সাফওয়ানকে দেখে আরিশা মনে মনে খুশি হলেও মুখে তা প্রকাশ করল না। কিন্তু এই মুহূর্তে সে রীতিমতো ভয়ে কাঁপছে, নিজের শরীরের সেই মৃদু কম্পন সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। ভয় পাবেই না বা কেন? সাফওয়ান যেভাবে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তাতে মনে হচ্ছে সে যেন চোখ দিয়েই ওকে ভস্ম করে দেবে! তার নীলাভ চোখ দুটো দিয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে। আরিশা একটা শুকনো ঢোক গিলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে তাড়াহুড়ো করে বলল—
– “বাকি কথাটুকু আবার পরে ক্লাসে বলব, তুই এখন যা!”
ছেলেটি হেসে মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে চলে গেল। এদিকে সায়রা ভাইয়ের চোখ-মুখ দেখেই বুঝতে পারল তার ভাই চরম রেগে আছে। সে ভাইয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে আরিশা আর ওই ছেলেটিকে দেখে ভাইয়ের মনের অবস্থাটা বেশ টের পেল। হায় রে! তার ভাইয়ের বুকে এখন হিংসার মারাত্মক আগুন জ্বলছে। সেই আগুন আর একটু বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সায়রা দুষ্টুমি করে বলে উঠল—
– “ভাইয়া, চলো আরুকে অভি ড্রপ করে দেবে। আজকাল ওদের দুজনের খুব ভাব হয়েছে! চলো ভাইয়া।”
সায়রার কথা শুনে সাফওয়ানের আকর্ষণীয় চোয়াল জোড়া আরও শক্ত হয়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আরিশার দিকে। আরিশা কিছুতেই বুঝতে পারছে না এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে কী! সে এমন কী অপরাধ করেছে যে লোকটা আস্ত গিলে ফেলার মতো করে তাকিয়ে আছে? সাফওয়ান সায়রাকে গাড়িতে বসতে বলে ধীর পায়ে আরিশার দিকে এগিয়ে গেল। কোনো কিছু না বলেই সে আরিশার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে গাড়ির সামনের সিটে বসিয়ে দিল। আরিশা পুরো হকচকিয়ে গেল! সাফওয়ানের এমন আচমকার ব্যবহারের কোনো কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। সায়রা আরিশাকে সামনে বসার সুযোগ করে দিয়ে নিজে পেছনের সিটে আরাম করে বসল। সাফওয়ান গাড়িতে উঠে আরিশাকে গম্ভীর গলায় সিট বেল্ট বেঁধে নেওয়ার নির্দেশ দিল।
আরিশা এবার নিজের রাগ আর সামলাতে পারল না, গাড়ির ভেতরেই চিৎকার করে উঠল—
– “এই! আপনার সমস্যাটা কী, হ্যাঁ? এসেই আমার সাথে এরকম বিহেভ করার মানে কী?”
সাফওয়ান অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল—
– “নেক্সট টাইম যদি অন্য কোনো ছেলের কথায় ওভাবে হাসো, সো আই উইল মেক সিওর—তোমার হাসার মতো গালটাই যেন আর আস্ত না থাকে! অন্য কারো সাথে হাসার শখ জন্মের মতো মিটিয়ে দেব।”
সাফওয়ানের এমন শান্ত অথচ মারাত্মক সুরের হুমকি শুনে আরিশা সত্যি ভয় পেয়ে গেল। সে নিজের মুখটা দুই হাতে ঢেকে সিটের সাথে লেপ্টে রইল। আরিশার সেই অবস্থা দেখে সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণে এক সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল, যা আরিশার অগোচরেই রয়ে গেল। সায়রা পেছনের সিটে বসে ভাইয়ের এমন তীব্র জেলাসি দেখে মনে মনে প্রচুর হাসছে, কিন্তু বড় ভাই বলে মুখে কিছু বলতে পারছে না। সে আলতো করে ফোনটা বের করে আরিশাকে একটা টেক্সট পাঠাল।
টেক্সটের নোটিফিকেশন পেয়ে আরিশা ফোন অন করে সায়রার মেসেজটা দেখল। মেসেজটা দেখেই আরিশা চোখ গরম করে পেছনের সিটে বসা সায়রার দিকে তাকাল। সায়রা দাঁত কেলিয়ে হেসে আরিশাকে আরও খেপিয়ে তুলল। টেক্সটটা ছিল ঠিক এরকম—
– “আরু, তোর সাইকো আশিকের আশিকিগিরি এবার সামলা! তোর তো খুব শখ ছিল একটা পজেসিভ সাইকো আশিকের, এবার ঠেলা সামলা!
