আমি_এক_গরীব_স্বামীর_স্ত্রী

 আমি_এক_গরীব_স্বামীর_স্ত্রী



আরিয়ানের চোখে সেই অদ্ভুত ভয়টা আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। যেন সে এমন কাউকে সামনে দেখছে, যাকে সে অনেক আগে থেকেই চেনে… আর যার সম্পর্কে এমন কিছু জানে, যা আমরা কেউ জানি না।
উঠোনজুড়ে তখনও চাপা গুঞ্জন চলছে। পাড়ার মানুষজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে সবকিছু দেখছে। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ আবার অবিশ্বাস নিয়ে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে আছে।
আরিয়ান ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এল।
তার চোখ একবার আমার দিকে গেল, তারপর স্থির হয়ে থামল মিস্টার ইয়াসিনের মুখে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
শেষ পর্যন্ত আরিয়ানই নিচু গলায় বলল, “আপনি… এখানে?”
ইয়াসিনের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটল।
“তোমার মনে হচ্ছে, আমার এখানে থাকার কথা না?”
আরিয়ান উত্তর দিল না।
কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছিল। সে স্পষ্ট অস্বস্তিতে পড়েছে।
আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালাম।
আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো অদৃশ্য সম্পর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। এমন একটা ইতিহাস, যার কিছুই আমি জানি না।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “তোমরা… একে অপরকে চেনো?” আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে আমার দিকে তাকাল। তারপর চোখ সরিয়ে নিল। কিন্তু ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন, “হ্যাঁ। অনেকদিনের পরিচয়।”
আমার বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠল।
আরিয়ান শুকনো গলায় বলল, “আমি আসলে… সিমরানের সঙ্গে একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
ইয়াসিন স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সেই দৃষ্টির মধ্যে রাগ ছিল না, কিন্তু এমন এক চাপা শক্তি ছিল, যা মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
কয়েক সেকেন্ড পর তিনি শান্ত স্বরে বললেন, “কথা বলতে পারো।”
আমি অবাক হলাম।
আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো বাধা দেবেন। কিন্তু তিনি একটুও উত্তেজিত হলেন না।
বরং এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।
আরিয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “একটু বাইরে আসবে?”
আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম।
চারপাশের এত মানুষের সামনে কথা বলতে অস্বস্তি লাগছিল। কিন্তু ইয়াসিনের দিকে তাকাতেই তিনি খুব আস্তে মাথা নাড়লেন।
আমি ধীরে ধীরে আরিয়ানের সঙ্গে উঠোনের একপাশে চলে গেলাম।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি তখনও আমাদের ওপর।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল, “তুমি ঠিক আছো?”
আমি ঠোঁট কামড়ে বললাম, “তোমার কী মনে হয়?”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি জানতাম না ব্যাপারটা এতদূর যাবে।”
আমি কষ্ট মেশানো হাসি দিলাম। “কোন ব্যাপারটা? আমার জীবনটা এভাবে বদলে যাওয়া?”
আরিয়ান মাথা নিচু করল।
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “তুমি কি আগে থেকেই ইয়াসিনকে চিনতে?”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “চিনতাম।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“কীভাবে?”
আরিয়ান একবার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিনের দিকে তাকাল। ইয়াসিন তখনও স্থিরভাবে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
আরিয়ান নিচু গলায় বলল, “তুমি যাকে সাধারণ শ্রমিক ভাবছো… তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একজন।”
আমি ধীরে বললাম, “সেটা তো এখন বুঝতেই পারছি। কিন্তু তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন?”
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
তার মুখে এমন এক অস্বস্তি ফুটে উঠল, যেন সে এমন একটা সত্য লুকিয়ে রেখেছে, যা বলা উচিত না।
আমি এবার একটু জোর দিয়ে বললাম, “সত্যিটা বলো, আরিয়ান।”
সে গভীর শ্বাস নিল।
“আমি আগে ইয়াসিন রহমান গ্রুপে চাকরি করতাম।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
“কি?”
“হ্যাঁ। পাঁচ বছর আগে আমি তাদের কোম্পানিতে জুনিয়র অফিসার ছিলাম।”
আমার মাথার ভেতর যেন শব্দ হচ্ছিল।
আরিয়ান আবার বলল, “তখনই প্রথম আমি উনাকে দেখি। কিন্তু উনি সাধারণ মালিকদের মতো না।”
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, “মানে?”
সে নিচু গলায় বলল, “উনি মানুষকে পরীক্ষা করেন।”
এই একই কথা কিছুক্ষণ আগে ইয়াসিনও বলেছিলেন।
আমার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
