শশুর_বাড়ির_অপমান

 শশুর_বাড়ির_অপমান

শশুর_বাড়ির_অপমান


ফোনের স্ক্রিনে জ্বলতে থাকা মেসেজটার দিকে আমি স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।
“এখন তোমার পালা চুপ থাকার।”
আমার আঙুল ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
ঘরের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা। বাইরে হালকা বাতাসে গাছের ডাল জানালায় আঘাত করছিল। আর আমার মনে হচ্ছিল, চারপাশের অন্ধকার ধীরে ধীরে আরও কাছে চলে আসছে।
রুখসানা আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে মেসেজ পড়লেন।
তারপর তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“ওরা তোমাকে ভয় দেখাতে চাইছে।”
আমি নিচু গলায় বললাম,
“ইয়াসিন কি সত্যিই মারা গেছে?”
দুই পুলিশ অফিসার একে অপরের দিকে তাকালেন।
তারপর একজন ধীরে বললেন,
“গাড়ির অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু এখনও কোনো মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি।”
আমার বুকের ভেতর ধীরে কাঁপন উঠল।
মানে একটা সম্ভাবনা এখনও আছে।
সে বেঁচেও থাকতে পারে।
হয়তো পালিয়ে গেছে।
হয়তো কেউ তাকে সরিয়ে দিয়েছে।
অথবা…
হয়তো পুরো ঘটনাটাই সাজানো।
রুখসানা অফিসারদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমাদের নিরাপত্তা দরকার।”
অফিসার মাথা নাড়লেন।
“আজ রাত থেকে বাড়ির বাইরে পাহারা থাকবে।”
তারা চলে যাওয়ার পর আমি ধীরে সোফায় বসে পড়লাম।
মাথার ভেতর সবকিছু একসঙ্গে ঘুরছিল।
পাঁচ বছর।
পুরো পাঁচ বছর আমি একটা অভিনয়ের মধ্যে বেঁচে ছিলাম।
আমি ভেবেছিলাম, আমার লড়াই শুধু একটা অপমানজনক পরিবারের বিরুদ্ধে।
কিন্তু এখন বুঝলাম, আমি এমন এক জালের ভেতরে ঢুকে পড়েছি, যেখান থেকে মানুষ সহজে বের হতে পারে না।
রুখসানা ধীরে বললেন,
“তুমি চাইলে এখনও বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারো।”
আমি মাথা তুললাম।
“আর সবকিছু ছেড়ে পালাব?”
তিনি চুপ রইলেন।
আমি ধীরে নিজের পেটের ওপর হাত রাখলাম।
“না। আমি এবার শেষ পর্যন্ত দেখব।”
রুখসানার চোখে প্রথমবার হালকা সম্মান দেখলাম।
পরদিন সকাল।
আকাশ পরিষ্কার।
গত কয়েকদিনের ঝড়বৃষ্টির পর আজ ইতালির আকাশ অস্বাভাবিক শান্ত লাগছিল।
কিন্তু সেই শান্তি আমার ভেতরে ছিল না।
সকালে পুলিশ আবার এলো।
তাদের মুখ আগের চেয়ে বেশি গম্ভীর।
একজন অফিসার বললেন,
“আমরা একটা বিষয় নিশ্চিত হয়েছি।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কী?”
“গাড়িতে বিস্ফোরণটা দুর্ঘটনা ছিল না।”
ঘরের বাতাস যেন থেমে গেল।
আমি ফিসফিস করে বললাম,
“মানে কেউ বোমা বসিয়েছিল?”
অফিসার ধীরে মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ।”
আমার হাত কাঁপতে শুরু করল।
রুখসানা দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন,
“ইয়াসিন কোথায়?”
অফিসার বললেন,
“আমরা এখনও তাকে খুঁজে পাইনি।”
এই কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি জন্মাল।
আমি জানতাম না আমি কী চাই।
সে বেঁচে থাকুক?
নাকি না?
কারণ সবকিছুর পরেও একটা সত্য অস্বীকার করতে পারছিলাম না।
আমি একসময় তাকে ভালোবেসেছিলাম।
খুব বেশি ভালোবেসেছিলাম।
দুপুরের দিকে আমি একা বারান্দায় বসে ছিলাম।
হঠাৎ ফোনে আবার Unknown Number থেকে কল এলো।
