আবদ্ধ_প্রণয়_পেরিয়ে
আরুর পেটে মুখ গুজে শুয়ে আছে নীল। সেই কখন থেকে উঠতে বলছে, উঠছেই না । এদিকে ইরা চলে আসলে সমস্যা হবে। বুঝে যাবে সব। আরু আবার ডেকে উঠলো,
“ আরে উঠুন না!”
“ হুসস,আমি আমার বাবুর সাথে কথা বলছি!”
আরু হেসে ফেললো। বাড়িতে সবাই জেনে গেছে, আরু অন্তঃসত্বা। আরাফাত খান আতিয়া খান আর আয়ানও এর মধ্যে এসে দেখা করে গেছে। তবে এখনো ইরার কাছে অজানা রাখার চেষ্টায় আছে সবাই। সবাই জানলেও এমন ভান ধরে আছে, যেন সব আগের মতোই স্বাভাবিক। সবাই চাইলেও আরুর সাথে ইরার জন্য স্বাভাবিক হতে পারছে না। এ নিয়েও সবাই আপসেট থাকে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই, পরিস্থিতির স্বীকার সবাই। কারোর পদধ্বন্নি শুনতেই আরু বেড থেকে জোর করে নীলকে নামিয়ে দিতে চাইলো। ইরা যে আসছে তা শিওর। নীল উঠতে চাইছে না, আরু মুখটা পাংসুটে করে বলল,
“ উঠুন না! ইরা আসছে। “
“ না আসে! আজকেই সব শেষ করবো। ওকে সহ্য করতে পারছি না।”
বলেই উঠতে গেলে আরু মাথা ঝাকালো, মানে না। নীল চুপ করে গেল। এখন আবার এক্টিং। ইরা রুমে ঢুকতেই দেখলো, দুজনে দুপাশ হয়ে ঘুমিয়ে আছে। দরজা যেহেতু খোলা, সেহেতু সন্দেহ করার অবকাশ নেই।ইরা খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেলো। যেতেই নীল ঘুরে এসে আরুকে বাহুবদ্ধ করে নিল। আরু ঘুরে নীলের বুকে মুখ গুজতেই নীল স্বস্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল।
*****
সপ্তাহটা যেন চোখের পলকে কেটে গেল।কিন্তু এই সাতদিনে চৌধুরী বাড়ির পরিবেশ পুরো বদলে গেছে। ইরা যেন নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। কখনো নীলের পাশে গিয়ে বসছে, কখনো সবার সামনে পুরোনো স্মৃতি টেনে আনছে। এমনকি একদিন তো সকালের নাস্তায় বসেই বলে উঠল,
“আন্টি, জানেন? নীল আগে কফিতে একচামচের বেশি সুগার খেত না। আমি না থাকায় অভ্যাসটাই বদলে গেছে বোধহয়।”
মোহনা চৌধুরী শুধু মৃদু হেসে বললেন,
“মানুষের জীবনে সঠিক মানুষ এলে অনেক অভ্যাসই বদলে যায়, ইরা।”
কথাটা শুনে আরু নিচে মাথা নামিয়ে হাসি চাপল। ইরার মুখ শক্ত হয়ে গেল।এই সাতদিনে আরু একবারও ইরার সাথে তর্ক করেনি।না নিয়েছে ইরার সঙ্গে পাঙ্গা।নীলের পাশেও বেশি ঘেষে নি। নীল ঘেষতে গেলেও চোখ দিয়ে গিলে খাওয়া দৃষ্টি দিয়েছে। বেচারা নীল বউয়ের সব আবদার মেনে নিয়েছে বাধ্য হয়ে। আরু সব এমন ভাবে করেছে
যেন হেরো দল আরু।
অদ্ভুত শান্ত ছিল।এতেই ইরা আরও নিশ্চিত হয়েছে আরু হয়তো সত্যিই হেরে গেছে।কিন্তু সে জানত না, এই নীরবতার আড়ালেই তার জন্য ফাঁদ তৈরি হচ্ছে।সকালে ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে আছে।
আমজাদ চৌধুরী গম্ভীর মুখে বললেন,
“আজ সবাই বিকেলে বাসায় থাকবে।আরুর নাকি জরুরি কথা আছে।”
ইরা ঠোঁটের কোণে হাসি টানল।তার বিশ্বাস, আজই হয়তো ডিভোর্সের ব্যাপারটা ফাইনাল হবে।
নীল একবার শুধু আরুর দিকে তাকাল।
আরু শান্তভাবে পানি খেয়ে উঠে গেল। নীল ইরার পাশের চেয়ারে বসে তখনো ব্রেকফাস্ট করছে।
বিকেলে ড্রয়িং রুমে পুরো পরিবার বসে আছে।
ইরা সাজগোজ করে এসেছে। মুখে আত্মতৃপ্তির ছাপ।হঠাৎ আরু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল।
তার হাতে একটা ফাইল।ইরা ভ্রু কুঁচকালো।মনে মনে নেচে উঠে আওড়ালো, “ ওহ নো, ডিভোর্স পেপারস রেডি। ইউ আর জিনিয়াস আরু।’
তবে মুখে না জানার ভান ধরে বলল,“ওগুলো কি আরু?”
