তো তার আইরি হতেই পারে না! মেয়েটা এতটা হালকা হলো কীভাবে? মনে হচ্ছে এই ৪৮ দিনে যেন দশ কেজি ওজন কমে গেছে! আরাভ আরও বেশি অবাক হলো সায়রার নিঃশ্বাসের গতি দেখে—খুব ক্ষীণ, একদম হালকা। কমফোর্টার জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা শরীরে যে স্বাভাবিক উষ্ণতা থাকার কথা, তা এখন সায়রার মধ্যে নেই; শরীরটা একরকম ঠাণ্ডা আর নিস্তেজ হয়ে আছে। ঘুমালে তো মানুষের শরীর এমন অসাড় হয়ে যায় না! আরাভ তবুও সায়রাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রাখল। এতক্ষণে তার অশান্ত বুকটা কিছুটা শান্ত হতে লাগল—ঠিক যেন ডাঙ্গায় ছটফট করা কোনো মাছ এতক্ষণে চেনা জলের খোঁজ পেয়েছে।
তবুও আরাভ পুরোপুরি শান্ত হতে পারল না। সে সায়রার চুলে নাক ডুবিয়ে দিল—এই তো সেই মিষ্টি মেয়েলি ঘ্রাণ, যা আফিমের নেশার চেয়েও মারাত্মক! অন্য সময় একটা অদ্ভুত ব্যাপার হতো—সায়রা যত গভীর ঘুমেই আচ্ছন্ন থাকুক না কেন, আরাভ জড়িয়ে ধরার সাথে সাথেই সে ঘুমের ঘোরেই বিড়ালছানার মতো আরাভের বুকে এসে লেপ্টে যেত। কিন্তু আজ তেমন কিছুই হলো না। সায়রা যেভাবে ছিল, ঠিক সেভাবেই নিস্পন্দ পড়ে রইল। আরাভ সায়রার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে ডেকে উঠল—
– “আইরি…”
কোনো সাড়া নেই।
– “আইরি, এই আইরি!”
আরও কয়েকবার ডাকার পরেও সায়রা কোনো জবাব দিল না। আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সায়রাকে বুকে জড়িয়েই ঘুমানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা কিছুতেই কমছে না। এই ছটফটানি শুধু তখনই কমবে, যখন তার আইরি নিজের মুখে তার সাথে কথা বলবে, মিস্টার শাহরিয়ার বলে ডাকবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সায়রা নিজেকে আবিষ্কার করল আরাভের প্রশস্তু বুকের মাঝে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে—সায়রা বিন্দুমাত্র কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে আরাভের শক্ত বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর ফ্রেশ হয়ে সোজা নিচে চলে গেল; যেন আরাভের এই ফিরে আসা কিংবা তার উপস্থিতি সায়রার উপর কোনো প্রভাবই ফেলছে না!
এদিকে আরাভ ঘুম থেকে উঠে সায়রাকে নিজের পাশে না পেয়ে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। তাড়াহুড়ো করে পুরো রুমে খুঁজেও যখন সায়রাকে পেল না, তখন সে দ্রুত নিচে নেমে এল। নিচে গিয়ে দেখল সায়রা রান্নাঘরে শারমিন শাহরিয়ারের সাথে নাস্তার কাজে হাত লাগিয়েছে, কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই—একদম নিস্তব্ধ। আরাভ খেয়াল করে দেখলো সায়রা অনেক বেশি শুকিয়ে গেছে শরীর কমে গেছে। চোখের নিচে কালচে দাগ স্পষ্ট। তবুও স্বাভাবিক ভাবেই কাজ করছে সায়রার এই অতিরিক্ত স্বাভাবিক আচরণ আরাভের মেনে নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। সে এত দিন পর ফিরে এল, অথচ সায়রা তার ওপর রাগ করছে না, অভিমান দেখাচ্ছে না, এমনকি বকাঝকাও করছে না! কেন এমন করছে তার আইরি?
