মুখোশের_আড়ালে
আমি মূর্তির ন্যায় জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইলাম। দু'চোখের কোণ গড়িয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল কার্পেটের উপরে। ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলাম। বেদনাভরা মুখে শাশুড়ীকে বললাম,
"মা, আমি শেফালীকে একটিবার দেখতে যেতে চাই। আমাদের তো গাড়ি আছে। আর ঢাকা টু ময়মনসিংহ দূরত্ব মাত্র ১২৫ কিলোমিটারের মতো হবে। যেতে আড়াই ঘন্টারও কম সময় লাগবে। ত্রয়ী আপনার কাছেই থাকুক। একদিন স্কুল বন্ধ গেলে কিছু হবে না। খুব বেলা হয়নি এখনও। রোড ফ্রি পাব। খুব খারাপ লাগছে মেয়েটার জন্য। কত দেখেছি। কত কথা বলেছি।"
উনি মুখ গোঁজ করে বাঁকা স্বরে জবাব দিলেন।
"আমি এসব জানি টানি না বাপু। মাহিদুলকে জিজ্ঞেস করো। সে পারমিশন দিলে তুমি ময়মনসিংহ নয় দিল্লিও যাইতে পারে।"
আমি মাহিদুলকে কল দিয়ে অনুমতি চাইলাম। সে গম্ভীর বিরক্তিকর গলায় বলল,
"বেশী আদিখ্যেতা দেখাচ্ছ তুমি। অন্য বাসার মৃ/ত কাজের মেয়েকে দেখার জন্য তুমি তার জেলায় যেতে চাও। এসব কোন গ্রহণযোগ্য কথা হল না মারজিয়া। তুমি গেলে কী মরা শেফালী তোমাকে দেখতে পাবে? যেতে হবে না। দরকার হলে আবার কল দাও সেখানে।"
আমার বেজায় মন খারাপ হয়ে গেল। সাথে মেজাজটাও। শেফালীর স্বাভাবিক মৃ/ত্যু হলে হয়তো এতটা খারাপ লাগত না। একরাশ মন খারাপ নিয়ে সকালের কাজগুলো শেষ করলাম। ত্রয়ীকে ঘুম থেকে ঢেকে তুললাম। ওকে নাস্তা খাইয়ে দিলাম। স্কুল ড্রেস পরিয়ে রেডি করলাম তাকে। প্রতিদিনের মতো শাশুড়ীর কাছে বলে ওকে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। মনটা ভীষণ এলোমেলো হয়ে আছে। যেতে যেতে আবার শেফালীর বাবার নাম্বারে ফোন দিলাম। রিসিভ করল তার এক আত্মীয়। শেফালীর মৃ/ত্যু'র বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
"শেফালীকে মে/ re ফেলেছে এটা কীভাবে বুঝল তার পরিবারের লোকজন?"
উনি কান্নাজড়িত স্বরে জানাল,
"সকালে শেফালী উঠতেছে না দেইখা তার মা তার রুমে গেল। দেখল শেফালী সোজা হইয়া আছে। সারাশরীর শক্ত ও ঠান্ডা। বাড়ির লোকজন কেউ ডাক্তার নিয়া আইলো। কেউ থানায় গিয়া পুলিশ নিয়া আইল। ডাক্তার শিরা চেক কইরা কইল রাইতেই ওর মৃ/ত্যু হইছে। পুলিশকে আগের সব ঘটনা কইল ওর মা। শুইনা পুলিশ কইল মনে হয় গলা টিপা মাই/রা ফালাইছে। তারা লা/ শ নিয়া চইলা গেল।"
"শেফালীর রুমে কি বাইরে থেকে ঢোকা যায়?"
