অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রুহিরা এসে পৌঁছাল স্বপ্নের সেই প্রবাল দ্বীপ—সেন্টমার্টিনে। এদিকে ঢাকা থেকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তিটুকু যেন দ্বীপের মাটিতে পা রাখামাত্রই কর্পূরের মতো উবে গেল সবার।
ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার পুরো যাত্রাটাই ছিল রুহির জন্য এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। আগের দিন রাতের ঠিক দশটায় পূর্বের করা প্লেন অনুযায়ী খন্দকার বাড়ির পুরো বহর নিয়ে শাহাবুদ্দিন সাহেব ঢাকার সায়েদাবাদে গিয়ে উপস্থিত হলেন। এরপরেই রুবিদের কলেজ থেকে আগে থেকে ঠিক করে রাখা বাস আসলেই তারা সবাই সায়দাবাদ থেকেই টেকনাফগামী বিলাসবহুল এসি বাসে চড়ে বসলেন। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে বাস যখন হাইওয়ে ধরে ছুটছিল, রুহির চোখে তখন ঘুম ছিল না ছিলো এক অন্যরকম আনন্দ।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে শুধু সময়ের হিসেব করছিল কখন তার স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়াবে। অতঃপর দীর্ঘ দশ থেকে এগারো ঘণ্টার পথ পেরিয়ে, ভোরের আলো ফুটতেই বাস এসে থামল টেকনাফের দমদমিয়া ঘাটে।
সেখানে নামতেই সবার চোখে মুখে ভোরের স্নিগ্ধ আলো আর নাফ নদীর রূপ যেন এক পশলা সতেজতা এনে দিল। ঘাটে ফ্রেশ হয়ে হালকা নাস্তা সেরে নেওয়ার পরই শুরু হলো আসল রোমাঞ্চ। সকাল সাড়ে নয়টায় কেয়ারী সিন্দাবাদ জাহাজে ওঠার পর রুহির ভেতরের উত্তেজনা যেন বাঁধ মানছিল না। নাফ নদী আর বঙ্গোপসাগরের মোহনা ধরে যখন জাহাজটি চলতে শুরু করল, তখনই চারপাশের গাঙচিলেরা জাহাজের পিছু পিছু ডানা ঝাপটে ওড়ার এক অপূর্ব মেলা বসাল। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টার জলপথের সেই রোমাঞ্চকর যাত্রা শেষ করে, ঘড়ির কাঁটায় যখন ঠিক দুপুর বারোটা বাজল, তখন নীল জলের বুক চিরে দূর দিগন্তে ভেসে উঠল নারিকেল জিঞ্জিরা খ্যাত সেন্টমার্টিন দ্বীপ।
সেখানে পৌছার পরে তারা সকলে যখন জেটি ঘাটে নামলো তখই কোথা থেকে যেন এক পশলা নোনা বাতাস এসে রুহির চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিল। রুহি দুচোখ ভরে সবটা উপভোগ করলো, তার মনে হলো সেন্টমার্টিনের এই মনোরম দৃশ্য যেন এতোদিন দেখে আসা যেকোনো ক্যানভাসের চেয়েও মারাত্বক সুন্দর, যা সে নিজের দু চোখ দিয়ে সামনা-সামনি না দেখলে জীবনেও বুঝতোনা।
এদিকে যতদূর তার চোখ যায়, কেবল সুনীল জলরাশি আর আকাশের নীল যেন একে অপরের সাথে একাকার হয়ে মিশে গেছে। সেই সাথে চারদিকে সারি সারি নারিকেল গাছের পাতাগুলোও বাতাসে দোল খাচ্ছে, যেন তারা দূর দেশ থেকে আসা এই অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছে।
একসময় তারা রিসোর্টের দিকে অগ্রসর হলো, তাদের জন্য বুক করা সমুদ্রমুখী চমৎকার রিসোর্টটিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে গেল। সকলে রুমে গিয়ে কোনমতে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার সেরেই যে যার রুমে একটু ক্লান্তি কাটাতে গড়াগড়ি দিলো। কিন্তু রুহি যেন আর নিজেকে ঘরে আটকে রাখতে পারল না। রিমু আর রুবি তখন ক্লান্তিতে বিছানায় এলিয়ে পড়েছে, কিন্তু রুহির মনে তখন সমুদ্রের টান। সে আলতো পায়ে রুমের দরজা খুলে একাই বেরিয়ে এল রিসোর্টের সামনের ব্যক্তিগত সৈকতে।
তখন বিকেল ছুঁইছুঁই। রোদের তীব্রতা কমে এসে চারপাশের আলোতে একটা সোনাঝরা ভাব চলে এসেছে। রুহি ধীরপায়ে বালুকাময় সৈকত ধরে পানির একদম কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। সে দেখলো ধবধবে সাদা নরম বালুর ওপর এসে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের নীল জলরাশি। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে সেই জলরাশির অবিরাম বয়ে যাওয়ার ছন্দময় শব্দ—'ঝুপঝাপ, গর্জন-মাখা এক অদ্ভুত সুর'।
একেকটি বিশাল ঢেউ যখন ফেনা তুলে রুহির পায়ের পাতা ছুঁয়ে আবার সাগরের বুকে মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন এক স্বর্গীয় অনুভূতিতে রুহির চোখ দুটো যেন আপনা-আপনিতেই বুজে এল।
