শূন্যতা_ছুঁয়ে_পূর্ণতা
-“শুনেছি মিসেস কারহানের জমজ বাচ্চা ছিলো কিন্তু এক্সিডেন্টের ফলে ছেলে সন্তানটা মা’রা গেছে!”
ফিসফিসিয়ে আসা শব্দ গুলো চীনা পুরুষের কর্ণগোচর হলো ঠিকই কিন্তু তার পদযুগল থামল না। রিদের স্ট্রেচারের পিছন পিছন পিছন উন্মাদের মতো ছুটছে শুভ্র বর্ণের চীনা পুরুষ। স্ট্রেচারের ওপর শায়িত রিদের ছোট্ট, নিথর অবয়ব। ওর ক্ষুদ্র নাসিকার ওপর চেপে বসা অক্সিজেন মাস্কটি প্রতি লহমায় কৃত্রিম বাষ্পে ঝাপসা হয়ে উঠছে, যা প্রমাণ দিচ্ছে—হৃদয়ের স্পন্দনটুকু এখনো পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়নি। তাযিনের সুঠাম, দীর্ঘ অবয়ব পাগলের ন্যায় ছুটে চলছে স্ট্রেচাররের সমান্তরালে। এলেক্স স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল এটা ভেবে যে তাযিন হয়তো তার অনাগত সন্তানের নির্মম দশা সম্পর্কে অবাগত নয় কিন্তু তারা জানলো না তাদের প্রিয় বন্ধু নিজের অংশের মৃ’ত্যু শোনার পরও ছুটে চলেছে তার বুকের ধন,রক্তের নাহয়েও অতি আপন,আত্মার আত্মীয় তাকে প্রথম পিতৃত্বের স্বাদ দেওয়া সন্তানের পিছনে। চার মাসের সেই প্রস্ফুটিত হওয়ার পূর্বেই ঝরে যাওয়া ভ্রূণটির শোক যদি সে এই মুহূর্তে ব্যক্ত করতে পারতো তাহলে হয়তো উপস্থিত সবাই এক অসহায়, অভাগার পিতার আহাজারি দেখে স্তব্ধ হয়ে যেত। কিন্তু চীনা পুরুষ পারল না নিজের যন্ত্রণা ব্যক্ত করতে তার কাছে যেন অনাগত সন্তানের থেকে বুকের সন্তানই বেশি গুরুত্ব পেল।
হাসপাতালের ওটি-র ভারী, নিস্পন্দ ধাতব দরজার সম্মুখে আসতেই স্ট্রেচারের গতি শিথিল হয়ে আসে, দরজার মুখোমুখি হতেই প্যারামেডিকদের পদযুগলসহ স্ট্রেচার এর ঘুর্নায়মান চাকা থেমে যায়। মুহূর্তের মধ্যে চিকিৎসকদের একটি দল ক্ষিপ্রহস্তে স্ট্রেচারটিকে ভেতরের অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। অবুঝ রিদের অসাড় অবয়ব যখন তাযিনের দৃষ্টিসীমানা অতিক্রম করে এক অলীক যবনিকাপাতের দিকে অগ্রসর হতে চাইল, ঠিক তখনই চীনা পুরুষের ভেতরের সমস্ত সংযমের শেষ প্রাচীরটি এক লহমায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। এক লাফে গিয়ে স্ট্রেচারের লোহার রেলিংটি নিজের রক্তাক্ত দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার ধবধবে শুভ্র কপালে ফুটে ওঠা নীল শিরাগুলো ক্রোধে ও তীব্র আশঙ্কায় দপদপ করছে। উন্মাদের মতো মাথা নাড়াতে নাড়াতে কর্কশ ও অবরুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল তাযিন:
-“না! ওকে ভেতরে নিয়ে যেও না! আমি আমার ছেলেকে কোথাও যেতে দেব না! রিদ... মাই বয়, ড্যাডার হাতটা ধরো!”
ডাক্তারদের একজন অত্যন্ত গম্ভীর ও পেশাদারী কণ্ঠে তাযিনকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে বললেন, -"মিস্টার কারহান, শান্ত হোন! পেশেন্টের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক, আমাদের এখনই ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হবে। প্লিজ ওটি-র দরজাটা ছাড়ুন!"
কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক যুক্তি আর নিয়মের শৃঙ্খল আজ এক ব্যাকুল পিতার অবশ মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।চীনা পুরুষের আঁখিদ্বয় বেয়ে তপ্ত অশ্রুধারা অনবরত ঝরে পড়ছে, সে এক চুল পরিমাণও নিজের জায়গা থেকে নড়তে রাজি নয়। স্ট্রেচারটিকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে অবুঝ বালকের মতো অনুনয় করতে লাগল:
-“এলেক্স! কাই! তোরা ডাক্তারদের বারণ কর! ওরা আমার বাডিকে আমার থেকে আলাদা করে দিচ্ছে রে! ও একা অন্ধকার ঘরে ভয় পাবে! ও একা ঘুমাতে পারে না!”
পরিস্থিতির এই ভয়াবহ রূপ এবং তাযিনের এমন অভূতপূর্ব পাগলামি অবলোকন করে এলেক্স আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ করল না। সে ভালো করেই জানে, এই ক্ষণিক বিলম্বই হয়তো রিদের জীবনের শেষ আলোটুকুকে চিরতরে নিভিয়ে দিতে পারে। এলেক্স নিজের চোখের জলকে চোখের কোণেই শক্ত পাথরে রূপান্তর করে কাইয়ের দিকে তাকিয়ে তীব্র কণ্ঠে আদেশ দিল, -"কাই, ধর ওকে! যেকোনো উপায়ে ওটি-র দরজা থেকে সরিয়ে আন!"
