তুমিময়_এক_অদ্ভুত_নেশা

 

তুমিময়_এক_অদ্ভুত_নেশা



সাফওয়ানের এমন হুমকি শুনে আরিশা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে চিৎকার করে বলল—
– “আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই কথা বলেছি, আপনি বলার কে? কিসের জন্য এত অধিকার খাটাচ্ছেন আমার ওপর, হ্যাঁ? আমার ওপর আপনার কোনো অধিকার নেই! আমার জীবন থেকে একদম দূরে থাকুন আপনি! যাকে ভালোবাসেন, তার ওপর গিয়ে অধিকার খাটান। আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না, তাহলে আমি কার সাথে কী করব, কার সাথে হাসব—সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার! আপনি বলার কে?”
আরিশার এই কঠিন কথাগুলো শুনে সাফওয়ান একদম চুপ হয়ে গেল। এত সব কথার মাঝে তার কানে শুধু একটা শব্দই বারবার বাজতে লাগল—‘অধিকার’। তার নাকি কোনো অধিকার নেই আরুর ওপর! সে আরিশার দিকে তাকাল। কান্নার ফলে আরিশার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ মুখটা একদম লাল হয়ে গেছে। সাফওয়ান মুখে কিছু না বলে নিজের ফোনটা বের করে জারিফকে একটা টেক্সট করল, তারপরই গাড়ি স্টার্ট দিল। আরিশা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিরবে কাঁদতে লাগল। তার মনে মনে এক তীব্র অভিমান দানা বাঁধল—‘এত কিছুর পরেও লোকটা কিছু বলছে না! লোকটা আমাকে মেরেছে, তাতেও আমার এত কষ্ট হচ্ছে না; কিন্তু লোকটা তো এখনও স্বীকার করছে না যে সে অন্য কাউকে ভালোবাসে না! তার মানে আমিই ঠিক ভাবছি, ওনি অন্য কাউকেই ভালোবাসে, আর তাই তো আমাকে কোনো রকম এক্সপ্লেনেশন দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না!’
আরিশার এসব ভাবনার মাঝেই গাড়িটা এসে থামল একটা কাজী অফিসের সামনে। আরিশা ভেবেছিল গাড়ি বোধহয় বাড়ির সামনে এসে থেমেছে, তাই সে কোনো দিকে না তাকিয়েই ঝটপট গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। কিন্তু নামতেই সে দেখতে পেল এটা তাদের বাড়ি নয়! হঠাৎ কাজী অফিসের সাইনবোর্ডের দিকে চোখ যেতেই আরিশা চমকে উঠল। সে সাফওয়ানের দিকে তাকাতেই দেখল লোকটা ফোনে কারও সাথে কথা বলছে। আরিশা নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে ক্ষুব্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল—
– “আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছেন?”
সাফওয়ান আরিশার কথা শুনে ফোনের আলাপ শেষ করে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল—
– “বিয়ে করতে!”
‘বিয়ে করতে’—এই দুটো শব্দ শোনা মাত্রই আরিশার বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল! লোকটা বিয়ে করবে, আর সেটা তাকে এভাবে সামনাসামনি দেখাতে নিয়ে এসেছে? একটা মানুষ এতটা নির্দয়, এতটা পাষাণ কী করে হতে পারে? লোকটা না হয় তাকে ভালোবাসে না, কিন্তু আরিশা যে লোকটাকে কতটা ভালোবাসে, তা তো খুব ভালো করেই জানা! সব জেনেও নিজের বিয়েতে তাকে নিয়ে এসেছে?
আরিশা নিজের চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করে আবারও দ্রুত গাড়িতে উঠে বসতে গেল। কিন্তু ঠিক তখনই সাফওয়ান খপ করে আরিশার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। সে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
– “কোথায় যাচ্ছ?”
আরিশা নিজের হাতটা সাফওয়ানের শক্ত মুঠো থেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে ধরা গলায় বলল—
– “বিয়ে করতে এসেছেন, যান গিয়ে বিয়ে করুন! আমি কোথায় যাচ্ছি না যাচ্ছি, সেটা আপনার না জানলেও চলবে!”
