প্রতারক_স্বামীর_স্বপ্নভঙ্গ

 প্রতারক_স্বামীর_স্বপ্নভঙ্গ



গাড়িটা ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে এগোচ্ছিল। জানালার বাইরে ঢাকা শহরের বিকেলের আলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল, আর সোহাগি নিঃশব্দে বসে ছিল পিছনের সিটে। তার পাশে আয়ান মাথা নিচু করে বসে ছিল, দুই হাতে নিজের ছোট ব্যাগটা শক্ত করে ধরে। আয়েশা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, যেন কিছু বুঝতে চাইছে, কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছে না।
সোহাগির বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ছিল। তবুও সে কাঁদছিল না। এত অপমান, এত প্রতারণা, এত রাতের কান্নার পর তার চোখে আর পানি অবশিষ্ট নেই।
চালক হঠাৎ ধীরে গলায় বলল, “ম্যাডাম, স্যার বলেছেন আপনি যেন ভয় না পান। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।”
সোহাগি মাথা তুলল। “ফ্লাইট কতটার?”
“আর দুই ঘণ্টা পরে।”
সে আস্তে মাথা নেড়ে আবার খামের কাগজগুলো দেখতে লাগল।
একটার পর একটা ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
যৌথ অ্যাকাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকা সরানো হয়েছে গত এক বছরে।
লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট।
বিদেশ ভ্রমণ।
ডায়মন্ড জুয়েলারি।
সবকিছু তানিয়া রহমানের নামে।
হঠাৎ তার হাত থেমে গেল।
একটা আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট।
সে ভ্রু কুঁচকাল।
তারিখটা ছিল মাত্র তিন সপ্তাহ আগের।
কিন্তু রিপোর্টে একটা লাইন দেখে তার বুক ধক করে উঠল।
“গর্ভকাল আনুমানিক ২২ সপ্তাহ।”
সোহাগি দ্রুত হিসাব করল।
২২ সপ্তাহ মানে প্রায় পাঁচ মাস।
কিন্তু পাঁচ মাস আগে মিস্টার ইয়াসিন প্রতিদিন তার কাছেই ছিল। তখনও সে সংসারের নাটক চালিয়ে যাচ্ছিল।
তার মানে—
সোহাগির নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল।
তানিয়া শুধু প্রেমিকা না।
এই সম্পর্ক বহুদিনের।
অনেক বেশি পুরোনো।
ঠিক তখনই তার ফোন কেঁপে উঠল।
অ্যাডভোকেট সাদিকুল ইসলাম।
“হ্যালো?”
ওপাশে গম্ভীর কণ্ঠ। “আপনি কি রওনা হয়েছেন?”
“হ্যাঁ।”
“ভালো। এখন যা বলব, শান্ত হয়ে শুনবেন। ক্লিনিকে বড় সমস্যা হয়েছে।”
সোহাগির বুক কেঁপে উঠল। “কী হয়েছে?”
“ডা. ফারহান রহমান রিপোর্ট দেখে কিছু অসংগতি পেয়েছেন। তারা নতুন করে টেস্ট করছেন।”
“কী ধরনের অসংগতি?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ধীরে ধীরে সাদিকুল বললেন, “তানিয়া রহমানের গর্ভের সন্তান সম্ভবত মিস্টার ইয়াসিনের নয়।”
সোহাগি চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিল।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবী থেমে গেল।
তারপর সে খুব ধীরে বলল, “আপনি নিশ্চিত?”
“ডিএনএ টেস্টের আগ পর্যন্ত শতভাগ নিশ্চিত বলা যাবে না। কিন্তু ডাক্তারদের সন্দেহ খুব শক্ত।”
সোহাগি কোনো কথা বলল না।
তার মাথার ভেতর হঠাৎ মিস্টার ইয়াসিনের সেই মুখটা ভেসে উঠল।
যে মুখে একটু আগেও অহংকার ছিল।
যে মানুষটা বলেছিল সে তার “আসল ভবিষ্যৎ” খুঁজে পেয়েছে।
আর এখন সেই ভবিষ্যৎ ভেঙে পড়ছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এতে সোহাগির ভেতরে কোনো আনন্দ হচ্ছিল না।
শুধু এক ধরনের শূন্যতা।
অনেক দেরিতে পাওয়া সত্য কখনো সুখ দেয় না।
গাড়ি এয়ারপোর্টের ভিআইপি গেটের সামনে থামল।
একজন নিরাপত্তাকর্মী দ্রুত এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিল।
“ম্যাডাম, এইদিকে আসুন।”
আয়ান ধীরে জিজ্ঞেস করল, “মা… আমরা কি আর কখনো বাবাকে দেখব না?”
প্রশ্নটা শুনে সোহাগির বুক মোচড় দিয়ে উঠল।
সে ছেলের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
আয়ানের মাথায় হাত রেখে বলল, “জানি না, সোনা। কিন্তু আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তোমাদের আর কখনো কষ্ট পেতে দেব না।”
আয়ান ঠোঁট কামড়ে মাথা নেড়ে চুপ করে গেল।
অন্যদিকে ঠিক সেই সময় শহরের সবচেয়ে দামি প্রাইভেট ক্লিনিকের সামনে একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামছিল।
রওশন আরা খাতুন গর্বিত মুখে নেমে বললেন, “আমি বলেছিলাম না, আমার ছেলে একদিন ঠিক উত্তরাধিকারী পাবে।”
তার পাশে দাঁড়িয়ে মিস্টার ইয়াসিন ফোনে ব্যস্ত।
সে বারবার বন্ধুদের কল দিচ্ছিল।
“অভিনন্দন বলার জন্য প্রস্তুত থাকো।”