আমার বুক কেঁপে উঠল।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রিসিভ করলাম।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর…
ইয়াসিনের গলা।
আমার নিঃশ্বাস থেমে গেল।
“মাহি…”
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
“তুমি বেঁচে আছো?”
সে হালকা হাসল।
কিন্তু সেই হাসির ভেতরে ক্লান্তি ছিল।
“হ্যাঁ।”
আমার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যেতে লাগল।
রাগ।
স্বস্তি।
ঘৃণা।
সব একসঙ্গে।
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম,
“তুমি কোথায়?”
“বলা নিরাপদ না।”
আমি দাঁত চেপে বললাম,
“তুমি আমাকে এই অবস্থায় ফেলেছ!”
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আমি জানি।”
“না, তুমি কিছুই জানো না।”
আমার গলা কেঁপে উঠছিল।
“তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ। আমার বিশ্বাস ভেঙেছ। আমার নামে অপরাধ করেছ। আর এখন বলছ তুমি জানো?”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর সে নিচু গলায় বলল,
“আমি কখনও চাইনি তুমি এতে জড়াও।”
আমি তিক্ত হেসে উঠলাম।
“কিন্তু জড়িয়েছ তো।”
সে ফিসফিস করে বলল,
“কার্লো আমাকে ছাড়বে না।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তুমি তার জন্য কাজ করেছ কেন?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইয়াসিন বলল,
“কারণ আমি লোভী ছিলাম।”
এই প্রথম সে সত্যি কথা বলল।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
সে আবার বলল,
“শুরুতে ভেবেছিলাম শুধু ব্যবসা। পরে বুঝলাম বের হওয়ার রাস্তা নেই।”
আমি ধীরে বললাম,
“আর তাই আমাকে ঢাল বানালে?”
ওপাশে কোনো উত্তর নেই।
এই নীরবতাই তার স্বীকারোক্তি।
আমার চোখ ভিজে উঠছিল।
কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম, যে মানুষটাকে আমি চিনতাম… সে হয়তো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।
ইয়াসিন আবার বলল,
“শোনো, খুব মন দিয়ে শোনো। কার্লো এখন তোমার পেছনেও লাগবে।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কেন?”
“কারণ তোমার কাছে প্রমাণ আছে।”
আমি ধীরে বললাম,
“তুমি কোথায়?”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল।
তারপর বলল,
“আজ রাত আটটায় পুরোনো সেই লেকের পাশে এসো।”
আমি চমকে উঠলাম।
ওই জায়গাটা আমি চিনি।
বিয়ের পর প্রথমবার ইয়াসিন আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল।
শান্ত নীল পানি।
চারপাশে পাহাড়।
সেদিন সে বলেছিল,
“যতদিন বাঁচব, তোমাকে কখনও একা ছাড়ব না।”
আমার বুকের ভেতর ব্যথা উঠল।
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম,
“কেন আসব?”
ইয়াসিন নিচু স্বরে বলল,
“কারণ আমার কাছে সব প্রমাণ আছে।”
কল কেটে গেল।
আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
রুখসানা এসে জিজ্ঞেস করলেন,
“সে কী বলেছে?”
সব শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“তুমি সেখানে যাবে না।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“আমার যেতে হবে।”
“এটা ফাঁদও হতে পারে।”
আমি ধীরে মাথা নাড়লাম।
“হয়তো। কিন্তু এই গল্পের শেষ আমাকে দেখতেই হবে।”
রাত আটটা।
আকাশ কালো হয়ে আছে।
লেকের পাশের রাস্তা ফাঁকা।
দূরে পানির ওপর চাঁদের আলো পড়ছে।
আমি ধীরে গাড়ি থেকে নামলাম।
রুখসানা আর পুলিশ দূরে লুকিয়ে ছিল।
