তিন_মাসের_নীরব_প্রতারণা
“তুমি ভুল মানুষকে দুর্বল ভাবছিলে।”
কথাটা আমি এত আস্তে বলেছিলাম যে ঘরের বাতাসও হয়তো পুরোটা শুনতে পায়নি। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল আমার ভেতরের ভীতু, অসহায় নারীটা ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। তার জায়গায় জন্ম নিচ্ছে অন্য কেউ। এমন একজন, যে আর শুধু বাঁচতে চায় না। সত্যিটা সামনে আনতে চায়।
মিস্টার ইয়াসিন তখনও ঘুমিয়ে ছিল। তার মুখে অদ্ভুত শান্তি। অথচ সেই মানুষটাই গত তিন মাস ধরে আমাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দিয়েছে। আমার স্মৃতি, আমার শরীর, আমার আত্মবিশ্বাস—সবকিছু একটু একটু করে কেড়ে নিয়েছে।
আমি বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় চলে গেলাম।
রাত অনেক গভীর। দূরের রাস্তার বাতিগুলো ঝাপসা লাগছিল। ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই হঠাৎ আমার চোখ ভিজে উঠল।
আমি কাঁদছিলাম না শুধু প্রতারণার জন্য।
আমি কাঁদছিলাম কারণ আমি তাকে সত্যি সত্যিই ভালোবেসেছিলাম।
আমাদের বিয়ের প্রথম দিকের দিনগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গেল। তখন আমার দোকান ছোট ছিল। ঈদের আগে কাজের চাপ সামলাতে পারতাম না। মিস্টার ইয়াসিন রাত জেগে কাপড় গুছিয়ে দিত। আমি ক্লান্ত হয়ে গেলে রান্না করত। দোকান থেকে ফেরার পথে আমার পছন্দের জিলাপি নিয়ে আসত।
আমি ভেবেছিলাম এই মানুষটার হাত ধরে বুড়ো হব।
কখন সেই মানুষটা বদলে গেল?
নাকি সে কখনোই বদলায়নি?
হয়তো আমি শুধু চিনতে পারিনি।
ভোরের দিকে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম।
এখন থেকে আমি শুধু তার ওপর নজর রাখব না। আমি প্রতিটা প্রমাণ জমা করব।
কারণ যদি একদিন আমাকে সত্যিই পাগল প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে আমার হাতে সত্য দরকার।
সেই সকাল থেকেই আমি নতুনভাবে সব শুরু করলাম।
আমি ফোনের গোপন ফোল্ডারে সব ছবি, স্ক্রিনশট আর নোট জমাতে লাগলাম। মিস্টার ইয়াসিন কখন চা বানায়, কখন ফোনে কথা বলে, কখন বাইরে যায়—সব লিখে রাখতাম।
আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি কাপ বদলানো বন্ধ করলাম না।
বরং আরও সতর্ক হয়ে গেলাম।
কারণ আমি বুঝে গিয়েছিলাম, এই মানুষটা নিজের ফাঁদেই ধীরে ধীরে আটকা পড়ছে।
পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যে তার পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
একদিন সকালে সে দোকানের চাবি খুঁজে পাচ্ছিল না। পুরো বাড়ি তছনছ করে ফেলল। পরে দেখা গেল চাবিটা তার নিজের পকেটেই।
আরেকদিন দুপুরে সে আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করল, “আজ কি শুক্রবার?”
আমি চুপ করে কয়েক সেকেন্ড তার গলা শুনছিলাম।
তার কণ্ঠে বিভ্রান্তি ছিল।
ঠিক সেই একই বিভ্রান্তি, যা আমি গত তিন মাস ধরে অনুভব করেছি।
আমি ধীরে বললাম, “আজ সোমবার।”
ওপাশে নীরবতা।
তারপর সে ফোন কেটে দিল।
সেই রাতে আমি তাকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। অনেকক্ষণ ধরে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
আমি রান্নাঘর থেকে দেখছিলাম।
হঠাৎ সে বলল, “নীলা।”
“হুম?”
“তোমার কি কখনো মনে হয় তুমি কিছু ভুলে যাচ্ছ?”