আজ্ঞা শোনামাত্রই কাই এবং এলেক্স দুজনে মিলে তাদের সমস্ত শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে প্রিয় বন্ধুর দীর্ঘ অবয়বটিকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। চারপাশের ঠান্ডা নিওন আলোর নিচে শুরু হলো এক নির্মম ও অসম যুদ্ধ—একদিকে দুই পরম বন্ধুর সুরক্ষার প্রাচীর, অন্যদিকে এক নিঃস্ব পিতার হারানো পৃথিবী ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুলতা। তাযিন তার সর্বশক্তি দিয়ে সেই লৌহকঠিন বাঁধন ছিন্ন করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে দুই পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে লাগল। সেই সুযোগে চিকিৎসক’রা স্ট্রেচার ভিতরে টেনে নিয়ে ও’টির দরজা বন্ধ করে দিলো। তৎক্ষনাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল চীনা পুরুষ :-
-“কাই, ছেড়ে দে আমাকে! এলেক্স, তোরা আমার সাথে বেইমানি করলি! আমার ছেলেটাকে ওরা কেড়ে নিল! আমি ম’রে যাবো ভাই, আমার রিদের কিছু হলে আমি ম’রে যাবো!”
তার বলিষ্ঠ দেহ ক্রমশই অবশ ও নিস্তেজ হয়ে আসে। দুই বন্ধুর বাহুর ঘেরাটোপের মাঝেই সে ধীরে ধীরে হসপিটালের হিমশীতল মেঝেতে হাঁটু গেড়ে ধপাস করে বসে পড়ল। তার শূন্য দুটি হাত অবাধ্যভাবে ওটি-র রুদ্ধ দরজার দিকে প্রসারিত হয়ে রইল, যেন সেই বন্ধ দরজার ওপারেই আটকে রয়েছে তার জীবনের সমস্ত শূন্যতা আর পূর্ণতার শেষ সমীকরণ।
—-----
দেখতে দেখতে সময়ের চাকা ঘূর্ণায়মান গতিতে প্রায় তিন-তিনটি ঘণ্টা অতিক্রম করে গেল। হাসপাতালের দীর্ঘ, রুগ্ন করিডোরে নিওন আলোর ফ্যাকাশে আভা এক বিষাদময় চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ওটি-র বন্ধ প্রবেশদ্বারের সম্মুখে পাথরের মূর্তির ন্যায় নিস্পন্দ হয়ে বসে আছে কারহান তাযিন। তার সেই অতি শুভ্র কান্তিতে এখন আর কোনো চঞ্চলতা নেই, নেই কোনো উন্মত্ত হাহাকার; কেবল এক অলৌকিক, ভয়ানক শান্ত রূপ ধারণ করে সে চেয়ে আছে রুদ্ধ দরজার দিকে। তার বাম পাশে এক বুক উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এলেক্স ও কাই। সায়র করিডোরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
কিছুক্ষণ পূর্বেই তটিনীর জ্ঞান ফিরেছে কিন্তু ঘন ঘন হওয়া প্যানিক এট্যাকের ফলে মেয়েটা এখনো বিছানায় পরে আছে, প্রিয় সখির এই অবস্থা যেন তাকে পাগলপ্রায় করে তুলেছে। জিমিন, মিরিন ও বয়োবৃদ্ধ দম্পতির শারীরিক অবস্থা পূর্বের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল ও আশঙ্কামুক্ত। কিন্তু এই সুখবরটুকুও করিডোরে উপস্থিত পুরুষদের চিত্তে স্বস্তির প্রলেপ দিতে সক্ষম হলো না।ঠিক তখনই টালমাটাল পায়ে করিডোরের অন্ধকার কোণ থেকে ছুটে এলো ইরিনা। কিছুক্ষণ আগেই তার সংজ্ঞা ফিরেছে, কিন্তু বন্ধুদের আশঙ্কাজনক অবস্থার কথা স্মরণ হতেই নিজের দুর্বল শরীরকে উপেক্ষা করে সে উন্মাদের মতো ধাবিত হয়েছে এখানে। তাযিনের এই নিষ্পলক, অসাড় অবয়ব এবং পুরো পরিবারের এই বিধ্বস্ত দশা অবলোকন করা মাত্রই ইরিনার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে তাযিনের এই পাথর হয়ে যাওয়া রূপ দেখে অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। তাযিনের পাশে বসে থাকা এলেক্স ও কাইয়ের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল ও আশঙ্কাজনক কণ্ঠে অস্ফুটে বলে উঠল:
-“এলেক্স কে.টি এভাবে কেন বসে আছে? রিদ ভালো আছে তো?”
এলেক্স প্রিয় বন্ধুর উৎকন্ঠা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তাদের কারোরই কারো সাথে রক্তের সম্পর্ক নেই তবুও কতো টান, একেই হয়তো বন্ধুত্ব বলে। তারা সবাই এক চমৎকার বন্ধনে আবদ্ধ তা হলো বন্ধুত্ব। সায়র ইরিনার মাথায় হাত বুলিয়ে, টেনে এনে পাশে বসিয়ে বলল:
-“তোর নিজের অবস্থাও ভালো না, চিন্তা করিস না আমাদের রিদ ঠিক হয়ে যাবে। নিজের পুচকে দুটোর খেয়াল রাখ, বেডি চিন্তায় তোর কিছু হয়ে গেলে জিমিন কে কি জবাব দিবো আমরা?”