”
আরিশার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। সাফওয়ান এমন আচরণ কেন করছে? এই লোক নিজে অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসে, অথচ তাকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে! বলে কিনা অন্য কারো কথায় হাসলে হাসার গালটাই আস্ত রাখবে না! এহহ… মগের মুল্লুক পেয়েছে নাকি? আমি একশো বার হাসব, দেখব কোন খাটাশ কী করতে পারে! ঠিক তখনই সাফওয়ানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে আরিশা আবার ভয়ে জমে গেল—
– “আমি ঠিক কী কী করতে পারি, তা তোমার ধারণার বাইরে, আরেকবার চেষ্টা করে দেখো তোমার গাল আস্ত থাকে কিনা। চাপড়ে গালের হাড় ভেঙে দেব। ইডিয়ট!”
আরিশা আর কিছু ভাবতেই পারল না। এই লোক… সে মনে মনে কী ভাবছে তা কীভাবে বুঝতে পারছে! সাফওয়ান আবারও বলল—
– “স্টুপিড, বেশি ভাবা বন্ধ করো। এত ছোট মাথায় এত চাপ নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।”
আরিশা কী করবে আর কী বলবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। আশ্চর্য! এই লোক কি মনের কথাও পড়তে পারে নাকি? সে কী ভাবছে, তাও এই লোক হুবহু বলে দিচ্ছে কীভাবে!
~~~~~~~~~~~~~
সাফওয়ান আসলে শাহরিয়ার ভিলায় ঢুকতে চায়নি। আরিশা আর সায়রাকে গেটে নামিয়ে দিয়েই সে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু সায়রা তাকে কিছুতেই যেতে দিল না। সে জোর করে ভাইয়ের হাত ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এল এই বলে—
– “ভাইয়া, তোমার ওই ফ্ল্যাটে এখন একা একা কে থাকবে? সেখানে তো এখনও রান্নাবান্নাই কিছু হয়নি! তুমি কখন রান্না করবে আর কখন খাবে? তার চেয়ে এখানে আসো, ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি খাবারের ব্যবস্থা করছি, তুমি খেয়ে তারপর যেও। বরং আজকে রাতটা তুমি এখানেই থেকে যাও না!”
সাফওয়ান তবুও রাজি হতে চাইছিল না, কিন্তু সায়রার নাছোড়বান্দা জেদ আর জোরাজুরির কাছে শেষমেশ তাকে হার মানতেই হলো। সাফওয়ানকে হঠাৎ বাড়িতে দেখে শারমিন শাহরিয়ার ভীষণ খুশি হলেন এবং তড়িঘড়ি করে খাবারের ব্যবস্থা করতে রান্নাঘরে গেলেন। ওদিকে সায়রা ড্রাইভারকে ডেকে সাফওয়ানের লাগেজগুলো ভেতরে নিয়ে আসার জন্য বলল। শারমিন শাহরিয়ার আরিশাকে ডেকে বললেন সাফওয়ানকে গেস্ট রুমে নিয়ে যেতে। আরিশার মনে মনে একদম ইচ্ছে না থাকলেও, মায়ের কথার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস তার নেই। তাই সে বাধ্য হয়ে সাফওয়ানের লাগেজসহ তাকে নিয়ে এগিয়ে গেল, আর সায়রা ফ্রেশ হয়ে এসে শাশুড়ির সাথে রান্নাঘরের কাজে হাত লাগাল।
গেস্ট রুমের সামনে এসে আরিশা সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত উদাসীন গলায় বলল—
– “এই যে, আপনার রুম!”
আরিশার কথা বলার এই অবহেলা মাখানো টোনটা সাফওয়ানের মোটেও পছন্দ হলো না। তার কণ্ঠে এমন উদাসীনতা দেখে সাফওয়ান বেশ রুক্ষ গলায় বলে উঠল—
– “কেমন মেয়ে তুমি? বাড়ির একজন গেস্টকে রুমের বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে রেখেই বিদায় হতে চাইছ? আর বলছ ‘এই যে আপনার রুম’! এতটুকু জানো না যে গেস্ট আসলে রুমে সব ঠিকঠাক গুছিয়ে দিয়ে যেতে হয়?”