সমুদ্রের এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে রুহির বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল। তার মনে হলো সাগরের এই ঢেউয়ের শব্দের মাঝে সে যেন কারও কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে। ঠিক তখনই রুহির মনে পড়ল নিজের ব্যাগে সযত্নে রাখা সেই সাদা রঙের রহস্যময় বক্সটির কথা। আজ রাতে বারোটা বাজলেই তার জন্মদিন। শাহাজ ভাই রুপি কাসাফাদ্দৌজা আশিকের শর্ত অনুযায়ী, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই সে খুলতে পারবে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত উপহারের বাক্স খানা।
এবার রুহি চোখ মেলে দিগন্তের শেষ সীমানায় তাকাল, যেখানে নীল জল আর আকাশ এক হয়ে গেছে। সমুদ্রের এই ঢেউয়ের গর্জন, নোনা বাতাস, অদ্ভুত অনুভূতি আর মনের ভেতরের সেই গোপন কৌতূহল—সব মিলিয়ে সেন্টমার্টিনের এই প্রথম বিকেলটি রুহির জীবনের অন্যতম এক জাদুকরী মুহূর্ত হয়ে রইল।
একসময় সমুদ্রের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রুহির মনের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা ভর করল। বিশাল এই সাগরের বুকে ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ার দৃশ্যটা যতটা মনোরম, রুহির ভেতরের মনটা ঠিক ততটাই ব্যাকুল হয়ে উঠছে। ঠিক এই মুহূর্তে, প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে হঠাৎই তার মনে তীব্রভাবে জড়িয়ে ধরল একজনের মুখ—তিনি আর কেউ নয় বরং রুহির প্রিয়, অতি আপনজন তার শাহাজ ভাই।
রুহি একদৃষ্টিতে দূরে যতটুকু তার চোখ যাচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে রইল। এদিকে সমুদ্র কিনারার বাতাস এসে তার ওড়নাটা উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। তার অবুঝ মন বারবার ভাবছে, যদি কোনো অলৌকিক উপায়ে শাহাজ ভাই এই মুহূর্তে এখানে এসে তার পাশে দাঁড়াতো! যদি এই বিস্তীর্ণ বালুচরে শাহাজের শক্ত হাতটা সে নিজের হাতের মুঠোয় পেত, তবে হয়তো সমুদ্র দেখার এই অপার আনন্দ তার মুখে আরও হাজার গুণ বেশি হয়ে ফুটে উঠত। হঠাৎই রুহির ঠোঁট দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। সমুদ্রের গর্জনের মাঝেই সে খুব নিচু স্বরে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনেই বলে উঠল, “আপনি পাশে থাকলে এই সময়, এই মুহুর্ত না জানি আরও কতটা সুন্দর হতো শাহাজ ভাই!”
এরপরই রুহির মনে পড়ে গেল গত দুদিনের সব কথা। খন্দকার বাড়ি থেকে যখন শাহাজ আর কাব্য ভাই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল, তখন পুরোটা পথ তারা ভয়েস মেসেজে একে অপরের সাথে কথা বলেছে। শাহাজ ড্রাইভ করছিলো কিন্তু তাও শত ব্যস্ততার মাঝে রুহির প্রতিটা মেসেজের উত্তর দিতে ভোলেনি। এমনকি চট্টগ্রামে পৌঁছানো পর্যন্ত শাহাজ তাকে সব আপডেট দিয়েছে। আজ সকালে যখন তারা সেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজে বের হচ্ছিল, তার ঠিক আগেও শাহাজ নিজে কল করে রুহিকে বলেছিল, “আমরা কাজে বের হচ্ছি রুহি, এসে কথা হবে, সাবধানে থাকিস।”
শাহেজের এসব ছোট ছোট কেয়ার আর অনুভুতিতে রুহি কতোনা খুশি হলো কিন্তু সেই দুপুরের পর থেকেই শাহাজের আর কোনো ফোন বা মেসেজ আসেনি। রুহি এখানে সেন্টমার্টিনে পৌঁছানোর সাথে সাথেই পরম উৎসাহ নিয়ে শাহাজকে ফোন করেছিল তাকে জানানোর জন্য, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো প্রকার রেসপন্স পাওয়া যায়নি। ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেছে, কিন্তু শাহাজ ধরেনি। মেসেজগুলোও যেন নেটওয়ার্কের বাইরে একাকী পড়ে আছে।
রুহির মনটা এবার ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। এত বড় সমুদ্র, এত সুন্দর পরিবেশ—সবকিছু যেন এক নিমেষে ম্লান মনে হতে লাগল। সে বালুর ওপর বসে পড়ে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজল। নোনা বাতাস যেন তার মনের হাহাকার আরও বাড়িয়ে দিল। রুহি ম্লান মুখে ফিসফিস করে বলল, “আপনি এখন কোথায় শাহাজ ভাই? আমি যে আপনাকে বড্ড মিস করছি...”