সায়রের আশ্বস্তকারী বাক্যগুলো বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বেই করিডোরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। ইরিনা অশ্রুভেজা নয়নে ওটি-র সেই বন্ধ ভারী দরজার দিকে তাকাল। গর্ভস্থ দুটি প্রাণের অস্তিত্ব যেখানে তাকে প্রতিনিয়ত মাতৃত্বের মায়ায় ব্যাকুল করে তোলে, সেখানে প্রিয় সখির কোল খালি হওয়া এবং ছোট্ট রিদের এই জীবন-মৃত্যুর ক্রান্তিলগ্ন তার অবলা চিত্তকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। সায়রের সান্ত্বনা তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করলেও মনের গহীনের অস্থিরতা যেন বিন্দুমাত্র হ্রাস পেল না। সে অতি ক্ষীণ ও কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল:
-“কীভাবে শান্ত হব সায়র? সব তো ঠিকই চলছিল ইয়ার এসব কেন হচ্ছে আমাদের সাথে?আল্লাহ কেন আমাদের সাথে এমন করলেন?”
ইরিনার রোদনভরা আকুলতা করিডোরের দেয়ালে দেয়ালে এক করুণ প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল। কাই ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সায়রের পাশে দাঁড়াল। তার সুঠাম অবয়বে এতক্ষণের জমাটবদ্ধ কাঠিন্য ভেদ করে এক সুগভীর ক্লান্তির রেখা ফুটে উঠেছে। জীবনের এই চরম দুর্দিনে যেখানে প্রতিটি পুরুষ অবশ হয়ে পড়ার উপক্রম, সেখানে জিমিনের অনুপস্থিতি আর প্রিয় বন্ধুদের এই রিক্ততা কাইয়ের ভেতরের সহনশীলতাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে। সে এক তপ্ত নিশ্বাস নির্গত করে ইরিনাকে উদ্দেশ্য করে মৃদু কণ্ঠে বলল:
-“ইরিনা, জিমিন এখন কিছুটা সুস্থ। ও তোর এই অবস্থা দেখলে ওটি-র বেড থেকে উঠে চলে আসবে। তুই প্লিজ কেবিনে গিয়ে একটু বিশ্রাম নে। রিদের জন্য ভেতরে ডাক্তারদের সেরা টিমটা লড়ছে, তুই নিজের পুচকে দুটোর কথা একটু ভাব ভাই।”
ইরিনা কিছু একটা ভেবে সরাসরি তাযিনের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো:-
-“তুই কি বাচ্চাদের বিষয়ে জানিস না তাযিন? আরজুর জ্ঞান ফিরেছে, একবারও যাবি না তুই তোর হার্টকে দেখতে?”
ইরিনার তীক্ষ্ণ প্রশ্নটি করিডোরের নিরেট বাতাসে আছড়ে পড়ল ঠিকই, কিন্তু চীনা পুরুষের পাথুরে অবয়বে কোনো চঞ্চলতা সৃষ্টি করতে পারল না। সে পূর্বের ন্যায় স্তব্ধ, নিস্পন্দ হয়ে বসে রইল। তার দৃষ্টি এখনও ওটি-র লৌহকঠিন দরজার ওপর স্থির, কিন্তু মনের গহীন কন্দরে যে এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বইছে তা বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান হলো না। যখন থেকে সেই নার্সদের ফিসফিসানি তার কর্ণগোচর হয়েছে যে—তাদের জমজ সন্তান ছিল এবং এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তার নিজের ঔরসজাত ছেলে সন্তানটি পৃথিবীর আলো দেখার পূর্বেই চিরতরে হারিয়ে গেছে, তখন থেকেই এক তীব্র অনুশোচনার অনল তার সমস্ত সত্ত্বাকে দগ্ধ করে চলেছে। এক অলীক অপরাধবোধের অন্ধকার চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে সে। তার অবশ স্নায়ু ভেদ করে স্মৃতির পাতাগুলো উল্টে গেল চার মাস আগের সেই দিনটিতে। যখন তাযিন বলেছিল তার কোনো ছেলে সন্তান চাই না। যদি কখনো চলেও আসে, তবে সে অনায়াসে তা অ্যাবোর্ট করে ফেলবে! তার জীবনে রিদ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো সন্তানের প্রয়োজন নেই, রিদ একাই তার সম্পূর্ণ পৃথিবী! সেই অতীত বাক্যগুলো তাযিনের মস্তিষ্কে কোনো বিষাক্ত তীরের ন্যায় বিঁধতে লাগল। এক সুগভীর আত্মগ্লানিতে তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। তবে কি তার সেই অহংকারী, অবিবেচকের মতো বলা কথাগুলোর জন্যই আজ নিয়তি এত বড় নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিল? তার নিজের মুখের অভিশাপই কি শেষ পর্যন্ত তার তার অনাগত পুত্রকে কেড়ে নিলো? নিজের কলিজার টুকরো রিদকে ভালোবাসতে গিয়ে সে কি নিজের অজান্তেই অন্য এক নিষ্পাপ প্রাণের নির্মম মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল? এই ভয়ানক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চীনা পুরুষের নিজেকে বড্ড পাপিষ্ঠ মনে হচ্ছে। নাহ হতে পারলো ভালো সন্তান আর না হতে পারলো ভালো বাবা। এই মুখ কিভাবে দেখাবে সে তার অর্ধাঙ্গিনীকে।ইরিনা তাযিনের এই অবিশ্বাস্য নীরবতা দেখে আরও কিছুটা এগিয়ে এসে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল:
-“তাযিন! তুই কিছু বলছিস না কেন? তোর কি নিজের স্ত্রীর জন্য একটুও কষ্ট হচ্ছে না? আরজু তোকে কত ডাকছিল!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এলেক্স আর কাই একে অপরের দিকে তাকায়। তারা ভালো করেই জানে, তাযিন এই মুহূর্তে কোন মানসিক নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে। সায়র ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তাযিনের কাঁধে হাত রাখল, তার সুঠাম হাতের স্পর্শেও আজ পরম বন্ধুর এই নীরবতার দেয়াল ভাঙা অসম্ভব বলে মনে হলো। তাযিন শুষ্ক ও ম্লান কণ্ঠে, যেন এক অন্য জগত থেকে ফিসফিস করে স্বগতোক্তির মতো অস্ফুটে বলে উঠল:
-“আমিই তো চেয়েছিলাম ও যেন না আসে... আমিই বলেছিলাম আমার রিদ ছাড়া কাউকে লাগবে না। এটা আমার পাপের শাস্তি ইরিনা... আমারই পাপের শাস্তি!”