আরু ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,“আপনার সত্যি।”
ইরার বুক ধক করে উঠল।আস্তে করে বলল,
“মানে?”
আরু ফাইল খুলে টেবিলের উপর কয়েকটা ছবি ছড়িয়ে দিল।ছবিগুলো দেখে মুহূর্তেই ইরার মুখের রং উড়ে গেল।ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—
ইরা অন্য একজন পুরুষের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায়। শুধু তাই না, বিদেশে থাকা অবস্থায় সেই লোকটার সাথে লিভ-ইন করত, তার প্রমাণও আছে। যার জন্য নীলকে ছেড়ে দিয়েছিলো। লোকটা সেই। নীলের মতো তাকেও ছেড়ে আবার নীলের কাছে এসেছে। বেচারা খুজতে খুজতে বিডিতে এসে সেই আরুর কাছেই ধরা খেয়েছে। অতপঃ ইরা আবার নীলের জীবনে ফিরতে চাইছে, এটা মেনে নিতে পারেনি। তাইতো ধোকার উপরে ধোকা দেওয়া হলো।ততক্ষনে মীর আর নিহাল আসলো। সাথে জ্যাকসনও উপস্থিত। মিথ্যা বলার সুযোগ নেই।ইরা জ্যাককে দেখেই চোখ উল্টে ফেললো।
মোহনা চৌধুরী হতভম্ব হয়ে বললেন,“ইরা! এসব কি?”
ইরা তোতলাতে লাগল,“আন্টি… এগুলো মিথ্যে…”
“মিথ্যে?”এবার নীরা ফোন বের করল।
একটা ভিডিও চালু করতেই পুরো রুম নিস্তব্ধ।
ভিডিওতে ইরার নিজের কণ্ঠ—
“নীলকে আমি চাই। ওকে না পেলে কাউকে পেতেও দেব না। আর যেভাবে সেদিন কৌশলে ছবি তুলেছি, সেটা সবাইকে দেখালেই নীল আমার। আরু কিচ্ছু করতে পারবে না ।”
নীল ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।আমজাদ চৌধুরী বজ্রকণ্ঠে বললেন,
“তুমি আমার ছেলের সংসার ভাঙতে চেয়েছো? একবার ছেলে কে ভেঙে চলে গেছো। আবার পুরো সংসার ভাঙতে এসেছো।”
ইরা এবার চিৎকার করে উঠল,নিজের খোলস কতদিন আটকে রাখা যায়? সেই বেরিয়েই এলো।
“হ্যাঁ চেয়েছি! কারণ আমি নীলকে ভালোবাসি!”