সাগরের ঢেউগুলো তখনো অবিরাম গর্জন করে চলেছে, যেন রুহির এই আকুল প্রশ্নের উত্তর দিতেই তারা বারবার তীরে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু রুহির মন পড়ে রইল সেই চেনা মানুষটার অপেক্ষায়, যে দূর চট্টগ্রামে থেকেও এখন রুহির ভাবনার পুরোটা জুড়ে রাজত্ব করছে।
★★★
সময় গড়ালো রুহি প্রায় অনেকক্ষণ যাবৎ নিরিবিলিতে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে রইল। সাগরের এই অপরুপ চিত্র আর দিগন্তের মায়াবী রূপ যেন তার মনকে এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছে।
এদিকে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির কারণে তারা রিসোর্টে কোনো সিঙ্গেল রুম পায়নি। খন্দকার বাড়ির এত বড় বহরের জন্য এক্সট্রা মাত্র দুটি বড় রুম পাওয়া গিয়েছিল। সেই হিসেবে শাহাবুদ্দিন সাহেবর কথা মত রুম শেয়ারিংয়ের একটি সুন্দর ব্যবস্থা করা হয়েছে। রুবি, রুহি এবং রিমুকে দেওয়া হয়েছে একটি রুম। আর অন্য রুমটিতে রুপাঞ্জলি, এবং ছোট চাচ্চু শাহাবুদ্দিন সাহেব একসাথে থাকছেন। অন্যদিকে, রুবির হবু বর ইমদাদ তার নিজের ডিপার্টমেন্টের ঠিক করা রুমেই সেট হয়েছে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তাদের সবার রুমগুলোই পাশাপাশি আছে। তাই করোরই বিশেষ সমস্যা হচ্ছে না।
এদিকে এতটা পথ ক্লান্তিকর জার্নি করে এসেই দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিছানায় শুয়েছিলেন ছোট মা রুপাঞ্জলি। চোখটা একটু লেগে এসেছিল। ঘুমাতে যাওয়ার আগে রুহি তাদের রুমে তার পাশেই বসে ছিল। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে পাশে রুহিকে দেখতে না পেয়ে তিনি কিছুটা চিন্তিত হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। ভাবলেন হয়তো পাশের রুমে আছে। তাই তিনি পাশের রুবি আর রিমুর রুমে গিয়ে উঁকি দিলেন, কিন্তু দেখলেন সেখানে ওরা দুজনেই শুধু শুয়ে আছে, রুহি নেই।
অগত্যা করিডোরে এসে বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখতে পেলেন, রিসোর্টের ঠিক সামনের সমুদ্রের পাড়ে, নরম বালুর ওপর একা বসে আছে রুহি। তার দৃষ্টি সুদূরের সমুদ্রের পানে চেয়ে আছে। রুপাঞ্জলি আর দেরি না করে ধীরপায়ে সৈকতের দিকে এগিয়ে গেলেন।
সেন্টমার্টিন সমুদ্রকিনারের বিকেলবেলার বাতাস এক অন্যরকম মাদকতায় ভরা। নোনা জলের স্পর্শে সেই বাতাস যেমন স্নিগ্ধ, তেমনই চঞ্চল। চারপাশের নারিকেল পাতার ঝিরঝির শব্দের সাথে মিশে সেই হাওয়া যখন এসে চোখে-মুখে ছুঁয়ে যায় তখন মনে হয় শরীরের সব ক্লান্তি এক নিমেষে জুড়িয়ে যায়। অবশেষে রুপাঞ্জলি রুহির একদম কাছে এসে তার পাশে বালুর ওপর বসলো। নিজের পাশে কারও অস্তিত্ব টের পেয়ে রুহি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখল ছোট মা বসে আছেন।
প্রিয় ছোট মাকে দেখে রুহির মলিন মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। রুপাঞ্জলি মেয়ের মতো রুহির দিকে তাকিয়ে আদরমাখা সুরে জিজ্ঞেস করলেন, “এখানে কখন এসেছো রুহি?”
রুহি সাগরের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল, “অনেকক্ষণ আগে ছোট মা।”
“কেন? রুমে গিয়ে একটু রেস্ট করোনি?”রুপাঞ্জলি প্রশ্ন করলো।
রুহি মাথা নেড়ে বলল, “না, একদম শুতে ইচ্ছা করেনি ছোট মা। এত সুন্দর একটা পরিবেশ, রুমের চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকতে মন চাইল না, তাই এখানে চলে এলাম।”
রুপাঞ্জলি এবার শাসন মেশানো গলায় বললেন, “তাও তো, এতটা পথ জার্নি করে এসেছো, একটু রেস্ট করা দরকার ছিল তো! না হলে তো ট্যুরটা এনজয় করতে পারবে না। দেখবে, সন্ধ্যা হতে না হতেই ঘুমে ঢলে পড়বে তখন!”
এবার রুহি হেসে উঠে বলল, “এমন কিছুই হবে না ছোট মা, দেখো তুমি! আর একটু পরেই তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে। দেখো না, এখনের পরিবেশটা কতটা সুন্দর!”