ঠিক তখনই করিডোরের সেই রুগ্ন ও দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ওটি-র ভারী ধাতব দরজাটি এক কর্কশ শব্দে উন্মুক্ত হয়ে যায়। এতক্ষণের জমে থাকা নিস্পন্দ আবহে যেন এক আকস্মিক প্রলয়ঙ্কারী ঝড় আছড়ে পড়ল। দরজা খোলার চিরপরিচিত গম্ভীর আওয়াজ কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই এতক্ষণ ধরে মেঝের ওপর পাথরের মূর্তির ন্যায় বসে থাকা তাযিনের অবশ শরীরে এক অলৌকিক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল। সে সমস্ত জাগতিক অসাড়তা ঝেড়ে ফেলে এক উন্মত্ত, আহত পশুর ক্ষিপ্রতায় ছিটকে গিয়ে দাঁড়াল ওটি থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসা ধবধবে সাদা অ্যাপ্রন পরিহিত প্রধান চিকিৎসকের সম্মুখে। তাযিনের ফ্যাকাশে শুভ্র ললাটের নীল শিরাগুলো পুনরায় তীব্র আশঙ্কায় ও আতঙ্কে দপদপ কম্পমান হয়। নয়নযুগলে এতক্ষণের জমে থাকা মহাশূন্যতার হাহাকার লহমায় এক জলন্ত, ব্যাকুল অনলে রূপান্তরিত হয়েছে।
চিকিৎসক মুখাবয়ব থেকে সবুজ সার্জিক্যাল মাস্কটি সরাতেই তাঁর অভিজ্ঞ আঁখিদ্বয়ে পেশাদারী গাম্ভীর্যের পাশাপাশি এক পরম ক্লান্তি ও সুগভীর সহানুভূতির রেখা দৃশ্যমান হলো। তাযিনের এই চরম উন্মাদনা এবং পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এলেক্স, কাই, সায়র ও ইরিনার জলন্ত, স্থির দৃষ্টি অবলোকন করে তিনি এক সুদীর্ঘ ও ভারী নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাযিন উন্মাদের ন্যায় সম্মুখে দন্ডায়মান মানুষ্কটার হাত চেপে ধরে আকুল কন্ঠে জানতে চাইল:-
-“ডক্টর! আমার রিদ... আমার ছেলে চোখ মেলেছে? ও সুস্থ তো? ডক্টর, কিছু বলুন প্লিজ!”
ডক্টর তাযিনের হাতের মুঠো হতে নিজের অ্যাপ্রনটি আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে তার কাঁধে সান্ত্বনার হাত রাখলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর অত্যন্ত গম্ভীর ও বিষাদগ্রস্ত শোনাল, তিনি ধীর শান্ত গলায় বললেন:
-“মিস্টার কারহান, শান্ত হোন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সবটুকু চেষ্টা করেছি। বাচ্চার মাথায় অত্যন্ত গুরুতর ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়েছিল, যা বন্ধ করতে আমাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে। পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।”
ডক্টরের মুখ থেকে নির্গত প্রতিটি শব্দ যেন করিডোরে উপস্থিত মানুষগুলোর বুকে একেকটি তপ্ত সিসার মতো বিঁধতে লাগল। ইরিনা নিজের ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, আর সায়র শক্ত করে দেয়াল আঁকড়ে ধরল।
ডক্টর এক মুহূর্ত থামলেন, অতঃপর করিডোরের শূন্যতায় এক চরম ও অমোঘ সত্য ছুড়ে দিয়ে বললেন:
-“মেডিকেল সায়েন্সের পক্ষ থেকে যা যা করার ছিল, আমরা তার সবটুকুই করেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে রিদের জ্ঞান ফেরার বিষয়টি সম্পূর্ণ অলৌকিক এবং তা একমাত্র উপরওয়ালার ওপরই নির্ভর করছে। ইন্টারনাল ইনজুরির তীব্রতার কারণে এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে কিছুই বলা সম্ভব নয় যে আগামী কয়েক ঘণ্টা কী হতে চলেছে। আপনারা এখন সমস্ত হাহাকার বন্ধ করে সেই উপরওয়ালাকে ডাকুন। একমাত্র তিনিই পারেন এই নিষ্পাপ প্রাণটিকে ফিরিয়ে দিতে।”
কথাগুলো শেষ করেই তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না, অত্যন্ত ভারী ও ক্লান্ত কদমে করিডোরের অন্য প্রান্তে চলে গেলেন। ডক্টরের প্রস্থানপথের দিকে চেয়ে থাকা তাযিনের চোখের জ্বলন্ত অনলটুকু যেন এক নিমেষে নিভে গেল। সেখানে আর কোনো আকুলতা নেই, নেই কোনো উন্মত্ত হাহাকার। চীনা পুরুষ অনুভূতিহীন হয়ে পরলো নিজের কলিজার টুকরোর জীবনাশঙ্কা সংবাদ শ্রবণ করে। কোনো দিকে দৃষ্টিপাত না করে অগ্রসর হলো করিডোরের দিকে। সে রোবটের মতো যান্ত্রিক পায়ে করিডোরের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।
-“তাযিন! কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
পেছন থেকে এলেক্সের শঙ্কিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, সে ধাবিত হতে চাইল পরম বন্ধুর দিকে। কিন্তু সায়র তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে থামিয়ে দিলো। সায়র শূন্য দৃষ্টিতে তাযিনের চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে এক যন্ত্রণাকাতর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অস্ফুটে বলল:
-“যেতে দে ওকে। ওর ভেতরের ঝড়টা আমাদের ধারণ ক্ষমতার বাইরে। ও এখন একাই থাকতে চাইছে।তুই মিরিনের কাছে যা তোকে এই মুহূর্তে ওর বেশি দরকার!”