আরিশা মুখটা বাঁকিয়ে বলল—
– “আমি কেন ঠিক করতে যাব, হ্যাঁ? থাকবেন আপনি, আপনিই নিজের মতো ঠিক করে থাকুন। আর আমি যতদূর জানি, আমাদের বাড়ির সব রুম সবসময় পরিষ্কার আর গোছানোই থাকে। বাকিগুলো আপনি নিজেই গুছিয়ে নিন।”
সাফওয়ান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল—
– “শাহরিয়ার বাড়ির মেয়ের যে ন্যূনতম ম্যানার্স বা সৌজন্যবোধটুকুও নেই, তা এখন বেশ ভালোই বুঝতে পারছি।”
আরিশা তেড়ে উঠে বলল—
– “একদম বাজে কথা বলবেন না! আমার মধ্যে যথেষ্ট ম্যানার্স আছে। শুধু সামনের মানুষটা কেমন, তার ওপর নির্ভর করে আমার ম্যানার্স কমবে নাকি বাড়বে!”
সাফওয়ান আরিশার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল—
– “তুমি নাকি আমাকে ভালোবাসতে? এই কি তোমার সেই ভালোবাসা?”
আরিশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলেও সে বাইরে নিজেকে শক্ত রাখল। এক পলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল—
– “সেই ভালোবাসাকে তো আপনি নিজের হাতে গলা টিপে মেরে ফেলেছেন! মানুষ জীবনে ভুল একবারই করে, আমিও ভুলটা একবারই করেছি। দ্বিতীয়বার সেই ভুল করার কোনো চান্স নেই।”
আরিশার এই কঠিন কথা শুনে সাফওয়ান চুপ হয়ে গেল। সে বেশ অদ্ভুত দৃষ্টিতে আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল—
– “মাত্র তিন মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল তোমার ভালোবাসা? তার মানে আমি ঠিকই ভেবেছিলাম, আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা ওটা শুধুই ক্ষণিকের মোহ ছিল, যা সময়ের সাথে সাথে কেটে গেছে।”
সাফওয়ানের এই কথার জবাবে আরিশা আর নিজেকে জড়াল না। সে নিজেকে শান্ত রেখে বলল—
– “যা ভাবার ভাবুন, মোহ নাকি ভালোবাসা—তাতে আমার এখন আর কিছুই যায় আসে না। এখন দয়া করে ফ্রেশ হয়ে নিন।”
কথাটা বলেই আরিশা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না, হনহন করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। আরিশার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বলল—
– “মোহ কিংবা ভালোবাসা, যাই হোক না কেন—তুমি আমার জীবনে এসেছো। আমি নিজে তোমার কাছে যাইনি, আর একবার যখন আমার সীমানায় এসেছ, ভালোবাসা না থাকলেও তোমাকে আমার হয়েই থাকতে হবে। সাফওয়ান চৌধুরী একবার যে জিনিসের ওপর নজর দেয়, সে জিনিস যেকোনো মূল্যে নিজের করেই ছাড়ে।”
কথাগুলো আপনমনে বলেই সে নিজের লাগেজটা টেনে নিয়ে গেস্ট রুমে ঢুকে পড়ল।
এদিকে আরিশা নিজের রুমে এসে ধপ করে বিছানায় বসল। সে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল—
– ‘আমার ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়নি মিস্টার চৌধুরী! আমি আপনাকে তিন মাস আগেও যেরকম ভালোবেসেছি, এখনও ঠিক সেরকমই বাসি, আর ভবিষ্যতেও বাসব। কিন্তু আমি আগে আপনার লুকানো সত্যিটা জানতে চাই। হয় আপনি নিজে থেকে বলবেন, না হলে আপনার মুখ থেকে আমি বলাব! যে অবহেলার কষ্ট আমি এতদিন একা পেয়েছি, তার কিছুটা হলেও এবার আপনাকে ফিল করাবো।’
~~~~~~~~~~~~~~