নীল এবার উঠে দাঁড়াল।চোখদুটো ভয়ংকর ঠান্ডা।
“ভালোবাসা?ভালোবাসা কাউকে ব্ল্যাকমেইল করে না, ইরা। ভালোবাসা কারো সম্মান নিয়ে খেলে না।”
ইরা কাঁদতে কাঁদতে নীলের কাছে যেতে চাইল।
“নীল প্লিজ… আমি শুধু তোমাকে ফিরে চাইছিলাম…ওই মেয়েটাকে সহ্য হয়না আমার।”
রা নীলকে ধরার আগেইৎনীল একপা পিছিয়ে গেল। আওড়ালো,
“ ভদ্র ভাবে বলো। সি ইজ মাই ওয়াইফ। আর যেদিন তুমি আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে, সেদিনই সব শেষ হয়ে গেছে। আর আজ তুমি আমার স্ত্রীকে অপমান করেছো। সেটা আমি কখনো ক্ষমা করবো না।”
ইরা এবার আরুর দিকে তাকাল।চোখে ঘৃণা আর হিংস্রতা।আরুর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“তুই এসব প্ল্যান করেছিস? তুই না থাকলে নীল আমার। তুই—”
আমজাদ চৌধুরীর গর্জনে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।“এনাফ ইজ এনাফ! আজকের পর এই বাড়িতে তোমার ছায়াও দেখতে চাই না।”
ইরা অসহায়ের মতো চারদিকে তাকাল।
কেউ তার পাশে নেই।শেষবার নীলের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“তুমি সুখী হবে না…”
নীল শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“আমি আগেই সুখী। আমার স্ত্রী আছে।”
কথাটা শুনে আরুর বুক কেঁপে উঠল।জ্যাকসন এই সুযোগে ইরার হাত ধরে বাইরে যেতে যেতে বলল, “ আমার দশ লক্ষ টাকা চাই বেবি। এক্ষুনি, নেওয়ার সময় তো খুব ভালোবাসা দেখালে। এখন এসব ভালোবাসা মাই ফুট! টাকা দে!”
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের সাথে সাথে যেন বাড়িটার উপর চাপা অন্ধকারটাও সরে গেল। যেহেতু সবাই প্লান করে সব করেছে। তাই প্রশ্ন উত্তর নেই। সবাই আরুকে ঘিরে ধরল। মীর নাচতে নাচতে বলল,
“ ইয়েএএ, আমি কাকামনি হবো। শুনো ভাবি, আমি কিন্তু বেবির নাম রাখবো? “
“ হুমম। “
নীরার যেহেতু সন্তান নেই। তাই আরুকে নিয়ে সে একটু বেশিই খুশি। সবাই খুশিতে শুধু নাচতে পারছে না। এদিকে মোহনা চৌধুরী আরুকে বুকে জড়িয়ে নিল। কপালে আলতো ঠোঁট ছুইয়ে দিতেই
আমজাদ চৌধুরী বললেন, “ এখন আর এসব নিয়ে কথা বাড়িয়ো না। সবাই যার যার রুমে যাও।রেস্ট করো।“
সবাই রুমে চলে গেল। রাতের খাবার শেষে সবাই ঘুমিয়ে গেছে।রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে আরু।
আকাশ পরিষ্কার। বৃষ্টি নেই আজ।হঠাৎ পেছন থেকে নীল এসে জড়িয়ে ধরল।
“কি ভাবছো?”
আরু আস্তে বলল,“সব শেষ হয়ে গেল কি না ভাবছি।”
“না।শেষ হয়নি, জাস্ট শুরু।”
নীল তার কাঁধ থেকে চুল সরিয়ে মুখ নামিয়ে রাখল।খোচা খোচা দাড়ি বিধছে গলায়।
“সব শুরু হলো।”
আরু ঘুরে তাকাল।চোখদুটো ভেজা তার। আওড়ালো,
“আপনি ভয় পাননি? যদি আমি সত্যিই হাল ছেড়ে দিতাম?”
নীল মৃদু হেসে বলল,“তুমি পারতে না।”
“এত বিশ্বাস?”
“হুম। কারণ তুমি আমার আরাধ্যা। আমার বাড়ি। মানুষ নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবে বলো?”
আরুর চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
নীল এবার আলতো করে সেটা মুছে দিল।
“এই কান্নাকাটি বন্ধ হবে কবে?”