রুপাঞ্জলি আর কথা বাড়ালেন না। দুজনে পাশাপাশি বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সাগরের বুকে বিকেলের শেষ আলোর ঝিলিক আর ঢেউয়ের ভাঙাগড়ার এই অপরূপ প্রাকৃতিক চিত্র তারা দুজনেই পরম মুগ্ধতা নিয়ে প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর, ঘরের গুমোট ভাব কাটিয়ে একে একে সবাই যার যার রুম থেকে বেরিয়ে এল। প্রথমে রুবি আর রিমু দুজনে বেশ পরিপাটি হয়ে সেজেগুজে নিচে নেমে এল। ঠিক তার একটু পরেই শাহাবুদ্দিন সাহেবের সাথে জরুরি কোনো বিষয়ে কথা বলতে বলতে ইমদাদও সেখানে এসে উপস্থিত হলো।
ইমদাদ সামনে আসতেই রুহির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, “তো রুহি, কেমন লাগছে তোমার সেন্টমার্টিন?”
রুহি খুবই খুশি হয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “অনেক অনেক ভালো লাগছে ভাইয়া!”
রুহির চোখে-মুখে তখন আনন্দের ঝিলিক। এই সমুদ্রের নীল পানির গর্জন, সাথে সমুদ্রকিনারের এই মাতাল করা শীতল বাতাস—সবকিছুই তার মনকে এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে।
এরই মাঝে রুবির ডিপার্টমেন্টের কিছু ক্লাসমেটও সেখানে এসে উপস্থিত হলো। তারা সবাই মিলে আশেপাশে কোথাও একটু ঘুরতে যাওয়ার তাগিদ দিল। ছাএছাএীদের ইচ্ছেতে এবার ইমদাদ হাতের ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে সময়টা দেখে নিল। তারপর সবার উদ্দেশ্যে বলল, “আর একটু পরেই তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে, তাই এখন বেশি দূরে যাওয়া যাবে না। চলো, আশেপাশের এই সৈকতটাতেই একটু হেঁটে হেঁটে ঘোরা যাক।”
ইমদাদের কথায় সবাই সায় দিল। তারা সবাই একসাথে দলবেঁধে সমুদ্রের পাড় ধরে ধরে আশেপাশের সুন্দর জায়গাগুলো ঘুরতে লাগল। রুহি সবার মাঝে হাঁটছে বটে, কিন্তু তার চোখ দুটো প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য অবলোকন করছে। সেন্টমার্টিনের এই রূপ সে যত দেখছে, ততই এক অজানা মুগ্ধতায় তার মন যেন হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু থেকে থেকে শাহাজের কথা মনে পড়তেই তার ভেতর কেমন যেন একটা অস্থিরতা ফুটে উঠছে।
★★★
অতঃপর এতোক্ষন উৎফুল্ল থাকা রুহির হঠাৎই মনট খারাপ হয়ে গেলো। এত সুন্দর চারপাশ, এত কোলাহল, তাও বুকের ভেতর উঁকি দিয়ে যাওয়া শাহাজের সেই নীরবতা তাকে যেন বারবার একলা করে দিচ্ছে। উদাস মনে সবার সাথে যখন সে সমুদ্রের কিনারা ধরে ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, তখনই হঠাৎ তার পায়ের পাতায় শক্ত মতন কিছু একটা ঠেকল। পায়ে হুট করে শক্ত কিছুর স্পর্শ পাওয়ায় রুহি প্রথমে একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সে ভাবল হয়তো কোনো কাঁকড়া বা ধারালো পাথর। কিন্তু সাবধানে পা সরিয়ে নিচু হয়ে হাত দিয়ে দেখতেই তার মনটা ভালো হয়ে গেল। একটা চমৎকার, মসৃণ ঝিনুক!
সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতের ধবধবে বালুর চরে প্রায়ই ছোট-বড় ঝিনুক ও শামুকের খোলস পড়ে থাকতে দেখা যায়। এগুলো দেখতে কোনোটা ধবধবে সাদা, কোনোটা আবার অদ্ভুত সুন্দর কারুকাজ করা। মাঝে মাঝে পানির হালকা ছোঁয়া লেগে চাঁদের আলোয় ওগুলো মুক্তোর মতো চকচক করে ওঠে।
আকস্মিক ঝিনুক পেয়ে রুহি ওটা হাতে তুলে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল, তার খুব পছন্দ হলো। এরপর সৈকত ধরে যতদূর সে হাঁটতে লাগল, দেখা গেল বালুর ভাঁজে ভাঁজে এমন আরও অসংখ্য সুন্দর সুন্দর ঝিনুক পড়ে আছে। এতো এতো ঝিনুক দেখে রুহির মন খারাপের রেশটা যেন হঠাৎই ভালো হয়ে গেলো, এক অদ্ভুত আনন্দ পেয়ে হাঁটতে হাঁটতেই সেগুলোকে সে কুড়াতে শুরু করল।
এদিকে রুহিকে এভাবে বালু চষে ঝিনুক কুড়াতে দেখে ছোট চাচ্চু শাহাবুদ্দিন সাহেব হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। তিনি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রুহি, এত ঝিনুক কুড়িয়ে এগুলো দিয়ে কী করবি তুই?”
