কাজের_মেয়ের_গুজব
“সব প্রমাণ আপনার আইডি ব্যবহার করে করা হয়েছে।”
ফোনের ওপাশ থেকে সহকারীর আতঙ্কিত কণ্ঠ বারবার কানে বাজছিল। মিস্টার ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। যেন পুরো পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেছে। তার চারপাশে সবাই তাকিয়ে আছে, কিন্তু তিনি কিছু শুনতে পাচ্ছিলেন না।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল
কেউ তাকে ধ্বংস করার জন্য ধাপে ধাপে ফাঁদ পেতেছে।
প্রথমে কোম্পানির গোপন তথ্য ফাঁস।
তারপর মিডিয়ায় কেলেঙ্কারি।
এখন কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ।
সবকিছু এত নিখুঁতভাবে সাজানো যে বাইরে থেকে তাকালে মনে হবে তিনিই অপরাধী।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে ফোন নামালেন।
রাহিমা খাতুন উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
“কি হয়েছে?”
ইয়াসিন শান্ত থাকার চেষ্টা করলেন।
“অফিসে সমস্যা হয়েছে।”
কিন্তু তার চোখের ভেতরের ঝড় লুকানো যাচ্ছিল না।
অন্যদিকে সুহাসিনী তখনও মেঝেতে বসে কাঁদছিল। জালালের নাম শুনলেই তার শরীর কেঁপে উঠছে। বহু বছরের জমে থাকা ভয় যেন আবার জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে।
ইয়াসিন একবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন।
“তুমি ভয় পেয়ো না।”
সুহাসিনী ভাঙা গলায় বলল,
“ওরা খুব শক্তিশালী “আমি আছি।”
“আপনি বুঝতে পারছেন না। জালাল মানুষ মারতে পারে।”
ইয়াসিনের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
“এইবার ও ভুল মানুষকে ভয় দেখাতে এসেছে।”
তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
“আমি অফিসে যাচ্ছি। দরজা বন্ধ করে থাকবে।”
সুহাসিনী হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল।
“যাবেন না… আমার খুব ভয় করছে।”
এই প্রথম মেয়েটা এত অসহায়ের মতো তাকে থামানোর চেষ্টা করল।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত রাখলেন।
“আমি ফিরে আসব। তোমাকে একা ফেলে কোথাও যাব না।”
তিনি বেরিয়ে গেলেন।
গাড়িতে উঠে তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের বিশ্বস্ত আইনজীবী আরিফকে ফোন করলেন।
“অফিসে আসুন। জরুরি।”
ঢাকার রাস্তা তখন দুপুরের ভিড়ে আটকে আছে। কিন্তু ইয়াসিনের মনে হচ্ছিল সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছে।
অফিসে পৌঁছাতেই তিনি দেখলেন পুরো পরিবেশ অস্থির।
কর্মচারীরা ফিসফিস করছে। কেউ সরাসরি চোখে তাকাচ্ছে না।
বোর্ডরুমে ঢুকতেই কয়েকজন পরিচালক গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন।
তানভীরও সেখানে।
তার ঠোঁটের কোণে হালকা অদ্ভুত হাসি।
একজন পরিচালক কড়া গলায় বললেন,
“মিস্টার ইয়াসিন, কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় পঁচিশ কোটি টাকা গায়েব হয়েছে।”
আরেকজন বললেন,
“সব লেনদেন আপনার আইডি থেকে হয়েছে।”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন,
“আমি এই ট্রান্সফারের সঙ্গে জড়িত না।”
তানভীর ধীরে ধীরে বলল,
“কিন্তু প্রমাণ তো অন্য কথা বলছে।”
ইয়াসিন এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।
“তুমি কি বলতে চাইছ?”
তানভীর ভান করা দুঃখের সুরে বলল,
“স্যার, আমি শুধু কোম্পানিকে বাঁচাতে চাই।”
“নাকি নিজেকে?”
ঘরের ভেতর মুহূর্তে নীরবতা নেমে এলো।
তানভীরের চোখ সরু হয়ে উঠল।
“আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?”
ইয়াসিন উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখন আইটি বিভাগের প্রধান ভেতরে এসে বলল,
“স্যার, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে গত রাতে কেউ আপনার কেবিনে ঢুকেছিল।”
“কে?”