সাফওয়ান হয়তো আরিশার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারল। সে ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল—
– “তোমাকে ছাড়া বিয়ে করব না আমি! তুমি নিজের চোখে দেখবে আজ আমাকে বিয়ে করতে!”
– “আমার কোনো শখ নেই আপনার বিয়ে দেখার!”
– “তাহলে কীসের শখ আছে? আমাকে বিয়ে করার?”
– “সেটাও আগে ছিল, এখন আর নেই! এখন আপনি যাকে খুশি বিয়ে করুন, আমার কী? আমি আপনার চেহারাটাও আর দেখতে চাই না!” কথাগুলো বলতে বলতে আরিশার গলা কান্নায় বুজে আসতে লাগল।
সাফওয়ান এবার আরিশার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
– “ঠিক আছে, তুমি তো আগে ভালোবাসতে আমাকে, এখন মোহ কেটে গেছে। তাই আমি কাকে বিয়ে করলাম, তাতে তো তোমার কিছু যায় আসার কথাও না! তবুও, তোমার যখন আসলেই কিছু যায় আসে না, তাহলে চলো—আমার বিয়ের সাক্ষী হবে!”
– “পারব না!”
– “কেন? আমাকে অন্য কারও সাথে বিয়ে হতে দেখলে খুব কষ্ট হবে বুঝি?”
– “নাহ!”
– “তাহলে চলো!”
আরিশার কোনো উত্তরের আশা না করে সাফওয়ান জোর করে তাকে সাথে নিয়ে কাজী অফিসের ভেতরে ঢুকে গেল।
_
কাজী অফিসের ভেতরে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই সেখানে এসে হাজির হলো জারিফ আর মাইশা। আরিশা অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে– কার সাথে লোকটার বিয়ে হবে, সেই মেয়েটাকে দেখার জন্য! কিন্তু কাজী সাহেব যখন সব নিয়মকানুন শেষ করে হঠাৎ আরিশাকেই ‘কবুল’ বলতে বললেন, তখন আরিশা যেন চারশো চল্লিশ ভোল্টের ঝটকা খেল! কিন্তু আরিশা এবার সম্পূর্ণ বেঁকে বসল। সে কিছুতেই এই বিয়ে করবে না! তাকে আগে জানতে হবে লোঅটার মনে কি আছে! আরিশা চিৎকার করে উঠল—
– “আমি এই লোককে কোনোদিন বিয়ে করব না! এই লোক অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসে, আমি নিজে ওনাকে অন্য মেয়ের সাথে দেখেছি! তার ওপর, এই লোক কিছুক্ষণ আগে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আমার গায়ে হাত তুলেছে, আমাকে মেরেছে!”
কিন্তু আরিশার কোনো কথাই কানে নিল না সাফওয়ান। সে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে আদেশের সুরে বলল—
– “কবুল বলো আরু!”
আরিশা আবার চিৎকার করে উঠল—
– “বলছি তো বলব না কবুল! আমি আপনাকে বিয়ে করব না। আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না, তাহলে এখন জোর করে বিয়ে করতে চাইছেন কেন?”
– “আমার ভালোবাসা সহ্য করার ক্ষমতা তোমার নেই, তাই আপাতত কবুল বলো। বিয়ে করে আগে বউ হও, তারপর ভালোবাসা কাকে বলে তা আস্তে আস্তে বুঝিয়ে দেব।”
সাফওয়ানের এই কথা শুনে আরিশা ঠিক কী বুঝবে তা ভেবে পেল না। তবে সে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে—এই লোকটার কাছ থেকে আজকেই জেনে ছাড়বে যে সাফওয়ানের জীবনে অন্য কোনো মেয়ে আছে কি না! সে ত্যাড়া উত্তর দিয়ে বলল—
– “আপনি অন্য একজনকে ভালোবেসে এখন আমাকে কেন বিয়ে করতে চাইছেন? এই জন্যই তো সেদিন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কারণ আপনি অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসেন! তাই না?”