রুহি হাতের ঝিনুকগুলো চাচ্চুকে দেখিয়ে এক গাল হেসে বলল, “এগুলো আমি সাথে করে বাড়ি নিয়ে যাব চাচ্চু। এগুলো দিয়ে সুতোয় গেঁথে সুন্দর মালা বানাব, আর ঘরের দেয়াল ডেকোরেশন করার জন্য সুন্দর একটা শোপিস তৈরি করব।”
শাহেব চাচ্চু রুহিকে সর্বদা মেয়ের মতো দেখে তাই রুহির এই চপলতায় শুধু প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন। এরপর প্রায় অনেকটা সময় ধরে তারা সবাই মিলে সমুদ্র সৈকতে ঘোরাঘুরি করলেন।
অন্যদিকে রিমু আর রুবি নানান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একসময় রুবির জোড়াজুড়িতে রুহিও তাদের সাথে যোগ দিয়ে বেশ কিছু ছবি তুলল, যাতে জীবনের এই সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতি হিসেবে ফ্রেমবন্দি হয়ে থাকে। অবশেষে গোধূলির আলো মুছে গিয়ে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসতেই ইমদাদের ডাকে সবাই আবার রিসোর্টের দিকে ফিরে এল।
এদিকে রিসোর্টে ফিরে যে যার রুমে গিয়ে একটু হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। রুহিও চটজলদি ফ্রেশ হয়ে হালকা রঙের একটা আরামদায়ক পোশাক পরে চাদর গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এলো। তার সারাদিনের জার্নির ক্লান্তি যেন উধাও, কারণ রাতের সেন্টমার্টিনকে দেখার তীব্র ইচ্ছে তখন তার মনে।
সবাই ফ্রেশ হয়ে রাতের সেন্টমার্টিন দেখতে যখন আবারও রিসোর্টের বাইরে বের হলো, তখন রুহির চোখ দুটো বিস্ময়ে ও মুগ্ধতায় চকমক করে উঠল। রাতের সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য যেন দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন, এক মায়াবী রূপকথার মতো।
আকাশে তখন একফালি চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের রুপালি আলো যখন সমুদ্রের আদিগন্ত বিস্তৃত কালো জলের ওপর আছড়ে পড়ছে, তখন মনে হচ্ছে যেন কেউ কোটি কোটি হিরে ছড়িয়ে দিয়েছে জলের বুকে। দিনের বেলার সেই চঞ্চল সমুদ্র রাতে যেন আরও গম্ভীর, আরও রহস্যময় রূপ ধারণ করেছে। অন্ধকার ফুঁড়ে আসা বিশাল বিশাল কালো ঢেউগুলো যখন গগনবিদারী শব্দে সৈকতে আছড়ে পড়ে সাদা ফেনা তুলছে, তখন এক অপার্থিব দৃশ্যের সৃষ্টি হচ্ছে। পুরো দ্বীপ জুড়ে সারি সারি নারিকেল গাছের মাথাগুলো রাতের মৃদু বাতাসে দুলছে, আর দূর থেকে ভেসে আসছে লোনা পানির সোঁদা গন্ধ। অন্যদিকে সৈকতের ক্যাফেগুলো থেকে হালকা আলোর রোশনাই আর মৃদু গানের সুর ভেসে আসছে, যা পরিবেশটাকে আরও বেশি রোমান্টিক ও মায়াবী করে তুলেছে।
রুহি এসব দেখে রাতের এই নিস্তব্ধ, সুন্দর সাগরের দিকে তাকিয়ে এক গভীর ঘোরের মধ্যে তলিয়ে গেল। অন্যদিকে রাত যত বাড়ছে, তার জন্মদিনের প্রথম প্রহরটি ঠিক ততটাই কাছে চলে আসছে। আর সেই সাথে তার ব্যাগে থাকা কাসাফাদ্দৌজা আশিকের দেওয়া সাদা বক্সটির রহস্য উন্মোচনের সময়ও ঘনিয়ে আসছে।
রাতের সেন্টমার্টিনের সেই মায়াবী রূপ দেখতে দেখতে তারা একপর্যায়ে রিসোর্টের ঠিক পাশেই গড়ে ওঠা চমৎকার একটি বিচ-ক্যাফেতে গিয়ে ঢুকল। ক্যাফেটি কাঠের গুঁড়ি আর বাঁশ দিয়ে নান্দনিকভাবে সাজানো, ওপরে ছনের ছাউনি। চারদিকের মৃদু আলো পরিবেশটাকে যেন আরও চমৎকার করে তুলেছে।
ক্যাফেতে ঢুকে ছয়জনে একটা কাঠের টেবিল ঘিরে বসল। ইমদাদ মেনু কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে রুহি, রুবি আর রিমুকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তোমরা কী খাবে দেখো, যার যা পছন্দ নাস্তা অর্ডার করো।”
অনিকের কথা মত মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে রুহি আর রিমু উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। কিন্তু সেন্টমার্টিনের স্থানীয় সব খাবারের নাম দেখে তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না এই সময়ে কোনটা অর্ডার করা ভালো হবে। সামুদ্রিক মাছের নানান আইটেম আর অচেনা কিছু নামের ভিড়ে দ্বিধায় পড়ে রুহি মেনু কার্ডটা ইমদাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হেসে বলল, “ভাইয়া, আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না! আপনিই বরং আমাদের সবার জন্য অর্ডার করে দিন।”