লোকটা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
“ভিডিওর কিছু অংশ ডিলিট করা হয়েছে।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন,
“যেটুকু আছে দেখান।”
স্ক্রিনে ফুটেজ চালু হলো।
রাত প্রায় একটা।
ভিডিওতে দেখা গেল কালো হুডি পরা একজন মানুষ ইয়াসিনের কেবিনে ঢুকছে।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরে লোকটা হাত তুলে দরজা বন্ধ করতে গেলে তার কব্জির ঘড়ি স্পষ্ট দেখা গেল।
ইয়াসিনের চোখ হঠাৎ থেমে গেল।
এই ঘড়িটা তিনি আগে দেখেছেন।
খুব কাছ থেকে।
তিনি ধীরে ধীরে তানভীরের দিকে তাকালেন।
তানভীরের হাতে ঠিক একই ঘড়ি।
তানভীর মুহূর্তে হাত নিচে নামিয়ে ফেলল।
ইয়াসিন ঠান্ডা হাসলেন।
“মজার ব্যাপার।”
তানভীর জোর করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
“স্যার, এটা কাকতালীয়ও হতে পারে।”
ইয়াসিন কিছু বললেন না।
কিন্তু তার মনে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে— তানভীরই সবকিছুর পেছনে।
অন্যদিকে বাড়িতে সুহাসিনী একা বসে ছিল। তার মাথার ভেতর পুরনো স্মৃতিগুলো ঘুরছে।
শালবনপুর গ্রামের সেই রাত।
অন্ধকার মাঠ।
সাংবাদিকের আতঙ্কিত চিৎকার।
আর জালালের হাতে রক্তমাখা ছুরি।
সুহাসিনী দুহাতে কান চেপে ধরল।
“না… না…”
ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নাম্বার।
সে দ্বিধায় পড়ে গেল। তারপর ধীরে কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কর্কশ কণ্ঠ।
জালাল।
“কেমন আছো সুহাসিনী?”
সুহাসিনীর বুক কেঁপে উঠল।
“কি চান?”
জালাল হেসে বলল,
“অনেক বড়লোক হয়ে গেছো দেখছি।”
“আমাকে আর ফোন দিবেন না।”
“দেব। কারণ খেলা এখনও শেষ হয়নি।”
সুহাসিনীর হাত কাঁপছিল।
“আপনি আমার জীবনটা কেন শেষ করতে চান?”
জালালের কণ্ঠ হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কারণ তুমি বেঁচে আছো।”
“মানে?”
“সেদিন তোকে মেরেও ফেলতে পারতাম। ভুল করেছি।”
সুহাসিনীর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
“আপনি… আপনি কী বলছেন?”
জালাল ধীরে ধীরে বলল,
“তুই যা দেখেছিস, সেটা যদি বাইরে যায় তাহলে শুধু আমি না… আরও অনেকের নাম বের হবে।”
“আমি কাউকে কিছু বলিনি।”
“কিন্তু এখন তুই ইয়াসিনের স্ত্রী। আর ও সত্য খুঁজতে শুরু করেছে।”
সুহাসিনী কাঁপা গলায় বলল,
“দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন।”
জালাল হেসে উঠল।
“এত সহজে?”
তারপর হঠাৎ কণ্ঠ বদলে গেল।
“তোর ভাই হামিম আজ কলেজে গেছে, তাই না?”
সুহাসিনীর শরীর জমে গেল।
“হামিমের নাম নেবেন না!”
“রাফি আজ স্কুলে যায়নি কেন?”
সুহাসিনীর চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে গেল।
“আপনি ওদের ফলো করছেন?”
জালাল ঠান্ডা গলায় বলল,
“তুই যদি মুখ খোলিস, আগে ওদের মরতে হবে।”
কল কেটে গেল।
সুহাসিনী ফোন ফেলে দিল মেঝেতে।
তার পুরো শরীর কাঁপছিল।
সে বুঝে গেল— জালাল শুধু ভয় দেখাচ্ছে না, সত্যিই কিছু করতে পারে।
হঠাৎ তার মাথায় একটাই চিন্তা এলো।
হামিম, রাফি আর লায়না বিপদে আছে।
সে দ্রুত নিজের রুমে গিয়ে আলমারি খুলল। ভেতর থেকে পুরনো একটা ব্যাগ বের করল।
তার চোখে পানি।
সে ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে ওদের কাছে যেতে হবে…”
ঠিক তখন রাহিমা খাতুন দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
“তুমি কোথাও যাচ্ছ?”
সুহাসিনী চমকে উঠল।
“আমি… আমি গ্রামে যাব।”
“এখন?”
“আমার ভাইবোনদের বিপদ।”
রাহিমা খাতুন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আজ প্রথমবার তিনি মেয়েটার ভেতরের অসহায়ত্ব স্পষ্ট দেখলেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “একলা যাবে?”
সুহাসিনী মাথা নিচু করল। “আমার যেতেই হবে।”
রাহিমা খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “ইয়াসিনকে জানিয়েছ?”
“না।”
“ও জানলে যেতে দেবে না।” সুহাসিনী চুপ।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রাহিমা খাতুন এমন একটা কাজ করলেন, যা সুহাসিনী কখনো কল্পনাও করেনি।
তিনি আলমারি থেকে কিছু টাকা এনে তার হাতে দিলেন।
“নাও।” সুহাসিনী হতবাক হয়ে তাকাল।
“এগুলো কেন?” “পথে লাগবে।”
“আপনি… আমাকে সাহায্য করছেন?”
রাহিমা খাতুন মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
“সব মা-ই সন্তানের ভয় বোঝে।”
সুহাসিনীর চোখ আবার ভিজে উঠল।
ঠিক তখন বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
ইয়াসিন ফিরে এসেছেন।
সুহাসিনীর বুক ধক করে উঠল।
সে জানে এখন যদি ইয়াসিন সব জানতে পারেন, তাহলে তাকে যেতে দেবেন না।
কিন্তু তার ভাইবোনদের বাঁচাতে হলে আজ রাতেই শালবনপুর যেতে হবে।
আর সে জানে না… এই যাত্রা তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর যাত্রা হতে যাচ্ছে।

0 Comments