বিশ্বাস_ভাঙার_মূল্য
আমি কখনো ভাবিনি, একটা নবজাতকের কান্না শোনার আগেই সেটা আমার হৃদয় ভেঙে দিতে পারে।
সেদিন ছিল রবিবার। হাতে একটা গিফট ব্যাগ আর মুখে জোর করে ধরে রাখা হাসি নিয়ে আমি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে পৌঁছেছিলাম। আমার ছোট বোন তানহা সদ্য একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। কয়েক মাস ধরেই সে শিশুটির বাবার পরিচয় গোপন রেখেছিল।
মা বারবার একই কথা বলতেন
“এখন বিচার করার সময় না।”
“তানহা এখন খুব ভেঙে পড়েছে।”
“পরিবার সবসময় পরিবারের পাশে থাকে।”
আর সবসময়কার মতো আমিও পাশে থেকেছি।
আমি শিশুটির জন্য কিনেছিলাম নরম সূচিকর্ম করা একটা কম্বল, সুন্দর কাঠের একটা বেবি কট, আর ছোট্ট একটা জামা, যার ওপর লেখা ছিল
“আমার প্রথম আদর।”
আমার কাছে এটা শুধু উপহার ছিল না।
এটা ছিল সম্পর্ক ঠিক করার শেষ চেষ্টা।
একটা আশা।
সেই বোনটার আরও একটু কাছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, যে সবসময় এমন দূরত্ব বজায় রাখত যেন আমি সারাজীবন তার ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করি।
আমার স্বামী, মিস্টার ইয়াসিন, বলেছিলেন তিনি আসতে পারবেন না। সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই ঠিক করতে করতে তিনি আমার কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন—
“আজ গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। তানহাকে বলো, আমি ওর জন্য দোয়া করছি।”
আমি হেসে মাথা নেড়েছিলাম। তখনও বুঝিনি, কয়েক ঘণ্টা পর সেই কথাগুলোই আমার বুকের ভেতর বিষ হয়ে জমবে।
হাসপাতালজুড়ে ছিল জীবাণুনাশকের গন্ধ, কফির গন্ধ আর ফুলের মিষ্টি সুবাস। মাতৃত্ব বিভাগে চারদিকে আত্মীয়স্বজনের ব্যস্ততা, নরম পায়ে হাঁটা নার্স, আর নতুন জীবনের উচ্ছ্বাস।
আমি রিসেপশন থেকে তানহার কেবিন নম্বর জেনে করিডোর দিয়ে হাঁটছিলাম। চেষ্টা করছিলাম মন থেকে খুশি হতে।
আমি তাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম।
শিশুটিকে কোলে নিতে চেয়েছিলাম।
বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম, যদিও বছরের পর বছর নিঃসন্তান থাকার কষ্ট আমাদের দাম্পত্যকে দুর্বল করে দিয়েছে, তবুও আমার একটা পরিবার আছে।
তারপর আমি মিস্টার ইয়াসিনের কণ্ঠ শুনলাম।
আমি থেমে গেলাম।
প্রথমে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করলাম—
হয়তো ভুল শুনেছি।
হয়তো মিটিং শেষ করে তিনি চলে এসেছেন।
হয়তো আমাকে চমকে দিতে চেয়েছেন।
হয়তো জীবনে একবার হলেও আমি তার কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম।
তারপর তিনি হেসে উঠলেন।
“রুপালী কিছুই টের পায়নি,” তিনি বললেন। “বেচারি এখনও ভাবে আমি অফিসে আছি। যতদিন ও ক্রেডিট কার্ড আর গুলশানের ফ্ল্যাটের খরচ দিচ্ছে, ততদিন ওকে কিছু না জানানোই ভালো।”
আমার মনে হলো মাটিটা যেন পায়ের নিচ থেকে সরে গেল।
আমি ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগোলাম।
তানহার কেবিনের দরজা সামান্য ফাঁকা ছিল।
আমি ভেতরে ঢুকিনি।
শ্বাস নিতেও ভয় হচ্ছিল।
তারপর মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল।
শান্ত।
ঠান্ডা। নির্লিপ্ত।
“ওকে নিয়ে মাথা ঘামিও না। অন্তত কোনো একটা কাজে তো লাগে। তুমি আর তানহা সুখ পাওয়ার যোগ্য। রুপালী সবসময়ই কঠিন স্বভাবের ছিল। ঠান্ডা মনের। কাউকে সন্তান পর্যন্ত দিতে পারেনি।”
আমার হাত থেকে গিফট ব্যাগটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তারপর তানহা হালকা হেসে বলল
“ধন্যবাদ, মা। মিস্টার ইয়াসিন প্রোমোশন পেলেই রুপালীকে ডিভোর্স দেবে। তখন আমরা সত্যিকারের পরিবার হতে পারব। বাচ্চাটাকে দেখলেই বোঝা যায়, ও একদম বাবার মতো হয়েছে।”
মিস্টার ইয়াসিন এমন গর্ব নিয়ে বললেন, যা আমি কোনোদিন নিজের জন্য তার কণ্ঠে শুনিনি—
“আমার ছেলে আমার নাম বহন করবে। আর রুপালী এটা মেনে নেবে। সে সবসময় সবকিছু মেনে নেয়।”
আমি প্রথমে রাগ অনুভব করিনি।
