স্ত্রীর মর্যাদা
"আমি ভাবতাম, আমি নিজের কষ্টের টাকা দিয়ে যে স্বপ্নের বাড়ি গড়েছি সেখানে আমার স্ত্রী রাণীর মতো জীবন কাটাচ্ছে। একদিন কোনো খবর না দিয়ে বাড়ি ফিরে দেখি, আমার টাকা খরচ করে পরিবার ভালো ভালো খাবার খাচ্ছে আর আমার স্ত্রী রান্নাঘরের পেছনে বসে সাদাভাত আর পানির মতো পাতলা ডাল দিয়ে খাচ্ছে। "
পরবাসের জীবনটা বাইরে থেকে দেখতে যতটা ঝলমলে, ভেতরটা ঠিক ততটাই কয়লার মতো কালো আর দমবন্ধ করা। গত সাতটা বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালিতে নিজের ঘাম র**ক্ত জল করা উপার্জনের প্রতিটি টাকা যখন দেশে পাঠাতাম, বুকে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করতাম। আমার প্রতিটা মুহূর্তের একটাই লক্ষ্য ছিল—আমার পরিবার যেন ভালো থাকে, আমার বৃদ্ধ মা-বাবা যেন চিকিৎসার অভাব না পায়, আর আমার আদরের ছোট ভাই-বোন দুটো যেন মাথা উঁচু করে সমাজে চলতে পারে।
আর সবার ওপরে ছিল আমার স্ত্রী, সুমি।
সুমির সাথে বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় আমাকে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। সুমি খুব শান্ত আর ধৈর্যশীল একটা মেয়ে। যাওয়ার সময় ও আমার হাত ধরে কেঁদে বলেছিল, "টাকা-পয়সা দিয়ে কী হবে? আপনি পাশে থাকলেই তো হতো।" আমি ওর মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম, "আর মাত্র কয়েকটা বছর সুমি, একটু কষ্ট করো। একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিই, তারপর বাকি জীবনটা একসাথে রাণীর মতো করে কাটাবো।"
সেই থেকে শুরু। ওভারটাইম, ভাঙা শরীর নিয়ে ডিউটি, আর খেয়ে না খেয়ে টাকা জমানো। প্রতি মাসে যখন দেশে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাতাম, মা ফোনে বলতেন, "বাবা রে, তোর পাঠানো টাকা দিয়ে বাড়ির কাজ ধরলাম। রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি হচ্ছে তোর।" ছোট ভাই রিফাত বলতো, "ভাইয়া, নতুন বাইকটা না কিনলে বন্ধুদের সামনে মুখ দেখানো যাচ্ছিল না, তাই কিনে ফেললাম।" আর সুমি? ও ফোনে শুধু বলতো, "আমি ভালো আছি। আপনি নিজের শরীরের খেয়াল রাখবেন। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবেন।" সুমি কখনো শাড়ি বা গহনার আবদার করেনি। আমি ভাবতাম, আমার সুমি হয়তো আমার মতোই টাকা জমাচ্ছে, আমার স্বপ্নের বাড়িটাকে আগলে রাখছে। ও তো সেই বাড়ির রাণী হবে।
টানা সাত বছর পর, কাউকে কিছু না জানিয়ে হুট করেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। সবাইকে একটা সারপ্রাইজ দেব। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে যখন আমাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, বুকের ভেতরটা তখন আনন্দে কাঁপছিল। সুমি আমাকে দেখে কতটা অবাক হবে, কতটা খুশি হবে—সেটাই ভাবছিলাম সারাপথ।
বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামার মুখে, তখন আমি আমাদের নতুন তৈরি করা তিনতলা ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। সত্যি, মা ঠিকই বলেছিলেন, বাড়িটা দেখতে একদম রাজপ্রাসাদের মতোই হয়েছে। সদর দরজা খোলাই ছিল। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই চোখে পড়ল দামি সোফা সেট, বিশাল বড় অ্যান্ড্রয়েড টিভি, আর এসি চলছে ঝিরঝির করে। সোফায় বসে রিফাত ফোনে গেম খেলছে, আর বোন রিয়া নতুন দামি থ্রি-পিস পরে আয়নার সামনে টিকটক বানাচ্ছে। ডাইনিং টেবিল থেকে মা-বাবার হাসির শব্দ আসছিল।