আমার হাতের কাপটা থেমে গেল।
সে ধীরে ধীরে আমার দিকে ফিরল।
তার চোখের নিচে ক্লান্তির দাগ।
“কখনো কখনো আমার মনে হচ্ছে মাথার ভেতর কুয়াশা জমে আছে।”
আমি ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলাম।
কারণ এই একই কথাটা আমি একদিন তাকে বলেছিলাম।
আর সে তখন আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল, “তুমি শুধু ক্লান্ত।”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “হয়তো তোমার বিশ্রাম দরকার।”
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, সে এখন নিজের শরীর নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেছে।
আর সেই সন্দেহই তাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেবে।
কিন্তু এরপর এমন কিছু ঘটল, যা আমি কল্পনাও করিনি।
দুই দিন পর দুপুরে দোকানে কাজ করছিলাম। হঠাৎ একটা কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে এলো এক মহিলা।
আমার বুক ধক করে উঠল।
আমি তাকে ছবিতে দেখেছি।
সাবিহা ইয়াসমিন।
সে ধীরে ধীরে দোকানের ভেতরে ঢুকল। তার পরনে দামি শাড়ি। চোখে কালো চশমা। ঠোঁটে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসী হাসি।
আমি সেলাই মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
সে চারপাশে তাকিয়ে বলল, “আপনিই নীলা?”
আমি মাথা নাড়লাম।
সে হাসল।
“আমি ইয়াসিনের অফিস থেকে এসেছি।”
মিথ্যা।
আমি বুঝে গিয়েছিলাম।
তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম।
“বসুন।”
সে ধীরে ধীরে চেয়ারে বসল। তারপর আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমাকে মাপছে।
“আপনাকে দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে না।”
আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
“মানে?”
সে হালকা হেসে বলল, “ইয়াসিন বলেছিল আপনার স্মৃতির সমস্যা হচ্ছে।”
আমি কিছু বললাম না।
সে আরও ঝুঁকে এলো।
“আপনি কি কখনো ভেবেছেন, মানুষ হঠাৎ করে এত ভুলোমনা হয়ে যায় কেন?”
তার চোখের ভেতর কিছু একটা ছিল। বিদ্রূপ? সতর্কতা? নাকি হুমকি?
আমি খুব ধীরে বললাম, “সব মানুষ একরকম না।”
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
“সেটা ঠিক।”
তারপর উঠে দাঁড়াল।
বের হওয়ার আগে থেমে বলল, “নিজের খেয়াল রাখবেন।”
মহিলাটা চলে যাওয়ার পরও আমি অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আমার হাত কাঁপছিল।
সে কেন এসেছিল?
আমাকে ভয় দেখাতে?
নাকি দেখতে আমি কতটা জানি?
সেই রাতে বাড়ি ফিরে আমি মিস্টার ইয়াসিনকে কিছুই বললাম না। বরং আগের মতোই আচরণ করলাম।
কিন্তু রাত গভীর হলে আমি তার ফোন আবার চেক করলাম।
নতুন মেসেজ।
সাবিহা লিখেছে,
“আজ তাকে দেখে মনে হলো কিছু একটা বুঝেছে।”
ইয়াসিনের উত্তর,
“অসম্ভব। ও এত বুদ্ধিমান না।”
আমার ভেতরটা হঠাৎ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি অনেক অপমান সহ্য করেছি জীবনে। কিন্তু সেই মুহূর্তে বুঝলাম, এই মানুষটা শুধু আমাকে ব্যবহার করেনি।
সে আমাকে তুচ্ছও করেছে।
আমি ফোনটা নামিয়ে রাখলাম।
আর তখনই হঠাৎ একটা জিনিস খেয়াল করলাম।
ফোনের ফাইল সেকশনে একটা অডিও রেকর্ডিং।
আমার বুক ধুকপুক করতে লাগল।
আমি প্লে করলাম।
প্রথমে ঝাপসা শব্দ। তারপর মিস্টার ইয়াসিনের গলা।
“ডোজটা ধীরে বাড়াতে হবে। যেন কেউ সন্দেহ না করে।”
তারপর একজন পুরুষের গলা।
“বেশি দিলে বিপদ হবে।”