"হ মা। খুব যায়। ঢুলীর বেড়ার ঘর। কোনার বাঁধ কাইটা রুমে আসন যায়।"
আক্ষেপ করতে করতে উনার থেকে বিদায় নিলাম। ত্রয়ীকে স্কুলে দিয়ে সোজা নিকটস্থ থানায় চলে গেলাম। অন্যদিনের মতো স্কুলের অভিভাবক রুমে বসলাম না। থানায় কর্তব্যরত পুলিশদের এ টু জেড সবই বললাম শেফালীর বিষয়ে। তারা কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করলেন আমার কথা শুনে। আমি তাদের অনুরোধ করে বললাম,
"স্যার,আমার পরিচয় গোপন রাখবেন দয়া করে।"
পুলিশ অফিসার আতিকুল আমাকে আস্বস্ত করে বললেন,
"অপরাধীকে চিহ্নিত করতে ও ধরতে আমরা সবসময় গোপনীয়তা অবলম্বন করি। এটা 'ল' য়ের অন্যতম একটা রুলস। রে/p ও হ / ত্যা। দুটো বিষয় সংঘটিত হয়েছে শেফালীর সাথে। কেসটা জটিল। তবে ব্যাপার না পুলিশের জন্য। আমাদেরকে আপনার আরো আগে ইনফর্ম করা উচিত ছিল।"
আমি চুপ করে আছি। কোনো জবাব দিলাম না। যদিও জবাব আমার কাছে ছিল। তারপর উনার নির্দেশে শেফালীর গ্রামের থানায় ফোন দিল অন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা। সব শুনে তিনি সেই থানার ওসিকে বললেন,
"বুঝলাম। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসুক। শেফালীদের বাড়িতে আবার যান । পরিবারকে বলুন হ/ ত্যা মামলা দায়ের করতে। এবং তাদের থেকে এড্রেস নিয়ে নাজিমের বাড়িতে যাবেন তার খোঁজ নিতে।"
আমি নাজিমের নাম্বার দিলাম তাদের। তারা আমার সামনেই নাজিমকে ফোন দিল। কিন্তু তার ফোনের সুইচড অফ। আমি তাদের বললাম,
"স্যার, নাজিম ছেলেটাকে ধরতে পারলেই সব সত্য উন্মোচন হয়ে যাবে। সবই ত জানালাম আপনাদেরকে।"
"তাতো অবশ্যই। আচ্ছা মিসেস মারজিয়া, শেফালীর ভাষ্য অনুযায়ী আপনার কাউকে ডাউট হয় চেনাজানার মধ্যে?"
"স্যার,এই বিষয়ে আপাতত কিছু বলতে চাই না। কোনো ক্লু পেলে পরে অবশ্যই থানায় আসব। এবং আপনাদেরকে অবগত করব।"
"ঠিক আছে। আপনি আসতে পারেন। বিষয়টা আমরা আমাদের মতো করে ডিল করব। শেফালীর বাবার থেকে আপনাদের এপাটমেন্টের এড্রেস নিব। শেফালীর কাজ করা মালেকের পরিবার তাই জানবে। আপনি ঝামেলা মুক্ত রইলেন।"
উনার কথা বুঝতে পারলাম। তবুও আমি নিজ থেকে বাড়ির এড্রেস দিয়ে দিলাম। যেন সহজেই উনারা লোকেশন চিনে যেতে পারে।
আমি অচল পায়ে থানা থেকে বের হলাম। স্কুলে গিয়ে ত্রয়ীকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। শাশুড়ী আমার মন থেকে শেফালীর কষ্ট ভোলাবার জন্য একথা ওকথা বলছেন নানান ছলে। যেহেতু দু'দিন পরে ঈদ। তাই প্রসঙ্গত কোরবানির কথা তুললেন। বললেন,
"আমাদের গরু দেখছ? নিচে গ্যারেজে রাখা আছে। যা দাম। ভারত থেকে তো গরু আনা যাচ্ছে না। তাই এত চড়া দাম।"
"না দেখিনাই মা। অনেকের গরু ছিল তো তাই বুঝতে পারিনি। সববারের মতো আমাদের একাই তো? নাহ?"