সাফওয়ানসহ আরিশা ও সায়রা—তিনজনই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করেছে। সাফওয়ান এত দীর্ঘ জার্নি করে এসেছে বলে শারমিন শাহরিয়ার তাকে গেস্ট রুমে একটু বিশ্রাম নিতে বলেছেন। সাফওয়ান সায়রাকে নিজের রুমে ডেকে তার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে আনা লাগেজ ভর্তি সব উপহার সায়রার হাতে তুলে দিল। সুস্থ হওয়ার পর বোনের জন্যই মূলত এই শপিংগুলো পরম যত্নে করেছে সাফওয়ান। সায়রা সেগুলো একপাশে রেখে ভাইয়ের সাথে গল্প করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সায়রার কোনোকালেই টাকা-পয়সা কিংবা দামি উপহারের প্রতি তেমন কোনো লোভ বা ঝোঁক ছিল না; সে তো শুধু চায় তার আপনজনদের, যারা তার সুখ-দুঃখে সবসময় হাসিমুখে পাশে থাকবে। সায়রা ভাইয়ের অপারেশন করানোর সময় কেমন লেগেছিল, কোনো ব্যথা পেয়েছে কি না, এখন সব ঠিকঠাক আছে কি না—সেসব খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞেস করছে। আর সাফওয়ানও খুব ধীরস্থিরভাবে বোনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করছে।
অনেকক্ষণ গল্প করার পর সায়রা যখন নিজের রুমে ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো, তখন সাফওয়ান তাকে ডেকে আরও একটি লাগেজ সায়রার হাতে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
– “পুতুল, এটা আরিশাকে দিয়ে দিস।”
সায়রা কিছু না বলে মুচকি হেসে লাগেজটা হাতে তুলে নিল। ছোট ভাই হলে না হয় এই নিয়ে একটু খ্যাপানো বা মজা করা যেত, কিন্তু গম্ভীর বড় ভাইয়ের সামনে কি আর এসব মজা করা যায়! সায়রা লাগেজটা নিয়ে সোজা আরিশার রুমে গেল এবং তা আরিশার সামনে রেখে আরিশার দিকে তাকিয়ে রইল। আরিশা লাগেজটা দেখে দুই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—
– “এই লাগেজটা কার রে সারু? এখানে নিয়ে এসেছিস কেন?”
সায়রা কথার সুর টেনে টেনে ও রহস্যময় হেসে বলল—
– “এটা তোর মিস্টার চৌধুরী তোর জন্য সিঙ্গাপুর থেকে নিয়ে এসেছেন! দেখ দেখ, খুলে দেখ কী কী এনেছেন, তোর পছন্দ হয় কি না!”
সায়রার কথা বলার এমন চপল ধরন দেখে আরিশা এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে পড়ে গেল। তার বুকটা ধক করে উঠল; মনে হচ্ছে যেন মিস্টার চৌধুরীর সাথে তার কোনো গোপন প্রেম ছিল, যা এখন সায়রার কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে! সে নিজের অস্বস্তি লুকাতে চেঁচিয়ে বলল—
– “আমার জন্য কেন আনতে যাবে এসব, হ্যাঁ? এগুলো তোর, তুই-ই নিয়ে নে! তোর ভাইয়ের সাথে কি আমার কোনো রিলেশন ছিল যে তুই এভাবে বলছিস? নিজের কথার টোন ঠিক কর সারু, কেমন যেন শোনাচ্ছে!”
আরিশার এমন আমতা আমতা করা কথায় সায়রার মুখের হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল। সে আরিশার আরও কাছে গিয়ে চোখ টিপে বলল—
– “আরু! ঠিক কেমন শোনাচ্ছে রে?”
আরিশা এবার লজ্জায় ও রাগে বিছানার বালিশটা টেনে নিয়ে বলল—
– “যা এখান থেকে! আমার কোনো গিফট-টিফট লাগবে না। তোর ভাইয়ের জিনিস তুই গিয়ে তোর ভাইয়াকেই ফেরত দিয়ে আয়!”
সায়রা এবার হাসতে হাসতে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল—
– “আমি পারব না! তোর মিস্টার চৌধুরী এটা স্পেশালভাবে শুধু তোর জন্যই দিয়েছেন। তোর যদি না লাগে, তবে তুই নিজে গিয়ে ভাইয়ার রুমে দিয়ে আয়, আমি পারব না! তোদের দুজনের মাঝে এসে আমি কেন শুধু শুধু ‘কাবাব মে হাড্ডি’ হতে যাব?”
সায়রা কথাগুলো বলেই আর পেছন ফিরে তাকাল না। সে হাসতে হাসতে গটগট করে চলে গেল নিজের রুমের দিকে।
ওদিকে সায়রার শেষ কথাটা শুনে আরিশা একদম থম মেরে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। সে অবাক হয়ে ভাবছে— ‘সারুটা ইদানীং কিরকম করে কথা বলছে তাকে লজ্জা দিচ্ছে? মিস্টার চৌধুরী আসার পর থেকেই কেমন যেন বাঁকা বাঁকা কথা বলে আমাকে জড়িয়ে খ্যাপাচ্ছে! এই সবকিছুর মূলে ওই খাটাশ বেডা, মিস্টার চৌধুরী! অসহ্য!’