রুহির কথায় ইমদাদ মৃদু হেসে মেনু কার্ডটা নিল। সে সেন্টমার্টিনের কিছু সুপরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী নাস্তা, যা এই দ্বীপের এক বিশেষ আকর্ষণ—যেমন মুচমুচে কাঁকড়া ফ্রাই (ক্র্যাব ফ্রাই), লোনা জলের রূপচাঁদা মাছের বার্বিকিউ, ছোট সাইজের পেঁয়াজু আর সাথে এই দ্বীপের বিখ্যাত মিষ্টি ডাবের পানি ও হট কফি অর্ডার করল।
অর্ডার দিয়ে তারা যখন অপেক্ষা করছিল, তখন রুহি ক্যাফের চারপাশের পরিবেশটার দিকে চোখ বুলাল। পুরো ক্যাফে এবং তার আশেপাশে মানুষের এক প্রাণবন্ত কোলাহল। একটু দূরে বালুচরের ওপর কাঠের টুকরো এক জড়ো করে ‘ক্যাম্প ফায়ার’ জ্বালানো হয়েছে। সেই আগুনের লালচে আভা গিয়ে পড়ছে তরুণ-তরুণীদের মুখে। তাদের মাঝখান থেকে একজন গিটার হাতে সুর তুলেছে, আর বাকিরা গোল হয়ে বসে সেই সুরের সাথে তাল মিলিয়ে গান গাইছে। কেউ কেউ আবার সমুদ্রের দিকে মুখ করে বালুর ওপর অলস বসে থেকে দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে গভীর আড্ডায় মেতে উঠেছে। সব মিলিয়ে যেন এক টুকরো স্বর্গীয় উৎসব নেমে এসেছে এই দ্বীপে। পরিবেশটা এতটাই সুন্দর যে রুহির যেন সেখানে নিমেষেই হারিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিলে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম নাস্তা চলে এল। ঠিক তখনই সমুদ্রতীরের চঞ্চল বাতাস যেন আরও বেগবান হয়ে উপচে পড়তে লাগল তাদের ওপর। সেই মাতাল করা নোনা হাওয়া রুহির চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল, জড়ানো শালটা উড়িয়ে নিতে চাইছিল বারবার। এই হিমেল বাতাসে বসে, ক্যাফের হালকা আলো-আঁধারিতে গরম গরম কাঁকড়া ফ্রাই আর জুসি বার্বিকিউ মুখে পুরে রুহিরা প্রকৃতির এই অপার, অসীম সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগল। সাগরের বুক চিরে ধেয়ে আসা কালো কালো ঢেউ আর রুপালি চাঁদের আলো—সবকিছু মিলিয়ে তাদের এই রাতের নাস্তার পর্বটি খন্দকার বাড়ির এই তরুণ দলের স্মৃতিতে এক অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি হয়ে জমা রইল।
ক্যাফেতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে তারা সবাই মিলে যখন আবারও রিসোর্টে গিয়ে বাইরে বালুচরের ওপর গোল হয়ে বসল। সেখানে যোগ দিল রুবির ডিপার্টমেন্টের আরও কয়েকজন ক্লাসমেট। আড্ডার একপর্যায়ে রুবির ক্লাসমেট ও স্টুডেন্টদের তীব্র আবদারের মুখে ইমদাদ গিটারে সুর তুলল। ইমদাদ যখন গুনগুন করে এক সুন্দর প্রেমের গান পরিবেশন করতে শুরু করল, তখন চারপাশের কোলাহল যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল।
ইমদাদের গাওয়া গানের প্রতিটা লাইনের প্রতিটা শব্দ যেন কেবল রুবির উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা ছিল। গানের সুরে সুরে সে যেন রুবির প্রতি তার গভীর ও পবিত্র ভালোবাসার কথাই প্রকাশ করছিল। আগুনের লালচে আভায় রুবির লজ্জারাঙা মুখ আর ইমদাদের মুগ্ধ চাউনি—দুইয়ে মিলে তাদের মধ্যকার ভালোবাসাটা যেন একাকার হয়ে ফুটে উঠল।
এদিকে সময় তার নিজস্ব গতিতে গড়াতে লাগল, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত নয়টার কাছাকাছি। গান-বাজনার পর্ব শেষ হতেই সবাই যখন যে যার মতো এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখনই সুযোগ বুঝে রুবি আর ইমদাদ হাত ধরাধরি করে সমুদ্রের ঢেউয়ের সীমানা ঘেঁষে হাঁটতে বের হলো। বাগদানের পর এই প্রথম তারা দুজনে নিজেদের মতো করে কিছুটা একান্ত সময় কাটাতে পারছে। এদিকে বাকিরা অর্থাৎ রিমু, রুহি, ছোট মা রুপাঞ্জলি এবং ছোট চাচ্চু শাহাবুদ্দিন সাহেব রিসোর্টের বাইরের চমৎকার কাঠের দোলনা আর বেতের চেয়ারগুলোতে বসে রইলেন। রুপাঞ্জলি আর শাহাবুদ্দিন সাহেব পাশাপাশি বেতের চেয়ারে বসে সমুদ্রের রূপ দেখতে দেখতে নিজেদের ফেলে আসা সেই রঙিন, প্রেমময় দিনগুলোতে ফিরে গেলেন। পুরোনো স্মৃতিরোমন্থনে তাদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সুখের হাসি।