আমি পা টিপে টিপে ডাইনিং রুমের দিকে এগোলাম। টেবিলে তখন রাজকীয় আয়োজন। বড় বড় রুই মাছের দো পেঁয়াজা, খাসির মাংসের ভুনা আর সুগন্ধি পোলাও। মা বাবাকে বলছেন, "শুনছ, রিফাতের জন্য এবার একটা বড় ঘরের মেয়ে দেখতে হবে। আমাদের এখন যে মর্যাদা, ছোটখাটো পরিবারে তো আর বিয়ে দেওয়া যায় না।" বাবা হেসে মাথা নাড়লেন।
কিন্তু আমার চোখ দুটো পুরো ঘরে শুধু একজনকে খুঁজছিল—আমার সুমি। এই রাজপ্রাসাদের রাণী কোথায়? ডাইনিং টেবিলে ওর জন্য কোনো চেয়ার ফাঁকা নেই, কোনো প্লেটও সাজানো নেই।
হঠাৎ আমার খেয়াল হলো, রান্নাঘরের পেছনের দিক থেকে একটা মৃদু বাসন ধোয়ার শব্দ আসছে। আমি ড্রয়িংরুমের চকমকে আলো আর সুস্বাদু খাবারের সুবাস পেরিয়ে আস্তে আস্তে রান্নাঘরের পেছনের অন্ধকার বারান্দাটার দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখানে কোনো আলো নেই, একটা জীর্ণ জিরো ওয়াটের বাল্ব ধিকধিক করে জ্বলছে।
সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা দেখার জন্য আমি মানসিকভাবে বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলাম না। আমার বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তের মধ্যে চুরমা*র হয়ে গেল।
মেঝেতে একটা প্লাস্টিকের ছেঁড়া বস্তা বিছিয়ে বসে আছে সুমি। ওর পরনে একটা মলিন, কয়েক জায়গায় সেলাই করা সুতির শাড়ি। চুলগুলো উসকোখুসকো। ওর সামনে রাখা একটা অ্যালুমিনিয়ামের থালা। তাতে সামান্য কিছু ঠাণ্ডা শক্ত সাদা ভাত, আর একটা বাটিতে পানির মতো পাতলা ডাল—যাতে কোনো তেলের দাগ পর্যন্ত নেই। আর থালার এক কোণায় পড়ে আছে একটা পোড়া শুকনা মরিচ। সুমি চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ফেলছে আর সেই ডাল দিয়ে মাখিয়ে এক লোকমা ভাত মুখে তুলছে।
আমার চোখের সামনে তখন সাত বছরের প্রবাস জীবনের সমস্ত কষ্ট, তপ্ত বালির গরম, আর রাতের পর রাত জেগে ডিউটি করার স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল। আমি কার জন্য টাকা পাঠিয়েছিলাম? কার সুখের জন্য নিজের যৌবনটা মরুভূমিতে বিলিয়ে দিলাম? আমার উপার্জনের টাকায় পুরো পরিবার পোলাও-মাংস খাচ্ছে, এসি রুমে ঘুমাচ্ছে, আর যে মেয়েটা আমার জন্য নিজের ঘর-সংসার ছেড়ে এই বাড়িতে এলো, সে রান্নাঘরের পেছনে বসে অবহেলিত কুকুরের মতো পাতলা ডাল-ভাত খাচ্ছে!
নিজের অজান্তেই আমার ব্যাগটা হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল। ভারী শব্দে সুমি চমকে পেছনের দিকে তাকাল। অন্ধকার পেরিয়ে যখন ও আমার মুখটা দেখতে পেল, ওর চোখ দুটো বিশ্বাসহীনতায় বড় বড় হয়ে গেল। হাতের ভাতের লোকমাটা হাত থেকে খসে থালায় পড়ে গেল।
"তু... তুমি?!" সুমির গলা দিয়ে শুধু এইটুকু শব্দ বের হলো। ওর চোখ দিয়ে তখন বাঁধভাঙা বন্যা নেমেছে।
আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ডাইনিং রুমের সেই আলো, সেই রাজকীয় খাবার—সবকিছুকে আমার বিষাক্ত মনে হতে লাগল। তীব্র ক্ষোভ, কষ্ট আর স্তব্ধতা নিয়ে আমি সুমির দিকে পা বাড়ালাম।

0 Comments