আরিশা বিরক্তি হয়ে লাগেজের দিকে তাকাল। তার এখন ইচ্ছে করছে লাগেজটা নিয়ে সোজা ওই খিটখিটে লোকটার মাথায় মারতে! তাকে এত কষ্ট দিয়ে এখন আবার কিসের গিফট দেওয়া হচ্ছে? শালা খাটাশ ব্যাটা! তবুও অবাধ্য মনটা ভেতর থেকে বারবার সায় দিচ্ছে—‘একবার খুলেই দেখ না, লোকটা কী এনেছে! হাজার হোক, ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া জীবনের প্রথম উপহার বলে কথা!’
এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই আরিশা ঝটপট গিয়ে নিজের রুমের দরজাটা লক করে দিল। তারপর লাগেজটা টেনে নিয়ে খাটের ওপর বসল। বুকটা ধকধক করতে থাকা অবস্থায় লাগেজটা খুলতেই তার চোখ জুড়িয়ে গেল। ভেতরে সুন্দর করে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন স্বাদের নামিদামি ব্র্যান্ডের ডার্ক চকলেট ও হোয়াইট চকলেট, একটা চমৎকার সুবাসের পারফিউম, হিজাব আর বোরকা সাথে পরার মতো কিছু আকর্ষনীয় ব্রোচ; আর তার ঠিক পাশেই রয়েছে একদম লেটেস্ট মডেলের একটা আইফোন সেভেন্টিন প্রো ম্যাক্স!
আরিশা নতুন ফোনটা হাতে নিয়ে গভীর ভাবনায় পড়ে গেল। কিছুদিন আগে তার নিজের ফোনটা ব্ল্যাকআউট হয়ে গেছে, সে কথা তো সে এখনও বাড়ির কাউকেই বলেনি! তাহলে মিস্টার চৌধুরী জানল কী করে যে তার একটা নতুন ফোনের প্রয়োজন? ভাবতে ভাবতেই আরিশা হঠাৎ মনের ভেতর এক তীব্র ধাক্কা খেল, চমকে উঠে ভাবল—‘কোনোভাবে সেই বেনামী আইডি থেকে আমাকে সারাক্ষণ মেসেজ দেওয়া রহস্যময় লোকটা মিস্টার চৌধুরী নয় তো?’
পরক্ষণেই সে মাথা ঝাকিয়ে নিজের ভাবনাটাকে উড়িয়ে দিয়ে ভাবল—‘না না, আমি আবার কীসব উল্টোপাল্টা ভাবছি! হয়তো এমনিতেই এনেছেন ওনার বোনের বান্ধবীর জন্য। এই খাটাশ ব্যাটা যে সামনে আসলে দুটো ভালো কথাও বলে না, তাকে নিয়ে আমি একটু বেশিই ভেবে ফেলছি। লোকটা তো এখনও আমার সাথে ঠিকঠাক করে কথাই বলতে চায় না!’
আরিশা বিছানায় হেলান দিয়ে আইফোনটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—‘আমি এখনও নিশ্চিত হতে পারছি না যে মিস্টার চৌধুরী সত্যিই অন্য কোনো মেয়েকে ভালোবাসে কি না। সেদিন সারুকে আর কী কী বলেছিল, তা তো জানতে হবে, সারুটাও আমাকে বলছে না! উল্টো বলছে ভাইয়ার নিজের মুখ থেকে শুনতে! আমাকে যেকোনো মূল্যে জানতেই হবে মিস্টার চৌধুরীর মনে কি চলছে!”
নোট: ১.২ কে রিয়েক্ট পূরণ হলে পরবর্তী পর্ব আসবে
গল্প পড়ে মন্তব্য করো ভালো খারাপ যেটাই হোক মন্তব্য করো। তাড়াতাড়ি টার্গেট পূরণ করো আপুরা
আরাভ শাহরিয়ার কে মিস করছো আপুরা?? বড় বড় মন্তব্য করো! তোমাদের কমেন্ট পড়তে আমার প্রচুর ভালো লাগে, গল্প লেখার উৎসাহ পাই। হ্যাপি রিডিং আপু'রা এন্ড ভাইয়া'রা