অপরদিকে পাশেই থাকা বড় কাঠের দোলনাটিতে রুহির পাশে বসে রিমু মোবাইলে অনিকের সাথে চ্যাট করতে আর কথা বলতে ভীষণ ব্যস্ত, রিমু অনিককে তার প্রতিটি মিনিটের আপডেট দিচ্ছে। কিন্তু রুহির অবস্থা তখন একদমই ভালো নয়। একে তো সারাদিনের ক্লান্তিকর দীর্ঘ জার্নি, তার ওপর দুপুরে একটুও রেস্ট না নিয়ে রোদের মধ্যে সমুদ্র বিলাস—সব মিলিয়ে শরীরটা এখন চরম ধকলের মুখে পড়েছে। রুহির চোখ দুটো যেন ভারী হয়ে আসছে। সে আপ্রান চেষ্টা করলো স্বাভাবিক থাকার কিন্তু কেমন যেন একটা অবশ করা ঘুম ঘুম ভাব তাকে গ্রাস করছে। অবশেষে সে আর পারল না। দোলনা থেকে উঠে ছোট মাকে ডেকে বলল, “ছোট মা, আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি রুমে গিয়ে একটু বিশ্রাম করি কেমন।”
রুহির কথা শুনে রুপাঞ্জলি আদর করে বললেন, “হ্যাঁ যাও, তোমাকে তো তখনই বলেছিলাম, আচ্ছা শুনো ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকো ভালো লাগবে।”
রুহি ধীরপায়ে রুমে প্রবেশ করল। দরজাটা লক করে সে সোজা বাথরুমে চলে গেল। চোখে-মুখে ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে ফ্রেশ হয়ে, বিশ্রামের জন্য একটি ঢোলাঢালা আরামদায়ক গেঞ্জি আর প্লাজো পরে নিল। এরপর খাটের ওপর এসে বসতেই তার চোখ গেল দেয়াল ঘড়ির দিকে। ঘড়িতে চেয়ে দেখল সবেমাত্র রাত নয়টা বাজে। বারোটা বাজতে অর্থাৎ তার জন্মদিন শুরু হতে এখনো পুরো তিন ঘণ্টা বাকি!
মুখে ঠান্ডা পানি পড়াতে আপাতত তার ঘুম ভাব কিছুটা কমেছে, তাই রুহি জেগে থাকবে সেই ভাবনাতে সে বিছানায় গিয়ে বসলো, বসেই এবার বিছানায় রাখা ব্যাগ থেকে সে মোবাইলটা হাতে নিল। এসে শাহাজকে যে ফোন করেছিলো এর পরে মোবাইলটা সে ভুলে ব্যাগে রেখেই এখানে ফেলে গিয়েছিল, সাথে নিয়ে বের হতে পারেনি। এদিকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে তার স্ক্রিন অন করতেই রুহির চোখ যেন চড়কগাছ! স্ক্রিন জুড়ে জ্বলজ্বল করছে শাহাজের পঞ্চাশটিরও ওপর মিসড কল! রুহির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
রুহি আর এক মুহূর্তও দেরি না করে কাঁপতে থাকা আঙুলে শাহাজের নাম্বারে চট করে ব্যাক কল দিল। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে শুধু যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে সচল নেই...” রুহি বারবার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু কোনোভাবেই কল আর ঢুকল না। নাম্বারে নেটওয়ার্কই নেই। এভাবে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে সে অনবরত ট্রাই করেই গেল, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মিলল না।
অনবরত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে একসময় নিজের ওপর চরম বিরক্তি আর রাগ নিয়ে মোবাইলটা খাটের একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। মনে মনে একরাশ অভিমান দানা বাঁধল—কেন সে মোবাইলটা রুমে রেখে গেল! শাহাজ ভাই হয়তো কোনো দরকারে এতবার ফোন করেছিলেন, আর এখন ওনার নাম্বারটাই বন্ধ! ভাবতে ভাবতেই রুহি বিছানায় শুয়ে পড়ল।
শরীরটা এমনিতেই ভীষণ ক্লান্ত ছিল, তার ওপর কান্নার মতো এক গুমোট কষ্ট আর চোখের সেই ঘুম ঘুম ভাবটা আবার ফিরে এল। কোলবালিশটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এপাশ-ওপাশ করতে করতেই রুহি একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