আরু হেসে ফেলে বলল,“জানিনা স্যার।”
নীল বিরক্ত মুখ করল।“আবার স্যার?”
“হুম। আমার হাজব্যান্ড, আমার স্যার।”
“শাস্তি দিব কিন্তু।”
“কি শাস্তি?”
নীল ধীরে ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“সারাজীবন আমার পাশে এভাবেই থাকতে হবে।”
আরু মৃদু হেসে নীলের বুকে মুখ লুকালো।
নিচে পুরো বাড়ি আলোয় ভরে আছে।
আর ওপরে চাঁদের নরম আলোয় দুটো মানুষ অবশেষে নিজেদের মতো করে এক হয়ে গেল।
***
ইরা চলে যাওয়ার পর যেন চৌধুরী বাড়িটা আবার আগের মতো প্রাণ ফিরে পেল।কিন্তু এই কয়েকদিনের ঝড় সবার মনেই একটা ক্লান্তি রেখে গেছে।বিশেষ করে আরুর।
বাইরে থেকে যতটা শক্ত দেখিয়েছে, ভিতরে ভিতরে ততটাই ভেঙেছে মেয়েটা।
সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই আরু অনুভব করল কেউ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।
চোখ খুলতেই দেখল নীল ওর ঘাড়ে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছে।আরু মৃদু হেসে ফিসফিস করল,
“স্যার…”
নীল চোখ না খুলেই বলল,“আবার স্যার ডাকছো কেন?”
“কারণ আমার ভালো লাগে।”
“আমার লাগে না।”
“তাহলে কি ডাকবো?”
নীল এবার চোখ খুলে তাকালো।
ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“স্বামী।”
আরুর গাল লাল হয়ে গেল।
“উফ! সকাল সকাল এসব বলতে হয়?”
“হুম। কারণ সকালে ঘুম ভাঙলে তোমাকে বউ মনে হয় বেশি।”
আরু ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল।নীল এবার উঠে ওর কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“আজ কোথাও যাবে?”
“না। কেন?”
“তাহলে সারাদিন আমার সাথে থাকবে।”
“আপনার অফিস?”
“আজ ছুটি।”
“মিথ্যুক। আপনি তো কালও বলেছিলেন জরুরি মিটিং আছে।”
নীল গম্ভীর মুখ করে বলল,“ছিল। কিন্তু এখন আমার জরুরি কাজ তুমি আর পুচকু।”
আরু এবার হেসে ফেলল জোরে।নিচে নামতেই সবাই একসাথে নাস্তা করছে।মীর দৌড়ে এসে আরুর পাশে বসে বলল,
“ভাবি, তুমি আর ভাইয়া আবার ঠিক হয়ে গেছো?”
আরু ভ্রু কুঁচকালো।বলল,“আমরা কবে ভুল ছিলাম?”
নীরা হেসে ফিসফিসিয়ে আরুর কানের কাছে বলল,“উফফ! এখন তো দেখছি একদম নতুন প্রেম।”
তারপর নীরা মুচকি হেসে নীলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ দেবরজি,তোমার মুখটা আজ অনেকদিন পর শান্ত লাগছে মনে হয়?”
নিহাল গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“শান্ত থাকবে না কেন? বউ পালায়নি তো।”
আরু লজ্জায় মাথা নিচু করল। নীল নির্বিকার মুখে বলল,
“পালালেও খুঁজে নিয়ে আসতাম।”
বলতেই পুরো টেবিলে হাসির রোল পড়ে গেল।আমজাদ চৌধুরী, মোহনা চৌধুরীও আসলেন।
দুপুরে সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে আরু বারান্দায় কাপড় মেলছিল।
হঠাৎ পিছন থেকে নীল এসে জড়িয়ে ধরল।
“এই! কেউ দেখে ফেলবে।”
“দেখুক।”
“আপনি দিন দিন নির্লজ্জ হচ্ছেন।”
“তোমার কারণেই।”
আরু চোখ ঘুরিয়ে বলল,“সব দোষ আমার?”
“হুম। তুমি এত সুন্দর কেন?”