আমি সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছিলাম।
মনে হচ্ছিল কেউ আমার বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ছয় বছরের সংসার, প্রতিটা প্রতিশ্রুতি, প্রতিটা পারিবারিক মুহূর্ত, প্রতিটা ডাক্তার দেখানো, আর প্রতিটা রাতের নীরব কান্না টেনে বের করে নিয়েছে।
যে মানুষটার পাশে আমি ভেঙে পড়েছি, সে গোপনে আমার নিজের বোনের সঙ্গে আরেকটা জীবন গড়ে তুলছিল।
আমি দরজা খুলিনি।
চিৎকার করিনি।
গিফট ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলিনি।
শুধু এক পা পিছিয়ে এলাম।
তারপর আরেক পা।
তারপর করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলাম, যেন আমার শরীরটা আর আমার নিজের না।
লিফটের স্টিলের দরজায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলাম।
ফ্যাকাসে মুখ।
শুকনো চোখ। নীরব ঠোঁট।
দেখতে শান্ত লাগছিল।
কিন্তু ভেতরে কিছু একটা মারা গিয়েছিল।
আর কিছু একটা জেগে উঠেছিল।
পার্কিং লটে গিয়ে গাড়িতে বসে আমি নীল কম্বলটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। নির্দোষ একটা শিশুর জন্য ভালোবাসা দিয়ে কিনেছিলাম সেটা।
শিশুটার কোনো দোষ ছিল না।
কিন্তু বড়দের ছিল।
আমি গাড়ি স্টার্ট দিলাম, কিন্তু বাসায় ফিরলাম না। কাছের একটা কফি শপে গিয়ে গাড়ি থামালাম, মোবাইলে ব্যাংকিং অ্যাপ খুললাম, আর খুঁজতে শুরু করলাম।
অনেক দিন ধরেই কিছু অদ্ভুত খরচ চোখে পড়ছিল।
প্রাইভেট ক্লিনিকের বিল।
রাইড শেয়ার পেমেন্ট।
শিশুর আসবাবপত্র, যেগুলো মিস্টার ইয়াসিন “অফিসের গিফট” বলেছিলেন।
এখন সব পরিষ্কার হয়ে গেল।
তানহার অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার।
প্রেগন্যান্সির চিকিৎসা খরচ।
দামি বেবি স্ট্রলার।
গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট—যার ভাড়া দেওয়া হচ্ছিল আমাদের যৌথ অ্যাকাউন্ট থেকে, যেখানে বেশিরভাগ টাকাই ছিল আমার চাকরির বোনাস।
তারপর সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসটা পেলাম।
একটা লিজিং অফিসের ইমেইল, যেখানে আমার নাম ব্যবহার করে ডিজিটাল সিগনেচার দেওয়া হয়েছে।
মিস্টার ইয়াসিন শুধু আমাকে প্রতারণাই করেননি।
তিনি আমার পরিচয় জাল করে তাদের নতুন জীবন গড়ার খরচ চালিয়েছেন।
এটা শুধু পরকীয়া ছিল না।
এটা ছিল আমার টাকা আর আমার পরিচয় ব্যবহার করে গড়ে তোলা একটা পরিবার।
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম, যতক্ষণ না আমার হাত কাঁপা বন্ধ হলো। তারপর সবকিছু ডাউনলোড করলাম।
স্ক্রিনশট।
ব্যাংক ট্রান্সফার। স্টেটমেন্ট। আইপি রেকর্ড।
সব ফাইল একটা ফোল্ডারে জমা করলাম।
ফোল্ডারের নাম দিলাম “প্রমাণ”
তারপর আমি ফোন করলাম একমাত্র মানুষটাকে, যাকে এখনও বিশ্বাস করতাম।
“নাদিয়া…” ফোন ধরতেই বললাম।
নাদিয়া ছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। এখন সে ঢাকার অন্যতম দক্ষ ডিভোর্স আইনজীবী।
“রুপালী? কী হয়েছে? তোমাকে অদ্ভুত শান্ত লাগছে।”
“আমার ডিভোর্স চাই,” আমি বললাম। “আর আমি এটা সঠিকভাবে করতে চাই।”
দুই ঘণ্টা পর নাদিয়া আমার ডাইনিং টেবিলের ওপারে বসে ছিল, আর আমি সব খুলে বলছিলাম।
হাসপাতালের করিডোর।
মিস্টার ইয়াসিনের কণ্ঠ।
মায়ের বিশ্বাসঘাতকতা।
তানহার হাসি।
জাল সিগনেচার। টাকা। অপমান।
নাদিয়া একবারও বাধা দিল না। সব শুনে সে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল। এটা শুধু প্রতারণা না, রুপালী, সে বলল। এটা জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, আর পরিকল্পিতভাবে তোমাকে ব্যবহার করে অন্য জীবন গড়ার চেষ্টা।
“আমি বের হয়ে যেতে চাই,” আমি ফিসফিস করে বললাম।
নাদিয়া আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল তাহলে এখনই ওদের মুখোমুখি হবে না।
ওকে ভাবতে দাও তুমি কিছুই জানো না। অহংকারী মানুষরা সবচেয়ে বেশি ভুল করে তখনই, যখন তারা ভাবে কেউ তাদের দেখছে না। তুমি এখন ভাঙা স্ত্রী নও, রুপালী। তুমি এখন ওদের হিসাবের শেষ অধ্যায়।”