সায়রের শূন্য ও বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠের বারণ শুনে এলেক্স আর পা বাড়াল না। সে এক বুক গভীর উৎকণ্ঠা ও অসহায়ত্ব নিয়ে করিডোরের ঠান্ডা নিওন আলোর নিচে দাঁড়িয়ে রইল। তাযিনের সেই সুঠাম, দীর্ঘ অবয়বটি কোনো লক্ষ্য ছাড়াই রোবটের মতো যান্ত্রিক পদক্ষেপে হাসপাতালের কাঁচের স্বয়ংক্রিয় প্রধান ফটকটি অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে যায়।বাইরে তখন শেষ রাত্রির কৃষ্ণপক্ষের তিথি। নিঝুম অরণ্যের বুক চিরে ধেয়ে আসা এক হিমশীতল বাতাস ঢাকার নিস্তব্ধ রাজপথে আছড়ে পড়ছে। চারপাশের এই মহাশূন্যতা যেন চীনা পুরুষের ভেতরের রিক্ততারই এক বাহ্যিক রূপ। মস্তকের কোণে তীব্রতর ভাবে আঘাত হানছে নিজের অসহায়ত্ব। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে সে হাসপাতালের সীমানা ছাড়িয়ে অচেনা এক জনমানবহীন রাজপথে চলে এসেছে, তা তাযিনের অবশ স্নায়ু টের পায়নি। তার চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রুধারা ঝরছে, দৃষ্টি ঝাপসা। হঠাৎ এক তীব্র ক্লান্তিতে তার সুঠাম পদযুগল আর অবাধ্য অবয়বকে টেনে নিয়ে যেতে পারল না। টালমাটাল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একপর্যায়ে সে থমকে দাঁড়াল।তার ঝাপসা অক্ষিপটের সামনে ভেসে উঠল একটি প্রাচীন, সুউচ্চ মসজিদের অবয়ব। নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতায় মিনারটি আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে যেন এক পরম আশ্রয়ের বার্তা দিচ্ছে। মসজিদের বন্ধ প্রবেশদ্বারের সম্মুখে আসতেই তাযিনের ভেতরের সমস্ত শক্তির শেষ কণাটুকুও কর্পূরের ন্যায় উবে যায়।সুগভীর আত্মগ্লানি আর অনুশোচনার অনলে দগ্ধ হয়ে সে মসজিদের সিঁড়ির ওপর হাঁটু গেড়ে ধপাস করে বসে পড়ল।
তার সুদীর্ঘ দুই হাত অবাধ্যভাবে নিজের মুখমণ্ডল ঢেকে নিল। নিঝুম রাতের শীতল বাতাসকে সাক্ষী করে এক পাপিষ্ঠ পিতা, এক রিক্ত স্বামী নিজের সমস্ত অহংকার আর পাপের বোঝা নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার সেই অবরুদ্ধ কণ্ঠের আহাজারি যেন মসজিদের দেয়ালে দেয়ালে এক করুণ প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল। চোখের জল মেঝের ধূলিকণাকে ভিজিয়ে দিতে লাগল। শূন্য আকাশের দিকে দুই হাত প্রসারিত করে, এক ভাঙা, অবরুদ্ধ ও শুষ্ক কণ্ঠে বাচ্চার মতো আকুতি জানিয়ে তাযিন চিৎকার করে উঠল:
-“আল্লাহ! আমি পাপিষ্ঠ! আমি ভুল করেছি! আমার অহংকারের শাস্তি তুমি আমাকে দাও, কিন্তু আমার নিষ্পাপ রিদকে কেড়ে নিও না! ও তো কোনো অপরাধ করেনি!আমার ভুলের জন্য আমার ছেলেকে শাস্তি দিও না আল্লাহ... আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও!”
সেই নিশীথ রাতে, খোদার ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে এক অহংকারী পুরুষের দর্প চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে এক নিঃস্ব, ভিখারি পিতার আকুল ক্রন্দনে রূপান্তরিত হলো, যার শেষ সমীকরণ কেবল ওই উপরওয়ালার দরবারেই নিহিত।
চীনা পুরুষের বুকচেরা সেই আহাজারি আর অশ্রুসিক্ত অনুনয় গভীর অন্ধকারের স্তব্ধতা ভেদ করে যেন আরশের পানে ধাবিত হতে চাইল। জগতের সমস্ত শৌর্য-বীর্য যার চরণে একদা লুটিয়ে পড়ত, আজ সে নিস্পন্দ, ধূলামলিন সিঁড়িতে এক রিক্ত অপরাধীর ন্যায় নতজানু। ঠিক তখনই মসজিদের কাঠের ভারী প্রবেশদ্বারটি অত্যন্ত মৃদু এক কর্কশ শব্দে উন্মুক্ত হয়।জগতের সমস্ত শৌর্য-বীর্য যার চরণে একদা লুটিয়ে পড়ত, আজ সে নিস্পন্দ, ধূলামলিন সিঁড়িতে এক রিক্ত অপরাধীর ন্যায় নতজানু। ঠিক তখনই মসজিদের কাঠের ভারী প্রবেশদ্বারটি অত্যন্ত মৃদু এক কর্কশ শব্দে উন্মুক্ত হয়ে ভেতর থেকে নির্গত হওয়া ম্লান নিওন আলোর একফালি রেখা এসে পড়ল তাযিনের ক্রন্দনরত, শুভ্র মুখাবয়বের ওপর। সেই আলোকচ্ছটার সমান্তরালে ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ মানুষ। শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখাবয়ব, অঙ্গে সাদা পিরহান আর মাথায় সুতি টুপি পরিহিত প্রবীণ ইমাম সাহেবের দৃষ্টি পরলো তাযিনের উপর। নিশুতি রাতের এই প্রহরে এক সুঠামদেহী যুবকের এমন হৃদয়বিদারক আত্মহননের ন্যায় ক্রন্দনধ্বনি তাঁর শান্ত চিত্তকে আলোড়িত করছে।