আরাভ সায়রাকে উদ্দেশ্য করে ডেকে আবারও ওপরে নিজের রুমে চলে গেল। কিন্তু সায়রা নিজের জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে রইল, ওপরে যাওয়ার কোনো লক্ষণই তার মধ্যে দেখা গেল না। সায়রাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শারমিন শাহরিয়ার বললেন—
– “সায়রা মা, আরাভ তোকে ডাকছে। ওপরে যা।”
সায়রা কোনো দ্বিমত না করে, বিনা বাক্যে ওপরের দিকে পা বাড়াল। শারমিন শাহরিয়ার গভীর চোখে সায়রার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিষয় নিশ্চিতভাবেই তিনি লক্ষ্য করেছেন—সায়রা এখন আর আগের মতো কারো সাথেই ঠিকঠাক কথা বলে না। আগে ওনার সাথে বসলে নিজের মায়ের কথা বলত, নানা ধরনের গল্পের ঝুড়ি খুলে বসত। আর এখন ওনি যা বলেন, সায়রা শুধু সেটুকুই করে; নিজে থেকে কোনো জবাব দেয় না। প্রথমে ভেবেছিলেন আরাভ আর সাফওয়ান বাড়িতে নেই বলে হয়তো মেয়েটার মন খারাপ, কিন্তু আরাভ ফিরে আসার পরেও সায়রার এই পাথরের মতো আচরণ এখন ওনাকেও বেশ ভাবিয়ে তুলল।
~~~~~~~~~~~~
সায়রা রুমে এসে দেখল আরাভ অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। সে ভেতরে ঢুকে একদম স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল—
– “কিছু লাগবে আপনার?”
সায়রার এই অতিরিক্ত স্বাভাবিক আচরণ কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না আরাভ। সে সায়রার দিকে এগিয়ে গিয়ে একদম তার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। সায়রার চোখের দিকে তাকিয়ে আকুল কণ্ঠে বলল—
– “আইরি, রাগ করেছ?”
সায়রা কোনো জবাব দিল না।
– “প্রচণ্ড অভিমান করে আছ, তাই না?”
সায়রা এবার অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল—
– “নাহ।”
এই একটা ‘নাহ’ শব্দের মাঝেই সায়রা যেন তাদের দুজনের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিল। আরাভ আর নিজেকে সামলাতে না পেরে বলল—
– “তাহলে কিছু বলছ না কেন?”
– “বলার মতো কিছু নেই, তাই বলছি না। কী জন্য ডেকেছেন বলুন?”
সায়রার এই চূড়ান্ত উদাসীনতা আরাভের ভেতরে প্রলয়ংকারী ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। তবুও সে নিজেকে কোনোমতে শান্ত রাখল; ভুল যেহেতু তার নিজের, তাই তাকে ঠাণ্ডা মাথায় সায়রার এই পাথরের মতো অভিমান ভাঙাতে হবে। সে সায়রার হাত দুটো ধরতে গিয়ে বলল—
– “আইরি, আমার কথা শোনো। আমি ইচ্ছে করে তোমাকে না জানিয়ে যাইনি…”
কিন্তু আরাভের সেই আকুল কৈফিয়ত শোনার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন মনে করল না সায়রা। সে আলতো করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আবারও রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরাভ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সায়রার চলে যাওয়ার দিকে। তার আইরি আজ তার কোনো কথাই শুনতে চাইল না!
আরাভ এবার বিছানায় বসে নিজের চুল খামচে ধরল। অস্থির চিত্তে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ দেওয়ালে জোরে ঘুসি মারলো সেভাবেই বিড়বিড় করে বলল—
– “কেন এমন করছ জান? তোমার এই নীরবতা আমাকে জ্যান্ত মেরে ফেলছে। একটু রহম করো এই মানবটার ওপর! আমি তো ওপারেও ভালো ছিলাম না, মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করেছি দীর্ঘ ৪৮টা দিন। তাহলে আজ যখন ফিরে এলাম, তুমি কেন আমার যন্ত্রণার উপশমকারী না হয়ে উল্টো আমার যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিতে মত্ত হলে?”
নোট: রেগুলার গল্প দেওয়ার ইচ্ছে আছে। তোমরা ভালো মতো রেসপন্স করলে। এই পর্বে ১. কে পূরণ হলে কালকে গল্প আসবে নয়তো টার্গেট পূরণ হলে আসবে। বড় বড় মন্তব্য করো ভালো খারাপ যেটাই হোক মন্তব্য করো। হ্যাপি রিডিং আপু'রা এন্ড ভাইয়া'রা 