– “ইডিয়ট! স্টুপিডিটি একদম করবে না। তোমাকে কে বলেছে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি?”
– “আমি নিজে চোখে দেখেছি!”
– “ভুল দেখেছ, আমি তোমাকে ভুল দেখিয়েছি। এখন তুমি সোজা কথায় কবুল বলবে, নাকি আমি অন্য কোনো উপায় বের করব তোমাকে কবুল বলানোর জন্য?”
সাফওয়ানের এই কথা শোনার সাথে সাথেই আরিশার চঞ্চল মনটা নিমিষেই শান্ত হয়ে গেল; তার তপ্ত হৃদয়ে যেন এক শীতল বাতাস বয়ে গেল! লোকটা অন্য কোনো মেয়েকে‌ ভালোবাসে না। কিন্তু এতো দিন তাকে যে এতো কষ্ট দিল তার কি হবে?আরিশা সাফওয়ানের কাছে এত সহজে ধরা দিতে রাজি হলো না। সে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল—
– “অন্য কাউকে ভালোবাসেন না আপনি ঠিক! কিন্তু আপনি আমাকেও ভালোবাসেন না, সেটা আপনি আমাকে খুব ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাই এখন আর আমি আপনাকে বিয়ে করব না!”
সাফওয়ান আরিশার খুব কাছে এসে সাফওয়ানের সেই চেনা গম্ভীর গলায় বলল—
– “বিয়ে তো আমি আজকেই করব, আর তোমাকেই করব!”
~~~~~~~~~~~~
সাফওয়ান আর আরিশার বিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে। সাফওয়ানের হুমকিতে আরিশা বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে। আরিশা নিজেও সাফওয়ানকে ভালোবাসে, সে তো শুধু লোকটা অন্য মেয়েকে ভালোবাসে কি না সেটা জানতে চেয়েছিল; যেহেতু লোকটা অন্য মেয়েকে ভালোবাসে না বলে নিজের মুখে স্বীকার করেছে, তার মানে আসলেই ভালোবাসে না। এটাই তার মনের বড় সন্তুষ্টি। বাকি রইল তাকে এতদিন কষ্ট দেওয়ার বিষয়টা; সে এখন বুঝতে পেরেছে লোকটা আসলে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে নিজের সাথে জড়াতে চায়নি, যেরকম সায়রাও তাকে বলেছিল। তবুও লোকটা তাকে না জানিয়ে এভাবে কষ্ট দিয়েছে, তার জন্য একটু কষ্ট সেও ফেরত দেবে! কিন্তু তার আগে লোকটাকে নিজের নামে করে নিতে হবে। আরিশা খুব মন থেকে বিয়েটা করেছে, যদিও সাফওয়ান মনে করছে সে তার জোরাজুরিতেই বিয়েটা করছে।
বিয়ে শেষ হওয়ার পরে সাফওয়ান আরিশার হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিয়ে কাজী অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে সে জারিফকে বলে গেল বাকি সবকিছু সামলে নিতে এবং মসজিদে কিছু মিষ্টি পাঠিয়ে দিতে। জারিফ ভাইয়ের কথায় সায় জানায়। সাফওয়ান চলে যাওয়ার পর মাইশা যেন এতক্ষণে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল! সাফওয়ান চলে যাওয়ার পর মাইশার কেন জানি মনে হলো, সাফওয়ানের সামনে গেলে ওর মুখ আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। লোকটা কীরকম রাগী আর গম্ভীর! আসলে সাফওয়ানের ব্যক্তিত্বই এমন, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষগুলো সবসময় তটস্থ হয়ে থাকে।