তিনি সিঁড়ি বেয়ে ধীর কদমে নেমে এলেন তাযিনের সন্নিকটে। কোনো পার্থিব পরিচয় কিংবা কৌতূহলের বশবর্তী না হয়ে, তিনি কেবল এক পরম স্নেহের চাদরে জড়িয়ে নিলেন এই অপরিচিত নিঃস্ব মানুষটিকে। তাযিনের কম্পমান, অবাধ্য কাঁধের ওপর নিজের অতি বৃদ্ধ ও অভিজ্ঞ হাত রেখে বললেন:-
-“আল্লাহর দরবারে চাইতে এসেছ বুঝি? তাহলে ভেতরে এসো, ওযু করে নাও।”
ইমাম সাহেবের এই অতি সাধারণ, সাবলীল বাক্যটি তাযিনের অবশ স্নায়ুমণ্ডলী ও দগ্ধ হৃদয়ে এক পশলা বৃষ্টির ন্যায় শান্তি বর্ষণ করল। বিজ্ঞান যেখানে হাত তুলে নিয়েছে, নিয়তি যেখানে প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠেছে, সেখানে এই বৃদ্ধের সহজ আহ্বানটি যেন এক অলৌকিক আলোর দিশা দেখাল। চীনা পুরুষ নিজের অবরুদ্ধ কণ্ঠের জড়তা কাটিয়ে অস্ফুটে শুধাল:
-“তিনি কি আমার মতো পাপিষ্ঠের কথা শুনবেন? আমি যে অনেক বড় অপরাধ করেছি!”
ইমাম সাহেব আকাশের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে পুনরায় তাযিনের দিকে চাইলেন। তাঁর শান্ত চোখ দুটিতে এক গভীর বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠল।
-“তিনি রহমানুর রাহিম, বাবা। তাঁর দয়ার কোনো শেষ নেই। বান্দা যত বড় পাপিষ্ঠই হোক না কেন, অনুশোচনার জল নিয়ে তাঁর দুয়ারে দাঁড়ালে তিনি কখনো খালি হাতে ফেরান না। এসো, ভেতরে এসে ওযু করে তাঁর সামনে সেজদায় পড়ো। তিনিই তোমার মনের সব ঝড় শান্ত করে দেবেন।”
–--------
হাসপাতালের করিডোরের সেই রুগ্ন নিওন আলোর ফ্যাকাশে আভা তখন আরও বেশি বিষাদময় রূপ ধারণ করেছে। সময় যেন এক তপ্ত সিসার মতো থমকে আছে এই প্রসূতি বিভাগের প্রতিটি কোনায়।
কেবিনের ভেতর নিস্তব্ধতা ভেদ করে কেবল এক মায়ের বুকচেরা গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। বিছানায় শায়িত মিরিনের ফ্যাকাশে, লোনা জলে ভেজা মুখাবয়ব। কিছুক্ষণ পূর্বেই তার পূর্ণ জ্ঞান ফিরেছে, আর জ্ঞান ফেরার সাথে সাথেই নিয়তির সেই চরম সত্যটি তার মাতৃত্বের সমস্ত আকাশকে এক লহমায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। তার কোল আজ রিক্ত, শূন্য। এলেক্স কেবিনে প্রবেশ করা মাত্রই মিরিন তার দিকে নিজের অবশ, কাঁপাকাঁপা দুটি হাত বাড়িয়ে দিল। এলেক্স আর নিজের ভেতরের জমে থাকা পাথুরে কাঠিন্য ধরে রাখতে পারল না। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মিরিনকে নিজের সুঠাম বুকের মাঝে সজোরে জাপটে ধরল। মিরিন এলেক্সের শার্টের কলার দুটো খামচে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। শূন্যতা শেষমেশ মিরিনের মতো চঞ্চল রমণীকেও ছুঁয়ে দিলো।মিরিন কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা, অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলতে লাগল:
-“এলেক্স! কেন এমন হলো বলুন? কেন বাঁচালেন না আমাদের বাচ্চাটাকে? আপনি তো সব সিচুয়েশন সামলাতে জানেন, তাহলে কেন ডাক্তারদের বারণ করলেন না?কেন ঝুঁকি নিলেন না। আমার বুকটা যে ফেটে যাচ্ছে, এলেক্স!”
মিরিনের এই আর্তনাদ ও তীব্র আকুলতার জবাবে এলেক্সের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। কণ্ঠনালী ভেদ করে এক সুগভীর, যন্ত্রণাদায়ক নিস্তব্ধতা যেন পুরো কেবিনে আছড়ে পড়ল। যে পুরুষ সর্বদা পরিস্থিতির লাগাম নিজের শক্ত মুঠোয় ধরে রাখতে অভ্যস্ত, সে আজ নিজ অর্ধাঙ্গিনীর অবুঝ প্রশ্নের সম্মুখে সম্পূর্ণ নিরুত্তর, অপরাধীর ন্যায় দণ্ডায়মান। তার নিজের বুকের ভেতর যে এক সহস্র খঞ্জর অনবরত আঘাত করে চলেছে, সেই রক্তক্ষরণের খবর এই মুহূর্তে মিরিনকে দেওয়ার কোনো ভাষা তার জানা নেই। ‘আমি নিজেই আমাদের সন্তানকে বিসর্জন দিয়েছি’—এই অমোঘ ও নিষ্ঠুর সত্যের ভার এলেক্সের বলিষ্ঠ কাঁধটিকেও যেন এক নিমেষে নুয়ে দিল। মিরিনের কম্পমান অবয়বটিকে নিজের সুঠাম বক্ষের মাঝে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। এলেক্সের চোখ দুটি অদ্ভুত রকম স্থির ও পলকহীন হলেও, চোখের কোণ বেয়ে তপ্ত অশ্রুধারা অনবরত ঝরে পড়ে মিরিনের এলোমেলো চুলগুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। নিজের ভেতরের অবদমিত হাহাকারকে ইস্পাতকঠিন ধৈর্যের আবরণে ঢেকে রেখে, অত্যন্ত রুদ্ধ ও কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে সে বলল:
-“আ’ম সরি ওয়াইফি, আই কান্ট প্রটেক্ট হিম। আমি তোমাকে হারানোর রিস্ক নিতে পারিনি!”