"হ্যাঁ। একাই। তোমার শ্বশুর, ম্যানেজার ও গার্ডকে নিয়ে গিয়ে গাবতলি হাট থেকে কিনে আনল।"
"মা,গার্ডকে দিয়ে দা,বটিগুলো শান দিয়ে নিয়ে নিতে হবে। এখন শিল পাটা খোদাই করা, দা,ব/ টি,দা/মা,Cha/কু ধার করার লোক প্রতিদিন সকাল বিকাল নিচে আসে।"
"লাগবে না। গতবছর না শান দিলাম? তাও দুইদিন আগে আমি দুইটা চা/কুতে শান দিয়ে নিলাম।"
আমি গোপনে চমকে উঠলাম। তবুও নিজেকে ধাতস্থ করে স্মিত হেসে জানতে চাইলাম,
"কখন দিলেন আবার ধার?"
"সেদিন রাতে। তুমি ঘুমায়া ছিলা। আমার ঘুম আসছিল না। চিন্তা করলাম ঘুম যেহেতু আসতেছে না,চা/ কু গুলায় শান দিয়া রাখি। বৃষ্টির জন্য তোমাদের কানে আওয়াজ আসব না। ঘুম ছূটে যাবে না চা/কুর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে৷ তাই কোণার বারান্দায় গিয়ে করছি।"
আমি তব্দা খেয়ে খেলাম। হলো কী। আর ভাবলাম কী! হায় আল্লাহ! নিজেই বেকুব বনে গেলাম। সন্দেহ বিষাক্ত সাপের চেয়েও ভয়ংকর! অযথাই ভয় পেলাম আর শাশুড়ীর উপর নেগেটিভ ধারণা পোষণ করলাম।
মাহিদুল এল বিকেলে। রাতে বিছানায় যাওয়ার পর নিজ থেকেই শেফালীর প্রসঙ্গ তুলল। তার পিতার মতো শেফালীর জন্য আফসোস করল দরদ মাখা কণ্ঠে। পরেরদিন সকালে আমার ডাক পড়ল তিনতলায়। মাহিদুল,তার বাবা, মা অতি বিরক্ত হলো এতে। তবুও আমি গেলাম। গিয়ে দেখি থানায় দেখা পরিচিত সেই দুজন পুলিশ কর্মকর্তা। সাথে আরেকজন পুলিশ। পরে শুনলাম উনি পুলিশের ডিবি অর্থাৎ গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ শাখায় কর্মরত।
আমাকে দেখেই চেনা একজন পুলিশ অচেনার সুরে বললেন,
"সরি ফর ডিস্ট্রাব। এই বাসায় কাজ করা শেফালী মারা গিয়েছে জানেন? আমরা তদন্তে এসেছি। উনাদের কাছে শুনলাম, শেফালীর সাথে আপনার কথা হতো। তাই যদি কোনো ক্লু পাওয়া যায়, সেজন্যই আপনার তলব করা।"
আমি বুঝতে পারলাম, উনারা এই বাহানায় আমার সাথে ওপেনলি যোগাযোগ করতে পারার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করেছে। এদের সাথে এমনভাবে কথা বলেছে,যেন তারা আমার কথা বলতে বাধ্য হয়। আমি চালাকি করে বললাম,
"আন্টি সত্যিই বলছে। আমার তাকে ভালো লাগতো। শেফালী মানুষ হিসেবেও ভালো ছিল। সে মারা গিয়েছে আমিও শুনেছি সকালে। কিন্তু এতে এনাদের সাথে কী বুঝলাম না? আর আপনারা কীভাবে জানলেন?"