জারিফ রেজিস্ট্রি পেপারসহ সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে মাইশার হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাইরে বের হয়ে দেখল সাফওয়ানের গাড়ি ইতিমধ্যে চলে গেছে। জারিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল; সাফওয়ানের হঠাৎ বিয়ে করার মেসেজ দেখে সে খুব তাড়াহুড়ো করে এসেছে, সাথে মাইশাও ছিল বলে তাকেও সাথে নিয়ে এসেছে। জারিফ অবশ্য আগে থেকেই জানতো যে ভাই আরিশাকেই বিয়ে করবে, কারণ সায়রা তাকে এই বিষয়টা বলেছিল। সায়রার কথা মনে পড়তেই জারিফ আনমনে হেসে উঠল। তার ফুল সবার থেকে আলাদা! এই তো সেদিন, ভাইয়ের টিউমারের ব্যাপারটা লুকানোর কারণে সে তাদের ওপর কত রাগ করল, কথা বলা বন্ধ করে দিল এবং বলেছিল তাদেরকে সে আর কোনোদিন কিছুই বলবে না, সবকিছু লুকিয়ে যাবে; অথচ আরিশা আর সাফওয়ান ভাইয়ের এই ব্যাপারটা সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে আসার পরেই সে জারিফকে আগেভাগে জানিয়ে দিয়েছে! সে রাগ-অভিমান করে ঠিকই, কিন্তু কাউকে কখনো দূরে ঠেলে দিতে পারে না—এইটাই তার ফুলের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব।
জারিফকে এভাবে আনমনে হাসতে দেখে মাইশা তার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল—
– “কী হয়েছে তোমার? এভাবে একা একা হাসছ কেন?”
– “আমার জীবনে হাসার মাত্র দুইটা কারণ; একটা তুমি আর একটা আমার ফুল। এখন তুমি তো আমার সাথেই আছ, আর বাকি রইল ফুল, তাই তার কথা ভেবেই হাসছি!”
– “হঠাৎ সারুর কথা ভেবে হাসার কারণ কী?”
– “হাসতে হয় না, আপনাআপনি হাসি চলে আসে ওর কথা ভাবলে। এই দেখো না, ভাইয়ের অসুস্থতার কথা লুকানোর কারণে সে ও আমাদের কিছু বলবে না বলেছিল, সবকিছু লুকিয়ে যাবে বলেছিল; কিন্তু দেখো, সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে আসার পরেই আরিশার ব্যাপারটা আগে এসে আমাকে বলল।”
জারিফের কথা শুনে মাইশাও মৃদু হাসল—
– “ও এরকমই। তুমি হয়তো আমার থেকেও বেশি চেনো সারুকে, কিন্তু আমি যতটুকু চিনি—ও মনের কথা সহজে কারও সাথে শেয়ার করে না; কিন্তু যাকে একবার আপন ভেবে ফেলে, তার সাথে শেয়ার না করে থাকতেই পারে না। আর সেই কাছের মানুষদের মধ্যে ভাগ্যক্রমে আমার নামটাও চলে এসেছে। আমি অনেক ভাগ্যবতী যে তোমার মতো একজন হাজবেন্ড পেয়েছি, আর সারু ও আরিশার মতো বেস্ট ফ্রেন্ড পেয়েছি।”
মাইশার কথা শুনে জারিফ মাইশার কাঁধ জড়িয়ে ধরল। কপালে একটা আদুরে চুমু দিয়ে বলল—
– “অলসো মি টু! আমিও ভীষণ ভাগ্যবান যে আমার জীবনে আমার মাইশুরানি, আমার ফুল আর সাফওয়ান ভাই তোমরা আছ। তোমাদের ঘিরেই তো আমার পুরো জীবন।”
দুজনে এবার গাড়িতে বসে নিজেদের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
~~~~~~~~~~~~
আরাভ অফিস শেষ করে মাত্র বাড়িতে এসেছে। নিজের রুমের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল সায়রা খাটে বসে আছে, ‘স্নো’-কে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ফোনে কথা বলছে। কারও পায়ের আওয়াজ পেয়ে সায়রা মাথা ঘুরিয়ে দেখল স্যুট হাতে দাঁড়িয়ে আছে আরাভ। আরাভকে দেখামাত্রই সায়রা ফোন কেটে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে আরাভের গলা জড়িয়ে ধরল। আরাভ আচমকা ধাক্কায় দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল, তবে সায়রাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল না। আরাভকে জড়িয়ে ধরতে না দেখে সায়রা আরাভের গলায় মুখ গুঁজে দেওয়া অবস্থাতেই অভিমানী সুরে বলল—
– “মিস্টার শাহরিয়ার, জড়িয়ে ধরছেন না কেন?”