আরু এবার চুপ হয়ে গেল।কিছু কথা থাকে, যেগুলোর উত্তর হয় না।নীল ধীরে ধীরে বলল,
“একটা কথা বলি?”
“হুম?”
“সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলাম।”
আরু অবাক হয়ে তাকাল।বলর,
“আপনি?”
“হুম। যদি তুমি সত্যি আমাকে ভুল বুঝতে।”
আরু কিছুক্ষণ চুপ থেকে নীলের বুকের উপর মাথা রাখল।এইযে তীব্র শান্তি এখানে পাওয়া যায়। আরু বলল,
“আমি আপনাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলাম।”
নীল চোখ বন্ধ করল।তারপর আস্তে বলল,
“আর কখনো এমন ভয় পেতে দেব না। প্রমিস।”
তারপর আরুর কানের কাছে গেয়ে উঠলো,
Khuda ne tujhko diya mujhe..
Tujke mein khoi nahi sakta..!
Main maar jaunga..
Agar khabi.!
Kehna pad gaya ye sanam..
Main tera hi hu magar..
Tera ho nahi sakta..!
বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে আরুর। হয়তো দূরে কোথাও মেঘ জমছে আবার। কিন্তু এবার সেই মেঘে যে আর ভয় নেই। কারণ ঝড়ের পরের আকাশটা সবসময় সবচেয়ে সুন্দর হয়।
রাতে রুমে এসে আরু দেখল বিছানার উপর একটা ছোট্ট বক্স রাখা।সে অবাক হয়ে বলল,
“এটা কি?”
নীল টাই খুলতে খুলতে বলল,“খুলে দেখো।”
আরু ধীরে ধীরে খুলতেই অবাক হয়ে গেল।
ভেতরে একটা সুন্দর নূপুর।
“এটা…”
“পছন্দ হয়েছে?”
আরু নূপুরটা হাতে নিয়ে তাকাল নীলের দিকে। তারপর উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“হঠাৎ?”
নীল কাছে এসে দাঁড়াল।ফিসফিসিয়ে কানের লতিতে ঠোঁট ছোয়ালো,
“কারণ আমার বউ রাগ করলে পায়ের শব্দ কমে যায়। আমি চাই, তুমি হাঁটলেই আমি শুনতে পাই।তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ আমার হৃদয়ে ক্ষরণ করুক।”
আরুর চোখ আবার ভিজে উঠল। নীল বিরক্ত মুখে বলল,
“এই মেয়ে এত কাঁদো কেন?”
আরু কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেলল।
“জানিনা স্যার…”
“আবার?”
“হুম। ”
নীল এবার আর কিছু বলল না।
শুধু ধীরে ওর পায়ে নূপুরটা পরিয়ে দিল।টুংটাং শব্দ উঠতেই নীল মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“এবার ঠিক লাগছে। এখন পুরোপুরি আমার বউ মনে হচ্ছে।”
রাত অনেকটা গভীর। চৌধুরী বাড়ির সব আলো নিভে গেছে প্রায়। শুধু নীলদের রুমের বারান্দায় হালকা হলুদ আলো জ্বলছে।আরু বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
পায়ে নীলের দেওয়া নূপুর। বাতাসে নূপুরের টুংটাং শব্দ কেমন মায়া ছড়াচ্ছে।নীল রুম থেকে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।এই মেয়েটাই একসময় ওর স্টুডেন্ট ছিল। চুপচাপ, জেদি, চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়ানো একটা মেয়ে।
আর আজ এই মেয়েটাই ওর সংসার, ওর শান্তি, ওর বাড়ি।নীল ধীরে ধীরে গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল আরুকে।কাধে মুখ নামাতেই আরু মুচকি হেসে বলল,
“আপনার অভ্যাস খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”
“হতে দাও।”
“সবসময় জড়িয়ে ধরতে হবে?”
“হুম।”
“কেন?”
নীল ওর কাঁধে থুতনি গেড়েই বলল,“কারণ ছাড়তে ইচ্ছে করে না।”
আরু চোখ বন্ধ করে ফেলল।
এই মানুষটার কাছে এলে কেন যেন পৃথিবীর সব ভয় ছোট মনে হয়।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর নীল আস্তে বলল,
“আরু?”