তার চোখে-মুখে এমন উচ্ছ্বাস, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জয় সে পেয়ে গেছে।
ক্লিনিকের ভেতরে তানিয়া শুয়ে ছিল প্রাইভেট কেবিনে।
তার মুখে কৃত্রিম হাসি।
কিন্তু হাত দুটো কাঁপছিল।
ডা. ফারহান রহমান রিপোর্ট হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।
তার মুখ খুব গম্ভীর।
“মিস্টার ইয়াসিন, একটু কথা বলতে হবে।”
ইয়াসিন হাসল। “ছেলে হবে তো?”
ডাক্তার চুপ।
এই নীরবতাই প্রথমবার ইয়াসিনের বুকের ভেতর অস্বস্তি তৈরি করল।
“কী হয়েছে?”
ডা. ফারহান ধীরে বললেন, “আমরা কিছু মেডিকেল অসংগতি পেয়েছি।”
রওশন আরা বিরক্ত গলায় বললেন, “ডাক্তার সাহেব, সোজা কথা বলেন।”
ডাক্তার এবার ইয়াসিনের দিকে তাকালেন।
“আপনার পুরোনো মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী… পাঁচ বছর আগে করা পরীক্ষায় আপনার স্থায়ী বন্ধ্যাত্ব ধরা পড়েছিল।”
পুরো রুম নিস্তব্ধ।
ইয়াসিনের মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
“কি… কী বললেন?”
ডাক্তার টেবিলে ফাইল রাখলেন।
“আপনি নিজেই এই পরীক্ষা করিয়েছিলেন। রিপোর্ট অনুযায়ী আপনার স্বাভাবিকভাবে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।”
তানিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
রওশন আরা চিৎকার করে উঠলেন, “অসম্ভব!”
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন, “আমি দুঃখিত। কিন্তু রিপোর্ট পরিষ্কার।”
ইয়াসিন যেন কিছুই বুঝতে পারছিল না।
তার মাথার ভেতর হঠাৎ একের পর এক স্মৃতি ভেসে উঠতে লাগল।
সোহাগির দুই সন্তান।
আয়ান।
আয়েশা।
তাহলে—
তার বুক কেঁপে উঠল।
সে ধীরে ধীরে তানিয়ার দিকে ফিরল।
“এই বাচ্চা কার?”
তানিয়া কাঁপা গলায় বলল, “আমি… আমি ব্যাখ্যা করতে পারব…”
ইয়াসিন হঠাৎ গর্জে উঠল, “কার সন্তান এটা!”
পুরো কেবিন কেঁপে উঠল তার চিৎকারে।
তানিয়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
“আমি ভয় পেয়েছিলাম…”
ইয়াসিন তার দিকে এগিয়ে গেল। “তুমি আমাকে প্রতারণা করেছ?”
ঠিক তখনই ডা. ফারহান আবার বললেন, “আরেকটা বিষয় আছে।”
সবাই তার দিকে তাকাল।
“দুই বছর আগে আপনার স্ত্রী সোহাগি নিজে এসে আপনার পুরোনো রিপোর্ট নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন।”
ইয়াসিন স্তব্ধ।
“মানে?”
“তিনি সত্যিটা জানতেন। কিন্তু তিনি কখনো আপনাকে অপমান করেননি। বরং বলেছিলেন পরিবার ভেঙে গেলে আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন।”
রওশন আরা ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।
তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।
ডাক্তার আরও বললেন, “আর আপনার দুই সন্তান…”
ইয়াসিন নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।
“আইভিএফ পদ্ধতিতে হয়েছে। আপনার অনুমতি নিয়েই চিকিৎসা হয়েছিল।”
ইয়াসিনের পা যেন হঠাৎ দুর্বল হয়ে গেল।
তার মাথা ঘুরতে লাগল।
মানে আয়ান আর আয়েশা তারই সন্তান।
সোহাগি তাকে কখনো প্রতারণা করেনি।
বরং এত বছর তাকে সম্মান বাঁচিয়ে রেখেছে।
আর সে?
সে কী করেছে?
নিজের সন্তানদের বোঝা বলেছে।
নিজের স্ত্রীকে অপমান করেছে।
একজন প্রতারক নারীর জন্য সবকিছু ধ্বংস করেছে।
হঠাৎ সে ফোন বের করল।
কাঁপা হাতে সোহাগির নাম্বারে কল দিল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
ফোন বন্ধ।
সে আতঙ্কিত হয়ে অ্যাডভোকেট করিমুল হককে কল দিল।
“ওরা কোথায়?”
ওপাশে শান্ত গলা। “ফ্লাইটের জন্য বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে।”
ইয়াসিন যেন পাগল হয়ে গেল।
সে দৌড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
রওশন আরা পিছন থেকে চিৎকার করছিলেন, “ইয়াসিন!”
কিন্তু সে শুনছিল না।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল।
সে নিজের পরিবারকে নিজ হাতে ধ্বংস করেছে।
এয়ারপোর্টের ভিআইপি লাউঞ্জে বসে সোহাগি শেষবারের মতো ফোনটা দেখল।
২২টা মিসড কল।
সবগুলো মিস্টার ইয়াসিনের।
সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ফোনটা বন্ধ করে দিল।
তারপর আয়েশার ছোট হাতটা শক্ত করে ধরল।
ঘোষণা ভেসে এল, “স্পেনগামী ফ্লাইটের যাত্রীদের বোর্ডিং শুরু হয়েছে।”
সোহাগি ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার সামনে নতুন জীবন।
পেছনে রয়ে গেল এক ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিবার, এক ভেঙে পড়া অহংকার, আর এক মানুষ যে খুব দেরিতে বুঝেছে ভালোবাসার মূল্য।

Post a Comment

0 Comments