কিন্তু এক জরায়ু-ছিন্ন, কোল খালি হওয়া মায়ের অবলা চিত্তে আজ সান্ত্বনার প্রলেপ বিন্দুমাত্র স্বস্তি দিতে পারল না। মিরিনের কাছে এই যুক্তিগুলো বড্ড অবান্তর, বড্ড নিষ্ঠুর মনে হলো। সে এলেক্সের শার্টের কলার আরও শক্ত করে খামচে ধরে, তার বুকের পাঁজরে নিজের মাথা কুটে অবাধ্য জেদে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্না মেশানো কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ কেবিনের ফ্যাকাশে দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল:
-“আমি কোনো নিয়মের কথা শুনতে চাই না, এলেক্স! আমি শুধু আমার বাচ্চা ফেরত চাই! ও তো আমাদের ভালোবাসার প্রথম স্পন্দন ছিল, ওকে কেন চলে যেতে দিলেন? আপনি কেন আমাকে আমার বাচ্চার সাথে মরতে দিলেন না? আমি এই শূন্যতা নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকব?”
যে পুরুষ কখনো কোনো পরিস্থিতিতে নিজের আবেগকে প্রকাশ হতে দেয়নি, আজ এক চরম শূন্যতার ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে ভীষণ রকমের অসহায়। চোখ বেয়ে অনবরত ঝরে পড়া তপ্ত অশ্রুধারা মিরিনের ফ্যাকাশে গালে আছড়ে পড়তে লাগল। অত্যন্ত রুদ্ধ, অবরুদ্ধ ও ভাঙা কণ্ঠে এলেক্স ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল:
-“কীভাবে তোমাকে মরতে দিতাম, মিরিন? কীভাবে? চার মাসের ওই না আসা স্পন্দনটার মায়া আমার বুকে যতটা না গভীরে শিকড় গেড়েছিল, তার চেয়ে সহস্র গুণ বেশি জায়গা জুড়ে তো তুমি আছো এই হৃদয়ে! ওই চিহ্নের সুধা আমি কাকে নিয়ে জড়াতাম যদি আমার পুরো পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যেত?”
মিরিন এলেক্সের এই নজিরবিহীন উন্মত্ত ক্রন্দন এবং চোখের অতলান্তিক হাহাকার দেখে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়।কিন্তু তার ভেতরের মাতৃত্বের অবদমিত ক্ষোভ ও জরায়ু হারানোর অলীক যন্ত্রণা তাকে পুনরায় এক হিংস্র ব্যাকুলতায় গ্রাস করল। সে এলেক্সের বুক থেকে নিজেকে সামান্য ছাড়িয়ে নিয়ে, শূন্য বিছানার চাদরটা মুঠো করে ধরে চিৎকার করে উঠল:
-“কিন্তু আমি যে আর কখনো মা হতে পারব না, এলেক্স! ডাক্তাররা যে আমার মাতৃত্বের শেষ সমীকরণটুকুও কেড়ে নিয়েছে! একি জীবন দিলেন আপনি আমাকে, যেখানে প্রতিটা লহমায় কেবল এই শূন্যতার বিষাক্ত দংশন সহ্য করতে হবে? এর চেয়ে কেন আমাকে চিরতরে ঘুমিয়ে যেতে দিলেন না?”
মিরিনের এই চরম ও নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এলেক্সের কণ্ঠরোধ হয়ে আসলো। এক সুগভীর আত্মগ্লানি ও অপরাধবোধের চোরাবালিতে তলিয়ে যেতে যেতে সে পুনরায় মিরিনকে নিজের বলিষ্ঠ বাহুর ঘেরাটোপে শক্ত করে জাপটে ধরল। যেন সামান্যতম আলগা হলেই তার জীবনের শেষ পূর্ণতাটুকুও এই অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাবে। সে মিরিনের কপালে নিজের ওষ্ঠাধর চেপে ধরে, এক বুক-চেরা দীর্ঘশ্বাস গোপন করার ব্যর্থ চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বলল:
-“আমি জানি আমি অপরাধী, মিরিন... নিজেকে নিজের সন্তানের খুনি মনে হচ্ছে আমার! কিন্তু খোদার কসম, যদি কখনো নিয়তি আমাকে পুনরায় এই নিষ্ঠুর পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়, আমি প্রতিবারই আমার সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে কেবল তোমাকেই ছিনিয়ে আনব। তুমি ছাড়া এই এলেক্সের কোনো অস্তিত্ব নেই, মিরিন... কোনো অস্তিত্ব নেই!”