আরিয়ান আবার বলতে শুরু করল, “কোম্পানিতে অনেক বড় বড় কর্মকর্তা ছিল। সবাই ইয়াসিন স্যারের সামনে ভদ্র আচরণ করত। কিন্তু একদিন উনি সাধারণ কর্মচারীর পোশাক পরে অফিসে আসেন।”
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
“কেউ চিনতে পারেনি। বরং অনেকে তাকে অপমান করেছিল। তখন উনি শুধু চুপচাপ দেখেছিলেন কে কেমন আচরণ করে।”
আমি ধীরে বললাম, “তারপর?”
আরিয়ান তিক্ত হাসল।
“পরদিন পুরো অফিস বদলে গিয়েছিল।”
তার চোখে অদ্ভুত একটা ভয় ফুটে উঠল।
“যারা ছোট মানুষ ভেবে অপমান করেছিল, তারা সবাই চাকরি হারায়। আর যারা সম্মান দিয়েছিল, তাদের পদোন্নতি হয়।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম, ইয়াসিন আসলে কেমন মানুষ।
তিনি শুধু ধনী নন… মানুষের ভেতরটা পড়তে জানেন।
ঠিক তখনই পেছন থেকে শান্ত গলা ভেসে এলো।
“আমার সম্পর্কে এত গল্প হচ্ছে?”
আমি চমকে ঘুরে তাকালাম।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন।
তার মুখে হালকা হাসি, কিন্তু চোখে সেই গভীরতা।
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
আমি প্রথমবার খেয়াল করলাম, আরিয়ান সত্যিই তাকে ভয় পায়।
ইয়াসিন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, “আরিয়ান, তোমার নতুন চাকরিটা কেমন চলছে?”
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল। “আপনি জানেন?”
“আমি অনেক কিছুই জানি।”
তার গলায় কোনো অহংকার ছিল না। কিন্তু কথাগুলো শুনে আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আরিয়ান শুকনো গলায় বলল, “ভালো চলছে।”
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন, “তুমি এখনও আগের মতোই সৎ আছো তো?”
প্রশ্নটা শুনে আরিয়ানের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালাম।
এদের মাঝে নিশ্চয়ই আরও বড় কোনো ইতিহাস আছে।
কিন্তু কেউ কিছু বলল না।
ঠিক তখনই হঠাৎ একটা মোটরবাইক দ্রুত এসে বাড়ির সামনে থামল।
একজন লোক হাঁপাতে হাঁপাতে নেমে এল।
স্যুট পরা লোকগুলোর একজন তাকে থামাতে যাচ্ছিল, কিন্তু লোকটা চিৎকার করে বলল, “স্যার! বড় সমস্যা হয়েছে!”
ইয়াসিনের চোখ সরু হয়ে গেল।
“কি হয়েছে?”
লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “গুলশানের সাইটে আগুন লেগেছে!”
চারপাশে সবাই চমকে উঠল।
আমি দেখলাম, ইয়াসিনের মুখের শান্তভাব মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।
তার চোখ ঠান্ডা হয়ে উঠল।
“কিভাবে?”
লোকটা গিলল। “কেউ ইচ্ছা করে আগুন লাগিয়েছে বলে সন্দেহ হচ্ছে।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “কেউ মারা গেছে?”
“না স্যার। কিন্তু ক্ষতি অনেক।”
আমি প্রথমবার তার চোখে চাপা রাগ দেখতে পেলাম।
ভয়ংকর রাগ।
তিনি ধীরে ধীরে ফোন বের করলেন।
তার কণ্ঠ এবার সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
ঠান্ডা। কঠিন। আদেশ দেওয়ার মতো।
“পুরো সাইট সিল করে দাও। কেউ বের হতে পারবে না।”
ওপাশ থেকে কী বলা হলো জানি না।
তিনি আবার বললেন, “আর সিসিটিভি ফুটেজ আমার কাছে পাঠাও। এখনই।”
ফোন কেটে তিনি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমি বুঝতে পারছিলাম, তার মাথার ভেতর তখন প্রচণ্ড কিছু চলছে।
ঠিক তখনই আরিয়ান নিচু গলায় বলল, “স্যার… আপনি কি মনে করেন, ওরা আবার শুরু করেছে?”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন।
সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা দেখে আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
“আমি অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করছিলাম।”
আরিয়ান আতঙ্কিত গলায় বলল, “তাহলে সিমরানও বিপদে পড়তে পারে।”
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
“মানে?”
কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
কিন্তু ইয়াসিন এবার খুব ধীরে আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে প্রথমবার স্পষ্ট উদ্বেগ দেখলাম।
তিনি নিচু গলায় বললেন, “আজ থেকে তুমি কখনও একা কোথাও যাবে না।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কেন?”
তিনি উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়িটার কাঁচ ধীরে ধীরে নামল।
ভেতরে বসে থাকা একজন মানুষ দূর থেকে স্থির চোখে আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি লোকটার মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না।
কিন্তু জানি না কেন… তাকে দেখেই আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
আর ঠিক তখনই ইয়াসিনের কণ্ঠ শুনলাম।
খুব নিচু, কিন্তু ভয়ংকর কঠিন।
“ওরা আমাকে খুঁজে পেয়েছে।”

Post a Comment

ভালোবাসার ডায়েরি একটি বাংলা রোমান্টিক গল্পের ওয়েবসাইট।
এখানে পাবেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প, অসমাপ্ত ভালোবাসা, কষ্ট, অপেক্ষা আর নীরব অনুভূতির কথা।
প্রতিটি গল্প যেন এক একটি ডায়েরির পাতা—
যেখানে লেখা থাকে আপনার, আমার, আমাদের ভালোবাসার কথা।
✍ গল্প পড়ুন
❤️ অনুভব করুন
📖 নিজের ভালোবাসার ডায়েরি খুঁজে নিন।

Previous Post Next Post