সায়রার সেই মিনমিন কণ্ঠস্বর শুনে আরাভ সূক্ষ্ম হেসে বলল—
– “আইরি, আমি বাইরে থেকে এসেছি, দেখো ঘামে পুরো ভিজে গেছি। জীবাণু ছড়াবে, ছাড়ো আমাকে, আমি শাওয়ার নিয়ে আসি!”
কথাটা সায়রার একদম পছন্দ হলো না। সে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আরাভকে। সায়রার সেই জেদ বুঝতে পেরে আরাভ আবার বলল—
– “আইরি ছাড়ো, তোমার গায়েও ঘাম লেগে যাবে।” একটু থেমে সে আবার বলল— “আমি শুনেছি মেয়েরা বর অফিস থেকে আসলে আগে ফ্রেশ হয়ে নিতে বলে; বরের শরীর থেকে নাকি ঘামের স্মেল আসে। তাহলে তুমি এত ব্যতিক্রম কেন?”
– “অন্য মেয়েদের কথা আমি জানি না। আমার আপনার প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ! সেটা পরিপাটি আপনি হোন কিংবা ঘামে ভিজে আসা আপনি—আপনার ঘামযুক্ত শরীরের প্রতিও আমার মারাত্মক আকর্ষণ। তাই সবভাবেই আপনি আমার ভীষণ প্রিয়! এখন চুপচাপ জড়িয়ে ধরুন।”
সায়রার কথা শুনে আরাভের ঠোঁটের কোণে চমৎকার এক হাসি ফুটে উঠল। আরাভ এবার সায়রাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল এবং হাঁটতে হাঁটতে খাটের পাশে চলে এল। সায়রা চুপচাপ আরাভের গলা জড়িয়ে ধরে রইল। সেটা দেখে আরাভ অত্যন্ত নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—
– “আইরি, কী হয়েছে? মন খারাপ?”
– “একটু মন খারাপ, আবার অনেকটা খুশি!”
– “তাহলে আমার আইরি অনেকটা খুশিকে রেখে, একটু মন খারাপকে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে? আচ্ছা এখন বলতো, একটু মন খারাপের কারণ কী? আর অনেকটা খুশিরই বা কারণ কী?”
– “ভাইয়া বিয়ে করেছে!”
সায়রার কথা শুনে আরাভ ক্ষণিকের জন্য চুপ করে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল—
– “এজন্যই কি তোমার মন খারাপ?”
– “নাহ! আমি কি কুটনি ননদিনী হব নাকি যে ভাইয়া বিয়ে করেছে বলে আমি মন খারাপ করব? ভাইয়া বিয়ে করেছে তাতে আমি অনেক খুশি। কিন্তু ভাইয়া কাজী অফিসে গিয়ে ওভাবে কোর্ট ম্যারেজ কেন করল? আমি তো ভাইয়ার বিয়ে ধুমধাম করে দিতে চেয়েছিলাম, অনেক আয়োজন করে, প্রোগ্রাম করে! আমি তো একটু ডান্সও করতে পারলাম না, কোনো আনন্দই করতে পারলাম না।”
সায়রার এমন বাচ্চাদের মতো আফসোস শুনে শব্দ করে হেসে উঠল আরাভ। সে সায়রাকে কোলে নিয়েই খাটের ওপর বসল তারপর বলল—
– “মন খারাপ করে না বউ! প্রয়োজনে তুমি আনন্দ করার জন্য তোমার ভাইকে আবার বিয়ে করাব, তবুও আমার বউ কেন মন খারাপ করে থাকবে? আমার বউ সবসময় হাসিখুশি থাকবে, তার জন্য যা যা করতে হবে—তার বর সব করবে!”

Post a Comment

0 Comments