বাইরে থেকে এই দৃশ্য অবলোকন করছে তটিনী, ইরিনা আর কাই।বন্ধুর জন্য তাদের অধরে ফুটে উঠেছে তৃপ্তির রেখা।
–-------
নিশুতি রাতের গাঢ় তিমির বিদায় নিয়ে প্রকৃতির বুকে তখন ম্লান উষার আগমন ঘটেছে। ঢাকার দিগন্তজোড়া ধূসর আকাশকে ভেদ করে উদীয়মান রবির কাঁচা সোনার ন্যায় আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে পড়ছে রাজপথে। রাতের হিমশীতল কুয়াশার চাদরখানি ক্রমশ পাতলা হয়ে এক অলীক বাষ্পের ন্যায় শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই নতুন ভোরের আলোও যেন সেই প্রাচীন, সুউচ্চ মসজিদের প্রাঙ্গণে জমে থাকা বিষাদের ঘন মেঘকে স্পর্শ করতে পারেনি।
মসজিদের অন্দরে প্রগাঢ় নিরবতা বিরাজমান। ম্লান নিওন আলোর জায়গাই স্থান করে নিয়েছে ভোরের স্নিগ্ধ আলো। যা বড় বড় কাঠের জানালা গলে এসে পড়েছে শীতল মেঝেতে। সেই নিস্পন্দ আলোর সমান্তরালে, মিহিন ধূলিকণা মাখানো জায়নামাজের ওপর তখনো এক সুঠামদেহী পুরুষ নিথর পাথরের ন্যায় পড়ে রয়েছে। পুরো রাত এভাবেই সেজদায় পরে ছিল তাযিন। একমুহূর্তের জন্যও মাথা তোলেনি সে, তার কপাল মাটির বুকে এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেন এক দর্পী সম্রাট তার সমস্ত জাগতিক শৌর্য-বীর্য, অহংকার আর প্রতিপত্তির রাজমুকুট খোদার চরণে সমর্পণ করে এক পরম আশ্রয়ের খোঁজে নতজানু হয়েছে। তার দীর্ঘ পিঠটি এখনো অনবরত কান্নার তীব্র বেগে থরথর করে কাঁপছে, আর চোখের লোনা জল জায়নামাজের মখমলি সুতোগুলোকে ভিজিয়ে একাকার করে দিয়েছে।
-“তাযিন আর কতো কাঁদবে?”
অতিপরিচিত কন্ঠে অপরিচিত ডাক শুনে থমকে যায় চীনা পুরুষ। তবুও ব্যস্ততা দেখায় না ধীরেসুস্থে মাথা তুলে সালাম ফিরিয়ে চকিতে পিছনে ফিরে। পাশাপাশি দুটো হুইলচেয়ারে হাস্যজ্বল মুখে বসে আছে তার অতি কাছের দুইজন, তার ওয়াইল্ড রোজ আর কলিজার টুকরো সন্তান। অবুঝ রিদের ক্ষুদ্র নাসিকার ওপর এখনো অক্সিজেন মাস্কটি চেপে বসা, যার ভেতরের বাষ্পে প্রতি লহমায় প্রমাণ মিলছে তার সচল ফুসফুসের অস্তিত্বের। আর আরজুর ফ্যাকাশে, ধবধবে শুভ্র হাতে বিঁধে থাকা ক্যানুলা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা স্যালাইন তার দেহে নতুন জীবনের সঞ্চার করছে। সেই দুই হুইলচেয়ারের হাতল শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরে পরম ভরসার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সায়র এবং ফারাহ। তাযিন তার কম্পমান বলিষ্ঠ অবয়বটিকে জায়নামাজের ওপর থেকে কোনোমতে টেনে তুলল। অবাধ্য অশ্রুধারা তার গাল বেয়ে অনবরত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু এবার সেই অশ্রুতে কোনো গ্লানি নেই, নেই কোনো বিষাক্ত অনুশোচনার অনল; কেবল রয়েছে এক পরম প্রাপ্তির মহিমান্বিত হাহাকার। সে দুই হাত বাড়িয়ে টালমাটাল পায়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে চাইল, কিন্তু অতিরিক্ত দুর্বলতায় তার পদযুগল কেঁপে উঠল। ভাঙা, অবরুদ্ধ, বাচ্চার মতো আকুল কণ্ঠে সে অস্ফুটে ডাকল:
-“মাই হার্ট এন্ড মাই বয়!”
চীনা পুরুষের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে গাল বেয়ে অশ্রুধারা বয়ে গেলো আরজুর। স্বামী নামক আপন পুরুষ টার এই নিখুঁত ভালোবাসা দেখে অবাক নাহয়ে পারলো না রমণী। নিজের অবশ হাতটি হুইলচেয়ারের হাতল থেকে সামান্য বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ কিন্তু অমৃতময় কণ্ঠে বলল:
-“এইযে মি.বেহায়া পুরুষ, আপনার ছেলে ঠিক হয়ে গেছে। হ্যাঁ এখনো কিছুদিন তার বেড রেস্ট প্রয়োজন ইঞ্জুরিও সারা লাগবে কিন্তু সে তার বাবাকে না দেখে থাকতে পারছিলো না তাই তো এম্বুল্যান্স নিয়ে লোকেশন ট্র্যাক করে চলে আসছে।”
অক্সিজেন মাস্কের ভেতর থেকেই রিদ তার ছোট্ট, আধো-বোজা চোখ দুটি মেলে তাযিনের দিকে তাকাল। তার ক্ষুদ্র হাতটি অতি সামান্য নড়ে উঠল, যেন সে তার ড্যাডার সেই চিরপরিচিত স্পর্শের ব্যাকুলতা টের পেয়েছে। ইমাম সাহেবের বলা সেই অমোঘ সত্য—‘তিনি রহমানুর রাহিম’—আজ তাযিনের চোখের সামনে এক জীবন্ত উপাখ্যান হয়ে ধরা দিল। বিজ্ঞান যেখানে হাত তুলে নিয়েছিল, সেখানে এক পাপিষ্ঠ পিতার অনুশোচনার জলের করুন দৃশ্য থেকে আরশের মালিক মুখ ফিরিয়ে নেননি। সায়র তাযিনের এই অবিশ্বাস?