"আমাদের কাছে ময়মনসিংহ মুক্তাগাছা থানা হতে ফোন এল। তাকে মা/ রা হয়েছে। তার আগে সে নাকি এই বাসায় রে/p হয়েছে। উনারা তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে গ্রামে। শেফালী সব তার পরিবারকে জানিয়েছে গ্রামে গিয়েই। তাকে রে/p করল কে তাকে খুঁজে বের করতেই আমরা তদন্তে নেমেছি। আপনি কী জানেন শেফালীর কারো সাথে রিলেশন ছিল? এনারা দাবী করছেন সে রে/প হয়নি। তার প্রেমিক আজিমের সাথে তার ইচ্ছায় ফিজিক্যাল রিলেশন হয়েছে।"
আমি ঢোক গিলে বললাম,
"স্যার, আমি এমন কিছুই জানি না। এবং আন্টিরাও ভালো মানুষ। এই বাসায় এমন নিকৃষ্ট কাজ করার মতো কেউই নেই আমার জানামতে।"
"তারমানে বাইরের কেউ। বা আজিমই।"
আমি চুপ করে আছি।
আংকেল বলল,
"তাতো বললামই আমরা। আজিম নামের ছেলেটি। তাকে ধরুন।"
"কিন্তু শেফালী তো আজিম নামের কোনো ছেলের কথা বলেনি তার মা,বাবার কাছে। বলল মুখোশ পরা অজ্ঞাত দু'জন পুরুষ মানুষ তাকে রে/প করেছে। আচ্ছা আজিমের নাম্বার দিন।"
উনারা আজিমের নাম্বার নিল আন্টির কাছ হতে। তাকে বারবার কল দিল। বাট সুইচড অফ।
ডিবি পুলিশ জুলকার, মালেক আংকেলকে জিজ্ঞেস করল,
"শেফালী থাকতে আপনারা লাস্ট কবে বাইরে গিয়ে গিয়েছেন? একটু মনে করে বলুন।"
আংকেল, আন্টি সময় নিয়ে দিনক্ষন হিসেব করে তাদের বলল। তারা তৎক্ষনাৎ নিচে চলে গেল তাদেরকে সাথে নিয়ে। কৌতুহল মেটাতে আমিও নিচে গেলাম তাদের সাথে। ম্যানেজারকে বলল তারা,
"সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বের করুন তিন মাস আগের। স্টোরেজ বড় না?"
"হ্যাঁ স্যার। বড়। পাঁচ মাস আগের ঘটনাও আমরা দেখতে পারি।"
সেই তারিখ বললে ম্যানেজার প্রথমে সেদিন কারা প্রবেশ করল তিনতলায় সেটা চেক করল টালী খাতার আগুন্তকদের নামের লিস্ট দেখে। আজিম বা অন্য কারোই নাম পেলনা মালেকের বাসায় যাওয়া লোকদের মধ্যে।
তার পর সবাই অফিস রুমে গেল। ল্যাপটপের সামনে বসল ম্যানেজার। তার পাশের চেয়ারে বসল পুলিশ দুজন। ডিবি জুলকার ম্যানেজারকে উঠিয়ে নিজেই বসল চেয়ারে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ চেক করতে। যেহেতু ৩ মাস আগের। তাই একটু বেগ পেতে হলো উনাকে। এই ভিতরে বাড়ির আরো কিছু মানুষ জড়ো হলো নিচের অফিসরুমে। ল্যাপটপের মনিটরে DVR খুলল। মেন্যুতে গিয়ে play ব্যাকে গেল। তারিখ ও সময় নির্বাচন করে দিল। চলতে শুরু করল সেই দিনের ভিডিও।
নাজিম নামের কোনো ছেলের টিকিটিও খুঁজে পেল না কেউ ভিডিও ফুটেজে।
কিন্তু একজনকে দেখতে পেল যিনি সেদিন মালেকের বাসায় গিয়েছিলেন। ডিবি জুলকার ভিডিও পজ করলেন। অবাক স্বরে বলে উঠলেন,
"এই সিনিয়র হাজী কে?"
সবাই অতি সম্মানিত ও শ্রদ্ধার চেনা মানুষটাকে দেখলেন একসঙ্গে। যদিও তার মুখ অনেকটা ঢাকা ছিল। প্রত্যেকে বিষ্ফোরিত ও অবিশ্বাস্য চোখে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। এ কী করে সম্ভব! কী করে?

0 Comments