ইয়াসিন হাসল।
“ওকে পাগল প্রমাণ করতে পারলেই হবে। তখন সব সম্পত্তি আমার নামে চলে আসবে।”
আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি ফোন শক্ত করে ধরে বসে রইলাম।
প্রতিটা শব্দ আমার মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো বাজছিল।
সে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছিল না শুধু।
সে চেয়েছিল সবাই বিশ্বাস করুক আমি মানসিকভাবে অসুস্থ।
যেন আমি নিজের কথাও প্রমাণ করতে না পারি।
আমার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল।
আমি ধীরে ধীরে মাথা তুলে তার দিকে তাকালাম।
সে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে আছে।
এত শান্ত।
এত স্বাভাবিক।
আমি জীবনে প্রথমবার সত্যিকারের ঘৃণা অনুভব করলাম।
পরদিন সকালে সে দেরিতে ঘুম থেকে উঠল। চোখ লাল। মুখ ক্লান্ত।
আমি নাস্তা দিচ্ছিলাম।
হঠাৎ সে থেমে বলল, “কাল রাতে আমার ফোন কি তুমি ধরেছিলে?”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
তবুও আমি শান্ত রইলাম।
“না তো।”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল, “আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাকে নজর রাখছে।”
আমি মাথা নিচু করলাম যাতে সে আমার চোখ দেখতে না পারে।
কারণ সেই মুহূর্তে আমার ঠোঁটের কোণে হাসি চলে এসেছিল।
সেদিন বিকেলে আমি প্রথমবার একজন আইনজীবীর কাছে গেলাম।
পুরোনো পরিচিত। আমার বাবার বন্ধুর ছেলে।
আমি তাকে সব বলিনি। শুধু কিছু কাগজ দেখালাম। ব্যাংক স্টেটমেন্ট। জমির নথির কপি। কয়েকটা স্ক্রিনশট।
তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“আপনি সাবধানে থাকবেন। মানুষ টাকা আর সম্পত্তির জন্য অনেক নিচে নামতে পারে।”
আমি ধীরে বললাম, “আমি যদি প্রমাণ দিতে পারি?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“তাহলে তাকে থামানো যাবে।”
বাড়ি ফেরার পথে আমার মনে হচ্ছিল অনেকদিন পর আমি আবার শ্বাস নিতে পারছি।
কারণ এখন আমি একা নই।
আমার হাতে সত্য আছে।
আর সেই সত্য ধীরে ধীরে মিস্টার ইয়াসিনের চারপাশে ফাঁসের মতো শক্ত হয়ে আসছে।
কিন্তু আমি তখনও জানতাম না, সবচেয়ে বড় আঘাতটা এখনো বাকি।
সেই রাতেই সব বদলে গেল।
রাত প্রায় দুইটা।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি বিছানার পাশ খালি।
মিস্টার ইয়াসিন নেই।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। বারান্দা ফাঁকা। রান্নাঘরও না।
তারপর নিচতলা থেকে শব্দ পেলাম।
আমাদের স্টোররুম।
আমি আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম।
দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না।
ফাঁক দিয়ে আলো বের হচ্ছিল।
আমি নিঃশব্দে কাছে গেলাম।
আর তারপর যা শুনলাম, তা আমার পুরো পৃথিবী আবার কাঁপিয়ে দিল।
সাবিহার গলা।
“আর দেরি করা যাবে না।”
ইয়াসিন নিচু স্বরে বলল,
“আর কয়েকদিন। ও এখন দুর্বল হয়ে গেছে।”
“যদি সব মনে পড়ে যায়?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মিস্টার ইয়াসিন খুব ঠান্ডা গলায় বলল,
“তাহলে শেষ উপায় ব্যবহার করতে হবে।”
আমার শরীর জমে গেল।
সাবিহা ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি নিশ্চিত?”
আর তারপর যে উত্তরটা এলো, সেটা শুনে আমার হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“প্রয়োজন হলে নীলাকে বাঁচিয়ে রাখার দরকার নেই।”