টিক-টিক টিক-টিক করে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গিয়ে একসময় রাত ১২টার ঘরের কাছাকাছি ছুঁয়ে ফেলল। সেন্টমার্টিনের বুকে রুহির জীবনের একটি বিশেষ দিন, তার জন্মদিন শুরু হতে চলেছে। কিন্তু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রুহির তা বোধগম্যই হলো না।
এদিকে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে নিজস্ব নিয়মে। দেয়াল ঘড়িতে এখন রাত ঠিক ১১:৫৯। আর মাত্র একটা মিনিট, তার পরেই শুরু হবে রুহির জীবনের সবচেয়ে বিশেষ একটি দিন, সূচনা হবে এক নতুন অধ্যায়ের। কিন্তু যার জন্মদিন, সেই রুহির কোনো হুঁশ নেই; ক্লান্তি আর ঘুমের ঘোরে সে তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। নিস্তব্ধ, নিরিবিলি পুরো রুম জুড়ে তখন কেবল তার মৃদু নিঃশ্বাসের ওঠানামার শব্দ।
ঠিক এই চরম মুহূর্তেই হুট করে রুহির রুমের দরজাটা একদম নিঃশব্দে, আস্তে আস্তে খুলে গেল। বাইরের চাঁদের আলো করিডোর বেয়ে ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল। সেই আলো-ছায়ার মাঝখান দিয়ে খুব সাবধানে, ধীরপায়ে কেউ একজন ভেতরে প্রবেশ করল। অন্ধকার ঘরে তার অবয়বটা যেন রহস্যময় শোনাল। একসময় মানুষটি পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে খাটের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো, ঠিক রুহির মুখ বরাবর।
অতঃপর ঘড়ির কাঁটা দুটো এক লাইনে আসতেই বারোটার গম্ভীর আওয়াজ হলো। আর ঠিক তখনই সেই চেনা মানুষটি ঝুঁকে এসে রুহির ললাটে নিজের উষ্ণ ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিল। এক পরম ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে, রুহির কানের কাছে মুখ এনে খুব নিচু আর গভীর স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল, “শুভ জন্মদিন আমার ভালোবাসা, আমার চঞ্চলা... জীবনে সর্বদা এমন হাসিখুশি থাক, সেই সাথে চিরকাল একান্ত আমারই হয়ে থাক।”
কপালে সেই চেনা স্পর্শ আর কানের কাছে উষ্ণ বাতাসের দোলায় হঠাৎ রুহি একটু নড়েচড়ে উঠল। তার ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতা দুটো পিটপিট করে মেলল সে। চোখের সামনে চাঁদের আলোয় ভেসে উঠল এক সুঠাম, চেনা অবয়ব। শাহাজ ভাই তার একদম মুখোমুখি বসে আছেন! কিন্তু রুহির চোখে তখনো ঘুমের রাজত্ব। তীব্র ঘুমে তার মস্তিষ্ক তখনো পুরোপুরি সজাগ হতে পারেনি।
সে আধো-বোঁজা চোখ নিয়ে, জড়িয়ে যাওয়া ঘুম-ঘুম কণ্ঠে বলে উঠল, “আপনি এসেছেন শাহাজ ভাই? উঁহু... আমি জানি এটা আপনি না। আমি আবার স্বপ্ন দেখছি, তাই না? কিন্তু... স্বপ্নের মধ্যেও না আপনাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগে। একদম একটা মিষ্টি রসগোল্লা!”
নিজের মনেই বিড়বিড় করে কথাগুলো বলেই রুহি শাহাজকে একটু ছোঁয়ার জন্য, তার চেনা অস্তিত্বটাকে আঁকড়ে ধরার জন্য অলস হাতটা বাড়িয়ে দিল। কিন্তু শাহাজের অবয়ব স্পর্শ করার আগেই ঘুমের তীব্র একঝাঁক পরি এসে আবার তার চোখে হানা দিল। তাই তার হাতটা আবারও মাঝপথেই বিছানায় গড়িয়ে পড়ল, শাহাজকে না ছুঁয়েই রুহি আবারও তলিয়ে গেল গভীর ঘুমের দেশে।
এদিকে শাহাজ যে সত্যি সত্যিই তার সামনে উপস্থিত ছিল, সে বুঝতেই পারলো না বরং রুহির অবুঝ মন সেটাকে সুন্দর এক স্বপ্ন ভেবেই ঘুমিয়ে রইল। আর সেই স্বপ্নের আবেশেই রুহির ঠোঁটের কোণে লেগে রইল পরম তৃপ্তির এক মিষ্টি হাসি।
এদিকে রুহির এই নিষ্পাপ চপলতা আর আধো-ঘুমের ঘোরে বলা কথাগুলো দেখে শাহাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। সে পরম স্নেহে রুহির কপালে হাত বুলিয়ে দিল। গায়ের কম্বলটা আরেকটু সুন্দর করে টেনে দিয়ে, তারপর ঝুঁকে এসে আলতো স্বরে বলল, “আজকের রাতটা না হয় ঘুমিয়েই কাটা রুহি। কারণ, কাল যা হবে এরপরে তুই হয়তো অনেক রাত ঘুমাতে পারবিনা কারন— “সামথিং ভ্যারি স্পেশাল ইস ওয়েটিং ফর ইউ”