আমি একা সামনে এগোলাম।
হঠাৎ অন্ধকার থেকে ইয়াসিন বেরিয়ে এল।
তার মুখ ক্লান্ত।
চোখের নিচে কালো দাগ।
আগের সেই আত্মবিশ্বাসী মানুষটা যেন আর নেই।
সে ধীরে বলল,
“তুমি এসেছ।”
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম,
“প্রমাণ কোথায়?”
সে একটা কালো ব্যাগ এগিয়ে দিল।
“সব এখানে আছে।”
আমি ব্যাগ নিলাম।
ভেতরে হার্ডড্রাইভ।
ডকুমেন্ট।
ব্যাংক রেকর্ড।
সব।
আমার বুক ধীরে ভারী হয়ে উঠল।
ইয়াসিন নিচু গলায় বলল,
“এগুলো পুলিশকে দিও।”
আমি তাকালাম তার দিকে।
“আর তুমি?”
সে হালকা হাসল।
“আমার জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
হঠাৎ দূরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
ইয়াসিনের মুখের রঙ বদলে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
“ওরা এসে গেছে।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
অন্ধকার রাস্তার দিকে কয়েকটা কালো গাড়ি দ্রুত এগিয়ে আসছিল।
ইয়াসিন হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরল।
“মাহি, দৌড়াও!”
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
“তুমি?”
সে প্রথমবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।
কিন্তু কিছু বলার আগেই সে আমাকে জোরে পেছনে ঠেলে দিল।
ঠিক তখনই গুলির শব্দে পুরো লেক কেঁপে উঠল।
আমি চিৎকার করে উঠলাম।
পুলিশ চারদিক থেকে বেরিয়ে এলো।
চিৎকার।
দৌড়াদৌড়ি।
গুলির শব্দ।
সবকিছু একসঙ্গে মিশে গেল।
আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝখানে আমি দেখলাম ইয়াসিন মাটিতে পড়ে যাচ্ছে।
আমার বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে গেল।
আমি দৌড়ে তার কাছে গেলাম।
তার শার্ট রক্তে ভিজে যাচ্ছে।
সে কষ্টে চোখ খুলল।
আমার হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“আমাদের বাচ্চাটাকে… ভালো রাখো…”
আমার চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল।
আমি কাঁপা গলায় বললাম,
“চুপ করো… কিছু হবে না…”
কিন্তু সে শুধু দুর্বল হেসে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
চারপাশের সব শব্দ তখন দূরে সরে যাচ্ছিল।
আমি শুধু স্থির হয়ে বসে ছিলাম।
যে মানুষটা আমার জীবন ধ্বংস করেছে…
শেষ মুহূর্তে সেই মানুষটাই আমাকে বাঁচিয়ে গেল।
তিন মাস পর।
বাংলাদেশ।
ঢাকার শান্ত এক সকালে আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আমার কোলে ছোট্ট মেয়ে।
তার চোখ ঠিক ইয়াসিনের মতো।
দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসছিল।
ইতালিতে কার্লো ভেন্ত্রি গ্রেপ্তার হয়েছে।
সব সত্য প্রকাশ পেয়েছে।
ইয়াসিনের পরিবার ভেঙে গেছে।
বিলকিস একবার ফোন করেছিলেন।
কাঁদছিলেন।
আমি শুধু বলেছিলাম,
“কিছু ক্ষতি কখনও পুরোপুরি ঠিক হয় না।”
তারপর কল কেটে দিয়েছিলাম।
আজ এতদিন পর আমি শান্ত।
পুরোপুরি সুখী না। কিন্তু শান্ত।
আমি নিচে ঘুমিয়ে থাকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম।
তারপর খুব আস্তে বললাম,
“তোমাকে কখনও কেউ দুর্বল ভাবতে পারবে না।”
দূরে সকালের আলো ধীরে পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ছিল।
আর আমার জীবনের দীর্ঘ অন্ধকার রাতটারও অবশেষে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।

Post a Comment

0 Comments