“হুম?”
“একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“করুন।”
“তুমি আমাকে এত ভালোবাসো কেন?”
আরু হেসে ফেলল আস্তে বলল,“জানিনা।”
“মিথ্যে।”
“সত্যি। ভালোবাসার কারণ হয় নাকি?”
নীল ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল।চোখে চোখ রেখে বলল,
“আমার আছে।”
“কি?”
“তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ অনুভূতি।”
আরুর বুকটা ধক করে উঠল।নীল ধীরে ধীরে বলল,
“আমি সবসময় ভাবতাম ভালোবাসা মানে হয়তো শুধু পাশে থাকা। কিন্তু তুমি শিখিয়েছো, ভালোবাসা মানে শান্তি। একটা মানুষকে দেখেই মনে হওয়া, ‘আমি বাসায় ফিরেছি।’ ”
আরুর চোখ চিকচিক করে উঠল আবার।
নীল সঙ্গে সঙ্গে বলল,“না! কান্না করা যাবে না আভির আম্মু ।”
আরু ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,“আমি এমনই।”
নীল মুচকি হেসে বলল,
“ জানি। এই জন্যই তো ভালোবাসি।”
বাতাসে আবার হালকা বৃষ্টি নামতে শুরু করল।
ছোট ছোট ফোঁটা এসে পড়ছে দুজনের গায়ে।
আরু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আবার বৃষ্টি…”
নীল মৃদু হেসে বলল,
“আমাদের জীবনের সাক্ষী বোধহয়।”
আরু কিছু বলার আগেই নীল ওর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।তারপর চোখে, গালে… ধীরে ধীরে থামল ওর ঠোঁটে।এই চুমুতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
শুধু গভীর ভালোবাসা। দুজন মানুষ একে অপরকে পাওয়ার নিশ্চিন্ত অনুভূতি।
চুমু ভেঙে নীল ফিসফিস করে বলল,
“একটা কথা বলবো?”
আরু লজ্জায় মাথা নিচু করল।
“হুম…”
“আমি তোমার প্রেমে পড়েছি, মিসেস আরাধ্যা চৌধুরী ।”
আরু হেসে ফেলল।“এতদিনে?”
“হুম। আর এবার আর উঠতে পারবো না। আমি ইহকাল পরকালেও সঙ্গে পাওয়ার জন্য পড়েছি।”
আরু এবার আলতো করে নীলের শার্ট খামচে ধরল।তারপর খুব আস্তে বলল,
“আমিও আপনাকে খুব ভালোবাসি… আমার ব্যক্তিগত পুরুষ, আমার স্যার ।”
নীল কপাল ঠুকল ওর কপালে।ভ্রু কুচকে বলল,
“এই স্যার ডাকটা আর গেল না।”
আরু মুচকি হাসল।
“ যাবে না।কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কটার শুরুই হয়েছিল একজন স্যার আর স্টুডেন্টের গল্প থেকে।”
নীল আর কিছু বলল না।শুধু ওকে আবার নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে নিল।নিচে পুরো শহর ঘুমিয়ে।ওপরে বৃষ্টি ঝরছে ধীরে ধীরে।
আর দুটো মানুষ নিজেদের সব ঝড় পেরিয়ে অবশেষে খুঁজে পেয়েছে তাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা—একজন আরেকজনকে।অবশেষে নীলাদ্র চৌধুরীর আবদ্ধ প্রণয় আরাধ্যা খানের জন্য খুলেছে। দুজন মিলেমিশে মনের দুয়ার ভেঙেছে।বোঝা গেল, একজন আরেকজনের সঙ্গে হৃদয়ের মিল খুজে পেলেই খুলে যাবে, ভেঙে যাবে, ছিটকে পড়বে, আর শেষ হবে রুক্ষতা, শুধুমাত্র আবদ্ধ প্রণয় পেরিয়ে।
~সমাপ্ত~

0 Comments